সাগর আই লাভ ইউ (১৮ পর্ব)

371
ছবি - দেবব্রত ঘোষ
 
সৃজনী তাদের প্রেমের গল্প বলল। আমি বরং সেই গল্পটা একটু সাজিয়ে গুছিয়ে বলি। গল্পটা হালকা অ্যাডাল্ট। একটা চুমু আছে। চুমু অ্যাডাল্টের পর্যায়ে পড়ে না, তারপরেও একেবারে ছেড়ে দেওয়া যায় না। দিনে দিনে বাঙালি ছেলেমেয়েরা অনেক মুক্ত মনের হচ্ছে ঠিকই, তবে এখনও ঝটাপট প্রকাশ্যে চুমু খেতে পারে না। 
এই গল্পটা শুনতে শুনতে কি বোঝা যাবে কে কাকে চুমু খাবে ‌?‌ সৃজনী তীর্থকে?‌  নাকি তীর্থই এগোবে। যদিও সম্ভবনা বলছে, সৃজনীর এগোনোই উচিত। সে চড় মেরেছিল, চুমু তাকেই খেতে হবে। সমস্যা হল, গল্প তো উচিত অনুচিত মানে না। যার চুমু খাওয়ার কথা, সে হয়তো খেলই না। 
অপেক্ষা করতে হবে। দেখি গল্প কেমন সাজাতে পারি।   
 
তীর্থ দেশ থেকে ফিরে যাবার সময়ে প্রতিবারই কিছু না কিছু নিয়ে যায়।  এবারও  নিল। লিস্ট এরকম—
১। পাঁচটা জামা, তিনটি পাঞ্জাবি, চার সেট স্যান্ডো গেঞ্জি। দুটো ঢোলা পায়ের পায়জামা। পাঞ্জাবির মধ্যে দুটো খাদির। আমেরিকায় জামা কাপড়ের দাম বেশি। তাই দেশ থেকে কিনে নেওয়া। বাঙালি আমেরিকায় থাকতে ভালবাসে, কিন্তু কেনাকাটা করতে ভালবাসে গরিব বাংলা থেকে। কেনাকাটার সময় বলে, হতচ্ছাড়া দেশে থাকি। খালি গলা কাটে। আমার বাংলা অনেক ভাল। এখানে সবই সস্তা। পারলে বছরখানেকের জন্য দাড়ি কামিয়ে যেতাম।
 
২। দু’‌জোড়া হাওয়াই চটি। ধনী দেশে ফটফটিয়ে চলার জন্য হাওয়াই চটি পাওয়া যায় না।
 
৩। তিন পাতা সেফটিপিন। এই আইটেম গত দু’‌বারই নিয়ে গিয়েছিল তীর্থ। দু’‌বারই হারিয়ে ফেলেছে। এবার তিন পাতা নেবার উদ্দেশ্য, তিনটে পাতা আলাদা আলাদা জায়গায় রাখা হবে। একটা পাতা অফিসের লকারে থাকবে। বাড়িরগুলো হারালে অফিস থেকে নেওয়া হবে। 
 
তীর্থর সেফটিপিন নেবার কারণ পায়জামা। পায়জামায় দড়ি ভরতে সেফটিপিন লাগে। তীর্থ যখনই নতুন পায়জামা পরতে গেছে তখনই দেখেছে দড়ি ভরবার জন্য কিছু নেই। একবার বিরাট কেলেঙ্কারি হয়েছিল। ছিল বাঙালিদের বিজয়ার পার্টি। ছেলেদের জন্য পায়জামা নয়তো ধুতি ছিল ড্রেস কোড। বাংলার মাটি বাংলার জলেরে মতো বাংলার ধুতি পায়জামা। সঙ্গে পাঞ্জাবি। তীর্থ নতুন পায়জামা পরতে গিয়ে দেখল, দড়ি নেই।  দড়ি ভরবার জন্য সেফটিপিনও খুঁজে পাওযা গেল না। পেরে তীর্থ বেল্ট দিয়ে বেঁধে পায়জামা পরল। পার্টিতে নড়াচড়ায় বেল্ট ফসকে পায়জামা গেল পড়ে.‌.‌.‌। পাঞ্জাবি হাঁটু পর্যন্ত হওয়ায় সেদিন তীর্থ ছোটো কেলেঙ্কারির মধ্যে পড়লেও, বড় কেলেঙ্কারির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল।
 
