বিশ্বের সব থেকে নিপীড়িত ও অত্যাচারিত জনজাতি রোহিঙ্গা‚ কিন্তু কেন!?

ইতালিয়ান কবি সালভাতর কুয়াশিমোদো বলেছিলেন, “ধর্মীয় শক্তি, রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে সহাবস্থান করে। আপাতদৃষ্টিতে যাকে নিরপেক্ষ মনে হলেও আসলে এটি সর্বদাই একটি তিক্ত সংগ্রামের নায়ক ছিল”।

এমন একটা বিপন্ন সময়ে আমরা দাঁড়িয়ে আছি যেখানে এই কথাগুলো ভীষণভাবে যুক্তিপূর্ণ মনে হয়। রাষ্ট্রের ক্ষমতাবানরা ক্ষমতা দর্শানোর জন্য যেটিকে মূল হাতিয়ার করেছে সেটাও সেই ধর্ম। আসলে, ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মানুষগুলোর যখনই গদিচ্যুত হবার সম্ভাবনা দেখা দেয় ঠিক তখনই দেশের মধ্যে ধর্ম নিয়ে এক নিদারুন অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি করে দেওয়া হয়আর একশ্রেনীর মানুষ যারা অপেক্ষাকৃত দুর্বল তাদের ওপর অত্যাচার, নিপীড়ন শুরু হয়ে যায়। নিজেদের অস্তিত্ব জাহির করবার তাগিদে তারা ধর্মের নামে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে দেয়। আর তাতেই সাধারণ মানুষ ‘ধর্ম গেল’ রব তুলে রে রে করে ওঠে। এর ফলে সংগ্রাম বাঁধে। যার পরিনতিতে একটা সময় সেই বিচ্ছিন্ন জনজাতি আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে বাস্তুচ্যুত উদ্বাস্তুতে পরিনত হয়।

রাষ্ট্রসংঘের সমীক্ষা (UNHCR) বলছে, ২০১৬ সালের পর সারা পৃথিবীতে উদ্বাস্তুর সংখ্যা সাড়ে ছয় কোটি ছাড়িয়েছে। কেন হতে হয় উদ্বাস্তু? কেন কোন জনজাতিকে এভাবে বাস্তুচ্যুত সর্বোপরি দেশচ্যুত হয়ে আশ্রয়ের জন্য অন্য কোন দেশের মুখাপেক্ষী হতে হয়? শুধুই কি ধর্ম নাকি সঙ্গে কোন স্বার্থের তাগিদও থাকে? অবশ্যই আছে। কখনো দেখা গেছে, এক দেশের সঙ্গে অপেক্ষাকৃত অনুন্নত দেশের স্বার্থ সংঘাত, যার ফল সিরিয়া, লিবিয়া, ইরাকি উদ্বাস্তু। আবার কখনো কোন এক বিশেষ জনজাতির ওপর সেই দেশের শাসকশ্রেনীরই আরোপিত এক তকমা লাগিয়ে আভ্যন্তরীণ স্বার্থসিদ্ধির ফল এই উদ্বাস্তু। এই মুহূর্তে যার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত রোহিঙ্গা। তবে, এখানে আরও কিছু কারণ আছেবহুবছর ধরে উত্তর আরাকানের রাখাইন প্রদেশের এই জনজাতি স্বাধীনতার আশায় যে বিক্ষোভ দেখিয়েছে তাতেই নিজের দেশের সরকারের কাছে তারা বিরাগভাজন হয়েছে।

