গলনাঙ্ক

208

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিঁড়ির ওপর বসে পড়েন রঘুবীর, হাঁটুতে মাথা গুঁজে দেন | পিঠ কাঁপতে থাকে | কাঁদছেন রঘুবীর চৌধুরী? সে ভাবে যতটা দেখাচ্ছে রঘুবীর তার চেয়ে অনেক বেশি বিধ্বস্ত | তার ক্লান্ত লাগে, সারাদিন, সরাদিন ছুটোছুটি, না খাওয়া এবার ধ্বনিত হয় তার শরীরের ভেতর, সেই সঙ্গে চোখ জ্বালা করে, নাক জ্বালা করে, বৃষ্টির জল গায়ে মেখে এতক্ষণ বসে থাকার এফেক্ট! বড়িটা ওই অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে, রঘুবীর চৌধুরীর ওই প্রতিক্রিয়া ওই ত্রাস দেখে তার কিছুটা টেনশন হয়েছিল — এ কথা অনস্বীকার্য | কৌতুহলও জেগেছিল কিছুটা | কিন্তু এবার সে বাড়ি ফিরতে চায়, ‘আমি যাই এবার, দরজাটা বন্ধ করে দিন |’ বলে সে |

বিহ্বল অবস্থাটা কাটেনি রঘুবীরদার, ‘ কি করে এরকম হতে পারে? দরজাটা খোলা পড়ে রইল কিন্তু কেউ ঢুকল না?’
‘ হয়ত কেউ ঢুকেছিল, আমরা তা জানতে পারব না | পাড়া-প্রতিবেশী কেউ ঢুকতে পারে, দরজা খোলা দেখেই ঢুকতে পারে, চোর বা খারাপ লোকই ঢুকবে সবসময় এমন কোনও কথা নেই | সব যখন ঠিকই আছে, জিনিসপত্র তছনছ হয়নি, কিছু খোয়া যায়নি তখন ধরে নিতে হবে কেউ ঢুকে থাকলেও সে বদমাইশ নয় | এবার আপনি শান্ত হন রঘুবীরদা |’ সে লক্ষ্য করল রঘুবীরদার চোখ মুখ আবার পাল্টে যাচ্ছে, কিছু একটা দুশ্চিন্তা আবার ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে | ‘ কি ভাবছেন?’

‘ একমাত্র বাড়িটা জানে কেউ ঢুকেছিল কিনা, আমি জানি না | বাড়িটার সঙ্গে আমার এতদিনের সম্পর্কে চিড় ধরে গেল গর্বী!’ থেমে থেমে বলে ওঠেন রঘুবীর চৌধুরী |

ফ্ল্যাটে ফিরেই গিজার অন করল সে | স্নান করল ভালো করে | ফ্রিজে ব্রেড, বাটার, চীজ, ডিম সবই আছে | কিন্তু তার ইচ্ছে করল ভাত খেতে | ভাত, ডিমের অমলেট | সাহানা বিদেশ থেকে সব সময়ই নানা রকম লিকার-টিকার এনে জমায় বাড়িতে | কচ্বিৎ কদাচিৎ দুজনে সন্ধেটা একসঙ্গে কাটালে কিছু একটা খুলে-টুলে বসে | আজ গর্বী নিজের জন্য একটু ব্র্যান্ডি ঢালল গ্লাসে | চুমুক দিতে দিতেই ভাত নেমে গেল তার | খেতে বসবে, ফোন! রাস্তায় থাকতে ফোন বেজেছিল তার্ | তারপর থেকে এখন অবধি সে ভুলেই গেছিল ফোন নামক বস্তুটর কথা! যশমাল্য ফোন করছে, ‘কোথায় ছিলিস? ফোন-টোন ধরিস না?’

‘ও, হ্যাঁ | বৃষ্টিতে আটকে গেছিলাম!’ সে এড়িয়ে গেল প্রসঙ্গটা |

‘ খুব টায়ার্ড?’

‘ভীষণ?’

‘ভিজেছিস?’

