ছিন্নমূলের কথাকার – ঋত্বিক ঘটক

তিনি পাগল – তিনি উন্মাদ, তিনি মদ্যপ। তিনি ছিন্নমূলের কথাকার – ঋত্বিক ঘটক। দেশভাগের যন্ত্রণাকে নীলকন্ঠের মতোই গলায় নিয়ে বেড়িয়েছেন। বুকে নিয়ে বেড়িয়েছেন। একেকটা ছবিতে চিৎকার করে নিজের অস্তিত্বের কথা বলেছেন। তাঁর সময়কার বাস্তুহারাদের কথা বলেছেন। তিনি বাংলা সেলুলয়েডের মরমিয়া শিল্পী ঋত্বিক ঘটক। ৪ঠা নভেম্বর তাঁর জন্মদিন। আমরা যারা বুর্জোয়া-গোত্রের সাংবাদিক, আমাদের সাধ্যি কি তাঁর মূল্যায়ন করি ? কাজেই অতিকথন অথবা চড়া-ধাঁচের তোষামোদটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। আমরা ভাবি না, ভাবতে চেষ্টাও করি না। আমরা তাঁর সিনেমা দেখতে যাই।
 
“আমি প্রতি মূহুর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাবো … (যে) আমি আপনাকে সস্তা আনন্দ দিতে আসিনি। প্রতি মূহুর্তে আপনাকে বোঝাবো যে যা দেখছেন, তা একটা কল্পিত ঘটনা। কিন্তু এর মধ্যে যা আছে সেটা সম্পূর্ণ সত্যি।” –ঋত্বিক ঘটক
 
১৯৫১ সালেই ঋত্বিক বানিয়ে ফেলেন তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি – ‘নাগরিক’। ব্যবসায়িক কারণে ছবিটি মুক্তি পায়নি তখন। মুক্তি পেতে পারলে – গুণমান বা উৎকর্ষে, সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’কেও তা ছাপিয়ে যেতে পারতো বলে অনেকের অভিমত। যা হোক, সে হয়নি। এরপর ঋত্বিক একে একে বানান – ‘অযান্ত্রিক’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘সুবর্ণরেখা’। মধ্যকার সময়ে তাঁর স্ট্রাগল, তাঁর ছোটোখাটো বেশ কিছু ডকুমেন্টারী তৈরী করা, পুণাতে তাঁর শিক্ষকতা – এই সব বিষয় সম্পর্কে আজকাল অনেকেই জানেন। কাজেই, পুনরুক্তির পথে হাঁটবো না।
 
ঋত্বিক ঘটকের প্রায় সমস্ত ছবি জুড়েই রয়েছে দেশভাগ। অথবা দেশভাগ-জনিত সমস্যা। আবার তাঁর কথাতেই বলি, সস্তা শ্লোগান বা বাণী-ও-মতবাদ সমৃদ্ধ সিনেমাতে তিনি আস্থা রাখেননি। তাঁর ছবিতে গল্প থাকে, একেকটা চরিত্র থাকে – একেকটা ঘটনার কথা বলা হয়। সবশেষে, হয়তো বা এক-আধটা প্রশ্ন থাকে। আমাদেরকে তা ভাবিয়ে দিয়ে যায়। মনেপ্রাণে তিনি দেশভাগের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর জবানিতে, “দুইডা বাংলারে আমি মিলাইতে চাইছি। দুইডারে আমি ভালোবাসি হেইডা কমু গিয়া মিঞা, এবং আমি আজীবন কইয়া যামু – মৃত্যু পর্যন্ত আমি কইয়া যামু। আমি পরোয়াই করিনা, আমার পয়সার পরোয়াই নাই …”
 
পদ্মার উপরে প্লেন। পাশাপাশি দুইজন। দুইজন বুদ্ধিজীবী মানুষ। এপার বাংলার মানুষ। ঢাকার আমন্ত্রণে চলেছেন বাংলাদেশ। নতুন জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ। পদ্মার উপরে উড়তে উড়তেই, একজন দেখছেন – মাঝআকাশের এরোপ্লেনের পেটেই অন্যজন কাঁদছেন। চিৎকার করে কাঁদছেন, তাঁকে সামলানো দায় হয়ে উঠেছে। তিনি কাঁদছেন। বুদ্ধিজীবী হয়েও কাঁদছেন। ঋত্বিক ঘটক। সফরসঙ্গী ছিলেন মৃণাল সেন। এটা কোনও সস্তা চমক ছিলো না। আজীবন ছিন্নমূল মানুষের যন্ত্রণার কথাই তিনি উপলব্ধি করেছেন, সিনেমায় বলেছেন। চলচ্চিত্র সমালোচক, অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের কথায় – আজও পৃথিবীর প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে যেখানে বাস্তুহারাদের কথা বলা হয়, শরণার্থীদের কথা বলা হয়, ঋত্বিক ঘটক সেখানে প্রাসঙ্গিক।
 
