কিছু না, কিচ্ছু না

860

ওয়ালি দাদ একজন করিতকর্মা ছুতোরের নাম | তার হাতের বাটালি ছুটত ঠিক যেমন ইঞ্জিনের মধ্যে ধকধক পিস্টন. ঠিক যেমন চিত্রকরের হাতে তুলি, ঠিক যেমন জল কেটে এগিয়ে যাওয়া রাজহাঁসের একজোড়া পা, ঠিক যেমন… নাহ থাক! ওয়ালি ওস্তাদ তার সম্পর্কে বানিয়ে বানিয়ে এত সব কথা বলা দু’চক্ষে সইতে পারে না ! আসলে ওয়ালি দাদ রোজ সকালবেলা জঙ্গলে গিয়ে কুড়ুল দিয়ে কাঠ কাটে, তারপর দুপুরবেলা সেই কাঠ বাটালি দিয়ে চেঁছে শক্তপোক্ত তক্তা বানিয়ে ফেলে আর বিকেলবেলা হলেই বাজারে সেই কাঠের তক্তাগুলো বেচে দেয় | ব্যাস এটুকুই তার কাজ | আর এর বদলে প্রতিদিন সে ঠিক তিন রূপিয়া রোজগার করে | তার মধ্যে একটা গোটা রূপিয়া খরচা হয়ে যায় খাবারদাবার কিনতে | জামাকাপড়, এক বান্ডিল বিড়ি, তাছাড়া এটা সেটা আর যা যা তার লাগে সেসব কিনতে আরো এক রূপিয়া | বাদ বাকি এক রূপিয়া রোজ রাতের বেলায় বাড়ি ফিরে এক প্রকান্ড মাটির কুঁজোয় জমিয়ে রাখে ওয়ালি দাদ | বছরের পর বছর, মাসের পর মাস, দিনের পর দিন ওয়ালি এভাবেই তোফা কাটিয়ে দিচ্ছে | গঞ্জের হল্লাগুলো থেকে দূরে জঙ্গলের ধরে তার একটা ছোটমোটো মাটির মকান আছে | রোজ রাতের দিকে সেখানে ওয়ালি দাদ ফুর্তিতে শিস দিয়ে গান গায় – কে না শুনেছে সেই গান!

একদিন, যেদিন সকাল থেকে ঘমাসান বৃষ্টি পড়ছিল আর কনকনে ঠান্ডা হওয়া স্তেপের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়ার সময় দীঘল ঘাসগুলোকে নুইয়ে দিচ্ছিল, সেদিন ওয়ালি দাদ আর কাঠ কাটতে গেল না | ঘরে বসে খুঁটিনাটি খুটখুট করতে করতে ওয়ালি ওস্তাদের চোখ পড়ল সেই বিশাল কুঁজোটার দিকে যার ভিতর সে হররোজ এক রূপিয়া জমিয়ে রাখে |

‘আরে কুঁজোটা তো বেমালুম ভর্তি হয়ে গেছে, এক্ষুনি এটাকে খালাস না করলেই নয়’, ওস্তাদ ভাবল | ‘নয়তো কালকে রাতে বাজার থেকে ফিরে যখন ১ রূপিয়া অর মধ্যে ঝনাত ছুঁড়ে দেব, রুপিয়াটা নির্ঘাত কুঁজো উপচে বাইরে এসে পড়বে |’ যেমন ভাবা তেমন কাজ | ওয়ালি দাদ তার পরিচিত এক স্বর্ণকারের বাড়ি গিয়ে হাজির হলো আর তাদের উঠোনে গিয়ে রূপিয়া ভর্তি কুঁজোটাকে উপুড় করে দিয়ে বলল – ‘আঃ শান্তি! এগুলোর বদলে আমাকে বরং এক টুকরো সোনা দাও |’ স্বর্ণকার, যেহেতু সে ছিল একজন ইমানদার ব্যবসায়ী এবং ওস্তাদের বিশেষ দোস্ত, তাই রুপিয়াগুলোকে গুনে গেঁথে হিসেব করে তার বদলে একজোড়া অপূর্ব কারুকার্যময় ঝকঝকে সোনার ভারী কাঁকন সওদা দিল! কিন্তু সোনার কাঁকনটা হাতে পেয়ে ওয়ালি দাদ আরেক আতান্তরে পড়ে গেল | এমন একজোড়া সুন্দর সোনার কাঁকন তার কিইবা কাজে লাগতে পারে! ভাবতে ভাবতে রাত কাবার | পরদিন সকালে কুঠার কাঁধে সে যখন সবে জঙ্গলের দিকে পা বাড়াতে যাবে, রাস্তায় তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল মস্ত এক বণিকের | যার সঙ্গে ছিল সাত-সাতটা মালপত্র বোঝাই উটের সারি | তাকে দেখে ওস্তাদের মাথায় চমত্কার এক ফন্দি খেটে গেল |