৪। তিনটি বই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরর শেষের কবিতা। এই বই নিজের জন্য নয়। বেঙ্গলি ক্লাবের নন্দিতাদির জন্য নিয়ে গেছে নন্দিতা। ওনার কালেকশনে থাকা শেষের কবিতা বইটির করুণ পরিনতি হয়েছে। ওর দেড় বছরের নাতি শাশি অনেকগুলো পাতা চিবিয়ে খেয়ে নিয়েছে। খেয়ে তার এত ভাল লেগেছে সে সুযোগ পেলেই বইটির খোঁজ করছে। আর একটি জয় গোস্বামীর কবিতার বই। এটা নিজের জন্য। তীর্থর কবিতার বই পড়ে না। কিন্তু সে শুনেছে, এই বইয়ের অনেকগুলো কবিতা নাকি প্রেমে প্রত্যাখানের ওপর লেখা। তিন নম্বর বইটি পাতি একটি গোয়েন্দা কাহিনী। নাম পানকৌড়ির রক্ত। এক সময় দীর্ঘ প্লেনযাত্রায় ভারি বই পড়ত তীর্থ। এতে ক্লান্তি বেশি হয়। তাই এবার এই গোয়েন্দা বই নিয়ে চলেছে। কাহিনীটি ইন্টারেস্টিং। গোয়েন্দা স্বপ্নে মাঝেমাঝে একটা পানকৌড়ি দেখতে পায়। এই পানকৌড়ির সূত্র ধরেই গোয়েন্দা খুনীকে ধরে।   
 
৫। হরলিক্সের শিশিতে খানিকটা চিঁড়ে নিয়ে গেছে তীর্থ। অতি প্রয়োজনীয় জিনিস। পেটের অসুখের পথ্য।
লিস্টের ছ’‌নম্বরটি গুরুত্ব।
 