‘হুঁ’

‘আচ্ছা, লিসন, কাল রাতে রাহুল আসছে আমার এখানে | রানী বলল সবাইকেই ডাকো | একটা ছোটখাটো পার্টিই অ্যারেঞ্জ করতে হবে ধরে নে! তোকে আর সকালে আসতে হবে না | ইউনিভার্সিটি থেকে ডাইরেক্টলি আয় | আমরা একটু কাজ নিয়ে বসব, তারপর আটটা নাগাদ গেস্টরা আসবে | লেট নাইট হয়ে গেলে আমি তোকে ড্রপ করে দেবো | বা তোর ইচ্ছে হলে আমার কোলে ঘুমোতে পারিস! ভোঁদাইটা!’

‘ ধ্যাৎ!’

‘ সত্যি! ঘুমোলে তোকে ঠিক ভোঁদাই-এর মতো দেখায় | ছবি তুলে দেখাবো | সরল সাদাসিধে গর্বী মুর্মুর!’

‘তুমি প্রকারান্তে কমপ্লিকেটেড বলছ আমাকে!’

‘তুই তাই বটেই! সারাক্ষণ নিজের স্বাধীনতা হারানোর চিন্তায় তটস্থ থাকে যে সে যথার্থই জটিল্ |’ এই কথা যশ তাকে প্রায়শই বলে, যশের বক্তব্য ‘প্রতিটা মানুষেরই নিজস্ব কতগুলো ফোবিয়া থাকে | তুই এখনও সেটা খুঁজে পাসনি | আমি তোকে খুঁজে দেবো একদিন! ইডিওলজি অফ ফিয়ার অনুযায়ী তোর এই অতিরিক্ত স্বাধীন থাকার ইচ্ছেটাই ধীরে ধীরে গ্রাস করছে তোকে, স্বাধীনতা হারানোর ভয়ে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে হানি!’ রঘুবীর চৌধুরীর সঙ্গে আজ যে ভাবে কাটল সন্ধেটা তাতে ভয় শব্দটাকে প্রায় চাক্ষুষ দেখতে পেয়েছে গর্বী | এখন সে স্বাধীনতা বা স্বাধীনতা হারানোর ভয় কোনও কিছু নিয়েই আলোচনায় যেতে রাজি নয় | ফোন ছেড়ে দিল সে | তখন একটা মেসেজ পাঠাল যশমাল্য, ‘মিসিং ইউ’ এই এস এম এস্-টার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাত খাওয়ার ইচ্ছে চলে গেল তার্ | একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কোনমতে খেয়ে উঠল সে | দাঁত ব্রাশ করে শুতে চলে গেল | তখনই চিন্তাটা মাথায় এল তার, মনে হল, সত্যি তো যখন সে নেই এই ফ্ল্যাটে তখন যদি কেউ তার বা সাহানার অজান্তে ঢুকে আসে ফ্ল্যাটে, চুরি-টুরি কিছুই করে না শুধু একটু সোফায় বসে বা বিছানায় শোয়, আয়নার সামনে দাঁড়ায়, তাদের পারফিউমগুলোর শুধু গন্ধই শুঁকে রেখে দেয় | ফ্রিজের খাবারগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে অপলক দৃষ্টিতে, মুচকি হাসে বা রাগ করে বা অভিশাপ দেয় তারপর কোনও চিহ্ন মাত্র না রেখে, কেবল একটা সংশয় রেখে চলে যায় যে হয়তো কেউ এসেছিল — তাহলে কেমন লাগবে গর্বীর? শুয়ে এ-পাশ ও-পাশ করল সে কিছুক্ষণ, অস্থির অস্থির লাগল তার সত্যি! বিছানা ছেড়ে নেমে একবার অন্ধকার ফ্ল্যাটটায় ঘুরে বেড়াল সে | কাচের দরজা খুলে ব্যালকলিতে গেল | সেখান থেকে দেখতে চেষ্টা করল ফ্ল্যাটের ভেতরটা, যেখানে যেখানে চোখ যায়! হঠাৎ চেনা বাড়িটাকে ভীশণই নিষ্ঠুর মনে হল তার! একেবারেই নিঃসম্পর্কিত তার সন্গে! এবং সে তৎ্ক্ষণাৎ ফোন করল তুনীরকে, বিরক্তভরে, ‘ কি করছিস!’ অভিমানে থমথম করছে তূনীরের গলা, ‘ঘুরে বেড়াচ্ছি রাস্তায় রাস্তায়!’

‘হস্টেলে ফিরিসনি?’
‘নাহ!’