‘বলত ভাইসাহেব, এ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দেখতে মেয়ে কে?’ – ওয়ালি দাদ জিজ্ঞেস করে বসল |

‘কে আবার! খাইস্তানের রাজকন্যে – এই তো এখন তার প্রাসাদেই যাচ্ছি আমি, তার জন্য সাত-সাতটা উটের পিঠে বোঝাই সুন্দর সুন্দর রকমারি পোশাক নিয়ে |’

হাতে চাঁদ পেল ওয়ালি ওস্তাদ –

‘আমার একটা উপকার করবে ভাইসাহেব? এই সোনার কাঁকনজোড়া সেই অপূর্ব সুন্দরী রাজকন্যের কাছে পৌঁছে দেবে আমার হয়ে?’

বণিক এমন অবাক আর কক্ষনো হয়নি, সে ওয়ালি দাদের মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু ওয়ালি ওস্তাদ ততক্ষণে কাকুতি মিনতি করতে শুরু করে দিয়েছে –

‘একবার ভেবে দেখ দোস্ত এ’দুটো সোনার গয়না নিয়ে কী মুশকিলেই না পড়েছি আমি, এগুলো আমার কোন কাজে আসবে বলতে পার!’

বণিকের হাতে কাঁকনদুটো গছিয়ে ওয়ালি যেন পালিয়ে বাঁচল, আর যাবার আগে দূর থেকে হাঁক দিয়ে বলে গেল –

‘খাইস্তানের রাজকন্যেকে আমার নামটা বোলো কিন্তু দোস্ত! বোলো, এটা ওয়ালি দাদের উপহার!’

ঠিক এক সপ্তাহ পরে যখন খাইস্তানের রাজপ্রাসাদে বণিক যখন রাজকন্যের হাতে ওয়ালি ওস্তাদের দেওয়া তোফা পৌঁছে দিল, রাজকন্যে দারুন খুশি হলো | তবে অবাক হলো তার চেয়েও বেশি |

‘কে এই ওয়ালি দাদ! আর কেনই বা আমাকে এমন সুন্দর আর দামী উপহার পাঠিয়েছ?’

‘ওয়ালি দাদ যেই হোক, সে নিশ্চয়ই নিজের ধনসম্পদের বহর দেখিয়ে আপনার মন জয় করতে চায়’ – রাজসভার এক বুদ্ধিদাতা জানাল |

‘আপনি ওকে আরও দামী কোনো উপহার পাঠান, যাতে অর ধনসম্পদের গর্ব ফুট হয়ে যায়’ – বলল আরেক পরামর্শদাতা |

রাজকন্যা পাঠালো মহার্ঘ্য আর সুক্ষ্মতম রেশমের এক প্রকান্ড বোঝা | আর বণিক যখন খাইস্তানের রাজকন্যের দেওয়া সেই প্রকান্ড উপহারের বোঝা উটের পিঠে চড়িয়ে হাজির করলো ওয়ালি ওস্তাদের কুঁড়ে ঘরের সামনে, সে হয়ে উঠলো একটা দেখার মতো দৃশ্য | ওস্তাদ তো আরেকটু হলেই ভিরমি খাচ্ছিল!

‘এই রেশমের বোঝা নিয়ে আমি কী করব’ – কাঁদো কাঁদো গলায় জিজ্ঞেস করলো ওয়ালি |

‘তুমি এটা অন্য কাউকে দিয়ে দিতে পারো’ – বণিক বলল |

‘কিন্তু কাকে দেব? কে আছে এমন?’

‘একজনই আছে, যাকে এ তোফা মানায়, তিনি নেকবাদের সম্রাট মহীয়ান!’ – জানাল বণিক |

নেকবাদের তরুণ সম্রাট যখন সেই মহার্ঘ্য আর সুক্ষ্মতম রেশম উপহার পেলেন, মুগ্ধ হয়ে গেলেন ওয়ালি দাদের সুক্ষ্ম রুচিবোধ আর জিন্দা দিলের পরিচয় পেয়ে | কিন্তু কে এই ওয়ালি দাদ আর কেনই বা তাঁকে এত দামী উপহার পাঠিয়েছে সম্রাটের জন্য? একই প্রশ্ন উঠলো, আর এবারেও একই রকম টুপি বা দাড়িগোঁফওয়ালা একই রকম চশমা আঁটা কোনো বুদ্ধিদাতা ভারী গম্ভীর গলায় জানাল – ‘ওয়ালি দাদ যেই হোক, সে নিশ্চয়ই নিজের ধনসম্পদের বহর দেখিয়ে আপনার মন জয় করতে চায়!’

