সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ২৮)

483
ছবি - দেবব্রত ঘোষ
শশার সঙ্গে আমার পরিচয় দু’বছর আগে।
সেদিন হাতিবাগানে ট্রাম দেখে মনটা উস্‌খুস্‌ করে উঠল। বহুদিন ট্রামে চড়া হয় না। কলকাতায় থাকি অথচ দীর্ঘদিন ট্রামে চড়ি না এটা কেমন কথা! 
কলকাতা শহরে তিন ধরনের স্পেশাল যানবাহন রয়েছে। এরা অতি প্রাচীন। ট্রাম, ঘোড়ায় টানা গাড়ি এবং হাতে টানা রিকশা। মাঝে মাঝে ময়দানে গিয়ে ঘোড়ার গাড়ি চড়তেও ইচ্ছে করে। পকেটে অত টাকা থাকে না। তবে হাতে টানা রিকশতে আমি এখন পারতপক্ষে চড়ি না। একটা মানুষ একটা মানুষকে টানছে এটা মানা যায় না।
সেদিন ট্রামটা কাছে আসতে‌ ফট করে সেকেণ্ড ক্লাসে উঠে পড়লাম। কোথাও যাওয়ার ছিল না। ট্রাম যেখানে যাবে আমিও সেখানে যাব। মাঝদুপুরে গাড়ি ফাঁকাই ছিল। একেবারে পিছনে গিয়ে বসেছি। ট্রামের লেজে। হেলতে দুলতে চললাম। মনটা নস্টালজিক হয়ে গেল। একসময়ে ট্রামে চেপে কলেজে গেছি। ন’‌টা সাতাশের ট্রাম ধরতাম বেলগাছিয়া মোড় থেকে। শ্যামবাজারের মোড় থেকে একটা মেয়ে উঠত। সুন্দর কিছু নয়। সাধারণ দেখতে। শাড়ি, লম্বা বেণী, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। গায়ের রঙও শ্যামলা। তারপরেও মেয়েটাকে দেখতে ভাল লাগত। মনে হত সেও কলেজের ছাত্রী। নেমে যেত‌‌ বেথুনের সামনে।  একদিন ভাবলাম নেমে পিছু নেব। মেয়েদের পিছু নেওয়া ভাল কাজ নয়—আমি এই থিওরি সবসময় মানি না। কাউকে ভাল লাগলে, তাকে বিরক্ত না করে তো একটু যাওয়াই যায়। অল্প বয়েসে সুন্দর মেয়েরা তো স্বপ্নের মতো। স্বপ্নের পিছনে যেতে দোষ কীসের?‌ সত্যি সত্যি একদিন আমি সেই সাধারণ মেয়েটির সঙ্গে ট্রাম থেকে নেমে পড়লাম। মেয়েটি রাস্তা পেরিয়ে বিডন স্ট্রিট ধরে হাঁটতে লাগল। আমিও গেলাম। মেয়েটি একটা গলির মধ্যে ঢুকল। আমিও ঢুকলাম। মেয়েটি খানিকটা এগিয়ে একটা মেটে রঙের বাড়ির সামনে দাঁড়াল। পুরোনো বাড়ি। সামনে একফালি রোয়াক। এক ধাপ সিঁড়ি। মেয়েটি সিঁড়ি দিয়ে উঠে হলুদ রঙের বন্ধ দরজার সামলে দাঁড়াল। আমি একটু দূরে থমকে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালাম। দিনের ফটফটে আলোয় উত্তর কলকাতার অচেনা একটা গলিতে কোনও মেয়ের পিছু নেওয়া খুব ঝুঁকির কাজ। কেউ দেখে ফেললে পিটুনি অবধারিত। কিন্তু আমার সেসব বোধ তখন লোপ পেয়েছিল। কৌতূহল বাড়ছিল। মেয়েটা তাহলে কলেজে পড়তে আসে না। রোজ এই বাড়িটায় আসে?‌‌ এটা কার বাড়ি?‌ এই সব পুরোনো দিনের বাড়িতে কলিংবেল থাকে না।‌ এখানেও নেই। কড়া আছে। মেয়েটি হাত বাড়িয়ে কড়া ধরতে গিয়ে হাত সরিয়ে নিল। তাহলে কি এবার নক্‌ করবে?‌ আমার কৌতূহল আরও বাড়ল। মেয়েটি নক্‌ করল না। ওকে কি কেউ ওপরের বারান্দা থেকে দেখেছে ?‌ কোনও জানলা থেকে?‌ এবার এসে দরজা খুলবে?‌ 