একটু চুপ করে থাকল গর্বী, তারপর বলল, ‘আয় আমার কাছে!’
‘সত্যি তো? মজা করছিস না?’
‘না!’
‘দিবি তো আদর করতে? দিবি তো?’ তূনীর কাঁদছে |

‘কি বোকা তুই! দেবো |’

‘গর্বী আজ আমার বাবার মৃত্যুদিন’
‘আজ তোর বাবার মৃত্যুদিন আর আজ তুই আমাকে পাওয়ার জন্য অত পাগল হয়ে গেলি? বাড়ি গেলি না? আজ তো তোর শোক পালন করার কথা’

‘হ্যাঁ, আজ আমার শোকের দিন্ | কিন্তু তোর সঙ্গে শোয়াটা কি আনন্দের্? তোর সন্গে শোয়ার কোনও স্বাদ নেই সোনা মেয়ে!’
‘স্বাদ নেই? তাহলে চাস কেন?’

হা, হা, করে হাসল তূনীর, ‘আমি চাইলে তুই দিস নাকি? তোর ইচ্ছে হলে দিস!’

‘কেন সেদিন অত চেপে ধরে হারানোর ভয়-টয় বললি? আমার দমবন্ধ হয়ে আসছিল’

‘সেদিন তোর মুখটা দেখে মনে হচ্ছিল তুই আমার, সম্পূর্ণ আমার!

‘সম্পূর্ণ আমার — এই বোধ খুব ভয়ঙ্কর তূনীর্ | এই বোধের থেকেই জন্ম নেয় ভয় | যাকে তুই হারানোর ভয় বলছিলি | আজকাল তোর চোখের মধ্যে ওই ভয়টা সব সময় দেখি আমি!’

####

ভয় দর্শনে গর্বীর প্রস্থান

ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে যশের কাছে পৌঁছতে গর্বীর প্রায় সাড়ে চারটে বেজে গেল | আজ বিকেলে কোনও টিউশন দেওয়ার ছিল না তার, থাকলে সমস্যা হত | যশ কেন অন্য কারও কথাতেই সে টিউশন অফ দেয় না | নিজের ইচ্ছে হলে দেয় | স্টাডিতেই ছিল যশ, স্ক্রিপ্ট নিয়েই কাজ করছিল | রানী দুজন লোক পাঠিয়ে দিয়েছে — সে দেখল পার্টির জোগাড়যন্ত্র তারাই করছে | কাটগ্লাসের পানপাত্র নামিয়ে মোছামুছি চলছে | যশ তাই বেশ নিশ্চিন্ত | আটটা সাড়ে আটটা নাগাদ মেনল্যান্ড চায়না থেকে খাবার এসে যাবে | স্ন্যাক্স্-এর ব্যবস্থা রানীর লোকেদের | সে স্টাডিতে ঢুকতে যশ রিডিং গ্লাস চোখ থেকে নামিয়ে দেখল তাকে, বলল, ‘এসেছিস্? পার্টির জন্য চেঞ্জ আনিসনি কোন? এটাই পরবি?

‘ এনেছি!’ বলল সে চেয়ার টেনে বসতে বসতে |

‘দেখা কি এনেছিস্?’

ঝোলা থেকে টিউনিকটা বের করে দেখালো গর্বী | তার কালো স্কিন টাইট জিনসের সন্গে কালো টিউনিকটা একদম পারফেক্ট দেখে টেখে যশ বলল, বেডরুমে যা, বিছানার ওপর একটা প্যাকেট আছে | ড্রেসটা ট্রাই কর একবার’

‘কি কিনেছো?’

‘দ্যাখ না গিয়ে |’

বেডরুমে গিয়ে প্যাকেট খুলে সে একটা ডিজাইনার টপ পেল | সাদা রং | বুকটা হানিকোম্ব করা | দারুণ দেখতে, চেঞ্জ করে আবার ফিরল সে যশের কাছে, ‘কোথা থেকে নিলে?’

