গলনাঙ্ক

474

পেয়েছি অলিভিয়া তাদেরই একজন হবে, নইলে ওর নাম শুনে আমার গলা শুকিয়ে যাবে কেন?’
‘এর বেশি অলিভিয়া সম্পর্কে কিছু মনে নেই আপনার?’ আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল গর্বী |
‘আমি মনে করতে চাই না! অলিভিয়া, হিতৈষণা, ভ্রমর, মৃত্তিকা এরা আমার অতীত | এদের সবার বৃশ্চিকের মত দাঁড়া ছিল গর্বী | ফার্স্ট ইয়ারের মোহরেরও ওই রকম দাঁড়া আছে!’

‘ভ্রমরই সেই মেয়েটা রঘুবীরদা যে আত্মহত্যা করেছিল? ফিল্ম স্টাডিজের ভ্রমর?’

‘ভ্রমর? হ্যাঁ, ভ্রমরই তো!’

(আত্মহত্যা একটা ব্ল্যাক ম্যাজিক | সে আত্মহত্যা করেছিল রঘুবীরের জন্য | মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত সে জানত সে আত্মহত্যা করছে রঘুবীরের জন্য | সেদিন সে বারবার অনুরোধ করেছিল রঘুবীর চৌধুরিকে তার সঙ্গে শেষ বারের মতো একবার দেখা করতে, রঘুবীর চৌধুরী কিছুতেই রাজি হননি | তখনই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আত্মহত্যা করবে |

বিকেল থেকেই ভীষন ঝড় বৃষ্টি হচ্ছিল সেদিন | সারাদিন ভ্রমর বাড়ি থেকে বেরোয়নি | রাত নটা নাগাদ মাকে চূর্নির বাড়ি যাচ্ছে বলে বেরিয়ে আসে সে | মা বাধা দিয়েছিল, একে ঝড় বৃষ্টি, তার ওপর রাত হয়ে গেছে, মা তাকে কিছুতেই ছাড়ছিল না, কিন্তু ঝগড়া-ঝাঁটি জেদাজেদি করে সে পথে নামে এবং যোধপুর পার্ক পৌঁছোয় | বেল বাজায় রঘুবীরের দরজায়, রঘুবীর দরজা খুলে ধরতে ভ্রমর বিনা প্রশ্নে ঢুকে পড়ে উঠে যায় দোতলায়, সেখান থেকে ছাদে ! রঘুবীর ছুটে আসে পেছন পেছন | ছাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভিজতে থাকে ভ্রমর, রঘুবীর দাঁড়িয়ে থাকে তার থেকে কয়েক হাত দূরে, ক্রমাগত বলতে থাকে, ‘কেন এসেছো ভ্রমর? কি চাও তুমি? আমি বলছি তুমি ফিরে যাও | আমি বলছি তুমি ভুল করছো! তুমি ফিরে যাও, আমরা পরে কথা বলব!’ আর ভ্রমর এসব কথা একটাও শুনতে পায় না, সে দুহাত বাড়িয়ে কাঁদতে থাকে | বজ্র-বিদ্যুৎ সহ ঝড়-য্হ্ঞ্ঝা বৃষ্টিপাত তো চলছিলই পুরো দিন ব্যাপী কিন্তু এই সময় হঠাৎই বহু গুণ বেড়ে যায় বজ্রপাতের সংখ্যা | লহমায় লহমায় বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে আকাশে | দানবীয়, ধাতব আর্তনাদে ভরে যায় চতুর্দিক, সমগ্র আকাশ হয়ে ওঠে অঘটনা-ব্রতী | অগ্নি কটাক্ষে ঝলসে যেতে থাকে চরাচর | আর ভ্রমর দেখে কখনও তার দুপায়ের ফাঁক দিয়ে, তার কাঁধের ওপর দিয়ে, মাথার ওপর দিয়ে, কখনও তার পুরো শরীরকে প্রদক্ষিণ করে একের পর এক অসন্তুষ্ট, ঈর্ষান্বিত বিদ্যুৎ রেখা তাকে ছুঁতে ছুঁতে না ছুঁয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, যেন কিলবিলে সাপ চোখের সামনে ধেয়ে আসছে দেখে সে ছুটে গিয়ে রঘুবীরকে ধরার চেষ্টা করে, আষ্টেপৃষ্ঠে — এবং রঘুবীর লাফিয়ে সরে যায় | তখন ছাদের দরজা থেকে দূরে তারা দুজনেই ছুটে বেড়ায় এদিক ওদিক, যেন মিলনের আগের রোমাঞ্চকর ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা খেলছে, তখন ইথারের মধ্যে নীল শিরা-উপশিরার বিশৃঙ্খল তরঙ্গগুলোকে উপেক্ষা করে রঘুবীর শুধু পালাতেই থাকে, পালাতেই থাকে ভ্রমরের কাঙাল, অধীর, স্পর্শকামী হাত অতিক্রম করে | সে কিছুতেই এমনকি তর্জনীটুকুও ছোঁয়াতে পারে না রঘুবীরের গায়ে | আর তার পিঠ পর্যন্ত লম্বা চুল পুড়ে যায় সম্পূর্ণত, মাথা থেকে পোড়া গন্ধ বেরোতে থাকে এবং তখনও সে দেখে রঘুবীরের চোখ থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসছে ভয়! কি নিষ্পাপ ভয়!

