সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ২৪)

494
ছবি - দেবব্রত ঘোষ

আমার জেদ ধরে গেছে। সাগরের জেদ। এই টাকা আমি খরচ করে তবে ছাড়ব। ততক্ষণ আমার অনশন কর্মসূচী চলবে। কেউ ঠেকাতে পারবে না। 
আমার এই কথাস যে শুনবে সেই হাসবে। বলবে,‘‌এসব হল সাগরের ধ্যাষ্টামো। মোটে তো ওই কটা টাকা। মোটের ওপর ভদ্রলোকের মতো একটা জামা আর চলনসই একটা জুতো কিনলেই ফুরিয়ে যাবে। তাই নিয়ে আবার বড় বড় কথা। যেন বিরাট গুপ্তধন পেয়েছে। আচ্ছা,জামা–‌জুতো না হয় বাদই দিলাম। নিজের ঘরের তক্তাপোষটা তো ঠিক করা যায়। ওটা তো বহুদিন হল ঢক্‌ঢক্‌ করে চলেছে। মেরামতিরই বা দরকার কী?‌ একটা নতুন কিনলেই তো হয়ে যায়। তক্তাপোষের আর কতই বা দাম হবে। সেই সঙ্গে ঘরের জানলাটাও ঠিক করা দরকার। একটা পাল্লা তো আটকানোই যায় না। যদি বা টেনেটুনে রাখা হয়, খানিক পরে ঠিক নিজের মতো খুলে যাবে। ঘরে হয় রোদ না হয় বৃষ্টি। রোদ–‌বৃষ্টি বাইরে ভাল, ঘরের ভিতর ভাল নয়। সাগরের কাছে এখন যা টাকা আছে তাতে জানলার একটা পাল্লা মেরামত করা কোনও ব্যাপারই নয়। আচ্ছা,তাও যদি ইচ্ছে না করে তাহলে একটা কাজ করতে পারে। বাড়িওলার পারমিশান নিয়ে ঘরে এক পোঁচ চুনকাম করিয়ে নিতে পারে। কী এমন খরচ পড়বে?‌ কতবছর তো চুনকাম হয়নি।’‌
যে যা খুশি বলুক। আমি এসব কোনও কথা শুনব না। এই টাকার একটা কানাকড়িও আমি এভাবে খরচ করতে চাই না। নিজের জন্য নো খরচ। সকালে যেমন কপর্দকশূন্য ‘‌ভিখিরি’‌ছিলাম,রাতেও বাড়ি ফিরব ‘‌ভিখিরি’‌ হয়ে। মাঝেমাঝে ‘‌ভিখিরি’হয়ে থাকতে পারলে ভাল হয়,মন রাজার মতো হয়ে যায়। যাদের কাছ থেকে ধারদেনা নিই তাদের খানিকটা মিটিয়ে দিতে চাই। তারপর দেখা যাবে। ইতিমধ্যে দুটো জায়গায় ফেল মেরেছি। খাবারের হোটেল, বাড়িওলা। দু‘‌জনের কাছ থেকেই মুখ শুকিয়ে ফিরতে হল। আচ্ছা,তমালের সঙ্গে একবার ট্রাই করলে কেমন হয়? যদিও‌ ওই ছেলের কাছে আমার যা হয়ে আছে, তাকে ধার বলে না,ঋণ বলে। ঋণ আর ধার এক জিনিস নয়। জীবন অভিধান নয়। ঋণ অনেক বড় শব্দ। অনেক ঋণ থাকে যা গোটা জীবনে মেটানো যায় না। তমালের কাছ থেকে টাকা পয়সা নেওয়াটাও সেরকম। যাই হোক,চেষ্টা তো করতে হবে।

