সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ১৪)

483
ছবি - দেবব্রত ঘোষ

জীবন কেমন?‌‌

এই বিষয়ে কতজন কতরকম কথাই না বলেছেন !‌ তার সব বিজ্ঞজন,দার্শনিক। এসব বিষয়ে আমার কথা বলবার কোনও অধিকার নেই। আমি হলাম,‘‌খাই দাই গান গাই তাইরে নাইরে না’টাইপ মানুষ। তাও নিজের পয়সায় সবটা হয় না। টিউশন,অড জবস্‌,বইপাড়ায় প্রুফ দেখে কতটাই বা রোজগার হবে? ‘গান গাই ‌তাইরে নাইরে না‌’‌টুকু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে পারে, ‘‌খাই দাই’টা পুরো চলে না। বাকিটা চলে ‘‌ধারাংচু’‌পদ্ধতিতে। ‘‌ধারাংচু’‌ অতি চমৎকার একটি পদ্ধতি। ধার নাও,ফেরত দাও। ফেরত দিতে না পারলে চিন্তা কর না। ধারকে ধার হিসেবে মেনে নাও। পদ্ধতি ভাল না? অনেকে আমাকে জিগ্যেস করে,‌‘‌সাগর,এর নাম ধারাংচু কেন ?’‌

আমি বলি,‘‌কোনও কারণ নেই,সুকুমার রায়ের ‘‌দ্রিঘাংচু’গল্প থেকে এই নামকরণের অনুপ্রেরণা পেয়েছি।’‌ 

‌যাই হোক,আমার মতো অকর্মন্য মানু্য বড় কথা বলতে গেলে তাকে দিতে হয় ধমক। এই গাধা,তুই চুপ কর দেখি। তুই বেটা জীবন,মৃত্যুর কী বুঝিস?‌ তারপরেও জীবন কেমন সে বিষয়ে আমার কিছু মতামত আছে। ফালতুর লোকের কাজের থেকে মতামত বেশি থাকে। 

আমার মতে,জীবন হল বিস্ময়ে ভরা। প্রতি ক্ষণে ক্ষণে শুধু অবাক হও আর অবাক হও। আকাশে মেঘের আলপনা এঁকে চলে যাওয়া সুপারসনিক জেট প্লেন দেখে অবাক হও। হাতের পাশ দিয়ে নেচে যাওয়া অতি তুচ্ছ ফড়িং দেখেও অবাক হও। কত ঘটনা অবিরত জীবনকে বিস্মিত করে,মহিমাণ্বিত করে। বিস্ময়ে তাই জাগে, জাগে আমার প্রাণ।

পুলিশ হাজতে সেই বিস্ময়ের ঘটনাই ঘটল। 

ধরে আনা বনলতার স্বামী আর তার সাগরেদকে পুলিশ ব্যাটম ট্রিটমেন্ট দিয়েছে। তারপর ঢুকিয়ে দিয়েছে লকাপে। দু’জনের অবস্থাই দেখি ভয়ংকর। খাবি খাচ্ছে আর বলছে,‘‌স্যার,আর কখনও করব না .‌.‌.‌‌স্যার,আর কখনও করব না.‌.‌.‌‌স্যার, আর কখনও করব না.‌.‌.‌।’

আমাকে বলছে ,মোবাইলকে বলছে,মেঝেতে ঘুমিয়ে থাকা বয়স্ক আসামীকে বলেছে, লকাপের স্যাঁতস্যাঁতে দেয়ালকে বলছে। 

মোবাইল আমার কানে কানে বলল, ‘‌মেডিসিন ভাল পড়েছে। এফেক্ট থাকবে অনেকক্ষণ। তবে আমার সমস্যা আছে।’‌

আমি গাল নামিয়ে বললাম,‘‌কী সমস্যা!‌’‌

মোবাইল এবার ঘুরে লোকটাকে এক ধমক দিয়ে বলল, ‘‌অ্যাই আমাকে স্যার ডাকবে না। আর একবার স্যার ডাক থাবড়ে দাঁত ফেলে দেব।’‌তারপর আমার দিকে ফিরে বলল,‘বুঝলেন দাদা,‌স্যার ডাকলে আমার গায়ে আমবাতের মতো চাকা চাকা বের হয়। ছোটোবেলা ডাক্তারবাবু দেখে বললেন,আমার হল স্যার অ্যালার্জি। কুচো চিংড়ি,বেগুন বাদ। মুসুর ডাল চলতে পারে,তবে রান্না করতে হবে ট্যালট্যাল করে।’‌

