সাগর, আই লাভ ইউ (পর্ব ৩)

1024

আমার বুক ধুকপুক করে ওঠে। কী করব?‌ ছুটে পালাব?‌

দুই হুমদো টাইপ লোক মিছিল থেকে বেরিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি পিছিয়ে একটা দেয়ালের গায়ে সিঁটিয়ে গিয়েছি। একে বলে ফায়ারিং স্কোয়ার্ড সিনড্রোম। ফায়ারিং স্কোয়ার্ডে দাঁড়ালে মানুষ সিঁটিয়ে থাকে। কখন গুলি ছুটে আসবে তার জন্য অপেক্ষা। অনেক সময় ভয় পেলে মানুষের এই দশা হয়। মনে হয় ফায়ারিং স্কোয়ার্ডে দাঁড়িয়ে আছি। সিঁটিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। একেই বলে ফায়ারিং স্কোয়াড সিনড্রোম। সেদিন আমার যা হয়েছিল। খুবই ভয় পেয়েছিলাম।

বিকেলের আলো আমাকে বিভ্রান্ত করেছে। বেগুনি পার্টিকে আমি  হলুদ দেখেছি। তাদের পতাকার রঙ চিনতে ভুল হয়েছে।  হলুদ পার্টির হয়ে শ্লোগান পর্যন্ত দিয়ে ফেলেছি। এক পার্টির মিছিলের সামনে অন্য পার্টির জয়ধ্বনি। ভয়ংকর কান্ড। এর শাস্তি কী?‌‌‌ আমি নিশ্চিত এর একটাই শাস্তি। পিটুনি। ঝান্ডা পিটুনি। যে ডান্ডায় ঝান্ডা লাগানো থাকে তাই দিয়ে মার। শুনেছি এই ধরনের পিটুনিতে শরীরের বাইরে যতটা না লাগে, ভিতরে লাগে তার থেকে অনেক বেশি। ওপরে সব ঠিক থাকে, ভিতরে হাড় ঝুর্‌ঝুরে হয়। ঝান্ডায় নীতি আর্দশ মিশে থাকে বলে এই অবস্থা। নীতি আর্দশ বাইরের বিষয় নয়, ভিতরের বিষয়। সে যেমন মেরুদন্ড শক্ত করে, তেমন মেরুদন্ড ভেঙেও দেয়।

মুখ ফিরিয়ে দেখি, আমার পাশের সেই মাঝবয়সী পালিয়েছে। ওই লোকই খানিক আগে  শ্লোগান দেওয়ার জন্য আমাকে উত্তেজিত করছিল। বলেছিল, ‘ভাই বাঁচতে চান তো জয়ধ্বনি দিন.‌.‌.‌জয়ধ্বনি দিন।‌’‌ আমার ইনটিউশন বলল, কথাটা ঠিকই বলেছে। মন্দ লোকের হাত থেকে বাঁচতে গেলে তার জয়ধ্বনি করতে হয়। আদিঅনন্ত কাল থেকে এই সিস্টেম চলছে। রাজারাজরার আমল থেকে এখনকার আইটি আমল পর্যন্ত। জয়ধ্বনিতে সব গুন্ডা কুপোকাত। আমি দেরি করিনি, গলা  ফাটিয়ে জয়ধ্বনি দিয়েছি। সেটা যে ভুল হয়ে গেছে আমি বুঝে উঠবার আগে, পাশের লোকটা বুঝতে পেরেছে এবং কেটে পড়েছে।

হুমদো দুজন এগিয়ে আসছে দ্রুত। আমি মন ফোনে রেবাকে ধরলাম।

রেবা বিরক্ত গলায় বলল,‌ ‘কী হয়েছে?‌ কাজের সময় ফোন করছ কেন?‌ তোমাকে না কাজের সময় ফোন করতে বারণ করেছি।’‌

আমি শান্ত গলায় বললাম‌,‘আজ একটা স্পেশাল অকেশনে তোমাকে ফোন করেছি রেবা।’‌

রেবা গলায় ঝাঁঝ নিয়ে বলল,‌‘‌তোমার স্পেশাল, নরমাল কোন অকেশনেই আমার ইন্টারেস্ট নেই।’‌

