সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ২০)

598
ছবি - দেবব্রত ঘোষ

চড় মারবার কথা শুনে তীর্থ নার্ভাস হয়ে যায়।

সত্যি মেয়েটা ঝামেলা পাকাবে নাকি?‌ হাবভাব দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। বাঙালি মেয়েরা কঠিন টাইপের হয়। সৃজনী তার মধ্যে অতিরিক্ত কঠিন। অতিরিক্ত ছাড়া কী?‌ এই মেয়ে রূপে গুনে একশোয় লেটার মার্কস পাওয়া একটা ছেলেকে দুম করে চড় মারতে পারে। আবার সেই চড়া মারে ছেলের সঙ্গে শপিং মলের সামনে অ্যাপয়েমেন্ট করতে পারে। এই মেয়ে অতিরিক্ত ছাড়া কী?‌ কঠিন মেয়েদের ফেলে দেওয়া যায়, অতিরিক্ত কঠিন মেয়েদের ফেলা যায় না। এই এক মুশকিল। বিদেশিনী ঘ্যামচাক ধরনের স্মার্ট হয়, কিন্তু এরকম ইরেজিসটেবল হয় না। বাঙানি মেয়ে বিয়ে করবার সাধ করে এরকম একটা জটিলতার মধ্যে পড়তে হবে কে ভেবেছিল?‌ ঢুকে পড়েছে, এখন আর বোরোবার উপায় নেই। 

তীর্থ তাও নরম গলায় ম্যানেজ করবার চেষ্টা করল। বলল, ‘‌ওসব বাদ দিন। যা হবার হয়ে গেছে। চলুন কোথাও লাঞ্চ করি। খুব খিদে পেয়েছে।’‌

সৃজনী চোখ পাকিয়ে বলল, ‘বাদ দেব মানে!‌ খেপেছেন?‌ আমায় প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে না?‌ প্রায়শ্চিত্ত মানে জানেন?‌ বললাম যে আপনার মতো গুডবয়ের সঙ্গে ওরকম বিচ্ছিরি কাণ্ড করে আমি মরমে মরে যাচ্ছি। আপনাকে কি এমনি সাত সকালে এখানে ছুটিয়ে আনলাম?‌’‌

তীর্থ জোর করে হাসবার চেষ্টা করল। হাসলও। বলল,‘‌ইটস ওকে। আপনি তো মুখেই বলছেন। ব্যস্‌ আমার দেশে আসা সার্থক। তাছাড়া, সেদিন আমিও ভুল করেছিলাম। আমার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে ডেটিং করবার কথা আপনাকে বলা ঠিক হয়নি। ইনডিসেন্ট প্রোপোসাল হয়ে গেছে। আসলে পরের দেশের সঙ্গে নিজের দেশটা গুলিয়ে ফেলেছিলাম। ইট ওয়াস আ ক্রাইম। নিজের দেশের কালচার ভুলে যাওয়াটা অপরাধ ছাড়া কী?‌ আমার ধাক্কা খাওয়ার দরকার ছিল। আমি মেনেও নিয়েছি।’‌

সৃজনী এবার থমকাল। বাঃ, এই ছেলে তো খুব সুন্দর করে‌ বলতে পারে। একটু কেবলাচন্দর হলে কী হবে, মাথা পরিস্কার। লেখাপড়া তো জানেই, নিজের ভুলটাও বুঝতে পেরেছে। তার জন্য এতদূর চলে আসবার কথা শুনে কাল রাতে অনেকক্ষণ ঘুম আসেনি। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করতে করতে সৃজনী নিজেই অবাক হচ্ছিল। সে জীবনে অজস্র প্রেমে পাগল ছেলে দেখেছ। সে সুন্দরী, স্মার্ট, শিক্ষিত। আমেরিকা, জাপানে হ্যাংলামি নেই। তার এরকম কেন হবে?‌ ভেবেছিল, আজ একবার এই ছেলেকে নেড়েচেড়ে দেখবে। এখন নিজেই তো ঘাবড়ে যাচ্ছে। ঘাবড়ে যাওয়া কি প্রেমে পড়া?‌ সে কি তীর্থর প্রেমে পড়ছে?‌  

