সাগর আই লাভ ইউ (শেষ পর্ব)

শসাকে কোর্টে তোলা হবে বেলা আড়াইটে। নারুম যাবে। নারুম খুব খুশি। সারেন্ডার করবার পর থেকে শসার ওপর অল্পবিস্তর চড়চাপড় হয়েছে, কিন্ত আমরা যাবার পর থেকে মারধোর তো দূরের কথা পুলিশ শসার সঙ্গে যথেষ্ট ভাল ব্যবহার করছে। তারওপর ওরা কথা দিয়েছে হালকা মামলা দেবে, যাতে অল্প কদিন জেল খেটেই বেরিয়ে আসতে পারে। শসা, নারুম দু’‌জনেই রাজি। কদিন জেল তো খাটতে হবে। নইলে যে সাজা পাওয়া হবে না। কর্মের ফলও ভোগ করা হবে না। কর্মের ফল ভোগ না করলে নিজেকে শুদ্ধ করাও যাবে না। সত্যি কী সুন্দর দুটো ছেলেমেয়ে!‌ তাছাড়া খানিক আগে নারুম একটা দারুণ সিদ্ধান্তের কথা আমাকে জানিয়েছে। সে ঠিক করছে, যতদিন শসা জেল খাটবে, ও শসার বৃদ্ধ অসুস্থ বাবা–‌মায়ের দায়িত্ব নেবে। আজ থেকেই সে পার্টটাইম কাজ খুঁজবে। কলেজে যেমন লেখাপড়া করছে করবে, তেমন কাজও করবে। সেই টাকা শসার বাড়িতে দিয়ে আসবে। শসার বাবা–‌মায়ের ডাল ভাতের যাতে কোনও সমস্যা না হয় দেখবে। নারুমের এই সিদ্ধান্তে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি। এই জন্যই মেয়েটিকে এখন সুন্দর দেখতে লাগছে!‌ একেবারে ঝলমল করছে। মানুষে ভিতরে আলো জ্বলে উঠলে তবেই সে ঝলমল করে। বাইরে থেকে যতই আলো ফেলা যাক কিছু এসে যায় না।  
আমি বললান, ‘নারুম, শসার মোবাইল ফোনটা তুমি রাখো।’‌
নারুম বলল,‘‌আমি কেন রাখব?‌ শসা তো আপনাকে রাখতে দিয়েছে।’‌
আমি হেসে বললাম,‘‌শসা একটা দরকারে ফোনটা আমাকে দিয়েছিল। সে দরকার মিটে গেছে।’‌
নারুম অবাক বলল,‘‌কী দরকার?‌’‌
‘‌তোমাকে ওর সঙ্গে একবার দেখা করিয়ে দেবার দরকার। যাও বাড়িতে একবার ঘুরে, কোর্টে যাও। শসা তোমার জন্য অপেক্ষা করবে।’‌
নারুম নিচু হয়ে আমায় প্রণাম করল। আমি টেনে তুলতে দেখি মেয়েটার চোখে জল। 
আমি হেসে বললাম,‘‌ধুস্‌ পাগলি। আজকালকার প্রেমে হাসি কান্নার কোনও ব্যাপার নেই।’
নারুম চোখ মুছতে মুছতে গাঢ় গলায় বলল,‘‌সাগরদা, শুধু নারুম নয়, আমিও আপনাকে ভালবাসি।’
আমি ওর কঁাধে হাত রেখে বললাম,‌‘‌আমরা আসলে সবাই সবাইকে ভালবাসতে চাই নারুম। কখনও পারি, কখনও পারি না। যখন পারি পৃথিবীটা খুব সুন্দর হয়ে যায়। যখন পারি না সব তেতো লাগে। যাও ,সাবধানে যাও।’
‌ নারুমতে ছেড়ে আমি ফট করে একটা ট্যাক্সি ডেকে ফেললাম। ড্রাইভারকে বললাম,‘‌পার্কস্ট্রিট।’‌
পার্কস্ট্রিটে আমি একটি মেয়ের অফিসে যাচ্ছি। এই মেয়েটির সঙ্গে আমার আজ বিকেলে দেখা হওয়ার কথা। দেখা হওয়ার কথা কপিশপে। আমি আগেই তার কাছে যাচ্ছি। মেয়েটিকে চমকে দেব।