৬। এক অতি সুন্দরীর চড়। সপাটে মারা চড়টি তীর্থ নিয়ে যায় তার ডান গালে করে।
এই ছ’‌নম্বর আইটেমটি আমেরিকায় পৌছে তীর্থকে বিরাট জ্বালাতনে ফেল। দেশের অনেক কিছু ভুলে যায়, এই চড় ভুলতে পারে না। শয়নে, স্বপ্নে, কর্মে চড় ঘুরে ঘুরে আসে। যখন সৃজনী চড় মেরেছিল, বেচারি এতটাই হকচকিয়ে গিয়েছিল যে ভাল–‌মন্দ কিছু বুঝতে পারেনি। পর্যায়ক্রমে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। ২৪ ঘন্টা পরে হয় অপমান, ৪৮ ঘন্টা পরে রাগ, ৭২ ঘন্টা পরে দুঃখ, ৯৬ ঘন্টা পরে সব মিলিয়ে খিচুড়ি। একসময় তীর্থর মনে হয়, এসব কিছুই নয়, সৃজনীর চড় তাকে অন্য ঝামেলায় ফেলেছে। সেই ঝামেলার নাম অভিমান। একদিন রাতে ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখল তীর্থ। স্বপ্নটা এরকম—
কলকাতা বিমানবন্দরে প্লেন থেকে নামল যে। মালপত্র নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখে হাতে ফুল নিয়ে দঁাড়িয়ে আছে এক অপরূপ সুন্দরী তরুণী।‌‌‌ মেয়েটি পরেছে চমৎকার একটি গাউন। সেই গাউন ভিক্টোরিয়ান যুগের মতো মাটিতে লুটোচ্ছে। তা‌কে দেখে সুন্দরী শ্লো মোশনে ছুটে আসে। সামনে এসে দাঁড়ালে মেয়েটিকে চিনতে পারে তীর্থ। সৃজনী!‌
সৃজনী হাসল। তারপর?‌
না, চুমু খায়নি। আবার ঠাসিয়ে চড়। এবার ডান গালে। তীর্থ অবাক হয়ে চিড়বিড়িয়ে ওঠা গালে হাত দিল।
সৃজনী হেসে বলল, ‘‌এত দেরি করলে কেন ?‌ জানও না, তুমি চলে যাওয়ার পর থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করে বসে আছি?‌’‌
তীর্থ গদগদ গলায় বলল,‘‌জানি না।’‌
সৃজনী ‘‌দুষ্টু’‌ হেসে বলল, ‘‌সেই কারণেই তো চড় মারলাম। আর কোনওদিন ভুলবে?‌’
তীর্থ ঘন স্বরে বলল,‘‌না‌। কোনওদিন ভুলব না।’‌
তীর্থ হাত বাড়িয়ে সৃজনীর হাত ধরতে গেলে ঘুম ভেঙে গেল। তীর্থ ঘড়ি দেখল। রাত দুটো বেজে সাতাশ। মোবাইলটা টেনে সরাসরি এমিরেটেসের অফিসে ফোন করল। এমিরিটাস বিশ্বের সেরা বিমান সংস্থা। ওদের দিন–‌রাত নেই। সুললিত ইংরেজিতে একটি নারী কন্ঠ বলল,‘‌স্যার, হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ?‌’‌
তীর্থ বলে,‘‌ইণ্ডিয়া যাবার আর্লি ফ্লাইটের টিকিট বুক করে দিন।’‌
দমদম বিমানন্দরে নেমে তীর্থর মনে হল, দেশে আসাটা মস্ত ছেলেমানুষি হয়ে গেছে। বাড়ি কাউকে জানানো হয়নি। বাড়ি গিয়ে কী বলবে ?‌ সারপ্রাইজ?‌ বিশ্বাস করানো কঠিন হবে। এছাড়া অন্য কোনও উপায়ও নেই। লাগেজ নিয়ে কফিশপে গিয়ে একটা কফি নিল তীর্থ। এক হাতে কফি, অন্য হাতে ব্যাগ টানতে টানতে এয়ারপোর্টের বাইরে আসতেই একটা অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখল তীর্থ। কাপ চলকে কফি পড়ল টি শার্টে। ভুল দেখছে?‌ নাকি সেই স্বপ্ন এখনও চলছে?‌
সৃজনী। জিনস আর সাদা ড্রেসে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ফুলের গোছা। 
তীর্থ কয়েক পা এগিয়ে গেল। সৃজনীও এগিয়ে গেল।
‘‌আপনি!‌’‌
তীর্থ ভয় ভয় হেসে বলল,‘‌এই তো এলাম।’‌
‘‌আমেরিকা থেকে!‌’‌
তীর্থ বলল,‘‌ওদেশেই তো থাকি।’
সৃজনী আরও অবাক হয়ে বলল,‘‌এই তো কদিন আগে ঘুরে গেলেন।’‌
তীর্থ নার্ভাস হয়ে দুম্‌ করে বলল,‘মা খুব অসুস্থ। হসপিটালে ভর্তি।’‌
সৃজনী চোখ বড় বড় করে বলল,‘‌সেকী!‌ মাসিমা অসুস্থ!‌ কই মা তো কিছু বলল না!‌’‌
তীর্থ তাড়াতাড়ি বলল,‘‌ও কিছু না। ঠিক হয়ে যাবে।’
সৃজনী ভুরু কঁুচকে বলল,‘‌কি‌ছু না মানে!‌ আপনি আমেরিকা থেকে এমনি এমনি উড়ে এলেন?‌’‌
তীর্থ এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে প্রসঙ্গ ঘোরাতে গেল। বলল, ‘‌আপনি এখানে?‌’‌‌
সৃজনী তার সুন্দর ভুরু দুটো কোঁচকানো অবস্থাতেই বলল,‘‌আমার এক বান্ধবী লণ্ডন থেকে আসছে। তাকে রিসিভ করতে এসেছি। আপনি এখন নিশ্চয় হসপিটালে যাবেন ‌?‌’‌
তীর্থ থতমত খেয়ে বলল,‘‌নিশ্চয়।’‌
‘‌কোন হসপিটাল?‌’‌
তীর্থ কপালের ঘাম মুছে বলল,‘যেতে যেতে ফোনে জেনে নেব।’‌
সৃজনীর ভুরু আরও কঁুচকে গেল। তীর্থ সরে পড়বার জন্য পা বাড়াল।
‘‌আচ্ছা চলি তাহলে?‌’‌
সৃজনী কিছু বলল না। চোখ সরু করে তীর্থর দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখমুখই বলে দিচ্ছে,তীর্থর কথা সে বিশ্বাস করেনি। ইতিমধ্যে তার বান্ধবী বেরিয়ে এল গেট থেকে। সৃজনী তার দিকে এগিয়ে গেল।
বেশি রাতে তীর্থর কালকাতা নম্বরের ফোন বেজে উঠল। 
‘‌‌মিথ্যে কথা বললেন কেন?‌’‌
তীর্থ একটু চুপ করে বলল,‘‌ভয়ে।’‌
সৃজনী বলল, ‘‌ভয়!‌ কাকে?‌’‌
মোবাইলে তো আর চড়ের ভয় নেই,তীর্থ বুকে বল এনে বলল,‘‌আপনাকে।’‌
 