‘নয়না দত্তার নতুন স্টোর ইনোগরেট করতে গেছিলাম সেদিন মনে আছে তোর? নয়না খুব ইনসিস্ট করল, ‘একটা কিছু নিন আপনার পছন্দের, তো আমি এটা নিলাম তোর জন্য | সাইজটা ঠিকই আছে! ইভনিং-এ এটাই পরিস |’

সে কাঁধ ঝাঁকাল | চেঞ্জ করল বেডরুমে ফিরে | কিচেনে গিয়ে কফি চাইল একটু | তারপর কাজ করতে বসল যশের সঙ্গে | মধ্যে মধ্যে কথা হল তার আর যশমাল্যর | স্ক্রিপ্টটা প্রায় শেষ | হয়ত সবাইকে নিয়ে বসে এর মধ্যে একটা দিন পড়া হবে স্ক্রিপ্ট | লন্ডন ফেস্টিভাল থেকে ফিরে ফাইনাল ব্রাশ আপ করবে যশ স্ক্রিপ্টের | এনডিং-টা নিয়ে ভীষণ ভাবিত এখন যশ | এনডিং-টা যশ যে ভাবে ভেবেছে গর্বীর সেটা খুবই পছন্দ হয়েছে | এনডিং-টা লেখার কথা ভাবলেই রোমাঞ্চ হচ্ছে তার!

সাতটা নাগাদ এসে পড়ল রানী | গর্বী তখন উঠে গেল পার্টির জন্য রেডি হতে | আটটা বাজার আগে থেকেই একে একে আসতে লাগল গেস্টরা | যশের ইউনিটেরই লোকজন সবাই | রূপালি পর্দার কয়েকজন | বীতশোক যশের সিনেমাটোগ্রাফার, এসেই বীতশোক ঘোষণা করল, ‘আমি আজ বারটেন্ডার! কার কি চাই আমাকে বলো!’ যশ ঢুকেছিল একটা সাওয়ার নিয়ে রেডি হতে | জিনস আর সাদা শার্ট পরে পারফিউমের গন্ধ ছড়িয়ে বেরিয়ে এল ও | সাদা বা কালো শার্ট ছাড়া আর কিছুই পরে না যশ | ফোন বাজছে যশের, যশ বলল, ‘আরে চলে এসো, চলে এসো, দ্য পার্টি ইজ অন!’ আরও কিছুক্ষণের মধ্যে লোকজনে, কোলাহলে পূর্ণ হয়ে গেল ফ্ল্যাটটা | কেউ একজন মিউজিক চালিয়ে দিল লো ভল্যুমে | ঢুকল চিত্রাঙ্গদা | চিত্রাঙ্গদাই নন্দিনীর রোলটা করবে | এবং সবার শেষে এসে পৌছলেন রাহুল সেনগুপ্ত | রাহুল একজন লন্ডন প্রবাসী বিজনেসম্যান | কলকাতায় সদ্য সদ্য একটা ফিল্ম প্রডাকশন হাউস লঞ্চ করেছেন ভদ্রলোক | সিরিয়াস, আর্বান ছবি প্রডিউস করতে আগ্রহী উনি | যশের গত তিনটে ছবিরই যিনি প্রডিউসার ছিলেন তার সঙ্গে এবার যশের কিছু মত পার্থক্য হওয়ায় যশ আর ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে কাজ করতে চাইছিল না | এই নিয়ে যশ-সহ ইউনিটের সকলেই সামান্য দুশ্চিন্তায় ছিল | এ হেন পরিস্থিতির মধ্যেই রাহুলের প্রস্তাবটা পৌছয় যশের কাছে | একটু আগেই যশ তাকে জানিয়েছে গতকাল রাহুলের সঙ্গে কথাবার্তা অনেকটাই এগিয়ে গেছে | সব একরকম ফাইনাল | সমমনস্ক লোকজনের সঙ্গে কাজ করাটা অনেক কমফর্টেবল গর্বী | আই অ্যাম লাকি যে রাহুলের মত শিক্ষিত, রুচিবান প্রডিসার পাচ্ছি!’ বলছিল যশ তাকে |

