প্রচেত গুপ্ত
জন্ম : ১৪ অক্টোবর, কলকাতায়, ১৯৬২ সালে | কলকাতার গায়ে বেড়ে ওঠে শহরতলি বাঙুর এভিনিউতে স্কুলের পড়াশোনা, বড় হওয়া | স্কুলজীবন থেকেই খেলাধুলার সঙ্গে লেখালেখির নেশা | প্রথম লেখা মাত্র ১২ বছর বয়সে আনন্দমেলা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় | তারপর বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লেখা চলতে থাকে | গোড়ার দিকে ছোটদের জন্য লেখাতেই বিশেষ ঝোঁক ছিল | স্কুল শেষ হলে স্কটিশ চার্চ কলেজ | এরপরই একটা দুটো করে বড়দের জন্য লেখার শুরু | অর্থনীতিতে স্নাতক হয়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসাবে বেছে নেওয়া | বিভিন্ন পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হতে থাকে নিয়মিত | প্রথম উপন্যাস 'আমার যা আছে' প্রকাশিত হয় আনন্দলোক পত্রিকায়, ২০০৪ সালের পূজাবার্ষিকীতে |
ছবি - দেবব্রত ঘোষ

দু‘‌মাসের টিউশন বেতনের টাকা আমার পকেটে। এর অর্থ সাগর এখন বড়লোক। 

Banglalive

মনে মনে হিসেব করে দেখলাম, মোটা ষোলোশো টাকা। উরি বাব্বা!‌ এ তো অনেক টাকা।‌ এত টাকা আমি নিয়ে আমি এখন কী করি?‌ সমস্যা হচ্ছে, এত টাকা পকেটে থাকলে,খিদে পেলে নিজেকে সামলাতে পারব না। পেটে খিদের মূল কারণই হল,পকেটে টান। সেই টান যদি না থাক,পকেট যদি উপচে পড়ে, তাহলে তো সব গোলমাল। অথচ আজ আমি প্রতিজ্ঞা করেছি,গোটা দিন না খেয়ে থাকব। এখনই খিদে পাচ্ছে। এই খিদে বাড়বে। নিজেকে ধরে রাখা কঠিন হবে তখন। এর থেকে বাঁচার উপায়,টাকা খরচ করে ফেলা। কী ভাবে করব?‌ আচ্ছা, ভাত–‌ডালের হোটেল খানিকটা ধার মিটিয়ে এলে কেমন হয়? 

ভাত–‌ডালের হোটেলে ঢুকতেই কাউন্টারে বসা ম্যানেজার তেতো মুখে বলল,‘‌আসুন সাগরবাবু।’‌

কিছু লোক আছে যাদের বলা হয়,‘‌মিটমিটে বদ’‌। এরা সামনে হাসে পিছনে ঝামেলা করে। এই ম্যানেজারও বদ তবে মিটমিটে নয়,খটখটে। ‘‌খটখটে বদ’দের ‌ মুখে হাসি থাকে না। শুকনো খটখট করে। এই লোক তাই।  ক‘‌মাস হল হোটেলে এসেছে। মালিক বসিয়েছে। খুব হম্বিতম্বি আছে। ধারবাকির কারবার বন্ধ করে দিয়েছে। আমার ধারবাকিও বন্ধ করতে চেয়েছিল। পারেনি। মালিকের ওপর থেকে বলা আছে। হোটেলের ছোটোখাটো কর্মীরাই আমাকে খবর দিয়ে রেখেছে। তারপরেও ওর কাছে যাই।

‘‌আমার হিসেবটা দিন ম্যানেজার সাহেব।’‌

মুখটাকে তোতো গেলার মতো করে ম্যানেজার বলল,‘‌কীসের হিসেব?‌’‌

আমি বললাম,‘‌আমার ধারের। ধার মিটিয়ে আমি বিদায় নেব। অন্য হোটেলের সঙ্গে আমার কনটাক্ট হয়েছে। ধারবাকির কনটাক্ট।’‌

ফিনফিনে চেহারার ম্যানেজার বেজার মুখটাকে আরও বেজার করে বলল,‘দুঃখিত সাগরবাবু,আপনাকে হিসেব দেওয়া যাবে না।’‌