আমি অবাক হয়ে গেলাম,পুলিশে হাতে ধরা পড়েও এই ছেলের মনে কী ফূর্তি। অপরাধীরা কি এমনই হয়?‌ কে জানে,হয়তো হয়। তবে মোবাইল যতই পকেটমার হোক,এইটুকু সময়ের মধ্যেই ছেলেটিকে আমার পছন্দ হয়েছে। প্রাণ আছে। জীবনকে অতি আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। এটা খুব কঠিন একটা প্র্যাকটিস। খুব অল্প মানুষ পারে। আমার ধারনা এই ছেলেকেও যখন পুলিশ ব্যাটম ট্রিটমেন্ট দেবে,তখনও সে চনমনে থাকবে। মোবাইল বলে চলেছে—

‘‌বাবা তো ছেলের স্যার অ্যানার্জির কথা শুনে খুব ভয় পেয়ে গেল। ডাক্তারবাবু বললেন,দেখবেন,আপনার ছেলে কখনও যেন এমন কাজ না করে যাতে তাকে কেউ ওকে স্যার ডাকে। তারপরই বাবা ভয় পেয়ে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিল। ’‌

আমি বললাম,‘কেন?‌ স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিল কেন?‌‌ স্কুলে পড়লে কি আমবাত হয়?‌’‌

মোবাইল বলল,‘‌না,তা নয়। লেখাপড়া শিখে যদি এমন কাজকম্ম কিছু করে বসি,যাতে সবাই আমাকে স্যার ডাকে ? ধরুন ফট্‌ করে মাস্টার হয়ে গেলাম বা ধরুন অফিসার। নেতা –‌মন্ত্রী কিছু হলে তো কেলেঙ্কারি এক শেষ। স্যারের বন্যা বয়ে যাবে,আর আমি আমবাতে মরব। তখন কী হবে?‌ বাবা,কোনও রিস্ক নিল না। লেখাপড়া বন্ধ করে দিলও। আমিও নিশ্চিন্ত হলাম।’‌

এরপরও বনলতার বর না তার চেলাটা কুঁই কুঁই করে বলল,‘‌‌স্যার,আর কখনও করব না.‌.‌.‌।’‌

মোবাইল এবার উঠে গিয়ে লোকটার গালে সত্যি সত্যি কষিয়ে একটা চড় মারল। এক চড়ে লোকটা গেল থেমে। পুলিশের চড়ে কথা চোরের চড়ে চুপ।

এরপর বেশ কিছুক্ষণের জন্য থানাও একবারে চুপচাপ। নিঃশব্দ। আমারও কেমন যেন ঝিম্‌ মতো ধরে গেল। ঘুমিয়ে পড়লাম। শুধু ঘুমিয়ে পড়লাম না,একটা স্বপ্নও দেখলাম। স্বপ্ন এরকম—

বসে আছি কোনও রাজপ্রাসাদের বারান্দায়। শ্বেত পাথরে বাঁধানো। অলস শীতবেলায় রোদ পোওয়াচ্ছি। হাতে কমিকসের বই। অ্যাসটেরিক্স। হঠাৎ দেখি একটা কাক এসে বসল সামনের পাঁচিলে। কবার ঘাড় এদিক ওদিক করে তাকাল। তারপর ডাকল,‘‌কঃ।’‌একেবারে সুকুমার রায়ের গল্প ‘‌দ্রিঘাংচু’র ডাক। আমি কাকের ‘‌কঃ’‌‌ডাকের মানে বুঝতে না পেরে যখন হাবুডুবু খাচ্ছি তখন শুনি ,মেয়ের গলায় খিলখিল আওয়াজ। মাথা ঘুরিয়ে দেখি স্রোতস্বিনী। রূপকথার রাজকন্যাদের মতো পোশাক পরেছে। সাদা গাউন। একমাথা চুল। কানে মুক্তোর দুল। গলায় মালা। ঝুঁকে পড়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,‘‌কঃ ডাকের মানে বুঝলে সাগরবাবু?‌’‌

