রুশিকোণ্ডা…বানগুণ্ডি অথবা ভারি সুন্দর

1319
পাহাড়ের ওপর থেকে সমুদ্র দেখার মজাই আলাদা

ছোট্ট পাহাড়ের মাথায় একটা হোটেল, যার ঘর থেকে বসে সামনে দেখা যাবে কেবল সমুদ্র আর সমুদ্র, তোফা আরামে ঢেউ গুণে ছুটি কাটাও। অতি লোভনীয় প্রস্তাব আর নাগালের মধ্যে এমন জায়গা বলতে একটাই… ভাইজ্যাগ বা বিশাখাপত্তনম। হাওড়া থেকে চেন্নাই এক্সপ্রেসে স্রেফ এক রাতের মামলা তাছাড়া দক্ষিণ ভারতের ট্রেন জার্নি তো প্রায় ঝামেলা-হুজ্জত বর্জিত। সকাল ৯টায় ভাইজ্যাগে পৌঁছে অটোয় চেপে রওনা দিলাম রুশিকোণ্ডার উদ্দেশ্যে, মোটে আধঘণ্টার পথ। মূল শহরের বাইরে খোলামেলা এই সমুদ্র সৈকতটিকে যেন আগলে রেখেছে এক সারি পাহাড়। কয়েক বছর হল এই জায়গাটাই টুরিস্টদের কাছে মুখ্য আকর্ষণ। অন্ধ্র সরকার হালে পাহাড়ের গায়ে বিচ রিসর্ট বানিয়ে দিয়েছে, আমরা এসেছি এই “হরিথা” তেই থাকব বলে। অটো আমাদের ভুট ভুট করে তুলে দিল রিসেপশন অবধি।

বিচে বসে আঁকা ‘হরিথা রিসর্ট’

আগস্ট মাসের শেষাশেষি ফলে অন্ধ্রের গরম কি জিনিস সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলেও সামনে অতখানি ছড়ানো নীল জল দেখে সেটা অত গায়ে মাখলাম না। একেবারে সমুদ্রের মুখোমুখি পরপর একতলা, দোতলা লাল টালির ছাদওলা সব কটেজ, আমাদেরটা অনেক এগিয়ে পাহাড়ের শেষ মাথায় ফলে এখান থেকে প্রাকৃতিক দৃশ্যটা অনেক বেশি নিরিবিলিতে উপভোগ করা যায়।

ছবি আঁকার জন্য আর তর সইছিল না তাই ঠাণ্ডা ঘরে বসে না থেকে একটা খোলা বারান্দায় গিয়ে কাজ শুরু দিলাম। অত ওপর থেকে সমুদ্র, বিচের দোকানপাট, ওয়াচ টাওয়ার, খুদে খুদে লোকজন, দূরের পাহাড় সব মিলিয়ে এমন কম্পোজিশন করার সুযোগ আগে পাইনি, এদিকে আমি তখন ঘেমে নেয়ে অস্থির হয়ে উঠছি, ঝোড়ো হাওয়ার চোটে ক্রমাগত কাগজ উড়ে যাচ্ছে তাও ডোন্ট কেয়ার কানাকড়ি। বিকেলবেলা রোদ পড়তে রিসর্টের সামনে পাহাড়ের গা বেয়ে এঁকে বেঁকে নেমে যাওয়া সিঁড়ি ভেঙ্গে বিচে গিয়ে হাজির হলাম। বালিয়াড়ির ধার ঘেঁষে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে জেলেদের ঝুপড়ি, নৌকো, মাছ ধরার জাল আর বড় রাস্তার দিকটায় সারি সারি খাবারের দোকান।

হোটেলের ঘরে বসে আঁকা বিচের ধারে জেলেদের ঝুপড়ি

একে শনিবার তার ওপর গণেশ পূজোর মরশুম তাই প্রচুর লোক এসেছে সমুদ্র দেখতে, এদের বেশির ভাগই অল্প বয়সী ছাত্র-টাত্র। সমুদ্রের জলকে ঢুকিয়ে এনে মাঝখানে বড় পুকুর বানানো হয়েছে, সবাই তার মধ্যে নেমে ঝাঁপাঝাঁপি করছে, ফোলানো নৌকো চেপে ভেসে বেড়াচ্ছে। নীচ থেকে সামনে পাহাড় সমেত আমাদের রিসর্টটা আঁকব বলে জড়ো করা পাথরগুলোর ওপর গুছিয়ে বসলাম, যথারীতি চারপাশে ভিড় জমে গেল।

সুন্দর কায়দায় বসে লিকিতা

কয়েকটি মেয়ে অনেকক্ষণ খলরবলর করছিল, একজনকে বললাম এসো তোমার স্কেচ করি, স্মার্ট মেয়ে হাতের আঙুলগুলোকে সুন্দর কায়দায় সাজিয়ে নিয়ে বসল। মিনিট কয়েকের মধ্যেই ছবি শেষ, সবাই বেশ চমৎকৃত আর আমি অবাক মেয়েটির নাম জেনে…লিকিতা। মনে হল ভুল শুনছি, খাতায় লিখে দেখালাম বলল ‘ইয়েস, ইয়েস’…ওয়েস্ট গোদাবরী থেকে ভাইজ্যাগে পড়তে এসেছে। ওর নামের মানেটা জিজ্ঞেস করার আগেই এগিয়ে এসে আমার সঙ্গে ভাব জমিয়ে নিলো ভাইজ্যাগের দুই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র সুস্মিতা আর শ্রীবৎস। আমার খাতা উলটে পালটে দেখল সেই সঙ্গে বেড়ানো আর কাজকর্মের কথা জানতে চাইল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। ছেলেটিরও নাকি কার্টুন আঁকার শখ আছে। শেষে মেয়েটাকে বললাম, ‘সুস্মিতা নামটা কিন্তু শুধু বাঙালীরাই রাখে’…স্যামান্য হেসে জবাব দিল ‘বাঙালীদের নামগুলো শুনতে খুব মিষ্টি হয়।’