সুতরাং কয়েকদিনের মধ্যেই নেকবাদের মহীয়ান তরুণ সম্রাটের উপহার দেওয়া ১২ টা ধপধপে তেজী ঘোড়া এনে ওয়ালি দাদের কুঁড়েঘরের দোরগোড়ায় হাজির করলো সেই বণিক | ওয়ালি ওস্তাদের পিলে চমকে গেল | ঘোড়াগুলোকে সে পত্রপাঠ চালান করে দিল খাইস্তানের প্রাসাদে | এবার আরো মুগ্ধ আরো অবাক হলেন খুবসুরত সেই রাজকন্যে | ভ্রু-ধনুক বেঁকে উঠলো সুন্দরীর |

‘বণিক, তুমি তো মাননীয় ওয়ালি দাদকে নিষেধ করতে পার, কেন যে বারবার এত দামী দামী উপহার তিনি পাঠান, আর আমিই বা ওনার যোগ্য উপহার কি দিতে পারি প্রত্যেকবার!’

কয়েকদিন বাদে খাইস্তানের রাজকন্যের উপহার দেওয়া ২০ টা গাধার পিঠে বোঝাই রূপো নিয়ে বণিক যখন হাজির হলো ওয়ালি দাদের মকানে, ওস্তাদ আর এক মুহূর্ত দেরি করলো না, ২০ টা গাধা বোঝাই রূপো চলে গেল নেকবাদের প্রাসাদে | নেকবাদের মহীয়ান সম্রাট এবার বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন | শেষে রাজসভার সবচেয়ে বুজুর্গ বুদ্ধিদাতা যিনি, তিনি এসে দাড়ি চুমড়ে বললেন – ‘ওয়ালি দাদ নিশ্চয়ই এটা জাহির করতে চায় যে নেকবাদের মহীয়ান সম্রাটের থেকেও সে বেশি বড়লোক | ওকে এমন একটা উপহার পাঠান যা দুনিয়ার কেউ কোনদিন কল্পনা করতেও বিষম খাবে |’

নেকবাদের সম্রাট এবার ওয়ালি দাদকে উপহার হিসেবে পাঠালেন সোনার ঝালড়ে মোড়া ২০ টি পুরুষ্টু উট, সোনার লাগাম পরানো ২০ টা তেজি ঘোড়া, ২০ টা হাতি যাদের পিঠে সোনার তৈরি হাওদা, এবং সব দেখাশোনা করার জন্য কুড়িজন জওয়ান বান্দা!

এসব নিয়ে বণিক যখন ওয়ালি দাদের কাছে হাজির হলো, ওস্তাদ তখন ঘরের উঠোনে বসে বাটালি দিয়ে কাঠ চেঁছে সমান করছিল | লটবহর সমেত বণিককে দেখে সে কেঁদেই ফেলল |

‘আমার কপাল পুড়েছে! কবে যে এইসব অনাসৃষ্টি কান্ড বন্ধ হবে!’ তারপর বণিককে ডেকে বলল –

‘তুমি বরং দুটো পছন্দসই জানোয়ার নিজের জন্য রেখে বাদবাকি জিনিসপত্র খাইস্তানের রাজকন্যের কাছে দিয়ে এস’ |

‘অসম্ভব!’ – ঝাঁঝিয়ে উঠলো বণিক, ‘আমি পারব না’| আগের বার রাজকন্যে আমাকে বলেছিলেন তোমাকে উপহার পাঠাতে নিষেধ করতে! এবার আর আমায় দিয়ে হবে না!’

শেষ পর্যন্ত ওয়ালি দাদের কাকুতি-মিনতিতে নিমরাজি হয়েছিল বণিক | আর এইসব লটবহর যখন খাইস্তানে পৌঁছল রাজকন্যের মাথা ঘুরে গেল! আর এবার বুদ্ধিদাতারা তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলল –

‘বুঝতে পারছেন না? লোকটা নিশ্চয়ই আপনার প্রেমে পাগল হয়ে গেছে, আপনাকে বিয়ে করতে চায়!’