আমি বললাম,‘‌কই !‌ না তো!‌’‌

স্রোতস্বিনী বলল,‘‌বোকা একটা।’‌

কাকটা বলল,‘‌সাগর,আই লাভ ইউ।’

কাক আমাকে ‘‌লাভ ইউ’‌বলছে?‌‌ আমি রাজসিংহাসন থেকে হুড়মুড়িয়ে পড়ে গেলাম। পুরোটা পড়তে পারলাম না। ঝনঝন আওয়াজ হল। অবাক হয়ে দেখি সিংহাসনের সঙ্গে আমাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। এবার হাততালির আওয়াজ। মুখ তুলে দেখি,সৃজনী!‌ সৃজনী এখানে কী করছে !‌ সে পরেছে একটা জিনস আর টি শার্ট।‌ কিশোরীর মতো হাততালি দিচ্ছে আর লাফাচ্ছে।

‘‌বেশ হয়েছে, বেশ হয়েছে, তুমি আর কোনওদিন সিংহাসন থেকে নামতে পারবে না.‌.‌.‌পারবে না।’‌

সেকী!‌ সারাজীবন আমি সিংহাসনে বন্দী হয়ে থাকব ?‌আমার তো দমবন্ধ হয়ে যাবে। ধড়ফড় করে ঘুম ভেঙে উঠে বসলাম।

একজন হাবিলদার লকাপের দরজা খুলছে। তালা–‌চাবির আওয়াজ আমার স্বপ্নে শিকল হয়ে এসেছে। হাবিলদারের পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই অফিসার। থানার বড়বাবু। আমাকে চমকে দিয়ে নিচু গলায় বললেন,‘‌স্যার,আপনি আসুন।’

স্যার!‌ থানার অফিসার একজন লকাপবন্দীকে ‘‌স্যার’‌ডাকছে! মোবাইল আমার দিকে অবাক হয়ে তাকাল। আমি তার পিঠে হাত দিয়ে হেসে বললাম,‌‘‌দেখা হবে।’‌

এরপরে আরও বিস্ময় আমার জন্য অপেক্ষা করেছিল।

অফিসার আমাকে নিজের টেবিলে নিয়ে গিয়ে খাতির করে বসালেন। 

‘‌আগে বলেনি কেন?‌’‌

আমি অবাক হয়ে বললাম,‘‌কী বলব?‌’‌

অফিসার অভিমানভরা বলল,‌‘‌আপনি মন্ত্রীমশাইকে চেনেন। এই কথা তো আমাকে বলা উচিত ছিল।’‌

আমি অবাক হয়ে বললাম,‘‌আমি মন্ত্রী চিনি!‌’‌

অফিসার বললেন,‘‌একটু আগে উনি এসেছিলেন। সারপ্রাইজ ভিজিট।’

আমার মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড়। অফিসার বলে কী!‌ মন্ত্রী এসেছিলেন!‌ আমার ঠাট্টা সত্যি হয়েছে!‌‌ 

অফিসার বললেন,‘‌উনি থানা ঘুরে দেখলেন। চা খেলেন। আমার কাজের প্রংশসা করলেন।’‌

আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম,‘‌আমি মন্ত্রীকে চিনি না।’‌

অফিসার ছলছল চোখে বললেন,‘‌আবার ঠাট্টা করছেন স্যার!‌ মন্ত্রীমশাইয়ের সঙ্গে আপনার ভোররাতে লেকে দেখা হয়,আর আপনি বলছেন,মন্ত্রীকে চেনেন না!‌ আপনি যদি আমাকে না বলতেন,আমার কী বিপদ হত বলুন দেখি। উনি এসে দেখতেন আমি নাক ডেকে ঘুমোচ্ছি। তারপর?‌ ‌হয় চাকরি নট নয় দার্জিলিঙে বদলি। ধন্যবাদ স্যার। অতি ধন্যবাদ। আপনি আমার সঙ্গে দয়া করে ব্রেকফাস্ট খান।’‌

