সাগর আই লাভ ইউ (১৭ পর্ব)

1397
ছবি - দেবব্রত ঘোষ

সৃজনীর প্রেম আর বিয়ের ব্যাপারটা ধরে ফেলেছি তার মুখ আর ছটফটে হাবভাব দেখে। কথারও মধ্যেও হিন্টস ছিল। কিন্তু সে কেন তীর্থকেই বর হিসেবে মেনে নিল সেটা বুঝতে পারছি না। আমি সৃজনীর সঙ্গে কথা বলতে বলতে প্যারালাল থিঙ্কিং চালাচ্ছি। প্রেমের রহস্য যদি ভেদ করা যায়। পারছি না। প্রেমের রহস্য অতি কঠিন রহস্য। শার্লক হোমসের পক্ষেও ভেদ করা অসম্ভব। দু-‌একবার ব্যোমকেশবাবুকে দেখেছি বটে, তবে তিনিও প্রেমিক–‌প্রেমিকার কাছে হার মেনেছেন। তারা অপরাধ করে চম্পট মেরেছে। গোয়েন্দা ব্যোমকেশ বক্সী তাদের পালাতে অ্যালাও করেছেন। সাগর তো কোন ছাড়।   

একবার টুক করে তীর্থর কেসটা ঝালিয়ে নিই। রি-কালেক্ট করা যাকে বলে।

তীর্থ থাকে আমেরিকায়। বস্টেনের মস্ত চাকুরে। ছেলে ভাল। রূপে গুণে রাজপুত্র টাইপ। সে এসেছিল কলকাতায়। বাঙালি বউয়ের সন্ধানে। আমজন অভিযানের মতো বউ অভিযান। বিদেশে চাকুরিরত ‘‌হীরের টুকরো’‌ বাঙালি যুবকরা বিদেশের সব ভালবাসে, বউ ভালবাসে না। একেবারে বাসে না তা বলব না, তবে সেসব রেয়ার কেস। হাজারে একটা দুটো ঘটে। আমাদের দেশে থাকত নবকাকু। চাষবাস করা মানুষ। কোনও ঝুট ঝামেলায় থাকক না। তার ছেলে ভোবলা ছিল একেবারে বিরাট গাধা। তিনবারেও মাধ্যমিক পাশ করতে পারল না। একসময়ে গাঁয়ের লোক বলত , মাধ্যমিকের সিলেবাস প্রতিবছর সোজা করবার কারণ নাকি ভোবলা। বোর্ডের কর্তাদের কাছে চ্যালেঞ্জ ছিল। তারা সিলবাসকে সোজা করতে করতে  প্রথমে জলের পর্যায়ে নিয়ে গেল। তারপরে নিয়ে গেল হাইড্রোজেন অক্সিজেনের পর্যায়ে। লাভ হল না।  মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় যারা পরীক্ষা হলে গার্ড দিতেন তারা পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে গেলেন।

‘‌ওরে ভোবলা প্রতি বছর তোকে দেখে দেখে তো চোখে অরুচি ধরে গেল। তুই বাবা টুকে মুকে যেভাবে হোক পাস করে বিদায় হ।’

ভোবলা এমনই গাধা সে ঠিকমতো টুকতে পর্যন্ত পারত না। লেখাপড়া ছেড়ে একসময় ভোবলা এক এনজিওতে কাজ পেয়ে গেল। সেই এনজিও নানা ধরনের নেচারাল ইনগ্রেডিয়েন্টের ওপর কাজ করত। প্রাকৃতিক উপাদান। ভোবলা কাজ পেল তাদের গোবর ডিভিশনে। গোবরের নানাবিধ কার্যকারিতা বোঝাতে গ্রামে গ্রামে প্রচার চালাতে হবে। সবাই বলল,‘‌ভাল‌ই হয়েছে। ভোবলার মাথায় গোবর ভরা। সে গোবর নিয়ে কাজে সাইন করবে।’‌ 

