প্রসেনজিত আমাদের কাছে দ্বিতীয় উত্তম : রুদ্রনীল ঘোষ

রুদ্রনীল ঘোষ এই সময়ের অন্যতম বলিষ্ঠ অভিনেতা | তাঁর অভিনয় ক্ষমতা বিচিত্র ও বহুমাত্রিক | শুধু পর্দায় ফুটিয়ে তোলাই নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও রুদ্রনীল সচেতন ও বহুমাত্রিক | অকপট আড্ডা দিলেন তন্ময় দত্তগুপ্ত-এর সঙ্গে |

এখন কী কাজ করছেন?

রুদ্রনীল ঘোষ : এখন ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তর ‘কেদারা’ আর সৃজিত মুখার্জীর ‘এক যে ছিল রাজা’র কাজ চলছে।

এই দুটো ছবিতে আপনার চরিত্র কী?

রুদ্রনীল ঘোষ : ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তর ‘কেদারা’য় দুটি চরিত্র।একজন কৌশিক গাঙ্গুলী অন্যজন আমি।ওই ছবিতে আমি পেশায় কাবাড়িওয়ালা।কাবাড়িওয়ালা মানে যারা ফেলে দেওয়া চেয়ার টেবিল,বাতিল কম্পিউটার,পুরানো দেওয়াল ঘড়ি, পুরানো আলমারি বিক্রি করে উপার্জন করে।অন্য পেশায় যাওয়ার ইঙ্গিত থাকলেও এরা পুরানোকে আঁকড়েই বাঁচতে চায়।এরা বুঝতে পারে যে বাতিল জিনিষের মতো এরাও বাতিল।তাই দুই বাতিল বিষয়ের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সহজেই।আমার এরকমই একটা চরিত্র।চরিত্রের নাম কেষ্ট।

আপনি চ্যাপলিন বলে একটা ছবিতে অভিনয় করেছিলেন।সেটাও অন্যরকম চরিত্র।এই ধরনের চরিত্র প্রস্তুতির মাধ্যম কি অবজারভেশন?

রুদ্রনীল ঘোষ : রুটেড ক্যারেক্টার আমাদের দেশে প্রচুর।তাদের গায়ে ধুলো ময়লা লেগে থাকে।সেই জন্য আমাদের চোখ তাদের দিকে যায় না।এদের জামা কাপড়ের রঙ বিবর্ণ।ধনী মানুষের উজ্জ্বল জামা কাপড়,দামি গাড়ি,ফ্ল্যাট এসব তো আছেই।গভীর ভাবে দেখলে বোঝা যাবে এই সমস্ত এলিট মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে ওই সমস্ত বিবর্ণ মানুষের ওপরে।মানে তাদের জীবন থেকে একজন কাজের মাসি বা একজন কাবাড়িওয়ালা বা একজন ড্রাইভার যদি সরে যায় তাহলে কিন্তু ওই সমস্ত আপার ক্লাসের গায়েও ধুলো ময়লা লাগবে।কারণ বাকি কাজগুলো তাদের করতে হবে।ঝকঝকে চরিত্রগুলো অধিকাংশ সময় মেকি হয়।তারা প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পর্ক তৈরি করেন বা কথা বলেন।কিন্তু প্রান্তিক চরিত্রগুলোর জন্যই স্বচ্ছল চরিত্রগুলোর বিচরণ।তাই ওই সমস্ত প্রান্তিক চরিত্রের প্রতি আমার আগ্রহ বেশি।এদের ভালো লাগার আরেকটা কারণ আছে।

কী কারণ?

রুদ্রনীল ঘোষ : আমার সহকর্মী বন্ধু বান্ধবের প্রায় অনেকেই এই ধরনের চরিত্রের দিকে ভালো ভাবে তাকানোর অবকাশ পান না।ফলে তারা এগুলো করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না।কারণ বিবর্ণ সাজলে আদৌ তাদের দিকে কেউ তাকাবে কিনা,সেই নিয়ে তারা চিন্তিত থাকেন।আমাদের মধ্যে কয়েকজন রয়েছেন,যেমন শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়,ঋত্বিক চক্রবর্তী আর আমি।মূলত এই তিনজন প্রান্তিক চরিত্রে রূপদান করি।কিছু ক্ষেত্রে পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়,খরাজ মুখার্জী এই ধরনের অভিনেতা রিয়েলিটির সঙ্গে অনায়াসে মিশে যান।বর্ণ এবং বিবর্ণ চরিত্রে প্রাণ প্রতিষ্ঠায় এরা সমান পারদর্শী।

এই সমস্ত চরিত্র কি বাইরের জগতে দেখে ইমিটেট করেন?