আমি কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেলাম। পুরোটাই কোইনসিডেন্স। জীবনটাই তো তাই। কোইনসিডেন্সে গাঁথা। নইলে এত বিস্ময় সে আনে কী করে!‌

অফিসার আমাকে ব্রেকফাস্ট খাওয়ালেন। চা–‌টোস্ট,ডবল ডিমের অমলেট আর কাপ–প্লেটে চা। অফিসার বললেন, ‘আমার নাম অর্জুন। অর্জুন সেন। যখন দরকার অনুগ্রহ করে আমাকে স্মরণ করবেন।’‌

আমি হেসে বললাম,‘‌এখনই স্মরণ করছি। আমার দুটো আর্জি শুনতে হবে।’‌

অফিসার বললেন,‘‌বলুল।‘‌

আমি বললান,‘‌বনলতার স্বামীকে আরও কয়েকবার ব্যাটম ট্রিটমেন্ট দিয়ে ছেড়ে দিন। গা হাতে পায়ে ব্যথা নিয়ে ও গিয়ে বনলতার সঙ্গে ঘর করুক। এই মেয়ের একা থাকাটা সমস্যা হবে।’‌

অফিসার একটু  ভাবলেন। বললেন,‘‌আচ্ছা, তাই হবে। তবে ক’দিন থানায় থাকুক। শিক্ষাটা ভাল করে হোক। মেয়েটিকে বলে দিচ্ছি,আবার এই ধরনের ঘটনা ঘটলে,সোজা যেন আমার কাছে চলে আসে।’‌

আমি বললান,‘‌থ্যাঙ্কু। আর সেকেণ্ড আর্জি,যে মোবাইল চোরটিকে আপনি ধরে রেখেছেন,তাকে মারধোর একটু কম করবেন।’‌

অফিসার অবাক হয়ে বললেন,‘‌আচ্ছা এটাও হবে। কিন্তু স্যার,এসবই তো অন্যের জন্য বললেন। আপনার কী দরকার বললেন না তো।’‌

আমি হেসে বললাম,‘‌আমি সাগর। সাগরের নিজের কিছু দরকার হয় না।’

থানা থেকে‌ বেরিয়ে দেখলাম,আকাশ ঝকঝক করছে। যাবতীয় মলিনতা,দুঃখ,কষ্ট মুছে সে হাসছে। 

চলবে…

গত পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-13/

১২ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-12/

১১ পর্বের লিংক –  https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-11/

১০ পর্বের লিংক –  https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-10/

৯ম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-9/

৮ম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-8/

৭ম পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-7/

৬ পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-6/

 
৪র্থ পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-guptapart-4/

৩য় পর্বের লিঙ্ক –https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-guptapart-3/

২য় পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/novel-by-prachet-gupta-2/

প্রথম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/novel-by-prachet-gupta/

Advertisements
Previous articleপুলিশের হাতে হানিপ্রীতের ডাইরি‚ ফাঁস বিস্ফোরক তথ্য
Next articleডুগডুগি (শেষ পর্ব )
প্রচেত গুপ্ত
জন্ম : ১৪ অক্টোবর, কলকাতায়, ১৯৬২ সালে | কলকাতার গায়ে বেড়ে ওঠে শহরতলি বাঙুর এভিনিউতে স্কুলের পড়াশোনা, বড় হওয়া | স্কুলজীবন থেকেই খেলাধুলার সঙ্গে লেখালেখির নেশা | প্রথম লেখা মাত্র ১২ বছর বয়সে আনন্দমেলা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় | তারপর বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লেখা চলতে থাকে | গোড়ার দিকে ছোটদের জন্য লেখাতেই বিশেষ ঝোঁক ছিল | স্কুল শেষ হলে স্কটিশ চার্চ কলেজ | এরপরই একটা দুটো করে বড়দের জন্য লেখার শুরু | অর্থনীতিতে স্নাতক হয়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসাবে বেছে নেওয়া | বিভিন্ন পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হতে থাকে নিয়মিত | প্রথম উপন্যাস 'আমার যা আছে' প্রকাশিত হয় আনন্দলোক পত্রিকায়, ২০০৪ সালের পূজাবার্ষিকীতে |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.