তমালের কাছে পৌছোনোর ফ্যাকড়া আছে। ওর চাকরিতে নানারকম উন্নতি হয়েছে। একটা উন্নতি হল অ্যাপয়েনমেন্ট ছাড়া ওর কাছে পৌছোনো যায় না। অফিসে গিয়ে একটার পর একটা মিটিং করতে থাকে। গিয়ে ঠায় বসে থাকতে হয়। আমার মনে হয়,ওর পোস্টের নাম,জেনারেল ম্যানেজার,ব্রাকেটে মিটিং। আমার অবশ্য বসে থাকায় কোনও সমস্যা নেই। লোকের অফিসে যাওয়া যেমন কাজ, আমার তেমনই মাঝেমাঝে তমালের ওখানে গিয়ে ধারের জন্য বসে থাকা কাজ। তমালও আমাকে মাঝেমাঝে খবর পাঠিয়ে ডেকে নেয়। যে কাজ কেউ করতে রাজি হয় না অথবা যে কাজ আদৌ করা যায় না সেই সব আমাকে দিয়ে করায়। অবশ্যই আমি যদি রাজি হই। তার বদলে ভাল পেমেন্ট আছে। বিদেশে এই ধরনের কাজকে ‘অড জবস্‌’‌বলা হয়। তমাল আমাকে যখন ডেকে পাঠায় তখনও অপেক্ষা করতে হয়। আর না বলে গেলে তো কথাই নেই। তবে ওদের অপেক্ষা করবার জায়গাটা ভারি আরামদায়ক। কাচে ঘেরা ছোটো একটা ঘর। শীতে –‌গরমে সবসময় ফিশফিশ‌ করে এসি চলছে। লম্বা লম্বা সোফা। অ্যাপয়েনমেন্ট ছাড়া গিয়ে কয়েকবার আমি শুয়ে ঘুমিয়েই পড়েছি। তমাল একদিন থমথমে মুখে বকাবকি করল।
‘‌তুই নাকি এখানে এসে ঘুমোস?‌’‌
আমি গদগদ ভাবে বললাম,‘‌তোদের ওয়েটিংরুমটা দারুণ। শুধু ঘুম নয়,ঘুমিয়ে দারুণ স্বপ্নও দেখা যায়। আজই স্বপ্ন দেখলাম,বিরাট একটা চকচকে অফিসে চাকরি পেয়েছি। বড় পোস্ট। ম্যানেজার ঘুম। অফিসের সবাই ঠিকমতো ঘুমোচ্ছে কিনা,সে ব্যাপারে দেখভাল করাটাই আমার কাজ।’‌
তমাল চাপা গলায় বসলে,‘‌ফাজলামি করবি না সাগর। অফিসটা ফাজলামি করবার জায়গা নয়। আমার কাছে খবর এসেছে,তুই নাকি মাঝেমাঝেই এখানে এসে ভিজিটরস্‌ রুমে ঘুমিয়ে পড়িস। সোফার ওপর টানটান হয়ে শুয়েও পড়েছিস।’
আমি অবাক হয়ে বললাম,‘‌শুয়ে পড়ব না তো কী করব!‌ ‌দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমোবো?‌ আমি কি ঘোড়া?‌’‌
তমাল দাঁত কিড়মিড় করে বলল,‘‌চোপ্‌। একদম বাজে কথা বলবি না। আমার অফিসটা রেল স্টেশন নয় নয় যে বেঞ্চে টানটান হয়ে শুয়ে ঘুমোবি। এরপর থেকে না ডাকলে,এদিকে পা বাড়াবি না বলে দিচ্ছি।’‌
আমি বললাম,‘‌আর আমার যদি দরকার থাকে?‌’‌
‘‌অ্যাপয়েনমেন্ট করে আসবি। আমাকে ফোন করবি। সময় নিবি।’‌
আমি বললাম,‘আমার তো ফোন নেই। তুই ভাল করেই সেটা জানিস তমাল।’‌
তমাল ভুরু কুঁচকে খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,‘‌তোকে আগেও অনেকবার বলেছি,আজ আবার বলছি, টাকা দিচ্ছি একটা মোবাইল ফোন কিনে নে। নাহলে,আমার কাছ থেকে একস্ট্রা একটা ফোন নিয়ে নে।’‌
আমি মুচকি হেসে বললাম,‘আমি মোবাইল ফোন সঙ্গে রাখি না। মনফোনের সঙ্গে ঝগড়া হয়ে যাবে।’‌
তমাল রেগে গিয়ে বলল,‘‌যা খুশি কর। আমার অফিস থেকে বেরিয়ে যা।’‌
সেই থেকে আমি তমালের সঙ্গে অ্যাপয়েনমেন্ট করে তবে ওর কাছে যাই। মন ফোনের সব কথা বলা যায়,টাকা পয়সার কথা বলা যায় না। এই বিষয়ে অ্যাপয়েনমেন্ট করতে হলে সত্যি ফোন লাগে। আমি মঙ্গলের মুদি দোকানে গেলাম। সেখানে এখনও পয়সা দিয়ে ল্যাণ্ড ফোন ব্যবহার করতে দেয়। আমি মাঝে মাঝে করি। এই একমাত্র জায়গা যেখানে কোন ধারবাকি রাখি না। কথা ধারবাকিতে হয় না।
ল্যাণ্ড ফোন থেকে তমালের মোবাইলের নম্বর টিপলাম। একবার বাজতেই ফোন ধরল। 
‘‌কী হয়েছে?‌’‌
‘‌তোর সঙ্গে দেখা করতে চাই।’‌
‘‌কেন?‌ কী ব্যাপার?‌’‌
আমি বললাম,‘‌টাকা–‌পয়সার ব্যাপার।’‌
তমাল রাগের গলায় বলে উঠল,‘‌কোনও টাকা পয়সার কথা তোর সঙ্গে বলব না।’‌
আমি বললাম,‘‌আরে বাবা,আমি তো ধার চাইতে যাব না। তুই আমার কথা তো আগে শুনবি তমাল।’‌
তমাল আরও রেগে গিয়ে বলল,‘‌বললাম তো শুনব না। তোকে এক পয়সাও ধার দেব না। একটা অলস ছেলে। টাকা পয়সা দিয়ে তোকে আরও অলস বানিয়ে দিয়েছি। যেদিন কাজের ব্যাপারে ফোন করবি,সেদিন কথা বলব।’‌
আমি বললাম,‘‌আরে,কথাটা তো শুনবি। আমি তোকে সামান্য কিছু টাকা ফেরত দিতে চাই। তোর কাছে আমার ঋণ মিটবে না কোনওদিন.‌.‌.‌।’‌
তমাল আরও জোরে ধমক দিল।
‘লেকচার থামা। ‌বলছি তো টাকা–‌পয়সা নিয়ে কোনও কথা শুনব না। দেওয়া নেওয়া কিচ্ছু না।’
আমি শান্ত করবার চেষ্টা করলাম। বললাম,‌‘‌আগে আমি যাই ।’‌
তমাল খ‌েঁকিয়ে উঠে বলল,‘‌বলছি না বাজে কথা বলবি না। তোর কাছ থেকে টাকা ফেরত নেওয়া তো দূরের কথা,আমি তোর মুখদর্শন পর্যন্ত করতে চাই না। যতদিন না কোনও চাকরি নিয়ে এসে আমাকে বলছিস,আমি জয়েন করেছি, ততদিন এ মুখো হবি না।’‌
কথা শেষ করে দড়াম্‌ করে ফোন কেটে দিল তমাল। কী অদ্ভুত ফ্যাচাং–‌এ পড়েছি রে বাবা!‌ কেউ আমার কাছ থেকে টাকা ফেরত নিতে চাইছে না!‌ সাগর হওয়ার এ কি জ্বালা!‌ আমি কি তবে চিরকাল ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘুরব?‌ ঋণ না ভালবাসা?‌ ভালবাসাই হবে। একটা অকর্মণ্য ছেলে হয়ে এত ভালবাসা কেন পাই আমি?‌ 
আমি এবার টাকা খরচের জন্য কঠিন অথচ সহজ সিদ্ধান্ত নিলাম। এই সিদ্ধান্ত কাজে লাগবেই।    