সৃজনী একটু চুপ করে থেকে নিচু বলল,‘‌চলুন, কোথায় খাবেন?‌’‌

তীর্থ মনে সাহস পেল। বলল,‘‌আমি তো কিছু  চিনি না। আপনি বলুন। যেখানে নিয়ে যাবেন সেখানে খাবেন।’‌

শপিং মলের টপ ফ্লোরে এক সিকি আলোয় ডোবা  ‘‌কোজি এণ্ড কুল’‌ রেঁস্তোরায় গিয়ে বসল দু’‌জন। খুব হালকা বাজনা চলছে। তীর্থর ভাল লাগল। কলকাতায় আজকাল চমৎকার সব ফুড হ্যাং আউট হয়েছে। ধোঁয়া ধুলো, ট্রাফিক, রাস্তাঘাট, মশা, ঠেলা, যেখান সেখান থুতু আর  পিক ফেলা নিয়ে সত্য মিথ্যে নানারকন কথা থাকলেও, খাবারের রেস্তোরাঁ নিয়ে এই শহরের কোনও কথা হবে না। যে কোনও দেশের সঙ্গে লড়ে যাবে।  

সৃজনী মেনু কার্ড নিয়ে বলল,‘‌কী খাবেন?‌’‌

‘যা খুশি। নিজের চয়েসেই তো রোজ খাই, আজ আপনার চয়েস।’‌

সৃজনী বলল,‘‌গুড বয়।’‌

সৃজনী অনেকটা সময় ধরে খাবার অর্ডার করল। স্প্যানিস কুইজিন। দাঁত ভাঙা ধরনের নাম। স্যালাডের নাম জারাগোলো এস্‌ক্যালিভাডা। ভাতের নাম অ্যারোজা লা কুবাডা। এই সব খাবার সম্পর্কে কোনও ধারনাই নেই সৃজনীর। নার্ভাস ভাব কাটানোর জন্য খবার নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করে মন সরাতে চাইল। বেয়ারা অর্ডার নিয়ে যাওয়ার পর সৃজনী নিচু গলায় বলল,‘কী ইনস্ট্রুমেন্ট বাজছে? সেতার?‌‌’

তীর্থ একটু কান পেতে শুনে বলল,‘‌‌না, সন্তুর। সেতারের টানের সঙ্গে এর টানের অনেক পার্থক্য। সন্তুর সুরকে অনেক ধরে রাখতে পারে না, তাকে আবার স্ট্রোকে জাগাতে হয়। বাজানোর সময় এর রেসোনেন্স কমতে থাকে। ফলে নোটেশনগুলো  ধরতে সুবিধে। সেতারের সুর কিন্তু একবার স্ট্রিং টানবার পর অনেকটা সময় ধরে থাকে। মনে হয়ে বাজানাটা চলছেই।’‌  

সৃজনী মুগ্ধ হয়ে বলল,‘‌বা, আপনার গান বাজনা সম্পর্কে তো বেশ ভাল ধারণা!‌’‌ 

তীর্থ লজ্জা পেয়ে বলল,‘নানা, সেরকম কিছু নয়, ‌আমেরিকায় আ‌মার এক বন্ধু বাজায়। ছেলেটি জার্মান। কিন্তু বাজায় সন্তুরের মতো পুরোপুরি একটা ভারতীয় ইনস্ট্রুমেন্ট। এবং উইথ প্যাশন। এটা আমার কাছে খুব ভাল লাগে।’‌

খাবার আসার পর, কিছু সময় চুপচাপ খাওয়া চলল। খাবার চমৎকার। ডিশের সঙ্গে মেনু কার্ডের মতো রেসিপি কার্ড দেওয়া আছে। জারা গোলট স্যালাডে নানা রকম শাক সবজি গ্রিল করে অলিভ অয়েলে সাঁতলে নেওয়া। অ্যারোজা হল ভাতের প্রিপারেশন। ভাত, ডিমস কলা সব ভেজে দেওয়া হয়েছে । সঙ্গে টোমাটো। চমৎকার খেতে।

