পাথরের ফাঁক দিয়ে ছুটে চলা বিতস্তাও ভয় পায় ইতিহাসের পাশে দু দণ্ড জিরোতে

ভালবাসার দিনটা দুপুরের পর থেকে রক্তাক্ত হয়ে গেল একটি নামের কল্যাণে‚ পুলওয়ামা | সেই নাম থেকে শুরু হওয়া ঘটনাক্রমে ভারতবাসীর মনের অভিধানে পাল্টে গেল  অভিনন্দন শব্দের অর্থ | কাশ্মীরের অন্য জায়গার মতো পুলওয়ামারও একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে | সেই ইতিহাসে রক্তের থেকে গোলাপের রংই বেশি গাঢ় | ভূস্বর্গের এই অংশে গোলাপের সুগন্ধ সবথেকে বেশি মোহময় ছিল এর স্বর্ণযুগে‚ রাজা অবন্তীবর্মনের সময়ে‚ ৮৫৫ থেকে ৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে | উপলখণ্ডের পাশ দিয়ে পথ করে নেওয়া খরস্রোতা বিতস্তা বা ঝিলমের পাশে আছে অবন্তীস্বামিনের মন্দির | পাশে দাঁড়ালে অনুভব করা যায় উৎপল বংশের রাজা অবন্তীবর্মণের শাসনকালীন সময়কে |

কাশ্মীর শাসনকারী হিন্দু সম্রাটদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন রাজা ললিতাদিত্য মুক্তাপীরা | তাঁর মৃত্যুর পর দুর্বল হয়ে পড়ে রাজবংশ | এরপর ক্ষমতার দখল নেয় কর্কোতা বংশ | সেই বংশের শেষ রাজার নাম সিপাত্তা জয়পীরা | কিন্তু তাঁকে চালনা করতেন তাঁর মামা | মাত্র বারো বছর শাসন করেছিলেন তরুণ রাজা | হত্যা করে সিংহাসন অধিকার করেন তাঁর মামা উৎপল | সেই যে উৎপল বংশ শুরু হল‚ কাশ্মীরে তার শাসন চলেছিল অষ্টম থেকে দশম শতাব্দী অবধি |

কাশ্মীরি পণ্ডিত কলহনের রচনা রাজতরঙ্গিনী বইয়ে এই উৎপল বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা অবন্তীবর্মণের বিস্তারিত বর্ণনা আছে | তিনি পূর্বসুরিদের মতো সাম্রাজ্য বিস্তার বা যুদ্ধে মন দেননি | তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল নিজের রাজ্য রক্ষা করা এবং তার সমৃদ্ধি বৃদ্ধি | শোষণ বন্ধে জমিদারদের ক্ষমতা খর্ব করেছিলেন | বাড়িয়েছিলেন ব্যবসা ও বাণিজ্য | ঝিলমের দুই তীরে প্রাসাদ উদ্যান আর মন্দিরে সাজিয়েছিলেন নিজের রাজ্যকে | 

তাঁর দুটি অনবদ্য কীর্তির ভগ্নাবশেষ আজও আছে | ঝিলমের তীরে ভগবান বিষ্ণুর মন্দির অবন্তীস্বামিন এবং শিবের মন্দির অবন্তীশ্বর | শিল্প সাহিত্যের সমঝদার এই রাজার সভায় ছিলেন পণ্ডিত আনন্দবর্ধন | যিনি লিখেছিলেন ‘ধন্ব্যালোক’ | যেখানে আলোচনা করা হয়েছে ধ্বনিতত্ত্ব নিয়ে |

পুলওয়ামা সহ গোটা অবন্তীপুরমকে সন্তানসম লালন পালন করে রাজা অবন্তীবর্মন দীর্ঘ আটাশ বছর শাসনের পরে প্রয়াত হন ৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে | তার পর এই বংশে সেরকম প্রতিপত্তিশালী শাসক কেউ ছিলেন না | রাজা অবন্তীবর্মণের তৈরি অবন্তীস্বামিন মন্দির ধ্বংস করেছিলেন সুলতান সিকন্দর বুতসিকান | তিনি কাশ্মীর শাসন করেছিলেন ১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৪১৩ খ্রিস্টাব্দ | প্রখ্যাত পুরাতাত্বিক তথা ASI-এর প্রতিষ্ঠাতা স্যর আলেকজান্ডার কানিংহ্যাম বলেছিলেন সম্ভবত কামানের তোপের মুখে পড়তে হয়েছিল ওই মন্দিরকে | পরে ১৯১৩ থেকে ১৯১৬ তিন বছর বিশিষ্ট পুরাতাত্বিক দয়রাম সাহনি এই দুই মন্দিরে খনন চালিয়ে মধ্যযুগীয়‚ ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দ সমসাময়িক বহু নিদর্শন প্রকাশ্যে এনেছিলেন | অর্থাৎ সুলতান সিকন্দরের আক্রমণের পরেও এই দুই মন্দিরে জনসমাগম হতো | 

তাহলে কী করে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ল কাশ্মীরের মন্দিরগুলি ? গবেষকদের মতে‚ বহির্শত্রুদের আক্রমণ এবং উপর্যুপরি ভূমিকম্পে বহু ক্ষতি হয় ঐতিহাসিক মন্দিরগুলির | কিন্তু পরিত্যক্ত হওয়ার আসল কারণ এখনও অনুমানসাপেক্ষ | 

সুদূর অতীতের সমৃদ্ধ অবন্তীপুর আজকের অবন্তীপোরা | জম্মু কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ | সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে এই জনপদ মুহুর্মুহ এখন মুখোমুখি হয় জঙ্গি আক্রমণের | বারুদের গন্ধে আর ভারতীয় সেনাবাহিনীর বুটের শব্দে ভারী হয়ে থাকে শ্রীনগরের পথে অসামান্য নৈসর্গিক দৃশ্য নিয়ে পড়ে থাকা ভূস্বর্গের এই অংশ | যা হতে পারত দেশের শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক নিদর্শনের পর্যটনস্থল‚ হয়ে গেছে জঙ্গি উপদ্রুত নাশকতাপ্রবণ শত্রু-নিশানা | অতীতের অবন্তীপুরমের জন্য কারও সময় নেই | সবাই ছুটছে ত্রস্ত বিতস্তার মতো | 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here