সবার সঙ্গে আলাপ করাতে করাতে যশ তার কাছেও নিয়ে এল রাহুল সেনগুপ্তকে | বড়জোর সাঁইত্রিশ আটত্রিশ হবে রাহুলের বয়েস | নিখুঁত সেভ করা ফর্সা মুখ, রিমলেস চশমার পেছনে ঠাণ্ডা কালো চোখের দৃষ্টি | জিনসের ওপর নীল শার্ট পরা, বেশ ব্যক্তিত্ববান, যশ বলে উঠল, ‘গর্বী মিট রাহুল সেনগুপ্ত, আওয়ার প্রডিউসার, হি’জ বেয়িং ভেরি সাপোর্টিভ টু আস, তুই তো জানিসই, আর রাহুল এ হল গর্বী মিত্রা, ফিল্ম স্টাডিজ পড়ছে | আমাকে স্ক্রিপ্ট লিখতে সাহায্য করছে ও | ছবি ফ্লোরে গেলে আমাকে অ্যাসিস্ট-ও করবে | আই থিংক শি হ্যাজ আ ব্রাইট কেরিয়ার আহেড!’ বলেই রাহুলকে এড়িয়ে তাকে চোখ মারল যশ | যশের আসল বক্তব্যটা হচ্ছে ‘গর্বী ফাঁকিবাজের চূড়ান্ত! কোনও কম্মের নয়!’

যশ সরে গেল রাহুলকে নিয়ে অন্য কারও সঙ্গে আলাপ করাতে | ভূমিকা এসে কথা বলতে শুরু করল তার সঙ্গে | তারই আগের ব্যচের মেয়ে ভূমিকার সঙ্গে ভালোই বন্ধুত্ব গর্বীর | ভূমিকা বলল, ‘রিপনদের কি খবর রে? ওরা শুনলাম এ বছর বুক ফেয়ারে একটা পত্রিকা বের করেছে? আমি এখনও হাতে পাইনি পত্রিকাটা!’

’হ্যাঁ, ‘ক্যারাভান’ নাম দিয়েছে | ভালৈ হয়েছে ব্যাপারটা | কৃষ্ণেন্দুদা, অরিজিৎদা, রঘুবীরদা সবাইকে দিয়েই লিখিয়েছে |

হেসে উঠল ভূমিকা‚ ‘রঘুবীরদা কি নিয়ে লিখলেন্?’

‘হিচকক! হাসলে কেন?’

এত সুইট লোকটা! কিন্তু মেয়েদের ভীষণ ভয় খায় | আমাদের তো চিরকাল এড়িয়ে এড়িয়ে থেকেছে | একবার জানিস না ক্লাস চলাকালীন কি কথায় কি কথায় সেক্স গডেসদের প্রসন্গ উঠেছে, সেখান থেকে মেরিলিন মনরো | সেই যে বলা হয় না ‘হলিউড কিলড মেরিলিন’ উনি এসব বলছেন্ | সিনেমার যে মেক বিলিভ ওয়ার্ল্ড, এই শো বিজ, গ্ল্যামার, নেম, ফেম, মানি — সমাজে তার কি প্রচন্ড প্রভাব, ক্ষতিকর প্রভাব এসব বলছেন’ বলতে বলতে হঠাৎ আমরা খেয়াল করলাম উনি আপন মনে বলে যাচ্ছেন মেরিলিন মনরোকে দেখলেও ওনার ভীষণ ভয় লাগে! দ্যাট ওয়াজ টেরিবল, আমরা সব হাসি চাপতে পারি না আর কি!’

রাত বাড়তে বাড়তে জমে উঠেছে পার্টি | কেউ একটা সাংঘাতিক জোক ক্র্যাক করেছে, সবাই হাসছে , হো হো করে | প্রায় আড়াইটে স্কচ পান করা হয়ে গেছে গর্বীর | জোকটা বিন্দুবিসর্গ না শুনেই হাসি পাচ্ছে তার, ভূমিকা কখন চলে গেছে তার খেয়ালই নেই | একটা সোফা অকুপাই করে বসে সবাইকে দেখছে সে, খুব রিল্যাক্সড লাগছে তার্ | এই সময় রানী এসে বসল তার পাশে, ‘হাই, কি খবর?’

রানী খুব ভাল মেয়ে | ভীষণই বুদ্ধিমতী | যশের কাছে রানী একটা অ্যাসেট্ | ওকে ছাড়া কথায় কথায় চোখে অন্ধকার দেখে যশমাল্য চ্যাটার্জ্জি | কলকাতার মেয়ে রানীর পড়াশোনা বম্বেতে, জে জে স্কুল অফ আর্টস থেকে মাস কম করেছে | খুবই ফ্যাশনেবল মেয়ে | কানে অনেকগুলো দুল, ঠোঁটে স্টাড, বাহুতে উল্কি — সেটা অবশ্য এখন দেখা যাচ্ছে না! হাই, হ্যালোর পর রানী বলল, ‘গর্বী, তোমাকে দারুণ দেখাছে | টপটা কি সুন্দর | কোথা থেকে নিয়েছো?’