দু‘‌একজন রেঁস্তোরায় ঢুকছে। বেশিরভাগই জোড়ায়। প্রেমিক প্রেমিকা। সৃজনীদের ডানপাশের সোফা দেওয়া টেবিলে সুন্দর দেখতে দুটো ছেলেমেয়ে বসেছে। তারা বসেছে পাশাপাশি এবং ঘনিষ্ঠ হয়েছে। কমবয়সী মেয়েটির স্পল্পবাস। শরীরের ওপরের অংশের বেশিটাই উন্মুক্ত। পুরুষসঙ্গীটি তাকে জড়িয়ে ধরে। তীর্থ আমেরিকায় থাকে। এর থেকে অনেক অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে সে অভ্যস্থ। ছেলেমেয়ে দুটি যদি সোফায় শুয়ে পড়েও একে অপরকে আদর করে তার কিছু এসে যাওয়ার কথা নয়। যায়ও না। ওদেশে এসব দিকে কেউ ঘুরেও তাকায় না। রাস্তা ঘাট পার্ক রেঁস্তোরায় আদর ভালবাসা কোনও বিষয় নয়। কিন্তু এখন অস্বস্তি হচ্ছে। অস্বস্তি বাড়ছেও। এটা কেন হচ্ছে?‌ তবে কি সঙ্গে কে আছে তার ওপরে আশপাশের ঘটনা মনে রিঅ্যাক্ট করে ‌?‌ সৃজনী থাকার কারণ তার কি একটু লজ্জা করছে ‌?‌ সম্ভবত তাই। বিকিনি পরা সুন্দরী দেখে যে সবসময় ইগনোর করে তার এই সামান্যতে অস্বস্তি হবে কেন?‌ 

তবে সৃজনীর কিছু এসে যাচ্ছে বলে মনে হল না। সে বলল,‘‌এবার বলুন, কেন আমার জন্য এতদূর চলে এলেন ?‌’‌

তীর্থ বলল,‘‌আমি ঠিক জানি না। সম্ভবত পাগলামি করেছি। এয়ারপোর্টে আপনার সঙ্গে দেখা না হলে হয়তো যোগাযোগই করতাম না।’‌

সৃজনীর ভাললাগা বাড়ছে। বিদেশে থাকা বাঙালি ছেলেদের সম্পর্কে তার ধারণা যে সবসময় ঠিক নয় বুঝতে পারছে। তার মনে হত, এরা দেশ থেকে বাঙালি মেয়ে বিয়ে করে নিয়ে যায়, বাড়িতে হেঁশেল ঠেলাবে বলে। তার এক পিসির সেই হাল হয়েছিল। বরকে ডাঁটা চচ্চড়ি খাওয়াতে খাওয়াতে জীবনে ওষ্ঠাগত হয়ে গিয়েছিল। এটা সবসময় ঠিক নয়।

তীর্থ বলল,‘‌ওসব কথা বাদ দিন। আপনার কাজকর্মের খবর বলুন।’‌

সৃজনী বলল,‘‌আমি ইন্টিরিয়র কনসালটান্ট হিসেবে কাজ শুরু করেছি। স্পেশালাইজড ফর স্মল ফ্ল্যাট।’‌

তীর্থ বলল,‘‌চমৎকার। এখন তো সবাই ছোট ফ্ল্যাটেই থাকে। কাজ অনেক পাবেন।’‌

সৃজনী বলল,  ‘হোপ সো। আমি নিজে এক সময় ফার্ম করব ঠিক করেছি।’‌

‘খুব ভাল। করুন। এখানে ইন্টিরিয়রের ডিমাণ্ড বাড়ছে। কাজের অভাব তো হবেই না, বরং করে শেষ করতে পারবেন না।’‌