সত্যি স্রোতস্বিনী আমাকে দেখে চমকে গেল।
‘‌তুমি আমার অফিসের ঠিকানা জানলে কী করে!‌’‌
আমি আর স্রোতস্বিনী বসে আছি ফুটপাথের একটা চায়ের দোকানে। পার্কস্ট্রিটে বড় বড় সব রেস্টুরেন্ট, কফি শপ, টী জংশনের ছড়াছড়ি। নামী দামী সব। গাড়ি করে আসতে হয়। এখানে ফুটপাথের চায়ের দোকানে বসার মজাই আলাদা। নিজেকে কেমন রাজার মতো লাগে। দুজনেই বসে আছি ব্যাটারির খোলে। কাগজের কাপে চা নিয়েছি। সত্যি কথা বলতে কী ফুটপাথে বসে চা খাবার কথাটা স্রোতস্বিনীই বলেছে। তার অফিস থেকে খানিকটা এগিয়ে আসতে হয়েছে। স্রোতস্বিনীর মতে পৃথিবীতে ফুটপাথ চায়ের যদি কখনও কম্পিটিশন হয়, এই চা নাকি মেডেল পেত।  ‘‌স্রোতস্বিনী, তোমার খেয়াল নেই, সেদিন কফিশপে বিল মেটানোর সময় তোমার একটা ভিজিটিং কার্ড ব্যাগ থেকে পড়ে গিয়েছিল। সেই কার্ড আমি তুলে নিই। এই দেখ।’‌
স্রোতস্বিনী বলে,‘‌থাক দেখাতে হবে না। এই সহজ পথটা আমার মাথায় আসেনি।’‌
আমি বললাম,‘‌আজ বিকেলে আমাদের দেখা হওয়ার কথা ছিল। তুমি বলেছিলে, সেই কফিশপে যেতে। গিয়ে আমাক মত জানাতে। তাই তো ‌?‌ আমি একটু আগেই চলে এসেছি।’‌
স্রোতস্বিনী হেসে বলল,‘‌তোমার  যে একটা চমকে দেওয়ার ব্যাপার থাকবে এত আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তবে আজ আমিও তোমাকে চমকে দেব।’
‘‌কীভাবে‌?‌’‌
স্রোতস্বিনী বলল,‘‌সেটা দেখতে পাবে। ‌যাক, ফাইনালি কী ঠিক করলে?‌’‌
আমি বললাম,‘‌আমার এখানে সাততাড়ি ছুটে আসা দেখে বুঝতে পারছো না?‌ আমি তোমার কিড্‌ন্যাপের কাজটা করব। এবার বলো কাকে কিডন্যাপ করতে হবে। ‌আজ বিকেল থেকেই কাজ শুরু।’‌
স্রোতস্বিনী একটু চুপ করে থাকল। বলল,‘‌ভাল করে ভেবে বলছো?‌’‌
আমি বললাম,‘‌অবশ্যই ভাল করে ভেবে বলছি।’‌
স্রোতস্বিনী বলল,‘‌পুলিশের ঝামেলা যদি হয় ‌?‌’
‌আমি এবার  হেসে ফেললাম। বললাম,‘‌পুলিশ আমার কাছে এখন আর কোনও ব্যাপার নয়। থানায় গেলে আমার হবে সাগর আদর।’‌
স্রোতস্বিনী চোখ গোল করে বলল,‘‌সাগর আদর!‌ সেটা কী?‌’‌
আমি বললাম,‘‌সে আছে। হলে দেখতে পাবে। এখন কাজের কথায় এসো।’‌
স্রোতস্বিনী চোখ সরু করে বলল,‌‘‌তোমার রেমুনারেশন কত?‌ পয়সা ছাড়া কাজ করাব না।’‌
আমি আর এক কাপ চা নিলাম। দুটো লেড়ো বিস্কুট নিলাম। এই বিস্কুটের থেকে ভাল বিস্কুট আর কিছু হয় না। তারপর বললাম,‘‌আমার পারিশ্রমিক একটু বেশি। দিতে পারবে?‌’‌
স্রোতস্বিনী বলল,‘‌কাজ করে দিতে পারলে, অবশ্যই দেব। অ্যামাউন্ট বলো।’