রুদ্রনীল ঘোষ : বাইরের জগতের একটা চরিত্রকে শুধু ওপর থেকে দেখলেই হয় না।ওপরের আচার আচরণ দেখে ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর কথা ভাবতে হয়।ধরা যাক একজনের শরীরে ফোড়া হয়েছে।ফোড়াটা হচ্ছে ভেতরের সমস্যা।ভেতরের সমস্যার জন্যই বাইরের বহিঃপ্রকাশ ফোড়া।অভিনেতার কাজই হলো ভেতরের মানুষটাকে দেখা।কারণ ভেতরের জন্যই বাইরের সাজসজ্জা হয়।

এবার এক যে ছিল রাজার কথা শুনব।

রুদ্রনীল ঘোষ : সৃজিত মুখার্জীর ‘এক যে ছিল রাজা’ ভাওয়াল রাজার ঘটনা অবলম্বনে তৈরি।এই ঘটনার নির্যাস নিয়েই উত্তম কুমার অভিনীত ‘সন্ন্যাসী রাজা’ তৈরি হয়েছিল।কিন্তু ‘সন্ন্যাসী রাজা’-তে সত্যি ইতিহাস তুলে ধরা হয়নি।সত্যি ঘটনা হলো রাজা মারা গিয়েছিলেন সিরোসিস অফ লিভারে নয়।মারা গিয়েছিলেন সেক্সুয়াল ডিসিসে।এটা হয়েছিল তার অসংযত জীবন যাপনের জন্য।

তার মানে উত্তম কুমার অভিনীত সন্ন্যাসী রাজাতে মূল ঘটনা তুলে ধরা হয়নি?

রুদ্রনীল ঘোষ : না, সেখানে অনেক মিথ্যে দেখানো হয়েছে।এর কারণ উত্তম কুমারকে যেন কারোর খারাপ না লাগে।সেই দিক থেকে বলব সৃজিত মুখার্জী অনেকটাই সত্যি তুলে ধরেছেন।সৃজিতের ছবির চরিত্রটাও একটা পিরিয়ডের।এবং তার বয়সের তিনটে সময়কে দেখানো হয়েছে।এই ছবিতে আমি ডাক্তারের চরিত্রে অভিনয় করেছি।

আপনি একটু আগে বললেন যে প্রান্তিক চরিত্র বা ডিগ্ল্যামারাইজড চরিত্র আপনাদের মতো মুষ্টিমেয় কয়েকজন বাদে কেউ করতে চান না।কিন্তু গৌতম ঘোষের মানের মানুষ’- প্রসেনজিত চ্যাটার্জীর মতো সুপারস্টার অভিনয় করেছেন।লালনও প্রান্তিক চরিত্র।এক্ষেত্রে কী বলবেন?

রুদ্রনীল ঘোষ : ২৫ বছর রঙ মেখে জামা কাপড় পরার পর একজন মানুষের বয়স হয়।প্রসেনজিত চ্যাটার্জী গ্ল্যামার প্রাপ্তির পর বুঝতে পেরেছেন এখন অতীতের সেই পোশাক পরলে কেউ বিশ্বাস করবে না।উনি অত্যন্ত বিচক্ষণ এবং অভিজ্ঞ মানুষ।আমাদের কাছে উনি দ্বিতীয় উত্তম কুমার।তিনি এতোগুলো বছর ধরে ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন।আজ দাপটের সঙ্গে বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে বিভিন্ন ধরনের ছবি হচ্ছে।ইন্ডাস্ট্রি সারভাইভ করেছে বলেই তো এই কাজগুলোর সুযোগ হচ্ছে।

তাই?

