সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ১৬)

900
ছবি - দেবব্রত ঘোষ

মন যেমন শক্ত করলাম তেমন মোড়াও শক্ত করে ধরলাম। তারপর অভিনয় করে বললাম,‘‌ওরে বাবা!‌ মোড়া থেকে পড়ে যাব বলছো? তোমার প্রেমিকের এত বড় নাম?‌‌’‌

সৃজনী দুষ্টু ধরনের হেসে বলল,‘বড় নাম কিনা জানি না, তবে তোমার‌ মোড়া থেকে পড়ে যাওয়ার চান্স আছে সাগরদা।’‌

না, সৃজনী শুধু প্রেমে পড়েনি। ওর এত উচ্ছ্বাস আরও বেশি কথা বলছে। সেই কথাটা কী?‌ 

প্রেমে পড়লে একধরনের ছেলেমানুষি তৈরি হয়। সৃজনীরও তাই হয়েছে এবং সেটা অতিরিক্তর অতিরিক্ত হয়েছে। আমি তার বিরাট কোনও পরিচিত নই।  দেখা হয়েছে মোটে দু–‌তিনদিন। কিন্তু আচার আচরণ এমন করছে যেন কতযুগের আলাপ !‌ এতেই কেমন সন্দেহ হচ্ছে। মজার কথা হল, মেয়েদের হাবভাব থেকেই প্রেম ধরা যায়। মেয়েরা সব গোপন রাখতে পারে, প্রেমে পড়লে গোপন রাখতে পারে না। প্রেমে পড়লে তাদের চরিত্রে বদল আসে। চোখে পড়ার মতো বদল। 

আমার দূর সম্পর্কের খুড়তুতো বোন মিছরির বেলায় এই কাণ্ড হয়েছিল। সে পড়েছিল প্রেমে কাকিমা ক্যাচ কট করে ফেলেছিল তার লাফালাফি দেখে।  মিছরি অতি গুড গার্ল। সাত চড়ে তো দূরের কথা সাত দুগুনে চোদ্দো চড়েও রা কাটবার মেয়ে নয়। তখন কলেজে পড়ছে। মাথা নিচু করে কলেজে যায়, মাথা নিচু করে ফেরে। চুপচাপ,শান্তশিষ্ট। তিনটে কথা বললে একটায় বিড়বিড় করে উত্তর দেয়, আবার দেয়ও না। কাকা–‌কাকিমা রাগারাগি করে, ‘‌বাড়িতে কেউ এলে তার সঙ্গে দুটো কথা তো বলতে পারিস।’‌

মিছরি শুকনো মুখে বলে,‌ ‘‌কী বলব!‌ আমার লোকজন ভাল লাগে না।’‌

কাকিমা আমাকে কতবার দুঃখ করেছে।

‘‌ইস বিয়ের পর মেয়েটার কী যে হবে!‌’‌

আমি আশ্বাস দিয়ে বলেছিলাম, ‘‌বাড়ির বউ কম কথা বলা ভাল। শাশুড়ি খুশি হয়।’‌

কাকিমা ঝাঁঝিয়ে উঠল,‘বোকার মতো কথা বলিস না সাগর। মিছরি কি শাশুড়িকে খুশি করবার জন্য বিয়ে করবে?‌ তার নিজের জীবন নেই?’‌‌‌  

সেই মিছরির চরিত্রে বদল হল। একেবারে ড্রাসটিক চেঞ্জ যাকে বলে। সব কিছুতেই লাফায়। ভাল খাবার পেলেও খুশি, পা মচকালেও খুশি। মেঘ হলেও ছাদে দৌড়োয়,রোদ উঠলেও বারান্দায় দাঁড়ায়। বাড়িতে অল্প পরিচিত কেউ বেড়াতে এলে খুশিতে একেবারে ডগমগ হয়ে উঠেছে।‌ ভাল করে চেনে না,তাকে নিয়ে আদিখ্যেতার শেষ নেই। তারওপর আবার ওইটুকু মেয়ে হয়েও গিন্নিবান্নি ধরনের কথা !‌ 