যেহেতু রোহিঙ্গা সমস্যাই এই লেখার উপজীব্য বিষয়, তাই তাদের প্রসঙ্গেই আসা যাক। পাশের দেশ মায়ানমারেই মূলত এই রোহিঙ্গাদের বাস। গত ৭০ বছর ধরে অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশদের হাত থেকে তৎকালীন বার্মা স্বাধীনতা পেলেও সেই দেশের উত্তর আরাকানের এই বিশেষ জনজাতিকে একপ্রকার খেদিয়েই তাড়ানোর চেষ্টা শুরু হল। সময়টা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। অক্ষশক্তি-মিত্রশক্তি লড়াইয়ে উত্তর আরাকান ছাড়া বাকি পুরো মায়ানমারই অক্ষশক্তির জাপানীদের সমর্থনে। একমাত্র রোহিঙ্গারাই ছিল ব্রিটিশদের সমর্থনে। কারণ তারা ভেবেছিল তাদের দাবি মতো একমাত্র ব্রিটিশরাই পারবে তাদের স্বায়ত্তশাসন দিতে। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। উল্টে, যেহেতু একমাত্র তারাই ব্রিটিশদের সমর্থন করেছিল সার্বভৌমত্ব পাওয়ার চেষ্টায়, সেই জিগির তুলে বাকি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মায়ানমার এই মুসলিম ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গাদের ওপর অকথ্য অত্যাচার করে তাদের দেশত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল। শুধু এটুকুই নয়, এর গভীরেও একটা ভয়ংকর ইতিহাস আছে। রোহিঙ্গাদেরও ছিল। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল, লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। প্রায় একশো বছরের ওপরের সেই বিভৎস, রক্তক্ষয়ী, প্রাণান্তকর ইতিহাসের সবটা এখানে আলোচনা করা সম্ভবও নয় । তাই অতীত ইতিহাসের কথা না বলে তাদের বর্তমান পরিস্থিতি, তাদের বিপন্নতা বোঝা্র চেষ্টা করাই ভাল। গত ২০১৭ সালের আগস্ট মাস থেকে এদের ওপর অচ্যাচারের মাত্রা ছাড়ালো। সমীক্ষা বলে, এক মাসের মধ্যে প্রায় ৭০০০ রোহিঙ্গার মৃত্যু এবং ২০১৮ সালের মধ্যে দু’লক্ষ রোহিঙ্গা তাদের প্রাণ বাঁচিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। রাষ্ট্রসংঘ বলছে, রোহিঙ্গা সবথেকে নিপীড়িত ও অত্যাচারিত জনজাতি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় রাষ্ট্রসংঘের সদস্য রাষ্ট্র যারা, তারা কেউই রোহিঙ্গাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়াচ্ছে না। কারণ তাতে যে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সংঘাত বেঁধে যাবে।

১৯৮২ সালে মায়ানমার, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার পর তাদের ন্যূনতম সুযোগসুবিধাটুকু দেওয়াও বন্ধ করে দেয়। এরজন্য তারা বেশকিছু সংগঠন তৈরি করে প্রতিবাদ জিইয়ে রাখার জন্য। কিন্তু এতে ফল আরও খারাপ হলনিজেদের দেশ থেকে তাদের প্রায় উৎখাত হতে হয়। এরপর শুরু হয় রাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এই সময় রোহিঙ্গারা কিছু জঙ্গিগোষ্ঠীর সাহায্য নিয়ে প্রত্যাঘাত করেব্যাস, এই সুযোগে রাষ্ট্র তাদের ওপর জঙ্গি তকমা লাগিয়ে দেয়। শোনা যায়, রোহিঙ্গাদের একটা ছোট অংশ জঙ্গিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্রত্যাঘাত করে। আর একেই বিশ্বের সামনে প্রমাণ হিসাবে মেলে ধরে নির্বিবাদে অচ্যাচার, নিপীড়ন, গণহত্যার মাত্রাকে আরও তীব্রতম করা হল।

কিন্তু যে প্রশ্নটা বারবার ঘুরেফিরে আসে, এত সবকিছুর মধ্যে বর্তমান মায়ানমার সরকার চুপ কেন? বর্তমান মায়ানমার রাষ্ট্রপ্রধান যেখানে নোবেল শান্তি পুরষ্কার প্রাপ্ত, সে দেশে এত অশান্তির মাঝেও কেন তিনি নিরুত্তর? কারণ দেখতে গেলে যেটা প্রথম মাথায় আসে আসলে সেটাও সেই স্বার্থ সংঘাতই। এত বছর ধরে সেনা শাসন চলার পর সু কি সবে ক্ষমতায় এসেছেন। আর এইমুহূর্তে তিনি যদি রোহিঙ্গাদের পক্ষ নিয়ে মুখ খোলেন তাহলে তিনি গদিচ্যুত হবেন এবং পুনরায় দেশে সেনাশাসন ফিরে আসবেযেটা কোনভাবেই একটি দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়।

এ তো গেল মায়ানমার সরকারের লাভক্ষতির হিসাব। কিন্তু পাশের দেশ, রাষ্ট্রসংঘের অন্যতম সদস্য দেশ এবং সর্বোপরি বিশ্বের সবথেকে বৃহৎ গনতান্ত্রিক দেশ হিসাবে কি আমাদের ভারতবর্ষের কোন দায়িত্ব নেই? নাকি সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থই আমাদের দেশের শাসকগোষ্ঠীকে এরকম অমানবিক করে তুলেছে?