সে দুঃখ পায় এইবার — রঘুবীর যে তাকে সত্যিই ভয় পায় এইবার মেনে নেয় ভ্রমর | এই স্বতঃসিদ্ধ ভয়ের প্রকোপে রঘুবীর যে কোনওদিনই তাকে কাঙ্ক্ষিত আলিঙ্গন ফিরিয়ে দেবে না, কোনওদিনই ভ্রমরের আত্মমগ্ন, আত্মনিষ্ঠ প্রেমকে দেখতে পাবে না — এই গ্লানি নিয়ে সে বার হয়ে আসে যোধপুর পার্কের বাড়িটা থেকে এবং সেই রাতেই নিজস্ব শোকপ্রবাহে নিজের মৃত্যুকে একান্তে অঞ্জলি দেয়! আত্মহত্যা একটা ব্ল্যাক ম্যাজিক | সে আত্মহত্যা করেছিল রঘুবীর চৌধুরীর জন্যই | কিন্তু আত্মহত্যার পরের মুহূর্তে সে আর কিছু জানে না এ সম্বন্ধে! জানে না-র থেকেও বড় কথা জানতে পারে না‚ জানাতেও পারে না | পৃথিবীর কোনও ভাষা, শব্দ, বোধ, স্মৃতি, চিন্তা বা ভাবনার প্রবৃত্তিই সে সঙ্গে নিয়ে যায়নি | মৃত্যুর পর সে কোথায় আর কিভাবে আছে তার কোনও ধারণাও তার নেই কারণ কারণ-টাও নেই আর ধারণাটাও নেই | যে টাইম বাউন্ড স্পেশে ‘কারণ’ এবং ‘ধারণা’ তৈরি হয়, উদ্ভব হয় সেই স্পেশ এবং টাইমের ধারণার ভেতর ভ্রমরও নেই, এসবের সঙ্গে তার কোনও সংস্রবও নেই! এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে রঘুবীর চৌধুরী বলে কেউ আছে কিনা, তাকে ভ্রমর মনে রেখেছে কিনা আত্মহত্যার কারণ সহ তার ভ্রমরের জানার উপায় নেই | কিন্তু যদি সে মহাবিশ্ব পার হয়ে যাওয়ার মুহূর্তে একটা স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে যেতে পারত, একটা ভাসমান মুখচ্ছবি সঙ্গে নিয়ে যেতে পারত তাহলে নিশ্চিতভাবেই রঘুবীরের স্মৃতি, রঘুবীরের মুখচ্ছবি নিজের অন্তসারশূন্যতায় বেঁধে নিয়ে চলে যেত সে |)