আমি বললাম,‘‌কেন! ‌দেওয়া যাবে না কেন ম্যানেজার সাহেব?‌ আমি তো আপনার কাছ থেকে টাকা চাইছি না,টাকা দিতে চাইছি।’‌

ম্যানেজার আরও মুখ ভেটকে বলল,‘‌তা জানি না। মালিকের বারণ আছে।’‌

আমি বললাম,‘‌কেন ম্যানেজার সাহেব?‌’‌

ম্যানেজার ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল,‘‌আমি কী জানি?‌ বললাম তো মালিককে জিগ্যেস করুন। উনি বলেছেন,সবার ধারবাকি ঠেকানো যাবে,কিন্তু সাগরবাবুকে কিছু বলা যাবে না। আপনি নাকি এই ব্যবসার পয়া লোক। গুড লাক। যেদিন থেকে আপনি ধারে খাওয়া শুরু করেছেন,সেদিন থেকে ওর ব্যবসার রমরমা। আপনার যখন ইচ্ছে হবে,ধার শোধ করবেন।’‌কথা শেষ করে ম্যানেজার নাক দিয়ে ‘‌ফোঁৎ’‌ ধরনের আওয়াজ করল। বলল,‘‌এই সব কুসংস্কার আমি বিশ্বাস করি না। পয়া বা অপয়া বলে কিছু হয় না। বিজনেসে টাকাই কেবল পয়া। বাকি সবই অপয়া। তাছাড়া আপনি কী এমন দরের লোক যে আপনাকে মাথায় নিয়ে নাচতে হবে?‌’‌

আরও পড়ুন:  সৌরভের সঙ্গে ‘বিশেষ সম্পর্ক’ ছিল? মুখ খুললেন নাগমা...

আমি জানি এসব পয়া–‌অপয়া বাজে কথা। আসলে হোটেলের মালিক আমাকে ভালবাসে। মনে হয়,ওর ভিতরেও একটা সাগর আছে। সমাজ,সংসারের কারণে সেই এলোমেলো মানুষটাকে বের করতে পারে না। এই খটখটে ম্যানেজার এসব কী ভাবে বুঝবে ?‌ আমি উৎসাহ নিয়ে বললাম,‘‌ঠিক কথা বলেছেন ম্যানেজার সাহেব। আপনার মালিক ভুল করছেন। আমি কোনও দরের লোক নই। আমার দাম ফুটো পয়সাও নয়।  বিশ্বাস না হলে হাতে কলমে দেখতে পারেন। পেন ইন হ্যাণ্ড। একটা ফেলে দেওয়া স্ক্র‌্যাপের দোকানে নিয়ে গিয়ে আমাকে বেচতে যান। ফুটো পয়সাও দাম পাবেন না। আপনার মালিক পয়সা চিনতে পারেনি,পয়াও চিনতে পারেনি। আমি ওর ব্যাড লাক,আপনি ওর গুড লাক।’‌

খটখটে ম্যানেজার ঘাড় কাত করে বলল,‘‌মেলা ঝামেলা করবেন না। আপনাকে দেখলেই গায়ের ভিতর জ্বালা করছে। এবার এখান থেকে কেটে পড়ুন। আর শুনুন, মালিকের ইচ্ছে মতো আপনি যত খুশি ধারে খান,কিন্তু সকালে বিকেল বউনির টাইমে আসবেন না। বউনি সময় ধারবাকি আমি সহ্য করতে পারি না।’‌

এরপর থেকেই আমি একটু দেরি করে যাই। আজ আগে আগে গিয়ে খটখটেকে চমকে দিলে কেমন হয়? আমি তাই ভাত‌ –‌হোটেলে এসে হাজির হয়েছি। ম্যানেজার তেতো মুখে ‘‌আসুন সাগরবাবু’ বলে আমাকে স্বাগত জানিয়েছে।

অনেকে বেজার মুখ বোঝাতে বাংলার পাঁচকে খাড়া করে। ভাবটা এমন যেন আমাদের পাঁচ নম্বর দেখতে খুব খারাপ। নিশ্চয় বজ্জাত সাহেবদের কাণ্ড। বাংলার পাঁচের থেকে ইংরেজির ফাইভ অনেক বিদ্‌ঘুটে দেখতে। পাঁচ যদি বেজার মুখের মতো হয়, ফাইভ তাহলে ডবল বেজার মুখের। তাই আমি উলটো বলি। হোটেলে ঢুকে দেখি ম্যানেজারের মুখটা ইংরেজির ফাইভের মতো হয়ে আছে।