আমি রেবার ধমক গা করলাম না। রেবা এরকমই। বললাম,‘আজ ‌বিদায় নেবার জন্য ফোন করেছি।’‌

রেবা  বিরক্ত হয়ে বলল,‌‘‌কোথা থেকে বিদায়?‌’‌

আমি বললাম, ‘‌এখনই সিওর হয়ে বলতে পারছি না। এটা নির্ভর করছে, ঝান্ডা পিটুনির ইনটেনসিটির ওপর। ইনটেনসিটি যদি হেভি হয়, তাহলে ইহজগত থেকে বিদায় নিতে হতে পারে। কম হলেও মিনিমাম দশদিন হাসপাতালে শয্যাশায়ী। তোমার চেনা কোনও হাসপাতাল আছে?‌ থাকলে একবার কথা বলতে পারও। আমার চাহিদা তেমন কিছু নেই। ট্রিটমেন্ট তেমন না হলেও চলবে, কিন্তু নার্স সুন্দরী হতে হবে। রেবা, আমার কুষ্ঠিতে লেখা আছে, সুন্দরীর হাতে মৃত্যু। ঝান্ডা পিটুনিতে যদি মৃত্যুবরণ করতে হয় তাহলে সুন্দরীর হাতেই করব। কুষ্ঠির সম্মান তো রাখতে হবে। ‌হবে না?‌’‌

রেবা অবাক হয়ে বলল,‌‘‌কী পিটুনি বললে!‌’‌

আমি মন ফোনে গর্বের হেসে বললাম,‌‘‌ঝান্ডা পিটুনি। খুবই উঁচুদরের পিটুনি। বেশি লোকের কপালে এই পিটুনি জোটে না। আমার জুটতে চলেছে। আমার জন্য উইশ রেখও রেবা। তোমাদের মতো ভালমানুষদের শুভেচ্ছা, আমার মৃত্যুর পথের পাথেয় হোক।’‌

রেবা থমথমে গলায় বলল,‌‘‌তোমাকে কে মারবে?‌’‌

আমি উৎসাহ নিয়ে বললাম,‌‘বেগুনি পার্টির গুন্ডারা। তবে আমি তাদের দোষ দিই না। আসলে এর জন্য দায়ী বিকেলের আলো। সেই আলো আমাকে রঙ চিনতে বিভ্রান্ত করেছে। বেগুনি রঙকে আমি হলুদ চিনেছি। তবে বিষয়টা ইন্টারেস্টিং হয়েছে। বিভ্রান্তির কারনেই আমি এখন ঝান্ডা পিটুনি খেতে চলেছি।’‌‌‌

রেবা ঠান্ডা গলায় বলল, ‘‌তোমার রসিকতা শোনবার মতো সময় আমার নেই সাগর। অনুগ্রহ করে তুমি আমাকে বিভ্রান্ত করবার চেষ্টা করবে না। তুমি তোমার বিকেলের আলো নিয়ে বসে থাক। আমাকে বিরক্ত করবে না।’

কথা শেষ করেই সেদিন মন ফোন কেটে দিয়েছিল রেবা। এসবের মধ্যেই হুমদো দুই গুন্ডা উঠে এসেছিল ফুটপাথে।  দুজনের হাতেই ঝান্ডার লাঠি। এরা কি দুজনে মিলে মারবে?‌ ডবল পেটানি?‌ আমি চোখ বুজি । আমি এখন কী করব?‌ আমার এক পকেটমার বন্ধু গেলু আমাকে বলেছে, ‘‌পাবলিক যখন কেলাবে, তখন ব্যথা কম লাগবার নানা টেকনিক আছে। আপনে কি সেই টেকনিকের কথা জানতে চান সাগর ভাই?‌’‌

আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম,‘‌ পাবলিক আমাকে মারবে কেন গেলু!‌ আমি কি তোমার মতো পকেটমারি করি?‌ মার খাবে পকেটমারেরা। আমি কেন খাব?‌’‌

গেলু বিড়িতে লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল। বলল,‌‘‌এইটা কেমন কথা হল সাগরভাই?‌ আপনে একটা বুদ্ধিশুদ্ধি সম্পন্ন মানু্য, এই ভুলটা আপনে কেমন করে করলেন?‌ সব পকেটমারের কি প্যাঁদানি হয়? হয় না। চারপাশ দ্যাখেন না কত ধনী পকেটমার বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়? মানু্ষ গলায় মালা দেয়।‌ পুলিশ সেলাম ঠোকে। আমরা যারা গরিব পকেটমার তারাই কেবল থাকি লাথি ঝাঁটার মধ্যে।’‌