‘যশ নিয়েছে, নয়না দত্তার বুটিক থেকে!’

শুনে ঠোঁট কামড়ে হাসলে লাগল রানী | সে বলল, ‘হাসছো কেন এরকম করে?’ এবং সে নিজেও হেসে ফেলল |

বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়তে লাগল রানী, ‘তোমাদের প্রেমটা খুব জমে উঠেছে তাই না গর্বী?’

আকাশ থেকে পড়ল সে, ‘মানে? তোমাদের মানে?’

অদ্ভুত একটা জেসচার করল রানী, ‘তোমাদের মানে তোমার আর যশমাল্যর!’

‘কি বলছো তুমি, আমি বুঝতে পারছি না!’

‘ডোন্ট টেল মি! সবাই জানে তোমরা প্রেম করছো |’

‘কিন্তু আমরা তো প্রেম করছি না, যশকে জিজ্ঞেস করো!’

সে খুঁজল যশকে |

‘যশকে জিজ্ঞেস করতে হবে?’ আবার হাসতে লাগল রানী | ‘তুমি এখনও খুব ছেলেমানুষ গর্বী!’

ভুরু কুঁচকে গেল তার — প্রেম? যশের সঙ্গে তো কোনও প্রেম নেই তার্ | হ্যাঁ, একথা ঠিক যে যশের প্রতি তার, তার প্রতি যশের একটা মুগ্ধতা আছে | এবং এই মুগ্ধতাকে কম্পার্টমেন্টালাইজ করা মুশকিল | যশ তাকে নিশ্চয়ই খুব পছন্দ করে, তাকে আলাদা একটা মানুষ হিসেবে যথাযোগ্য মূল্য দেয় | যশ মনে করে তার মধ্যে কাজ করার ক্ষমতা, দক্ষতা যথেষ্ট আছে, শুধু নেই সিনসিয়ারিটি | ‘কিন্তু ঠিক আছে, সবে তোর তেইশ বছর বয়েস, এই বয়েসে একটু খামখেয়ালীপনা, একটু মেজাজ-মর্জি অনুযায়ী চলা এগুলো তো থাকবেই |’ নিজেই বলে যশ্ | সেদিক থেকে যশমাল্য চ্যাটার্জ্জি তার মেন্টর, গড ফাদার গোছের | পরিচয় পর্ব অনেকটা গড়িয়ে যাওয়ার পর তারা দুজনে ফিজিকালও হয়েছে | সেটা নিয়ে আলাদা মাথাব্যথা নেই তার বা যশের | ফিজিকালি ক্লোজ হয়েছে বলেই কাজ করার ক্ষেত্রে কমফর্ট জোনটা বেড়ে গেছে তাদের | কাজ করার সময় সে আর যশ মিলেমিশে যেন একটাই মানুষ হয়ে ওঠে | যে কোনও মেয়ের পক্ষেই যশমাল্য চ্যাটার্জি একজন আকর্ষণীয় পুরুষ — অর্থ, খ্যাতি‚ প্রতিভা আছে এবং সিঙ্গল, মানে ডিভোর্সী | কিন্তু এক সঙ্গে কাজ করে বলে, মানসিকতায় মিল আছে বলে এবং শরীর দেওয়া-নেওয়া হয় বলে তাদের সম্পর্কটা প্রেমের? অ্যাবসার্ড! সে কখনও যশকে ‘আই লাভ ইউ’ বলে কিন্তু সেটা অন্য় রকম বলা | সে তো যশ সবাইকেই বলে থাকে | কোনও সমস্যার সমাধান করে দিলে, কোনও ভাল আইডিয়া দিলে যশ সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, ‘ ওটা তো প্রশংসার কথা — প্রেমের কথা নয় | বিছানায় যশ তাকে কখনও আই লাভ ইউ বলেনি | যেমন বলে তূনীর, বার বার তাকে চুমু খেতে খেতে, তার সারা গায়ে ঠোঁট ঘষতে ঘষতে বলতে থাকে ‘ আই লাভ ইউ’ ’আই লাভ ইউ!’ আর সে বিরক্ত হয়ে যায় শুনতে শুনতে, তার মনে হয় কানে তালা লেগে যাবে |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.