খাবারের প্লেট দেওয়া নেওয়া করতে গিয়ে তীর্থর সঙ্গে যতবারই সৃজনীর হাতের ছোঁয়া লাগছে, সৃজনীর কেমন একটা লাগছে। শিরশির করছে। কেন এমন হবে?‌ মনে হচ্ছে, এই স্পর্শ অন্যরকম। এর জন্য সে এতদিন অপেক্ষা করেছিল!‌ সৃজনী সর্তক হল। নিজেকে সামলালো। এসব কী ছেলেমানুষি হচ্ছে! শুধু সর্তক নয়, সহজ হতে হবে।‌ কেবালাচন্দটার সঙ্গে একটু মজা করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।  

খাওয়া শেষ করে ন্যাপকিনে মুখ মুছল সৃজনী। প্লেট সরিয়ে রেখে হেসে বলল, ‘‌এবার তো সহজ হয়েছেন, বেশ খানিকটা সময়ও কাটালেন আমার সঙ্গে, এবার বলুন তো কী বলতে চান।’‌

তীর্থ বলল, ‘‌আবার সেই কথা! উফ্‌ আপনি পারেনও বটে।’‌

সৃজনী ঠোঁট কামড়ে বলল,‘‌ও আপনি জোরে বলতে লজ্জা পাচ্ছেন?‌ ঠিক আছে আমি আপনার পাশে গিয়ে বসছি, আপনি কানে কানে বলুন।’‌

তীর্থকে হতভম্ব করে সত্যি সত্যি সৃজনী উঠে গিয়ে, টেবিল টপকে তীর্থর পাশে বসল। নিচু গলায় বলল,‘‌নিন এবার চট করে বলে ফেলুন। আমাকে উঠতে হবে।’‌

এই সময় রেস্তোঁরায় চুমুর ঘটনাটি ঘটল। কে চুমু খেল? তীর্থ?‌‌ 

চলবে…

গত পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-19/

১৮ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-18/

১৭ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-17/

১৬ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-16/

১৫ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-15/

১৪ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-14/

১৩পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-13/

১২ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-12/

১১ পর্বের লিংক –  https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-11/

১০ পর্বের লিংক –  https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-10/

৯ম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-9/

৮ম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-8/

৭ম পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-7/

৬ পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-6/

 
৪র্থ পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-guptapart-4/

৩য় পর্বের লিঙ্ক –https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-guptapart-3/

২য় পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/novel-by-prachet-gupta-2/

প্রথম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/novel-by-prachet-gupta/

Advertisements
Previous article” নীরব মোদীকে পেলে চপ্পলপেটা করব “
Next article৬ টি ফ্ল্যাটের দাম ৯০০ কোটি টাকা ! নীরব মোদীর হিমশৈলসম সম্পত্তির চূড়ামাত্র
প্রচেত গুপ্ত
জন্ম : ১৪ অক্টোবর, কলকাতায়, ১৯৬২ সালে | কলকাতার গায়ে বেড়ে ওঠে শহরতলি বাঙুর এভিনিউতে স্কুলের পড়াশোনা, বড় হওয়া | স্কুলজীবন থেকেই খেলাধুলার সঙ্গে লেখালেখির নেশা | প্রথম লেখা মাত্র ১২ বছর বয়সে আনন্দমেলা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় | তারপর বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লেখা চলতে থাকে | গোড়ার দিকে ছোটদের জন্য লেখাতেই বিশেষ ঝোঁক ছিল | স্কুল শেষ হলে স্কটিশ চার্চ কলেজ | এরপরই একটা দুটো করে বড়দের জন্য লেখার শুরু | অর্থনীতিতে স্নাতক হয়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসাবে বেছে নেওয়া | বিভিন্ন পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হতে থাকে নিয়মিত | প্রথম উপন্যাস 'আমার যা আছে' প্রকাশিত হয় আনন্দলোক পত্রিকায়, ২০০৪ সালের পূজাবার্ষিকীতে |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.