মেয়েটি দাঁড়িয়ে রইল। আমিও দাঁড়িয়ে রইলাম। এক মিনিট.‌.‌.‌দু’‌ মিনিট.‌.‌.‌তিন মিনিট.‌.‌.‌পাঁচ মিনিট.‌.‌.‌। কেউ এলও না। মেয়েটিও দরজা আওয়াজ করল না। কাউকে ডাকল না। চুপ করে আরও একটু দাঁড়িয়ে থেকে শাড়ির আঁচল দিয়ে গলা, কপালের ঘাম মুছল। তারপর সিঁড়ি থেকে নেমে যে পথে এসেছিল, সেই পথে ফিরে চলল। আমি হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। সিগারেট ধরালাম ফের। মেয়েটি এভাবে রোজ আসে?‌‌ একটা বন্ধ হলুদ দরজার সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে যায় রোজ?‌ আমি আর কোনওদিনও মেয়েটিকে ফলো করিনি। তাকায়ও নি কখনও। কারণ আমি বুঝতে পেরেছি, এই আসা, বন্ধ দরজার সাম তার নিজের। ব্যক্তিগত আর গোপনীয়। এখানে অন্য কারও প্রবেশ নিষেধ। হয়তো ওই হলুদ দরজার ওপাশে তার কোনও প্রিয় মানুষ আছে। আছে তার ভালবাসা বা বেদনা। একদিন সে হয়তো দরজা খুলবে। অথবা খুলবে না। সেই দৃশ্য দেখবার অধিকার আরও কারও নেই। আমাদের সকলের সামনেই তো এমন একটা করে হলুদ রঙের বন্ধ দরজা থাকে। আমার কখনও কখনও তার সামনে গিয়ে দাঁড়াই।
যাই হোক, এবার শশার কথা বলি।
ট্রামে উঠলে নিয়ম হল একটু ঝিমোতে হয়। আমার ধারনা ঘুম বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে ব্রিটিশরা বিলেতে ট্রাম বানিয়েছিল। সেইমতো দুলুনি, টিং টিং ঘন্টা, ভোঁস ভোঁস ব্রেক তৈরি করা হয়। সব মিলিয়ে যেন ঘুম পায়। নইলে ট্রাম থেকে নামিয়ে দিতে পারে। আমিও চোখ বুঁজেছিলাম। আমি যে কাঠের সিটে বসে আছি, সেটা তিনজনের। আমার দু’‌জন বসেছিলাম। একটু পরে আর একজন এসে বসল। মনে মনে বিরক্ত হলাম। ফাঁকা কামরায় আর কোনও জায়গা ছিল না?‌ যাক মরুক গে। ঝিমুনিতে মন দিলাম। 
পাশের লোকটার উস্‌খুসানিতে ধড়ফড় করে উঠলাম। লোকটা আমাকে আলতো ধাক্কাও দিচ্ছে।
‘‌ভাই, একটা বিরাট বিপদে পড়েছি।’‌
মাঝবয়সী লোক। জামা কাপড় মলিন। সঙ্গে ছাতা আর একটা চামড়ার ব্যাগ। অফিসের কেরানিবাবুরা একসময়ে এই ব্যাগ খুব ব্যবহার করত। বগলে চেপে ধরতে হয়। ব্যাগের অবস্থাও ভাল নয়।
আমি বললাম,‘‌কী হয়েছে?‌’‌
মাঝবয়সী অবাক গলায় বলল,‘‌আমার ব্যাগ থেকে টাকা তুলে নিয়েছে।’‌  ‌
কথা শেষ করে ‌ব্যাগটা এগিয়ে দেখালেন। চেন খোলা। বোঝাই যাচ্ছে পকেটমারের কীর্তি।
লোকটা যেভাবে কাটা জায়গার দিকে বিহ্বল চোখে তাকিয়েছিল। বিশ্বাস করতে পারছে না। মুখ ফিরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মলিন হেসে বলল,‘‌খুব বিপদে পড়ে গেলাম। বিরাট বিপদ।’‌
অন্য কেউ হলে চেঁচামেচি শুরু করে দিত। এই লোক নিচু গলায় আক্ষেপ করছে। ট্রামের পিছনে বসে থাকা দু–‌পাঁচটা লোক শুনতে পাচ্ছি।‌
আমি বললাম,‘‌কত টাকা ছিল।’‌