নাগরিকপঞ্জী নিয়ে বিক্ষোভের কারণে বাঙালীকে আত্মহত্যা করতে হচ্ছে। আজও – এখনও। রাজনৈতিক কথায় যাবো না। তবু, কিছুদিন আগে এই বাংলালাইভেই প্রকাশিত অম্লানকুসুম চক্রবর্তীর একটি প্রবন্ধের কথা মনে পড়ে গেলো। দুচামচ দেশপ্রেম এখন দু-গরাস ভাতের চাইতেও বেশী প্রয়োজনের। ঋত্বিক তাঁর ছবিতে, আবহসঙ্গীতের একেকটা জায়গায় চাবুকের শব্দকে ব্যবহার করেছেন। ‘মেঘে ঢাকা তারা’তে তাঁর ক্লোজআপ শট মনে করুন। বড় বড় চোখের সুপ্রিয়া দেবীকে ক্যামেরা ধরেছে, একটুখানি উপর থেকে – একটুখানি তেরচা ভাবে, ঠিক যেন বিসর্জনের সময়ে প্রতিমার ডুবে যাওয়ার মূহুর্ত। ব্যাকগ্রাউন্ডে রবিঠাকুর, ঝড়ের রাতে দুয়ার ভাঙার গান। ঠিকানাহীনের খবর। ঝোড়ো হাওয়ায় উড়ে বেড়াবার খবর। ঋত্বিক ঘটক, মদ্যপ সিনেমাকার ঋত্বিক ঘটক – ছিন্নমূলের কথাকার ঋত্বিক ঘটক। তাঁর জন্মদিন।
 
তাঁর ছবিতে ক্লাসিকাল গানের একটা বড় ব্যবহার দেখা যায়। কেরিয়রের শেষ দিকে বাবাসাহেব আলাউদ্দিনকে নিয়ে একটি ডকুমেন্টারী বানাবেন। ইউটিউবে আজকাল পাওয়া যায় সেসব। রবীন্দ্রনাথের শিষ্য ভাস্কর রামকিঙ্কর বেজকে নিয়েও তথ্যচিত্র বানাবেন। তাঁর ছবি ছিলো কবিতার মতন। মৃণাল সেনের জাম্পকাট নয়, মোহানার কাছে সুবর্ণরেখা নদীর মতোই তাঁর ছবিতে দৃশ্যান্তর ঘটতো – একখানি বাঁক থেকে আরেকটির পথে। কখনো কখনো আসতো ঝড়। তা সাময়িক। ঝড়ের পরেকার শান্তিটাতেই বিশ্বাস রাখতেন পরিচালক। আর ‘বাতেলা’ দেওয়াতেও তিনি অবিশ্বাসী ছিলেন।
 
তাঁকে কি মদ্যপ মনে হচ্ছে আপনাদের ? পাগলাগারদেও থাকতে বাধ্য হয়েছেন। মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। আন্তর্জাতিক উৎসবে সুযোগ পেয়েও, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতায় ‘সুবর্ণরেখা’র বিদেশ সফর বাতিল হয়েছে। তাঁর ছবি ব্যবসায়িক সাফল্য পায়নি। তাঁর কথাতেই, “আমার ছবিগুলো দেখেছি, সেই অযান্ত্রিক থেকে আরম্ভ করে সুবর্ণরেখা অবধি পাঁচখানা ছবিতেই, যখন রিলীজ হয় – চলে না, একদম চলে না। কয়েক বছর যাবার পর, লোকের টনক নড়ে – তখন খানিকটা দেখেটেখে।” ‘আরণ্যক’ নিয়ে ছবি করতে চেয়েছিলেন, জসীমুদ্দিনের ‘নকশীকাঁথার মাঠ’ নিয়েও কাজ করতে চেয়েছিলেন। হয়নি। টাকা পাননি, সমর্থনও নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগেই বানালেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’।
 
শেষ ছবির কাজ চলছে তখন। হাতে ধরে ধরে বানাচ্ছেন, ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ – যুক্তি সাজাচ্ছেন। ছবিতে উদ্বাস্তু হয়ে আসা মেয়েটি, তাঁর চোখে হয়ে যায় বাংলাদেশ। অবিভক্ত বাংলাদেশ। মিটমিট করে তাকান, গল্প বলতে বলতেই হঠাৎ একলাফে ভয়েসওভার ‘প্রেমে পড়ে গেলাম’। পর্দা-জোড়া মাঠ, শস্যক্ষেত। রবিঠাকুরের গান, “আমার অঙ্গে অঙ্গে কে – বাজায়, বাঁশী …” ঋত্বিক ঘটক আর রবিঠাকুর।
 
উন্মাদ ছিলেন। শিল্পের জন্য উন্মাদ ছিলেন, সত্যের জন্য উন্মাদ ছিলেন। রবিঠাকুরের কথার রেশ টেনেই বলতেন, আগে সত্যনিষ্ঠ হওয়া প্রয়োজন, তারপর সৌন্দর্যনিষ্ঠ। এর বাইরেটায় আর কিছুই নেই। কোনও দল, কোনও মতাদর্শের প্রতি চরম আনুগত্য প্রদর্শনের পথেই হাঁটেননি। কমিউনিস্ট পার্টি থেকেও বহিষ্কৃত হন। সোজাসুজি কথা বলেছেন, আর ছবি বানিয়েছেন। ছবিতে বার্তা দিয়েছেন, রাজনীতি করেননি। সরাসরি কোনও মতবাদকে আন্ডারলাইন করেননি। তাঁর ছবি যেন একেকটা সংলাপ, দর্শককেও ছুঁয়ে যেতে পারে। দর্শকও তার প্রত্যুত্তর দিতে পারে। ঋত্বিক ঘটক।
 
২০১৮তে কী বলতেন জানা নেই। মতাদর্শ-টর্শ নিয়ে বক্তব্য দেবার অবস্থায় থাকতেন না বোধহয়। হয়তো বা অস্ফূটে বলতেন, “ভাবো – ভাবা প্র্যাকটিস করো …” দেশ ভেঙে গেছে।
 
(সূত্রঃ ১। ‘ঋত্বিক’, সুরমা ঘটক, ২। ‘নিজের পায়ে নিজের পথে’, ঋত্বিক ঘটক)

Advertisements

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.