‌আমি একটু দম নিয়ে বললাম,‘‌অ্যামাউন্ট নয়, একটা মেয়েকে পার্ট টাইম কাজের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। মেয়েটির বয়ফ্রেণ্ড একজন পকেটমার। সে পুলিশের কাছে সারেন্ডার করেছে। অন্যায়ের সাজা নিয়ে শুদ্ধ হতে চায়। এতে মেয়েটি খুব খুশি। ছেলেটি যতদিন জেলে থাকবে ততদিন সে রোজগার করে তার বৃদ্ধ বাবা–‌মাকে  খাওয়াবে। আমি তোমার কাজ করে দেব তার বদলে তুমি মেয়েটিকে দেখবে। রাজি?‌’‌
স্রোতস্বিনী আমার চোখের দিকে অল্প কিছুক্ষন স্থির ভাবে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। নিচু গলায় বলল,‘‌রাজি। এবার মাথা ঠাণ্ডা করে কাজের কথা শোনও।’‌
স্রোতস্বিনীর কাজের কথা ইনিয়ে বিনিয়ে না বলে, এরপর সিনেমা–‌থিয়েটারের মতো পরপর যা ঘটল সেটা সংক্ষেপে বলাই মনে হয় ঠিক হবে।
আজ সন্ধ্যে পাঁচটার কিছু পরে রাসবিহারীর একটি ফিল্ম এডিটিং স্টুডিওতে আমি কিডন্যাপের কাজ সম্পন্ন করেছি। 
স্রোতস্বিনী আমাকে দিয়ে যে ছেলেটিকে কিডন্যাপ করালো তার নাম সুমন। সাতাশ –‌আঠাশ বছরের এক ঝরঝরে, বুদ্ধিমান যুবক। কলেজ ইউনিভার্সিটি পেরোনোর পরীক্ষায় এই ছেলে ফিজিক্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হত। তিনটি ভাল চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। চাকরিতে তার মন নেই। সে ফিল্মমেকার হবে। কিন্তু হতে পারছে না। সিনেমা তোলবার জন্য তাকে টাকা কে দেবে?‌ দুটো শর্ট ফিল্ম তুলেছে। একটির নাম সুশ্রী, অন্যটির নাম বিশ্রী। সুমনের বাবা ছেলের এই সিনেমা কর্মকাণ্ডে খেপে আগুন। তিনি ছেলেকে বলে দিয়েছেন সুশ্রী এবং বিশ্রীকে দু’‌কাঁধে নিয়ে সে যেন নিজের পথ দেখে। এত বড় গাধা পুত্রকে তিনি আর বাড়িতে দেখতে চান না। সুমন সেটাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিজের ভাগ্য অন্বেষন করবে। ভাগ্য ঠিক না, সিনেমা বানানোর অর্থ অন্বেষন। সে তার প্রেমিকা স্রোতস্বিনীকে জানিয়ে দিয়েছে ‌‘‌বিদায়’‌। তার এই টলোমলো জীবনে সুন্দরী, গুণী স্রোতস্বিনীকে নিয়ে বিপদে ফেলতে চায় না। স্রোতস্বিনী তাকে অনেক বোঝোনোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। ছেলে যোগাযোগই প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।
সুমন কোথায় আছে শুধু বলে দিল না আমাকে ভাড়া দিয়ে ট্যাক্সিতে তুলে দিল স্রোতস্বিনী। ছ’‌টার মধ্যে তাকে যোধপুর পার্কের একটা জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। স্রোতস্বিনী ফিরে গেল তার অফিসে। নারুমের জন্য কাজ সে অনায়াসে জোগাড় করে ফেলবে। তাদের অফিসের সেলস ডিভিশনে এই ধরনের বেশ কিছু কাজের সুযোগ আছে।