রঘুবীর চৌধুরীর চোখ জ্বলছে এখন | সে বলল, ‘আপনার তো কিছুই ভুলে যাওয়ার কথা নয় রঘুবীরদা? দাঁড়া গুলোর কথা মনে আছে যখন তখন আপনার সব মনে আছে | যদি ভুলে যেতেন তাহলে মুক্তি হত আপনার, এত রকম ফোবিয়া আর কার্যকর থাকত না আপনার ভেতর! মোহরকে দেখে ভয়াল সাপের কথা মনে হত না! যে ভয় বোধ আপনাকে অপরিণত মস্তিষ্ক করে তুলেছে তার একটা মীমাংসা হয়ে যেত!’

রঘুবীর কাঁপছেন থর থর করে, ‘মনে আছে, মনে আছে অলিভিয়াকে, সোসিওনজির ছাত্রী ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি! অলিভিয়াও ওই একই ভুল করেছিল ভ্রমরের মতো | ভ্রমরের থেকে আরও মারাত্মক ছিল অলিভিয়া, হাঁটু দিয়ে চেপে ধরত আমার গলা, পা দিয়ে পেঁচিয়ে ধরত! ‘

(করণের হাত বেঁধে ছিল অলিভিয়া প্রথমে | পিছমোড়া করে | তারপর ড্রয়ার থেকে খুঁজে বের করে স্কার্ফ দিয়ে বেঁধে ছিল চোখ | করণ হাসতে লাগল ‘হে, আই কান্ট সি এনিথিং!’ সে তখন কাতুকুতু দিতে লাগল করণকে | তারপর নিজের ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ নিয়ে গিয়ে ধরল করণের ঠোঁটের ওপর, ‘বলো, এটা কি?’

করণ চুমু খেল কতগুলো সেই আঙ্গুলে‚ চুষল, জিভ বোলালো, থাম্ব ফিঙ্গার, রাইট লেগ!’

তখন অলিভিয়া নিজের বাকি শরীর বাঁচিয়ে শুধু স্তনবৃন্ত ঠোঁটের ওপর নামিয়ে আনল, বলল, ‘তোমাকে বলতে হবে এটা কোন দিকের নিপল!’

ঠোঁট দিয়ে নেড়েচেড়ে, মুখ ঘষে করণ বলল, ‘এটা ডান দিক, তোমার ডান দিকের নিপলটা বেশি বড়, তোমার ডান ব্রেস্ট-টাও স্লাইটলি বিগার দ্যান দা লেফট ওয়ান!’

‘সব জানে হতচ্ছাড়া!’ বাংলায় বলে উঠল অলিভিয়া!

‘হে, হোয়াট ডিড ইউ সে?’ জানতে চাইল করণ |

‘তোমার চোখ বেঁধে দিয়ে কি লাভ? তুমি তো আমার সব জানো করণ’!

‘চোখ দিয়ে দেখি না সুইটি পাই, মন দিয়ে দেখি!’
‘এখন তোমার হাত বাঁধা খুলে দিলে কি করবে তুমি?’

‘ঝাঁপিয়ে পড়ব তোমার ওপর!’

সে দেখল করণের পুরুষাঙ্গ কাঁপাছে তিরতির করে |

‘খুলে দিই?’

‘না, উঠে এসো আমার ওপর |’ ফোর প্লে খুব পছন্দ করণের |

সে উঠে গেল না করণের ওপর, যদিও তার যোনিপথ থেকে ঘন তরল ক্রমাগত ক্ষরণ হয়ে লেপ্টে যাচ্ছিল দু উরুতে, সে শুয়ে পড়ল করণের পাশে |

করণ বলল, ‘কি হল?’