‘‌বাবা, কতদিন পরে তোমাদের দেখছি। মাঝে মাঝে তো আসতে পারও। দুটো গল্প করলেও তো ভাল লাগে। আরে বাবা, আত্মীয়স্বজেনের মধ্যে দেখা হবে,যোগাযোগ থাকবে সেটাই তো উচিত। এই তো আমাদের কলেজের অর্পিতা,তাদের বাড়িতে লোকজন আসা তো লেগেই আছে।’

মেয়ের এই কথা শুনে কাকা–‌কাকিমা শুধু হাঁ হয়ে যেতে লাগল তা নয়,যাদের এত খাতির করছে তাদের চোখও বড় বড় হয়ে গেল। এই মেয়ে তো এরকম আচরণ কখনও করেনি!‌‌

মিছিরর লাফালাফি এমন পর্যায়ে গেল যে,একবার কাকার পকেটমার হলো,শুনে কী খুশি!‌ 

‘বাবা,তোমার পকেটমার হয়েছে ?‌ ‌‌‌ইস্‌ কী ইন্টারেস্টিং!‌ জানো বাবা,আমি কোন পকেটমার হওয়া লোক দেখিনি। এই প্রথম তোমাকে দেখছি। তোমার একটা ছবি তুলে ফেবুতে পোস্ট করব। তলায় ক্যাপশন দেব—একদিন যারা মেরেছিল তারে গিয়ে \‌ রাজার দোহাই দিয়ে \‌ এ যুগে তারাই জন্ম নিয়েছে আজি\‌ মন্দিরে তারা এসেছে ভক্ত সাজি।’

কাকা থমথমে মুখে বলেছিলেন,‘‌এই ক্যাপশনে‌র অর্থ কী?‌’‌

মিছরি একগাল হেসে বলেছিল,‘‌কোনো মানে নেই। পকেটমারার সঙ্গে মেলালাম।’‌

কাকা বলেছিলেন,‘‌তুমি বড় হয়েছো বলে কিছু বললাম না। নইলে একটি চড়ে তোমার গাধামি ছুটিয়ে দিতাম। আমার সামনে থেকে এখন যেতে পার।’‌‌

কাকিমা এক সন্ধ্যেবেলা, মেয়ে কলেজ থেকে ফেরার পর তার ঘরে গেল। দরজার ছিটকিনি তুলে একেবারে সরাসরি ফায়ার। 

‘‌এই মেয়ে, তুই কার সঙ্গে প্রেম করছিস?‌’

আমার পিসতুতো বোন তো বিষম টিষম খেয়ে অস্থির। কাকিমা বলল‌,‘‌নাম বল,কী করে বল?‌ ডাক্তার ইঞ্জিনিয়র বাদে কোন ছেলে হলে আজই মেরে তোর ঠ্যাঙ ভাঙব।’‌ 

ডাক্তার ইঞ্জিনিয়র তো দূরের কথা, খুড়তুতো বোনের পাত্রটি স্কুলের পর আর লেখাপড়াতে এগোতে পারেনি। একসময় এই ধরনের ছেলেদের বলা হত রকবাজ,এখন বলা হয় বাইকবাজ। বাইকে বসে ইঁটবালি সাপ্লাই করে।

কাকিমা চোখ পাকিয়ে বলল,‘‌তোর লাফালাফি দেখেই সন্দেহ হয়েছিল। নে ওই ছোঁড়ার নাম বল।’

আমার খুড়তুতো বোন ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলে বলল,‘‌মা,আমি সন্টাদাকে বিয়ে করে ফেলেছি।’‌

কাকিমা মাথা ঘুরে ধপাস্‌ করে পড়ে যান।

‌এই হচ্ছে প্রেম এবং বিয়ের সিম্‌টম্‌। সৃজনীর সেরকম কিছু হল নাকি?‌ ‌আমি কৌতুকভরা গলায় বললাম,‘‌আমাকে একটা চান্স দেবে সৃজনী?‌’‌