সেই থেকে রাজকন্যার মন ছটফট করতে লাগলো ‘মহান’ ওয়ালি দাদকে এক পলক দেখবার জন্য | একদিন মস্ত এক রেশমে মুখ ঢেকে চুপকে চুপকে বেরিয়ে পড়ল রাজকন্যা, সঙ্গে শুধু এক পেয়ারের বাঁদী | খুঁজতে খুঁজতে ওরা পৌঁছে গেল ‘মহল’ ওয়ালি দাদের সেই টুটাফাটা ছোটমোট মকান থুড়ি মহান কুঁড়েঘরটির সামনে | আর সেখানকার হল হকিকত দেখে রাজকন্যে কেমন যেন ঘাবড়ে গেল | ঠিক সেই সময়ে এক অশ্বারোহী রাজকীয় যুবক এগিয়ে এলেন তার দিকে | কেমন যেন একটা উল্টোপাল্টা হওয়া বইতে শুরু করলো তার সঙ্গে সঙ্গে | একশোটা পদ্মফুল যেন ফুটে উঠলো একসাথে! একশোটা বাঁশিতে যেন মিঠে সুর বাজল! আসলে প্রথমবার চোখে চোখ রেখেই সুন্দরী রাজকন্যে নিজের কলিজার থেকেও বেশি ভালোবেসে ফেলেছে সেই খুবসুরত নওজোয়ানকে, যার আসল পরিচয়টি হলো সে নেকবাদের মহীয়ান সম্রাট! এবং যে কিনা খাইস্তানের রাজকন্যের মতই কোনো একজন রহস্যময় ওয়ালি দাদকে চর্মচক্ষে একবার দেখবে বলে খুঁজতে খুঁজতে ঘোড়া ছুটিয়ে এতদূর এসে হাজির হয়েছে! এদিকে সম্রাটের মনের অবস্থাও তথৈবচ, ঠিক রাজকন্যের দিলের মতো | ফলে পরের কয়েকটা মাস নেকবাদের সম্রাট আর খাইস্তানের রাজ্কন্যেকে একসঙ্গে দেখা যেতে লাগলো ফুলের বাগিচায়, নদীর কিনারে, দিনের আলোয়-রাতের অন্ধকারে-বিকেলে-ভরদুপুরে-পানশালায়-বাজারে-সূর্য ওঠার আগে-গোধুলির আলোয়-ঘোরার পিঠে-নৌকার খোলে | দু’জনের ওপর যেন জিন ভর করেছে বা বাজ পড়েছে! ওদের এই জিনে-পাওয়া দশাটা আরো অনেকদিন চলতেই থাকত যদি না ঘোষক এসে গ্রামে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে জানিয়ে যেত যে, শোনো শোনো শোনো সামনের অমুক মাসের অমুক তিথিতে খাইস্তানের রাজকন্যে আর নেকবাদের সম্রাট শুভ পরিনয়ে আবদ্ধ হতে চলেছেন | প্রজারা হইচই মাচিয়ে দিল!

এদিকে বেচারি ওয়ালি দাদ জানতই না যে ততদিনে তার নাম দেশে দেশে সবার মুখে মুখে ঘুরতে শুরু করেছে | বরং রাজকন্যে আর সম্রাট দু’জনেই তাকে নিজের নিজের প্রাসাদে বারবার নেমন্তন্ন করা স্বত্তেও সে যায়নি | কিন্তু তার টনকটা সেদিন নড়ল যেদিন সেপাইরা রাজকীয় বিয়ের উপঢৌকন হিসেবে ওয়ালি ওস্তাদের মকানের সামনে হাজির করলো একটা ছোটখাটো সোনার পাহাড় | ওয়ালি দাদ ব্যাপারটা দেখল খুব উত্সাহের সঙ্গে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, আর তারপর কুড়ুলটা হাতে নিয়ে মকান থেকে ফটাফট বেরিয়ে গেল | আর কোনদিন কেউ তাকে দেখেনি |

[‘ও কেয়া দেখা, জিসনে লাহোর নহি দেখা!’ এ হলো সেই পাঞ্জাবের গল্প যার রাজধানী লাহোর | লাহোর বিখ্যাত তার উদারতার জন্য | তবে এ গল্প লাহোর থেকে অনেক দূরের দেদার হরিয়ালি আর শুনশান জঙ্গলের গন্ধ মাখা | পাঞ্জাবের জল-ঘাস-মাটির ওপর দিয়ে সোজা সুফী উদার হাওয়া খেলে ভালো | আর এ গল্পের বয়স সম্ভবত ইসলামের থেকেও বেশি |]

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.