ভারতীয় সংবিধান কিন্তু অন্য কথা বলে। রাষ্ট্রে বসবাসকারী প্রত্যেকটা মানুষ সে নাগরিক হোক বা না হোক প্রত্যেকের মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের ১৪নং ধারায় বলা হয়েছে, ভারতীয় ভুখন্ডে অবস্থানরত প্রত্যেক ব্যাক্তি (নাগরিক হোক বা না হোক) আইনের চোখে সমান এবং মানবাধিকার পাবার ক্ষেত্রে সমানভাবে অধিকারী। এবং ২১নং ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্র কোন ব্যাক্তির (নাগরিক হোক বা না হোক) স্বাধীনতার অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। তবে এখানে প্রশ্ন আসতেই পারে আমাদের সংবিধান অনুপ্রবেশকারীদের জন্য কি আলাদা কিছু বলেছে? নাকি তারাও মৌলিক স্বাধীনতা পাবার যোগ্য? এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে সংবিধানের এই ১৪নং ধারার কথা মনে রেখেই মুম্বই হামলার অন্যতম জঙ্গি আজমল কাসভ’র জন্য এ দেশের সরকার আইনি সুবিধা দিয়েছিলেন এবং তার জন্য নির্দিষ্ট একজন উকিল নিয়োগ করা হয়েছিলএই একটি উদাহরণই যথেষ্ট এটা বোঝার জন্য যে, এ দেশে বসবাসকারী প্রত্যেকটা মানুষ (সে নাগরিক হোক, না হোক, অনুপ্রবেশকারী হোক এমনকি জঙ্গি হোক) প্রত্যেকেই মৌলিক অধিকার পাবার অধিকারী।

রোহিঙ্গারা বেআইনী অনুপ্রবেশকারী, তাদের বৈধ কোন কাগজপত্র নেই। আমাদের রাষ্ট্র এটাও বোঝাতে চাইছে তার সাধারণ মানুষকে। একটা বিরাট জনজাতি, যারা নিজেদের দেশে জঙ্গি তকমা পেয়ে বিতাড়িত হয়ে পেটে খিদে, তেষ্টা নিয়ে একটি নৌকায় কয়েকশো জন উঠে পড়লো শুধুমাত্র একটু আশ্রয় পাবার তাগিদে। এরা তাদের নৌকা ভাসিয়ে কোন দেশ আবিষ্কার বা নৌকাবিহারে বেরিয়ে পড়েনি। এই মহাসঙ্কটকালে একটু আশ্রয়, একটু মাটির ছোঁয়া আর একটু খাদ্যের জন্য জীবনযুদ্ধে নেমেছে। অবাক লাগে ভাবতে, এদের কাছ থেকে যখন বৈধ কাগজপত্রের আশা করা হয়।

মায়ানমার সরকার ঠিক যে অযৌক্তিক পদ্ধতিতে নিজেদের দেশ থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করেছিল সেই একই অযৌক্তিক ও নিষ্ঠুর পদ্ধতি ভারতও মেনে চলছে। রোহিঙ্গারা নাকি জঙ্গি। তারা নাকি পশ্চিম এশিয়ার জঙ্গিগোষ্ঠী এবং পাক জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে রয়েছে। তাই, যদি তাদের এই দেশে আশ্রয় দেওয়া হয় তাহলে জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। এবং এক নির্লজ্জ পদ্ধতিতে প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দল নিয়ম করে এবিষয়ে গলা ফাটিয়ে সাধারণ মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। তাহলে এখন কী করা উচিত? শাসকশ্রেনীর মতে, এদের নিজেদের দেশে পাঠানো উচিত। কোন দেশ? তাদের নিজেদের দেশ মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশ। কিন্তু সে পথও বন্ধ। কারণ সে দেশের শাসকগোষ্ঠী এই বিশেষ জনজাতিকে জঙ্গি বলে চিহ্নিত করে অত্যাচার, নিপীড়ন করে দেশচ্যুত করেছে। কিন্তু এব্যাপারেও আমাদের এই বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশের কিছু করার নেই। এসব গরিবগুর্বো, খেতে না পাওয়া মানুষগুলোর জন্য গলা ফাটিয়ে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সংঘাতে যেতে চায় না।