সৃজনী অবাক হয়ে বলল,‘‌কীসের চান্স?‌’‌

আমি সৃজনীর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম,‘তোমার প্রেমিকার নাম বলে দেওয়ার চান্স। আমি একটা ট্রাই নিই?‌’‌

এবার সৃজনীর ঘাবড়ে যাওয়ার পালা। বলল,‘‌তুমি পারবে?‌’‌

আমি ঘাড় কাত করে বিজ্ঞ মার্কা গলায় বললাম,‘‌পারব কিনা জানি না, তবে চেষ্টা করতে পারি। অবশ্য তোমাকে হেল্প করতে হবে। আমি তো হাতগুনে বলতে পারব না।’‌

সৃজনী উৎসাহ নিয়ে বলল,‘অবশ্যই হেল্প করব। আমি সিওর তুমি পারবে না। ইটস অ্যামেজিং সাগরদা। আমি নিজেও অবাক হচ্ছি। কী করে যে কী হয়ে ‌গেল!‌ একা একা বসে যখন ভাবছি,তখন মনে হয়,পুরোটা গল্প। ফিকশন।’‌

‘‌আমি সিওর তুমি পারবে না’‌বলে সৃজনী আসলে আমার ইগোতে খোঁচা দিল। আমার মজা লাগছে। আমি নিশ্চিত এই মেয়ের আমার সেই খুড়তুতো বোনের মতো। প্রেমের থেকেও বেশি কিছুতে ফেঁসেছে।

‘‌আগে বল,তুমি আমাকে সাহায্য করবে?‌’

সৃজনী ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,‘‌কীভাবে সাহায্য?‌ নাম বলে দিয়ে?‌’‌

সৃজনী আমাকে তাতাচ্ছে। আমি হেসে বললাম,‘‌শেষ পর্যন্ত তোমাকেই বলতে হবে,তবু একটু চেষ্টা করে নিই। তবে একটা কথা বলতে পারি। তুমি শুধু আমাকে প্রেমের খবর দিতে আসোনি সৃজনী। তার থেকে আর একটু বেশি কিছু বলতে এসেছো।’

সৃজনী ভুরু কুঁচকে বলল,‘‌বেশি কিছু!‌ কী বেশি?‌’‌

আমি মুচকি হেসে বললাম,‘‌এবার আপনি আমার তক্তাপোষটা চেপে ধরে বসুন সৃজনী ম্যাডাম। যা বলব তা শুনে ধপাস করে পড়ে না যান।’‌

সৃজনী চোখ মুখ কুঁচকে বলল,‘‌শুনি।’‌

আমি একটু চুপ করে থেকে শান্ত গলায় বললাম,‘‌তুমি বিয়ে করতে চলেছো। বিয়ের কার্ড তোমার ব্যাগে আছে।’‌

সৃজনী সোজা হয়ে বসল। এতবড় একটা হাঁ করে থাকল বেশ খানিকক্ষন বলল,‘‌তুমি জানো!‌ কে বলেছে?‌ তোমার বন্ধু?‌’‌

আমি এবার হাসি হাসি মুখে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলনাম,‘‌সৃজনী ম্যাডাম,তমালের সঙ্গে আমার কথা হয়নি কম করে একমাস হয়ে গেল। তার প্রধান কারণ,কদিন হল আমার টাকা পয়সার তেমন টানাটানি নেই। তার কাছে গিয়ে হাত পাততে হয়নি। ফলে তার কাছ থেকে আমার কোনও খবর পাওয়াই সম্ভব নয়।’‌

সৃজনী অবাক গলায় বলল,‘‌তাহলে কী করে জানলে?‌’

আমি হেসে বললাম,‘‌সাগর ম্যাজিক করে। ম্যাজিকের মন্ত্র কী জানো ?‌ মন্ত্র হল,যাস্‌ কোথা তুই গোর্বধন?‌ একটা মজার খবর শোন.‌.‌.‌।’‌ আমি জোরে হেসে উঠলাম। বললাম,‘‌কিন্তু এবার তোমাকে দুটো প্রশ্ন করতে চাই সৃজনী। রাজি তো? চিন্তা করো না,পাত্র বিষয়ে নো কোয়েশ্চন।‌’