আমি হেসে বলি,‌‘‌আহা, আমি তো পকেটমারই নই গেলু। না ধনী, না গরিব।’‌

গেলু বলে, ‘‌তাতে কী?‌ সৎ মানুষ মিথ্যা কারণে প্যাঁদানি খায় না?‌ হামেশাই খায়। ওসব তক্ক বাদ রাখেন। যা বলি শোনেন, কখন কাজে লাগবে তার ঠিক নাই।’‌

আমি হেসে বলি, ‘‌আচ্ছা, বল।’‌

গেলু বিড়ি ফেলে দিয়ে বলল,‌‘‌সাগরভাই, যখন মাইর হবে, আপনে মনে মনে গান ধরবেন। দেখবেন মাইরের মুখে দাঁড়িয়ে গানের সুর আপনার মনে নাই। সে আসে, একটু আসে না। ফসকে ফসকে যায়। আপনে তারে ধরবার চেষ্টা করবেন। ধরতে পারবেন না। মাইরের কথা মনে থাকবে না। মাইর হবে মাইরের মতো, আপনের সুর ধরা হবে আপনের মতো। মনে মনে ছুটাছুটি লাগবে।’‌

গেলুর গান থিওরি কি এখন অ্যাপ্লাই করব?‌ কোন গান গাইব?‌ আমার তো একটা গানই মনে পড়ছে। বারবার মনে পড়ছে। মাথার মধ্যে ঘুরতে শুরু করেছে।

‘‌‌ডাউন দ্য ওয়ে হোয়ার নাইটস আর গে\‌ এন্ড দ্য সান সাইন ডেলি অন দ্য মাউনটেন টপ\‌ আই টুক আ ট্রিপ অন আ সেলিং শিপ্\‌ এন্ড হোয়েন আই রিচড জামাইকা আই মেড আ স্টপ।’‌

 কী করব আমি?‌ শুধু গান মনে পড়ছে না, গানের সুরও যে মনে পড়ছে। হায়রে!‌

‘‌আহা, পথের প্রান্তে ওই সুদূর গাঁয়ে \‌যেথা সময় থমকে থাকে বটের ছায়ে\‌ আহা সন্ধ্যাদীপ জ্বালে তারার টিপ\‌ কত ফুলের গন্ধে মোর মন মাতায়।’‌

কী হবে আমি তো সুর ভুলতে পারছি না!‌

‘‌বাট আই অ্যাম স্যাড টু সে আই অ্যান অন মাই ওয়ে\ ওনট বি ব্যাক ফর মেনি আ ডে’‌‌

এ তো ভয়ংকর অবস্থা। গেলুর থিওরি কাজ করছে না। মাথার মধ্যে কোন গান ঢুকে পড়লে সহজে বেরোতে চায় না। কী বিপদ!‌

‘‌আহা চিন্তাহীন সেই সু্খের দিন\‌ কেন আমার চিত্তে আজও বাজায় বিন্‌\‌ সেই শালের বন মোর ঘরের কোন\‌ তারি নিবিড় বক্ষে মন অন্তরীণ।’‌

থাক যা হবার হোক। আমি এই গানের সুর ভুলব না। এই গানের জন্য হাজার মার খেতে রাজি আছি। আচ্ছা, গলা ছেড়ে গানটা ধরলে কেমন হয়?‌

 ঠিক এই রকম সময় বেদম আওয়াজ। একটা নয়, পর‌পর তিনটে। আমি চমকে চোখ খুললাম। ধোঁয়ায় ভরে যায় চারপাশ। হুমদো দুজন চিৎকার করে ওঠে।

‘‌বোম্‌, বোম্‌। শুয়োরের বাচ্চারা মিছিলে বোম্‌ মেরেছে। পালা, পালা.‌.‌.‌।’‌

আমার কথা ভুলে, পিছন ফিরে রুদ্ধশ্বাসে দৌড় লাগায় তারা।

আমি বুঝতে পারি বোমা আমাকে এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দিল। মনে মনে বোমাকে প্রণাম জানাই এবং ধীরে সুস্থে হাঁটতে থাকি।

কাঁদুনে মেয়ের হাত তিনেকের মধ্যে পৌঁছে আমি দুটো চমক খাই। এক নম্বর চমক হল, বিকেলের আলো আমাকে বিভ্রান্ত করতে পারেনি। মেয়ের হাতের রুমাল সত্যি নীল।  ‌আর দ্বিতীয় চমক হল, মেয়েটিকে আমি চিনি। একটু চিনি না, বেশি চিনি। তমালের দূর সম্পর্কের বোন। নাম সৃজনী। সৃজনীকে আমি দেখেছিলাম দু’‌বছর আগে। ওই একবারই দেখা। তারপরেও বেশি চিনে রেখেছি। এইটাই মজা। কাউকে কাউকে অল্প দেখাতেই অনেকটা চেনা যায়।