বেশি বু্দ্ধিমান ছেলেরা বেশি বোকা হয়। সুমনও তাই।
মোবাইলে স্রোতস্বিনী ফটো দেখিয়ে দিয়েছিল বলে চিনতে কোনও অসুবিধে হয়নি। বাইরে দঁাড়িয়ে সিগারেট টানছিল।
‘‌আপনি সুমন?‌’‌
‘‌হ্যাঁ, আপনি কে?‌’‌
‘‌আমি কেউ না। আপনি বিশ্রী নামে একটা শর্ট ফিল্ম বানিয়েছেন ?‌’
‘‌হ্যাঁ, আপনি কে ‌?‌’‌
‘আমি কেউ নই। আমার একজন চেনা প্রোডিউসার আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।’‌
সুমন বলল, ‘‌কবে?‌’
‘‌আজ এখুনি।’‌
সুমন বলল, ‘‌আজ তো হবে না। আমি এডিটিং এর কাজে ব্যস্ত। তাছাড়া এসব কাজে আগে অ্যাপয়েনমেন্ট করতে হয়।’‌
আমি এবার নিশ্চিন্ত মুখ করে বললাম,‘‌খুব ভাল। আমিও তাই চাইছিলাম। আমারও আজ কাজ আছে। তাছাড়া আমার একজন নিজের ডিরেক্টর আছে। এই ফাঁকে তার সঙ্গে দেখা করিয়ে দিই। এসব কাজ ফেলে রাখলেই হাতছাড়া। উনি আবার তিনমাস পরে ডেট দেবেন। আচ্ছা চললাম ভাই‌।’‌
আমি মুখ ঘুরিয়ে তিন পা চলে আসবার পরই পিছন থেকে ডাক। আমি জানতাম ডাক আসবে।
‘‌এই যে ভাই, একটু দাঁড়ান। ওপরে স্টুডিওতে বলে আসি।’
বাকিটা সামলেছে স্রোতস্বিনী। যোদপুর পার্কে রেজিস্ট্রি অফিসে সুমনকে বিয়ে করতে সে পনেরো মিনিট নিল। সুমনের পক্ষে আমি সাক্ষী হলাম। আগে থেকে সব ঠিক করা ছিল। বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর হতচকিত সুমনকে স্রোতস্বিনী তার গলার হারটা খুলে দিয়ে বলল,‌‘‌এই নাও এই দিয়ে তোমার সিনেমা তৈরির কাজ শুরু কর। এর মধ্যে সমস্যার কিছু নেই। বহু বড় ফিল্ম ডিরেক্টরের ছবি বানানো শুরু হয়েছে বঊয়ের গয়না ভাঙিয়ে। সেই জন্যই তো তোমাকে সিনেমার গল্পের মতো কিডন্যাপ করে এনে বিয়ে করলাম। এবার যাও।’‌
সুমন শান্ত গলায় বলল,‌‘‌না, আমরা কোথাও কফি খাব।’
সুমন আর স্রোতস্বিনী কফি খেতে যাওয়ার জন্য আমাকে খুব জোরাজুরি করেছিল। আমি রাজি হইনি। নবদম্পতির‌ মাঝে আমি কে?‌
আমার আজ আর কোনও কাজ নেই। আজ রাতে লেকে গিয়ে শুয়ে থাকব। রাত, চাঁদ, শীত শীত বাতাসের সঙ্গে কথা বলব। তাদের কাছে জানতে চাইব,পৃথিবীটা এত সুন্দর কেন?‌ নাকি সুন্দর নয়, আমাদের মায়া ‌?‌ যদি মায়া হয় তাই হোক। মায়ার মধ্যেই বাকিদিনগুলো বেঁচে থাকব।  (শেষ)‌ 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

One Response

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nayak 1

মুখোমুখি বসিবার

মুখোমুখি— এই শব্দটা শুনলেই একটাই ছবি মনে ঝিকিয়ে ওঠে বারবার। সারা জীবন চেয়েছি মুখোমুখি কখনও বসলে যেন সেই কাঙ্ক্ষিতকেই পাই