চলবে…

গত পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-23/

২২ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-22/

২১ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-21/

২০ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-20/

১৯ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-19/

১৮ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-18/

১৭ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-17/

১৬ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-16/

১৫ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-15/

১৪ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-14/

১৩পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-13/

১২ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-12/

১১ পর্বের লিংক –  https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-11/

১০ পর্বের লিংক –  https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-10/

৯ম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-9/

৮ম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-8/

৭ম পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-7/

৬ পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-6/

 
৪র্থ পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-guptapart-4/

৩য় পর্বের লিঙ্ক –https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-guptapart-3/

২য় পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/novel-by-prachet-gupta-2/

প্রথম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/novel-by-prachet-gupta/

Advertisements
Previous articleযত্ন করে ‘মালাবার পনির’ রেঁধে বিপাকে তারকা-শেফ সঞ্জীব কাপুর
Next articleকেতজেল পাখি (দ্রোহজ ২)
প্রচেত গুপ্ত
জন্ম : ১৪ অক্টোবর, কলকাতায়, ১৯৬২ সালে | কলকাতার গায়ে বেড়ে ওঠে শহরতলি বাঙুর এভিনিউতে স্কুলের পড়াশোনা, বড় হওয়া | স্কুলজীবন থেকেই খেলাধুলার সঙ্গে লেখালেখির নেশা | প্রথম লেখা মাত্র ১২ বছর বয়সে আনন্দমেলা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় | তারপর বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লেখা চলতে থাকে | গোড়ার দিকে ছোটদের জন্য লেখাতেই বিশেষ ঝোঁক ছিল | স্কুল শেষ হলে স্কটিশ চার্চ কলেজ | এরপরই একটা দুটো করে বড়দের জন্য লেখার শুরু | অর্থনীতিতে স্নাতক হয়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসাবে বেছে নেওয়া | বিভিন্ন পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হতে থাকে নিয়মিত | প্রথম উপন্যাস 'আমার যা আছে' প্রকাশিত হয় আনন্দলোক পত্রিকায়, ২০০৪ সালের পূজাবার্ষিকীতে |

1 COMMENT

  1. হূমায়ুন আহমেদের হিমুর মত লেখা, হিমু ও এরকম কাজ করত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.