সৃজনী হেরে যাওয়ার ভঙ্গিতে বলল,‘‌করো।’‌

আমি দার্শনিক ধরনের ভাব দেখিয়ে বললাম,‘‌সৃজনী জীবন কেমন বলে মনে হয় তোমার?‌’

সৃজনী অবাক হয়ে বলল,‘মানে!‌’‌

আমি বললাম,‘‌মানে অতি সহজ। হাউ ইজ লাইফ?‌’‌

সৃজনী লজ্জা পাওয়া মুখে বলল,‘‌ভেরি মিস্টিক,সো ভেরি নাইস।’‌

আমি চোখ সরু করে বললাম,‘‌এবার নেক্সট প্রশ্ন। ‌চড় না চুমু—পুরুষমানুষের গালের জন্য কোনটা উপযুক্ত?‌’‌

সৃজনী এবার একেবারে গাল লাল করে বলল,‘‌দুটোই। যখন যেটা দরকার।’‌

আমি হেসে বললাম,‘‌আর কিছু বলতে হবে?‌’‌

সৃজনী একটুক্ষন চুপ করে রইল। তারপর আপ্লুত হওয়া গলায় বলল,‘‌না। এবার বল সাগরদা,তুমি কী করে বুঝতে পারলে?‌’‌

আমি বললাম,‘‌গেস করলাম। সহজ গেস। তুমি আমাকে যখন বলতে এসেছো,নিশ্চয় বিষয়টি সম্পর্কে আমি কোনও না কোনও ভাবে ওয়াকিবহাল। প্রেমের কথা শুনেই কেমন যেন মনে হচ্ছিল, ছেলেটিকে আমি চিনি না তো?‌ প্রেমের কমন সাইকোলজি হল,সে গোপন কথা বলতে চায়। তার কাছে বেশি চায় যে গোপন কথাটা জানে। তারওপর তোমার বাড়াবাড়ি রকমের উচ্ছ্বাস দেখে মনে হল,নট ওনলি প্রেম,আরও কিছু আছে। সেটা বিয়ে ছাড়া আর কী হবে?‌’

সৃজনী বলল,‘‌ফ্যানটাস্টিক।’‌‌

চলবে…

গত পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-15/

১৪ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-14/

১৩পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-13/

১২ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-12/

১১ পর্বের লিংক –  https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-11/

১০ পর্বের লিংক –  https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-10/

৯ম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-9/

৮ম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-8/

৭ম পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-7/

৬ পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-6/

 
৪র্থ পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-guptapart-4/

৩য় পর্বের লিঙ্ক –https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-guptapart-3/

২য় পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/novel-by-prachet-gupta-2/

প্রথম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/novel-by-prachet-gupta/

Advertisements
Previous articleরাজকীয় বিয়েতে অতিথিদের জন্য উপহার ছিল একটি করে হিরের আংটি !
Next articleপথচলতি
প্রচেত গুপ্ত
জন্ম : ১৪ অক্টোবর, কলকাতায়, ১৯৬২ সালে | কলকাতার গায়ে বেড়ে ওঠে শহরতলি বাঙুর এভিনিউতে স্কুলের পড়াশোনা, বড় হওয়া | স্কুলজীবন থেকেই খেলাধুলার সঙ্গে লেখালেখির নেশা | প্রথম লেখা মাত্র ১২ বছর বয়সে আনন্দমেলা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় | তারপর বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লেখা চলতে থাকে | গোড়ার দিকে ছোটদের জন্য লেখাতেই বিশেষ ঝোঁক ছিল | স্কুল শেষ হলে স্কটিশ চার্চ কলেজ | এরপরই একটা দুটো করে বড়দের জন্য লেখার শুরু | অর্থনীতিতে স্নাতক হয়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসাবে বেছে নেওয়া | বিভিন্ন পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হতে থাকে নিয়মিত | প্রথম উপন্যাস 'আমার যা আছে' প্রকাশিত হয় আনন্দলোক পত্রিকায়, ২০০৪ সালের পূজাবার্ষিকীতে |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.