রুদ্রনীল ঘোষ : অবশ্যই।প্রসেনজিত চট্টোপাধ্যায় বহু বছর ধরে যেভাবে বাংলা ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন সেই রেজাল্ট বা সুফল আমরা আজ পাচ্ছি।আমাদের একটা টেনডেনসি আছে।যা কিছু ব্ল্যাক অ্যাণ্ড ওয়াইট,বা যাদের ছবিতে দেখেছি,বাস্তবে দেখিনি তারাই অমর।তাই উত্তম কুমারই শেষ শ্রেষ্ঠ নায়ক।এই ভাবনাগুলো আমাদের মধ্যে ইনজেক্ট করার চেষ্টা চলে।কিন্তু আমার একটু অন্যরকম মনে হয়।

কীরকম?

রুদ্রনীল ঘোষ : জটিল সামাজিক পরিস্থিতিতে প্রসেনজিত চ্যাটার্জীর কন্ট্রিবিউশন চিরস্মরণীয়।

জটিল পরিস্থিতি বলতে?

রুদ্রনীল ঘোষ : টেকশিয়ান,আর্টিস্ট বা কারোর মধ্যে মনমালিন্য হলে প্রসেনজিত প্রথম ফোন করেন।এবং ফোন করে বলেন-“তোমরা এই সমস্যা মিটিয়ে নাও”।উত্তম কুমার এই কাজ করার অবকাশ পাননি।কিন্তু প্রসেনজিত চ্যাটার্জী সেটা করে ফেলেছেন।

আপনার কথা অনুযায়ী এক্ষেত্রে কি প্রসেনজিত উত্তম কুমারের থেকে এগিয়ে আছেন?

রুদ্রনীল ঘোষ : অবশ্যই।আমি মনে করি প্রসেনজিত চট্টোপাধ্যায় এবং সৌমিত্র চটোপাধ্যায় লেজেণ্ডারি অভিনেতা ।এই বয়সেও তারা কাজ করছেন।সৌমিত্র জেঠুর শরীর অনুপাতে কাজ করা খুবই কঠিন।তবুও তিনি অক্লান্ত কাজ করছেন।আর এই বয়সে বুম্বাদার এনার্জি লেভেল একজন যুবকের মতো।আজ উত্তম কুমার বেঁচে থাকলে মেগাসিরিয়াল করতে হতো।উত্তম কুমারকে ধোয়া তুলসি পাতা মনে না করে তাঁর কাজগুলো ভালোভাবে দেখা দরকার।এবং সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।উত্তম কুমার নিঃসন্দেহে মহানায়ক।সেই জায়গা থেকে প্রসেনজিত চ্যাটার্জীর কৃতিত্ব কোনও অংশে কম নয়।তিরিশ বছর ধরে তিনি ইন্ডাস্ট্রিতে সারভাইভ করছেন।তবে একটা কথা বলার আছে।

কী?

রুদ্রনীল ঘোষ : লালনের চরিত্রে প্রসেনজিতকে আমার ভালো লাগেনি।সেটার জন্য আমি পরিচালকের দিকে আঙুল তুলতে চাই।কারণ লালনের ভূমিকায় প্রসেনজিতের চেহারায় কোনও পরিশ্রমের ছাপ ছিল না।লালনের দাড়ি দেখে মনে হয়েছে শ্যাম্পু করা সিল্কের দাড়ি।যে ফিলোসফির গান লালন গায় তাতে তার এতটা পরিচ্ছন্ন থাকার কারণ নেই।সেই জন্য চরিত্রটা আমার রিয়ালিস্টিক লাগেনি।আমি একটা মানুষকে শ্রদ্ধা করি মানে এই নয় যে তার সব কিছুকেই অসাধারণ বলব।সেই মানুষের গায়ে ঘামাচি বেরোতেই পারে।সেই ঘামাচিকে ঘামাচি না বলে ফুল ফুটেছে বলার মানে তাকে অসম্মান করা।

অভিনেতা প্রসেনজিত চট্টোপাধ্যায়কে আপনার কেমন মনে হয়?