‘অনেক।’‌
আমি বললাম,‘‌কত?‌’‌
লোকটা হতচকিত ভাবে বলল,‘‌তিরিশ হাজার। আমার মেয়ের বিয়ের টাকা। একজনের কাছ থেকে ধার করেছি। মনে হয়ে ট্রামে ওঠবার সময়ে কেউ ব্যাগ কেটে নিয়ে নিয়েছে।’
লোকটার ওপাশে বসেছিল, একটা রোগা পাতলা ছেলে। সাদা ফুলশার্ট। হাতা আটকানো। পকেটে পেন। চুল পাট পাট করে আঁচড়ানো। ‘‌গুডবয়’‌ মার্কা দেখতে। চোখ বুঁজে ঝিমোচ্ছিল। চোখ না খুলেই বলল,‘‌আপনি তো মস্ত বোকা। এত টাকা নিয়ে কেউ ট্রামে ওঠে?‌’‌
লোকটা এবার সেই ছেলের দিকে ঘা‌ড় ফিরিয়ে বলল,‘‌হ্যাঁ, বোকা। কিন্তু কী হবে ?‌ মেয়ের বিয়ে.‌.‌.‌।’‌
ছেলেটা এবার চোখ খুলে সেই চোখ পাকিয়ে বলল,‘‌ভ্যান ভ্যান করবেন না। ট্রাম থেকে নেমে থানায় রিপোর্ট করুন। আমাকে ঘুমোতে দিন।’‌ তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল,‘‌কী আশ্চর্য লোক। ব্যাগে গাদাখানেক টাকা নিয়ে ট্রামে উঠেছে!‌’‌
মাঝবয়সী এবার বিড়বিড় করে বলল,‘টাকাটা গেছে বড় কথা নয়, এবারও মেয়েটার বিয়ে আটকে গেল।’‌
আমি শান্ত করবার জন্য বললাম,  ‘‌অত চিন্তা করবেন ‌না। নিশ্চয় একটা পথ বেরোবে।’‌
ওপাশের ‘‌গুড বয়’‌ ফের চোখ বুঁজেই বলল,‘‌দাদা, কান্নাকাটি নেমে গিয়ে করুন।’‌
লোকটা উঠে দাঁড়াল। চেন খোলা ব্যাগটা হাতে তুলে নিল। শুকনো হেসে নিচু গলায় বলল, ‘‌ভাই, কাঁদছি না, হাসছি। আগেরবারও একই কাণ্ড। সেবারও টাকা জোগাড় করে মেয়ের বিয়ে দিতে পারিনি। শেষ মুহূর্তে অফিসের এক পিওনের অ্যাক্সিডেন্টে পা বাদ দিতে হল.‌.‌.‌ অপারেশনের অনেক খরচ.‌.‌.‌টাকাটা দিয়ে দিলাম। ভাবলাম, মেয়ের বিয়ে পরে হবে, আগে তো ছেলেটা বাঁচুক.‌.‌.আর ‌এবার টাকাটা গেল পকেটমার হয়ে.‌.‌.‌।’ কথা থামিয়ে লোকটা হাত দিয়ে মুখের ঘাম মুছল। বলল,‘‌মেয়েটার বিয়ের ভাগ্য নেই।’‌
কথা‌ শেষ করে লোকটা এই সিট ওই সিট ধরে এগিয়ে যেতে লাগল। আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। আহারে, বোকা লোক একটা। এই ভাবে এত টাকা নিয়ে কেউ বাসে ট্রামে ওঠে!‌
‘‌এই যে দাদা, এই যে টাকা পকেটমার হওয়া দাদা.‌.‌.‌।’‌
পাশের ছেলেটা ডেকে উঠল। আমি ঘাড় ফিরিয়ে দেখি, ছেলেটার হাতে এক বাণ্ডিল টাকা।
‘‌এই যে সিটের ফাঁকে পড়েছিল। নিয়ে যান।’‌
মাঝবয়সী লোক ঘুরে দাঁড়িয়ে বিস্ফারিত চোখে বলল,‘‌আমাকে বলছেন ভাই?‌’‌
সেই ‘‌গুডবয়’‌ বিস্ফারিত গলা নকল করে বলল,‘‌আপনাকেই বলছি দাদা। কখনও ব্যাগের চেন খুলে পড়ে গেছে.‌.‌.‌নিন, নিয়ে কেটে পড়ুন। একটু ঘুমোতে দিন।’‌
সেই মাঝবয়সী হতচকিত ভঙ্গিতে এসে টাকার বাণ্ডিল নিল। ছেলেটা বলল,‘‌দয়া করে গুণে দেখবেন না। যা পেয়েছেন সোনা মুখ করে ব্যাগে ভরে নিন।’‌
মাঝবয়সী বিড়বিড় করে বলল, ‘‌কীভাবে যে আপনাকে ধন্যবাদ জানব।’‌