সৃজনী চাপা রঙের ছিপছিপে মেয়ে। মুখে ধারালো সৌন্দর্য। এখন যেন আরও সুন্দর হয়েছে। জিনস আর টপে একেবারে তরবারির মতো ঝকঝক করছে। ও কি আমায় চিনতে পারবে?‌

আমি কিছু বলবার আগেই সৃজনী উচ্ছ্বসিত হয়ে এগিয়ে এল।

‘‌আরে সাগরদা, সাগরদা তুমি!‌’‌

আমি খুশি হয়ে বললাম,‘‌সৃজনী তুমি আমাকে চিনতে পেরেছ?‌’‌

সৃজনী হেসে বলল,‘‌না, পারিনি।’‌

কান্নার মধ্যে হেসে এই মেয়ে তার রূপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মেয়েদের এই একটা সুবিধে। হাসি বা কান্না দুটোতেই তাদের সৌন্দর্য বেড়ে যায়। এই কথাটা বলে আমি একবার রেবার কাছে জোর বকুনি খেয়েছিলাম।

‘‌এ আমার কী ধরনের ভাবনা সাগর! ছিঃ।‌ মেয়েরা কত দুঃখ কষ্টে চোখের জল ফেলে তুমি জানও না?‌ মেয়েদের চোখের জল মানে মজা?‌ তোমার ঠাট্টা?‌’‌

আমি বলি,‌‘‌রেবা, কথাটা আমি এভাবে বলিনি।’

রেবা তেড়েফুড়ে ওঠে। বলে,‘‌তুনি কীভাবে বলতে চেয়েছ আমার জানার দরকার নেই। তুমি আগে কথা উইড্র করো।’‌

আমি বলি,‘‌আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি উইড্র করছি।’‌

সেদিন  পিছিয়ে গেলেও আমি বিশ্বাস করি, হাসি কান্না দুটোতেই মেয়েদের সুন্দর দেখায়। হাসির সৌন্দর্যে থাকে আনন্দ, কান্নায় থাকে বিষাদ। বিষাদের সৌন্দর্য হয় তীব্র। সেই তীব্রতা বেশিক্ষণ সহ্য করা যায় না। হয় চোখের জল মুছিয়ে দিতে হয়, নয় মুখ ঘুরিয়ে নিতে হয়।

আমি বললাম, ‘‌সৃজনী, তুমি এখানে কী করছ?‌’‌

সৃজনী হাতের নীল রুমাল দিয়ে চোখ মুছল।  তারপর যা বলল, তাতে আমি চমকে ঊঠলাম।‌‌

 
চলবে

গত পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/novel-by-prachet-gupta-2/

প্রথম পর্বের লিংক – https://banglalive.com/novel-by-prachet-gupta/

Advertisements
Previous articleডুগডুগি (পর্ব ৭)
Next articleহোয়াটসঅ্যাপে এটা পড়ে বিশ্বাস করেছেন নাকি ?
প্রচেত গুপ্ত
জন্ম : ১৪ অক্টোবর, কলকাতায়, ১৯৬২ সালে | কলকাতার গায়ে বেড়ে ওঠে শহরতলি বাঙুর এভিনিউতে স্কুলের পড়াশোনা, বড় হওয়া | স্কুলজীবন থেকেই খেলাধুলার সঙ্গে লেখালেখির নেশা | প্রথম লেখা মাত্র ১২ বছর বয়সে আনন্দমেলা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় | তারপর বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লেখা চলতে থাকে | গোড়ার দিকে ছোটদের জন্য লেখাতেই বিশেষ ঝোঁক ছিল | স্কুল শেষ হলে স্কটিশ চার্চ কলেজ | এরপরই একটা দুটো করে বড়দের জন্য লেখার শুরু | অর্থনীতিতে স্নাতক হয়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসাবে বেছে নেওয়া | বিভিন্ন পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হতে থাকে নিয়মিত | প্রথম উপন্যাস 'আমার যা আছে' প্রকাশিত হয় আনন্দলোক পত্রিকায়, ২০০৪ সালের পূজাবার্ষিকীতে |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.