রুদ্রনীল ঘোষ : ‘অটোগ্রাফ’, ‘বাইশে শ্রাবণ’, ‘জাতিস্মর’ দেখে আমি বুম্বাদাকে ফোন করি।বলি —‘তুমি কী করে এই অভিনয় করলে আমাকে বোঝাও”।উনি আজও নিজেকে অভিনয়ের ছাত্র বলে মনে করেন।আমিও একজন অভিনয়ের ছাত্র।উনি সিনিয়র স্টুডেন্ট।তাই আমার প্রয়োজন ওনার থেকে নোট নেওয়া।যেটা আমার পরীক্ষার সময় কাজে লাগবে।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্তআনোয়ার কা কিস্যা ছবিতে আপনাকে কাস্ট করার কথা হয়েছিল।সব ঠিক হয়ে যাওয়ার পর বুদ্ধবাবু আপনাকে ওই ছবি থেকে বাদ দিয়েছিলেন।এবং নওয়াজদ্দিন সিদ্দিকিকে নির্বাচন করেন।বুদ্ধদেববাবুর ছবিতে মানুষের কথা বলা হয়।সততার কথা বলা হয়।কিন্তু তার ব্যক্তি জীবন পুরো উলটো কথা বলল।এই কন্ট্রাডিকশান কেন বলে মনে হয়?

রুদ্রনীল ঘোষ : ছোটবেলা থেকে আমাদের মহাপুরুষের জীবনী পড়ানো হয়।আমাদের সে সব পড়তে বেশ ভালো লাগে।কিন্তু আমরা কি তাদের মতো হতে পারি?পারি না।কয়েকজন বোদ্ধা মিলে ঠাণ্ডা ঘরে বসে কোনও ছবি দেখে এ্যাওয়ার্ড দিলেই সেই ছবির পূর্ণ মূল্যায়ন হয় না।রামকৃষ্ণদেব সমস্ত স্তরের মানুষকে কমিউনিকেট করতে পারতেন।বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর প্রতি আমি উষ্মা প্রকাশ করব না।কারণ উনি ওই চরিত্রে রণবীর কাপুরকে কাস্ট করেননি।করেছেন নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকিকে।ওনার নির্বাচনের ঘরানাটা একই রয়েছে।তবে একটা বিষয় উনি মেনে নিয়েছেন।সেটা হলো নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি বুদ্ধদেববাবুর থেকে বড় স্টার।মুম্বাইয়ের সফল পরিচালকেরা যাকে খুশি নিয়ে ছবি বানাতে পারেন।স্টারের কাঁধে = ভর দিয়ে প্যারালাল বা আর্ট ফিলমের ডিরেক্টর যদি হলে লোক ঢোকান,তাহলে সেই ডিরেক্টরের অবদান কোথায়?

ভবিষ্যতে এই বিষয় নিয়ে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর সঙ্গে আপনার কথা হয়েছে?

রুদ্রনীল ঘোষ : হ্যাঁ ।উনি বললেন রাগ করে না,রাগ করে না,রাগ করে না।আমরা একই ইন্ডাস্ট্রিতে আছি।পরে এক সঙ্গে কাজ করব।

আপনি অভিনয় করা বাদেও ছবিও আঁকেন।এটা অনেকের অজানা।এই ছবি আঁকার সূত্রপাত কীভাবে হলো?

রুদ্রনীল ঘোষ : আমার কাছে ছবি আঁকা,অভিনয় করা,গান গাওয়া এই সব আলাদা কিছু নয়।শুধু শিল্প মাধ্যমের ভাষাগুলো আলাদা।আমার বন্ধুবান্ধব বা সহকর্মীদের মধ্যে অঞ্জন দত্ত,কৌশিক গাঙ্গুলী,পরমব্রত অভিনয় বাদে নানান সৃজনশীল কাজ করেন।আমি আমার ক্ষেত্রে বলতে পারি এগুলো অসাধারণ কোনও গুণের পরিচয় নয়।খুবই সাধারণ কাজ।

আপনার স্ট্রাগল পিরিয়ডে আপনি স্ক্রিপ্ট লিখে রোজগার করতেন।এমনও হয়েছে যে আপনার লেখা স্ক্রিপ্টে আপনার নাম যায়নি।স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে অন্যের নাম গেছে।এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করেননি কেন?

রুদ্রনীল ঘোষ : আমার সারভাইভ করার মতো তখন কোনও বিকল্প পথ ছিল না।সেই সময় বড় চরিত্রে অভিনয় করতে গেলে ফর্সা এবং লম্বা হওয়া জরুরী ছিল।এখন হাঁটতে গেলে হোঁচট খেতেই হবে।হাত পা কাটবে।কষ্ট হবে।চোখের জল পড়বে।ওই চোখের জলের প্রয়োজন ছিল।তাই জীবনকে চিনতে পেরেছি।তাই হয়ত আজকে আপনার সঙ্গে কথা বলছি।

আপনি মুখের ওপর অপ্রিয় সত্যি কথা বলে দেন।এতে শত্রু বাড়ে না?