ভোবলা তাই করল। গ্রামে তার নাম হয়ে গেল গোবর ভোবলা। ভাল কাজ করবার কারণ সে এনজিও কর্তাদের সুনজরে পড়ল। তারা একসময়ে ভোবলাকে পাঠিয়ে দিল চিনে । গোবরের ওপর প্রজেক্ট। সেখানে র‌য়ে গেল বাংলার গোবর ভোবলা। হাউমাউ ধরনের প্রেমে পড়ে বিয়ে করে বসল এক চিনা তরুণীকে। সে বিয়ে করতেই পারে। মজার কথা হল, শুনলাম, সেই মেয়ে নাকি ভোবলার বাংলা ভাষা বোঝে না, ভোবলাও তার চিনা বোঝে না এক ফোঁটা। বোঝ কাণ্ড!‌ তাহলে ওরা নিজেরা নিজেদের মধ্যে কমিউনিকেট করে কী করে!‌ শুনলাম, বিয়ের বেশ কয়েক বছর কেটে গেল, তারা খুবই সুখে আছে। সুখের জন্য তারা  নিজেরা নিজেদের ভাষা তৈরি করে নিয়েছে। আমি একথা বিশ্বাস করিনি।  লোকে কত কী বানিয়ে বানিয়ে বলে।  দু‘‌বছর আগে ভোবলা দেশে এসেছিল। ওই সময় আমিও গ্রামে গিয়েছিলাম বাড়িতে দেখা করতে। একেবারে কোইনসিডেন্ট যাকে বলে। ভোবলার সঙ্গে দেখা হল।

‘‌কেমন আছিস ভোবলা ‌?‌’‌  

‘খুব ভাল আছি। তুমি কেমন আছো সাগরদা?‌’‌

‘‌ভোবলা, শুনেছি, তুই আর তোর বউ নাকি নিজেদের তৈরি ভাষায় কথা বলিস। কথাটা কি ঠিক?‌’‌

ভোবলা লজ্জা পেয়ে বলল,‘হ্যাঁ, ঠিক। সাগরদা, তুমি কি সেই ভাষা একটু শুনতে চাও ?‌’‌

আমি মুগ্ধ হয়ে ওর পিঠ চাপড়ে দিলাম। বললাম, ‘‌খেপেছিস? দুটো‌ ছেলেমেয়ের সুখের ভাষা শুধু তাদের নিজেদেরই থাকে। অন্যে সেই ভাষা কখনও বুঝতে পারে না।’‌

ভোবলা ব্যতিক্রম। সাধারণত ভাবে প্রবাসী যুবাদের কাছে বাংলার মাটি, বাংলার জলের মতো বাংলার বউ একটা গর্বের বিষয়। সে পুজো পার্বনে, কমিউনিটি হলে গিয়ে চওড়া লাল পাড় গরদ পরে, পিঠে এক ঢাল ভিজে চুল ফেলে, কপালে বড় লাল টিপ দিয়ে মেঝেতে বাবু হয়ে বসে চন্দন বাটবে। সে বাড়িতে হট প্যান্ট আর গেঞ্জি পরে মাঝে মাঝে বড়ি দেওয়া শুক্তো রান্না করবে। সে সকালে কোট প্যান্ট পরে ট্রাকের মতো শেভ্রলয়েট চালিয়ে অফিস ছুটবে। সে রাতে শুয়ে বাংলা ইংরেজি মিশিয়ে ফিসফিসিয়ে বলবে,‘‌অ্যাই দুষ্টু, নটি বয়।’‌ সে আর যাই করুক রাগ করে দুদিনের জন্য বাপের বাড়িতে যেতে পারবে না। তার মন খারাপ হলে সে ডিপ্রেসেশনের ট্যাবলেট খাবে, কিন্তু মন খুলে কাঁদতে পারবে না। বরকে আরও খারাপ লাগলে ডিভোর্স নিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে যাবে, ফিরে আসবার পথ থাকবে না। বিপুল বৈভব, বিলাসে সে একই সঙ্গে সুখী এবং অসুখী হবে।    