 

চলবে…

গত পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-17/

১৬ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-16/

১৫ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-15/

১৪ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-14/

১৩পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-13/

১২ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-12/

১১ পর্বের লিংক –  https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-11/

১০ পর্বের লিংক –  https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-10/

৯ম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-9/

৮ম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-8/

৭ম পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-7/

৬ পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-6/

 
৪র্থ পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-guptapart-4/

৩য় পর্বের লিঙ্ক –https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-guptapart-3/

২য় পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/novel-by-prachet-gupta-2/

প্রথম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/novel-by-prachet-gupta/

Advertisements
Previous articleএদিন আর ক্রিকেট নয়, শ্রী পঞ্চমীতে পলাশময় মহারাজের বেহালার বাড়ি
Next articleবন্ধ ঘরের ভিতর
প্রচেত গুপ্ত
জন্ম : ১৪ অক্টোবর, কলকাতায়, ১৯৬২ সালে | কলকাতার গায়ে বেড়ে ওঠে শহরতলি বাঙুর এভিনিউতে স্কুলের পড়াশোনা, বড় হওয়া | স্কুলজীবন থেকেই খেলাধুলার সঙ্গে লেখালেখির নেশা | প্রথম লেখা মাত্র ১২ বছর বয়সে আনন্দমেলা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় | তারপর বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লেখা চলতে থাকে | গোড়ার দিকে ছোটদের জন্য লেখাতেই বিশেষ ঝোঁক ছিল | স্কুল শেষ হলে স্কটিশ চার্চ কলেজ | এরপরই একটা দুটো করে বড়দের জন্য লেখার শুরু | অর্থনীতিতে স্নাতক হয়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসাবে বেছে নেওয়া | বিভিন্ন পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হতে থাকে নিয়মিত | প্রথম উপন্যাস 'আমার যা আছে' প্রকাশিত হয় আনন্দলোক পত্রিকায়, ২০০৪ সালের পূজাবার্ষিকীতে |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.