‘‌গুডবয়’‌  হাই তুলে বলল,‘‌আর ফ্যাচাং করবেন না। ঝিমোতে দিন। শালা এই ট্রামে ওঠাটাই ভুল হয়েছে।’‌
কথা শেষ করে ছেলেটি ঘাড় কাত করে চোখ বন্ধ করল। 
এই ছেলেই পকেটমার শসা। সেদিন মাঝবয়সী ট্রাম থেকে নেমে যাওয়ার পর সে চোখ খুলে এদিক ওদিক তাকায়। আমার দিকে ঝুঁকে গলা নামিয়ে বলে,‘‌কাজটা ভুল করলাম ?‌’‌
আমি হেসে বলেছিলাম, ‘ভুল নয়, বোকামি।’‌
কলেজস্ট্রিটৈ আমরা দুজনে একসঙ্গে নেমে পড়ি। একটা চায়ের দোকানে‌র বেঞ্চে বসে আলাপ করি।
এই ‘‌গুডবয়’ ই পকেটমার শসা।
 

চলবে…

গত পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-27/

২৬ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-26/

২৫পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-25/

২৪ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-24/

২৩ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-23/

২২ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-22/

২১ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-21/

২০ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-20/

১৯ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-19/

১৮ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-18/

১৭ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-17/

১৬ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-16/

১৫ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-15/

১৪ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-14/

১৩পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-13/

১২ পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-12/

১১ পর্বের লিংক –  https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-11/

১০ পর্বের লিংক –  https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-10/

৯ম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-9/

৮ম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-8/

৭ম পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-7/

৬ পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-gupta-part-6/

 
৪র্থ পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-guptapart-4/

৩য় পর্বের লিঙ্ক –https://banglalive.com/sagar-i-love-you-bengali-novel-by-prachet-guptapart-3/

২য় পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/novel-by-prachet-gupta-2/

প্রথম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/novel-by-prachet-gupta/

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.