যাই হোক, তীর্থ বস্টন থেকে বউ অভিযানে এসে সন্ধান পায় রূপসী, বুদ্ধিমতী তরুণী সৃজনীর। সৃজনীর মা কলেজ অধ্যাপিকা ‘‌হতে পারে হবু জামাই’‌এর প্রোফাইল দেখে আকুলি বিকুলি করে ওঠেন। তীর্থ পাত্রীতে খুশি। তার বাড়ির লোকও আনন্দিত। সৃজনীর মতো মেয়ের জন্য যে কোনও পাত্রপক্ষই আনন্দিত হবে। বিয়ের সবই ঠিকঠাক, এমন সময় তীর্থ নামের যুবকটি বলল, এই ভাবে বিয়ে করা ঠিক হবে না। বোস্টনে ফিরে হ্যাটা খেতে হবে। বিয়ের আগে তাকে ক’দিন প্রেম করতে হবে। সৃজনীর সঙ্গে লং ড্রাইভে যেতে হবে। একটু ইংটিং পিংটিং হবে। সেসব ছবি ফেসবুকে পোস্ট হবে। সৃজনী বসল বেঁকে। একী প্রস্তাব !‌ প্রেমের অভিনয় আবার কী!‌ এরপরে এক কাণ্ড হল। একদিন তীর্থ সৃজনীর বাড়ি গিয়ে কপাৎ করে তার হাত ধরে বসল। 

‘‌প্লিজ বেয়ার উইথ মি।’ 

ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে ঠাস্‌। সৃজনী বসাল চড়।

সেই চড় মারা ছেলের সঙ্গে প্রেম!‌ একেবারে বিয়ে!‌ কী করে ?‌

‘‌সৃজনী, ঘটনাটি কীভাবে ঘটল জানতে পারি?‌’‌

সৃজনী মিটিমিটি হেসে বলল,‘‌এটায় ফেল তো?‌’‌

আমি বললাম, ‘‌ফেল মানে ডাহা ফেল। এতক্ষণ প্যারালাল থিঙ্কিং দিলাম, লাভ হল না। অথচ মনে হচ্ছে জবরদস্ত কোনও প্রেম কাহিনী লুকিয়ে আছে।’

সৃজনী বলল,‘‌আচ্ছা বলছি। তুমি বলেই শুধু বলছি সাগরদা।’‌ 

সৃজনী কাহিনী শুরু করল।

চলবে…

গত পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-16/

১৫ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-15/

১৪ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-14/

১৩পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-13/

১২ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-12/

১১ পর্বের লিংক –  https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-11/

১০ পর্বের লিংক –  https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-10/

৯ম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-9/

৮ম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-8/

৭ম পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-7/

৬ পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-6/

 
৪র্থ পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-guptapart-4/

৩য় পর্বের লিঙ্ক –https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-guptapart-3/

২য় পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/novel-by-prachet-gupta-2/

প্রথম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/novel-by-prachet-gupta/

Advertisements
Previous articleদৃষ্টিশক্তি ঠিক রাখতে কী খাওয়া দরকার?
Next articleটুম্পারা ইশকুলে যাচ্ছে
প্রচেত গুপ্ত
জন্ম : ১৪ অক্টোবর, কলকাতায়, ১৯৬২ সালে | কলকাতার গায়ে বেড়ে ওঠে শহরতলি বাঙুর এভিনিউতে স্কুলের পড়াশোনা, বড় হওয়া | স্কুলজীবন থেকেই খেলাধুলার সঙ্গে লেখালেখির নেশা | প্রথম লেখা মাত্র ১২ বছর বয়সে আনন্দমেলা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় | তারপর বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লেখা চলতে থাকে | গোড়ার দিকে ছোটদের জন্য লেখাতেই বিশেষ ঝোঁক ছিল | স্কুল শেষ হলে স্কটিশ চার্চ কলেজ | এরপরই একটা দুটো করে বড়দের জন্য লেখার শুরু | অর্থনীতিতে স্নাতক হয়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসাবে বেছে নেওয়া | বিভিন্ন পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হতে থাকে নিয়মিত | প্রথম উপন্যাস 'আমার যা আছে' প্রকাশিত হয় আনন্দলোক পত্রিকায়, ২০০৪ সালের পূজাবার্ষিকীতে |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.