রুদ্রনীল ঘোষ : আমার তাতে বরং সুবিধা হয়।প্রকৃত বন্ধু সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্ত হই না।শিক্ষিত বিচক্ষণ মানুষের যথাযথ সমালোচনা করলে তাঁরা খুশি হন।প্রসেনজিত চট্টোপাধ্যায় এবং গৌতম ঘোষের উপযুক্ত সমালোচনা করলে তাঁরা খুশিই হবেন।কারণ তারা বিচক্ষণ।আর বিচক্ষণ বলেই তাঁরা এই জায়গায় এসেছেন।ওনাদের সঙ্গে আমার সুমধুর সম্পর্ক।সব সময় যারা প্রশংসা করেন তারা স্তাবক ছাড়া কিছু নয়।

এক সাক্ষাৎকারে আপনি পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়কে স্বার্থপর বলেছেন।কিন্তু শিল্পী মাত্রই কি একটু স্বার্থপর নয়?

রুদ্রনীল ঘোষ : হ্যাঁ, শিল্পী মাত্রই স্বার্থপর।এটা ঠিক।তার সৃষ্টিকে লালন করতে হলে বাকি অন্যান্য বিষয় থেকে তাকে চোখ সরাতে হবে।কিছু করার নেই।কিন্তু পরম একটু বেশি পরিমাণে স্বার্থপর।

এক সময়ে বাংলা কমার্শিয়াল ছবির ডায়লগ খুব জনপ্রিয় হতো।যেমন মারব এখানে লাশ পড়বে শ্মশানেবা বউ হারালে বউ পাওয়া যায়।মা হারালে মা পাওয়া যায় না” —এই সব।কিন্তু বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমায় এখন আর হিট ডায়লগ দেখা যায় না কেন?

রুদ্রনীল ঘোষ : স্ক্রিপ্ট রাইটার আর ডায়লগ রাইটার দুজন আলাদা মানুষ।আজকের সময়ে এই দুজনের কম্বিনেশনের একটু অভাব ঘটেছে।আর একটা বিষয় খুব ইম্পরটেন্ট।ডায়লগ ডেলিভারি যে করছেন তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে।মিঠুন চক্রবর্তীর মুখ দিয়ে ডায়লগ বলালে সেটা হিট করবে।ওই ডায়লগের পর কমার্শিয়ালি আমার একটা ডায়লগ ভাইরাল হয়েছে।ডায়লগটা হলো —“সেটা বড় কথা নয়”।ডায়লগটা এন.কে.সলিলের লেখা নয়।আমার লেখা।আমি শুটিংয়ের আগের দিন সলিলদাকে ফোন করি।করে বলি —“সলিল দা তোমার লেখা  ডায়লগের লেন্থ অনেক বেশি।মনে হয় ওয়ার্ক করার সময় হবে না”।সলিলদা আমাকে বলে —“তুই লিখে নে”।আমি তিন চারটে ডায়লগ লিখি।তার মধ্যে একটা ডায়লগ সলিলদাকে শোনাই।সলিলদা অনুমতি দেয়।এবং ওই ডায়লগটা ক্লিক করে।চিত্রনাট্যকার,সংলাপ রচয়িতা এবং অভিনেতার সঠিক সমন্বয়ে ডায়লগ হিট করে।

এবার আমি কিছু ব্যক্তিত্বের নাম বলব।আপনাকে এক কথায় তাদের সম্পর্কে বলতে হবে।

রুদ্রনীল ঘোষ : আচ্ছা।

চিরঞ্জিত চক্রবর্তী সম্পর্কে কী বলবেন?

রুদ্রনীল ঘোষ : অত্যন্ত শিক্ষিত সজ্জন মানুষ।

আর প্রসেনজিত চ্যাটার্জী?

রুদ্রনীল ঘোষ : আঠারো বছরের তরুণ।

সিপিএম সম্পর্কে কী বলবেন ?

রুদ্রনীল ঘোষ : লুপ্তপ্রায় প্রাণী।

তৃণমূলকে কী বলবেন?

রুদ্রনীল ঘোষ : বামপন্থী কংগ্রেস।

বিজেপি তাহলে কি?