আমি হাসি হাসি মুখে বললাম,‘‌আপনার সঙ্গে কথা আছে ম্যানেজার সাহেব।’‌

খটখটে ম্যানেজার বলল,‘‌সাগরবাবু,আজ আর কিছু বলবেন না। মেজাজ অতি খারাপ।’‌

আমি হেসে বললাম,‘‌দাঁড়ান, এখনই মেজাজ ভাল করে দিচ্ছি।’

আরও পড়ুন:  দুষ্টু-বৃষ্টি-নায়িকা

বলতে বলতে পকেটে টাকার খামে হাত দিলাম। আমি জানি পাওনা টাকা পেলেই এই লোকের মুখে হাসি ফুটবে। 

খটখটে ম্যানেজার বলল,‘‌মালিক মাসের প্রথম শনিবারগুলো রেগুলার খদ্দেরদের জন্য ফ্রি ডে হিসেবে ঘোষনা করেছে। আজ মাসের সেই প্রথম শনিবার।’‌

আমি অবাক হয়ে বলি,‘‌ফ্রি ডে!‌ সেটা আবার কী!‌’‌

খটখটে ম্যানেজার শুকনো মুখে বলল,‘‌রোজ যারা আমাদের কাছে খায়,মাসের এই একটা দিন তাদের সঙ্গে কোনওরকম টাকা–‌পয়সার লেনদেন চলবে না। তারা ফ্রিতে খাবেন।’

আমি বললাম,‘পুরোনো পাওনা নেবেন না?‌’‌

‌ম্যানেজার ফ্যোঁৎ করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,‘পুরোনো,নতুন‌ কোনও টাকাতেই হাত দিতে পারব না। খুবই দুঃখের।’‌ 

আমি আঁতকে উঠলাম।

‘‌সেকী!‌ এ কেমন কথা ?‌’‌

খটখটে ম্যানেজার কাঁদো কাঁদো মুখে বলল,‘‌সাগরবাবু,এই চাকরি আমি ছেড়ে দেব। অনেক হয়েছে। এনাফ ইজ এনাফ। আপনার মালিক যা শুরু করেছেন,‘‌তাতে এই হোটেল আর বেশি দিন নেই। শিগ্‌গিরই লাটে উঠবে। আমি লাটে ওঠা কোনও ব্যবসার ম্যানেজার হয়ে দুর্নাম নিতে পারব না।’‌

আমি তো ম্যানেজারের থেকে বেশি ভেঙে পড়লাম। কটা টাকা এখানে খরচ করব ভেবেছিলাম। হল না। ইস্‌,আজই মাসের প্রথম শনিবার হতে হল।

খটখটে ম্যানেজার বলল,‘‌সাগরবাবু আমাকে ভাল করে একটা পদত্যাগপত্র লিখে দেবেন তো। এই সপ্তাহই আমার শেষ সপ্তাহ।’‌

হোটেল থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলাম। কচুরি ভাজার গন্ধ এসে আমার পেট চনচন করে দিচ্ছে। ইচ্ছে করছে,পকেটের ষোলোশো টাকার সবটা দিয়ে গরম কচুরি কিনে খাই। কটা হবে?‌ আমি হনহনিয়ে হাঁটা দিলাম। তাড়াতাড়ি খাবারের হোটেল থেকে সরে যেতে হবে। ক্ষুর্ধাত থাকবার প্রতিজ্ঞা ধরে রাখতে হবে যে। 

খানিকটা হেঁটে আসবার পর দেখি,আমার বাড়িওলা রাস্তার ওপাশ থেকে হন্তদন্ত হয়ে আসছে। অন্য সময় বাড়িওলাকে দেখলে বুকের ভিতরটা ভয়ে ধড়াস্‌ করে উঠত। তিন–‌চার মাসের ভাড়া বাকি পড়ে থাকলে ‘‌ধড়াস্‌’‌এর আর দোষ কী?‌ আজও বুক ধড়াস্‌ করল। তবে একেবারে উলটো কারণে। আজকের ‌‘‌ধড়াস্‌’ হল  নিশ্চিন্তির ‘‌ধড়াস্‌’। ভদ্রলোককে পুরো টাকাটাই ধরিয়ে দেব।

আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম,‘‌মেসোমোশাই,আপনাকেই খুঁজছিলাম।’

বাড়িওলা মানুষটা রাগি রাগি ভাব করলেও আসলে খুবই ভাল। নইলে আমার মতো ভাড়াটেকে এতদিন সহ্য করছে কী করে?‌

আরও পড়ুন:  বাঙালীর বিশ্বকাপ এবং কমলাকান্তের পুনরার্বিভাব

‘তোমাকেও আমি খুঁজছি সাগর।’

আমি গদগদ গলায় বলি,‘‌আর খুঁজতে হবে না। বকেয়া ভাড়ার ছোটো একটা অংশ এখনই দিয়ে দিচ্ছি ‌মেসোমোশাই।’‌

বাড়িওলা ভদ্রলোক হেসে বললেন,‘আমাদের নাতি হয়েছে।’‌ 

আমি লাফিয়ে উঠি।

‘‌বুটুর ছেলে হয়েছে। সেই বুটু!‌’‌

বাড়িওলা মেসোমোশাই এক গাল হেসে বললেন,‌‘‌হ্যাঁ সেই বুটু। খানিক আগে শিকাগো থেকে ফোন করেছিল।’‌

আমি বললাম,‘‌খুব আনন্দ হচ্ছে মেসোমোশাই।’‌

‘‌শুধু আনন্দ হলে হবে না সাগর। তোমার মাসিমা বলেছে,নাতির একটা ভাল নাম তুমি দেবে। তুমিই পারবে। বুটুও তাই বলেছে। সে তোমাকে ফোন করত। তোমার ফোন নেই বলে করতে পারেনি।’‌

আমি পকেট থেকে খাম বের করে মিনমিন করে বললাম,‘‌মেসোমোশাই,আমি বাকি থাকা বাড়ি ভাড়ার কিছুটা আজ দিতে চাই।’‌

ভদ্রলোক ধমক দিয়ে বললেন,‘‌রাখ তোমার বাড়ি ভাড়া। ওই চার আনা ভাড়া নিয়ে এখন আমি ভাবছি ভেবেছো?‌ আরে বাবা,তুমি আবার নাতির নাম দাও আগে.‌.‌.‌যাও তোমার বকেয়া তিন মাসের ভাড়া মকুব করে দিলাম।’‌

আমি কাঁচুমাচু মুখে বললাম,‘মেসোমোশাই ,আমার টাকা আছে.‌.‌.‌।’

‘‌চোপ্‌। আর একবার ভাড়ার কথা তুললে বাড়ি থেকে দূর করে দেব। শোনো আজ রাতে তুমি আমাদের সঙ্গে খাবে। তোমার মাসিমা বলে দিয়েছে। সরো সরো, আমাকে মিষ্টির দোকানে যেতে দাও।‌’

বাড়িওলা হনহন করে হাঁটা দিলেন। আমি পথের মাঝখানে‌‌ হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। টাকা খরচ করা এত কঠিন ‌! 

 

চলবে…

গত পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-22/

২১ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-21/

২০ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-20/

১৯ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-19/

১৮ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-18/

১৭ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-17/

১৬ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-16/

১৫ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-15/

১৪ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-14/

১৩পর্বের লিংক – http://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-13/

১২ পর্বের লিংক – http://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-12/

১১ পর্বের লিংক –  http://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-11/

১০ পর্বের লিংক –  http://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-10/

৯ম পর্বের লিংক – http://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-9/

৮ম পর্বের লিংক – http://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-8/

৭ম পর্বের লিঙ্ক – http://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-7/

৬ পর্বের লিঙ্ক – http://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-6/

 
৪র্থ পর্বের লিঙ্ক – http://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-guptapart-4/

৩য় পর্বের লিঙ্ক –http://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-guptapart-3/

২য় পর্বের লিঙ্ক – http://banglalive.com/novel-by-prachet-gupta-2/

প্রথম পর্বের লিংক – http://banglalive.com/novel-by-prachet-gupta/

 

NO COMMENTS