টুরিজিমের হয়ে নৌকো চালায় অমর

ভাইজ্যাগের প্রধান আকর্ষণ হল ‘কৈলাস গিরি’, এসে ইস্তক রিসর্টের ম্যানেজার থেকে বেয়ারার দল ঘণ্টায় ঘণ্টায় খবর নিয়েছে জায়গাটা ঘোরা হয়েছে কিনা। দ্বিতীয় দিন লাঞ্চের পর অটো ভাড়া করে (এখানে এই বস্তুটির কোনও অভাব নেই, চাইলেই হাজির) যাওয়া গেল কৈলাস গিরি। পুরো ব্যাপারটা পাহাড়ের ওপর তবে মন্দিরের বালাই নেই, হর-পার্বতী দুজনের বিশাল সাইজের মূর্তি বসানো খোলা জায়গার চারপাশে বিশাল প্রমোদ উদ্যান, আজ রবিবার তাই ভিড়ে ভিড়। টয় ট্রেন, রেস্তোরা, পিকনিক পার্টি, সিরিয়ালের শুটিং, টাইট জিনস পরা বেঢপ চেহারার বাঙালি মহিলাদের উচ্চস্বরে (ভাষাটা ছেড়েই দিলাম) বরকে দাবড়ানি সব মিলিয়ে ঘণ্টা দেড়েক আমাদের মন্দ কাটল না। পাহাড়ে ওঠানামা করা গেল গণ্ডোলা চেপে, উঁচু থেকে সমুদ্রের ওপর ভাইজ্যাগ শহরটা দেখে চক্ষু সার্থক হল।

রুশিকোণ্ডায় বিকেলের পর থেকে গণেশ ঠাকুর ভাসানের হিড়িক পড়ে গেল, ট্রাক বোঝাই মেয়ে-মদ্দ এসে চলেছে দলে দলে, ব্যান্ড পার্টি, নাচা গানা সবই হচ্ছে কিন্তু কি আশ্চর্য কোথাও এতটুকু বেলেল্লাপনা চোখে পড়ল না। মাটিতে রাশি রাশি ডাব নিয়ে বসেছে মহিলারা…এদের ভাষায় ‘কোব্বারবোণ্ডাম’, হলুদ রঙের ভুট্টাও দেদার বিক্রি হচ্ছে। আমরা দুটোই খেয়ে দেখলাম, এখানকার পেটেন্ট জলখাবার বিটকেল আর বিস্বাদ বড়া আর ইড্‌লির চেয়ে ঢের ভালো। সন্ধ্যে হয়ে আসছে, ওপরে আমাদের রিসর্টে দেখছি আলো জ্বলে উঠেছে, বেশ মায়াময় লাগছে। মনে হল এবার এক কাপ চা খেতে হবে। রিসর্টের ডাইনিং হলের সামনে খোলা ছাদে টেবিল চেয়ার পাতা, চায়ে চুমুক দিতে দিতে অনেক নীচে জলের ধারে আলো ঝলমলে উৎসবের মেজাজটা দেখতে দারুণ লাগছিল।

পাহাড়ের গায়ে গড়ে উঠছে নতুন টাউনশিপ

আমাদের পাশে এসে বসলেন রেস্টোরান্টের কর্তা মিঃ চন্দ্রশেখর, ওঁকে সখেদে জানালাম, ‘আপনারা যত খুশি এই ইডলি-ধোসা খান আপত্তি নেই কিন্তু আমিষভোজীদের কথাও তো একটু ভাবা দরকার। বেশ মুশকো চেহারা হলেও দেখলাম লোকটা সরল গোছের, আমার কথাটা মেনে নিয়ে বলল ‘ইচ্ছে হলে আজ ডিনারে আমাদের তন্দুর প্রিপারেশনগুলো ট্রাই করতে পারেন।’ ভেবে দেখলাম ডিম বা মুরগির কারি অবধি চালিয়ে নিচ্ছি এর বেশি দুঃসাহসের আর দরকার কি? খেয়াল করিনি আকাশ ততক্ষণে কালো মেঘে ছেয়ে গেছে, ঘরে পৌঁছনোর আগেই তুমুল বৃষ্টি আর বাজ পড়া শুরু হল। এ-সি বন্ধ করে ঘরের বড় বড় জানলাগুলো খুলে দিলাম, বৃষ্টি তো শুধু দেখার জিনিস নয়, শোনারও। কাল ভোরেই ‘আরাকু’ রওনা হচ্ছি মনে হল ওখানেও একটু আধটু বৃষ্টি পেলে জমবে ভালো।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.