রুদ্রনীল ঘোষ : রাম নাম সত্য হ্যায়।

আপনার কাছে জীবন কী?

রুদ্রনীল ঘোষ : ঘাম।

আর মৃত্যু?

রুদ্রনীল ঘোষ : শান্তি।

প্রেম কী?

রুদ্রনীল ঘোষ : অস্থিরতা।

যদি বলি মা?

রুদ্রনীল ঘোষ : ঘুম।

ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি কী?

রুদ্রনীল ঘোষ : সার্কাস।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত?

রুদ্রনীল ঘোষ : ভালো কবি।

অভিষেক চ্যাটার্জী?

রুদ্রনীল ঘোষ : না ফোটা ফুল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর?

রুদ্রনীল ঘোষ : সমবায় ব্যাঙ্কের প্রবর্তক।

আপনাকে যদি মুখ্যমন্ত্রীর পোস্ট দেওয়া হয় তাহলে প্রথম কাজ কী করবেন?

রুদ্রনীল ঘোষ : প্র্থম কাজ হবে প্রত্যেকটা পোস্টে বিরোধী দলের মাথাগুলোকে বসিয়ে দেওয়া।

সামনে কী পরিকল্পনা আছে?

রুদ্রনীল ঘোষ : এই সময়ের আঠারো থেকে পঁচিশ বছরের ছেলেমেয়েরা ফাস্ট ফুডে বিশ্বাসী।অল্প পরিশ্রমে তারা বেশি প্রাপ্তি চায়।কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে কোনও জ্ঞান অর্জণ করা যায় না।আর জ্ঞান অর্জণ করা না গেলে সারভাইভ করা যায় না।আমার দুশ্চিন্তার জায়গা হলো ভ্যারাইটি ছেলে মেয়ে আমরা পাচ্ছি।কোয়ালিটি ছেলে মেয়ে পাচ্ছি না।কারণ তারা পরিশ্রম করতে রাজী নয়।পা-টাকে বাড়িতে রেখে ম্যারাথনে যাওয়া সম্ভব নয়।এখন সব কিছুই চেইন সিস্টেমে চলে।তারা সারভাইভ করতে না পারলে আমাদেরও সারভাইভ করা সম্ভব নয়।এই সাবজেক্টটাকে কি করে হ্যাণ্ডেল করা যায় সেটাই আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

আপনি গত বছর বলেছিলেন আপনার এক সাংবাদিক বন্ধু আছে,তার সঙ্গেই আপনার বিয়ের প্ল্যান রয়েছে।তো সেই বিয়ের কী হলো?

রুদ্রনীল ঘোষ : সে বিয়ে করে ফেলেছে।আমি সেই নেমতন্নও খেয়ে এসেছি।

তাহলে আপনার বিয়ের কী হবে?

রুদ্রনীল ঘোষ : অবশ্যই আমি আমার বৈধ জেনারেশন দেখতে চাই।সে কারণেই বিয়েটা খুব প্রয়োজন।অনেকে বলেন বিয়ে না করলে কাজ থেকে বাড়ি ফিরলে তোমাকে এক কাপ চা কে করে দেবে।পুরানো হ্যাংওভার থেকে এই সব বলা হয়।বিবাহিত মানুষেরা খুব ভালো করেই জানেন মুদিখানা,শ্বশুরবাড়ি,বাচ্চার প্রবলেম ছাড়া হাসবেণ্ড ওয়াইফের মধ্যে তেমন কোনও আলোচনা হয় না।এই সত্যি কথাটা অনেকেই বলেন না।কারণ বললে খারাপ শোনায়।আমার প্রফেশনে ভালো কাজের জন্য যে কষ্ট,পরিশ্রম সহ্য করতে হয় —-সেটা কখনই আমার ভবিষ্যতের ওয়াইফের পক্ষে ফিল করা সম্ভব নয়।সে আমার ক্লোজ বন্ধুর মতো ওপর থেকে উপলব্ধি করতে পারে।এখন সবার দ্বারা সব কাজ হয় না।আমার বাবা সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা।আমিও তাই।লম্বা হতে চেয়েছিলাম।হলাম না।লম্বা হলে ওপর থেকে কলকাতা দেখতে পারতাম।বেঁটে বলে নীচের থেকে দেখি।নিজে মাটির কাছাকাছি আছি বলে দাবি করি।দ্যাটস ইট।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here