বুঝতে কী খুব অসুবিধা হয়, ২০১৭ সালের শেষ থেকেই ভারতবর্ষের শাসকশ্রেণীর কাছে রোহিঙ্গা সমস্যা কেন এতটা মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে? রোহিঙ্গারা তো এর অনেক আগে থেকেই এদেশে ছিল। বুঝে নিতে বাকি থাকে না, আমাদের দেশের শাসকগোষ্ঠীর সেই মুসলিম পীড়ন রাজনীতিই এর প্রধান কারণ। মুসলিম মানেই জঙ্গি, আতঙ্কবাদী। আমাদের মনে কী কখনো এই প্রশ্ন এসেছে, শ্রীলঙ্কা থেকে এল.টি.টি.ই রা পালিয়ে এসে আমাদের দেশে আশ্রয় নিল। তারাও তো জঙ্গি তকমা পেয়ে নিজেদের দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছিল। তবে সেদিন আমাদের দেশ কীভাবে তাদের জায়গা দিয়েছিল? তারা হিন্দু জঙ্গি ছিল বলে? নাকি তাদের ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল? হিন্দুরা তো আবার কখনো জঙ্গি হতেই পারে না।

তাহলে, এভাবেই ধর্মের নিক্তিতে মানুষ মাপা হবে? রাষ্ট্র এভাবেই সুপরিকল্পিতভাবে ধর্মকে আশ্রয় করে মানুষ মারবে? এভাবেই তাহলে ধর্ম আর ক্ষমতা মিলেমিশে একাকার হবে? ফরাসি দার্শনিক ফুকো বলেছিলেন, ‘ক্ষমতার অস্তিত্ব তখনই থাকে যখন তাকে কাজে লাগানো হয়’। ক্ষমতার অস্তিত্ব তাহলে এভাবেই ধর্মের মধ্যে দিয়ে জাহির করা হবে? প্রশ্ন অনেক তবে উত্তরের আশা করাটা দুরাশাই। উন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ এবং অনুন্নত দেশ সব দেশের শাসকশ্রেণীই নিজেদের গদি বাঁচাতে এই বিশেষ একটি ধর্মকেই নিজেদের সময় এবং সুযোগসুবিধা মতো ব্যবহার করে গেছে। সেটা বোধহয় আরো বেশি করে বিশ্বের প্রত্যেকটা শরনার্থী শিবিরই প্রমাণ দেয়। তবে আয়রনি এটাই, যে ধর্মকে আজ অধিকাংশ রাষ্ট্র জঙ্গি তকমা দিয়েছে, সেই ধর্মেই আজ সবথেকে বেশি উদ্বাস্তু।

রূপা ব্যানার্জী
প্রিয় কাজ বই পড়া‚ ছবি তোলা আর বেড়ানো | স্বপ্ন প্রান্তিক মানুষের কথা তুলে ধরা |

2 COMMENTS

  1. Lekhata pore Anekta boi pora theoritical laglo. Kintu practically Anek kichui alada. Boi pora charao Aktu chokh kan khola rakhle ar logically vable baparta anno dike jai.

  2. এই লেখাটার জন্য প্রথমত ধন্যবাদ জানাই এই জন্য যে প্রচলিত যে ভাবনা আমার মধ্যেও বাসা বেধে আছে তাতে একটু হলেও নাড়া দিল৷ দ্বিতীয়ত পৃৃৃৃৃথিবীর নানান কোণে দেশহীন মানুষদের সম্বন্ধে জানার একটা আগ্রহ তৈরী হ’ল এই আত্মসর্বস্ব জীবন যাপনে৷
    শেষে একটা অনুরোধ, আর একটু বিস্তারিত করা গেলনা মানুষগুলো সম্পর্কে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here