‘এরকমই থাকি না একটু | এই যখন সব হতে পারে, তুমিও চাইছো আমিও চাইছি, তখন পড়ে থাক এটা এক পাশে!’

করণ বলল, ‘তোমার নিশ্চয়ই একটা ক্র্যাক পট লাভ অ্যাফেয়ার ছিলই, তাই না অলিভিয়া? বলো না কিছুতেই!’

‘কেন বললে?’

‘যৌনতার সময় মানুষ যদি হঠাৎ হঠাৎ বিষন্ন বোধ করে, যদি হঠাৎ করে উদাস হয়ে পড়ে তাহলে ধরে নিতে হবে তার একটা হিস্ট্রি আছে |’

‘তুমিও তো আগে কত প্রেম করেছো, ফিজিক্যাল হয়েছো কত মেয়ের সঙ্গে, তোমার মধ্যেও তাহলে বিষণ্ণতা আছে নিশ্চয়ই!’

‘যদি কোনও ছেলে প্রথম জীবনে একটা মধ্যবয়স্কা নারীর প্রেমে পড়ে এবং তার সঙ্গে বিছানায় যায় তাহলে তার ক্ষেত্রে প্রেম এবং যৌনতার সংজ্ঞা চিরতরে পাল্টে যায় অলিভিয়া!’

‘তাই বুঝি? তুমি কোনও আন্টির প্রেমে পড়েছিলে টিন এজে? বলোনি কখনও?’

‘আ ফ্যাট, ডিভোর্সী অফ ফোর্টি ফাইভ! আমার কলেজের অধ্যাপিকা | পার্সী | অঞ্জলি ওয়াটারওয়ালা!’

‘গুড গুড!’ সে মজা করে বলার চেষ্ট করল কথাটা কিন্তু মজাটা এল না কন্ঠস্বরে | উঠে বসে খুলে দিল করণের চোখের বাঁধন, হাতের বাঁধন এবং করণ উঠে এল তার শরীরের ওপর, সে বলল, ‘আচ্ছা, যদি উল্টোটা হয়? যদি একটা টিন এজের মেয়ে প্রেমে পড়ে তার তুলনায় অনেক বড় অধ্যাপকের?’

‘মেয়েদের ক্ষেত্রে সেটা খারাপ কিছু না, প্রথম জীবনেই সে একটা ম্যাচিওরড প্রেমের স্বাদ পায় | আর অধ্যাপকের সঙ্গে প্রেম মানে ফ্লুরোসেন্ট আলো, ভেতরের অন্ধকারে জ্বলে থাকে সব সময় |’

‘ছেলেদের আরে মেয়েদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা কেন?’

‘এই যে তুমি নেকেড হয়ে শুয়ে সরল শিশুর মতো এত প্রশ্ন করছো আমাকে সেটা করতে পারতে যদি আমি বয়েসে তোমার থেকে দশ বছরের ছোট হতাম? আর নারী পুরুষের প্রেমের কেমিস্ট্রিটা তো ওটাই | নারীর সব প্রশ্ন তো পুরুষের কাছে? প্রশ্ন তৈরি হওয়াই তো সম্পর্ক’ অনেক অনেক প্রশ্ন!’

ঠিক এই সময় ফোন বাজল অলিভিয়ার – ‘পৃথা’ | পৃথার সঙ্গে না মাসে ছ-মাসে একদিন কথা হয় হয়তো তার, লাস্ট মনসুমে সে, পৃথা আর কয়েকজন বন্ধুবান্ধব মিলে খান্ডালা গেছিল | তারপর হার্ডলি দেখা হয়েছে | কলকাতার পুরনো বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে বেশ কয়েকজনই এখন বম্বেতে | দেখা হলে তখন সবার মধ্যেই একটা অতিরিক্ত উৎসাহ দেখা যায় উইক এন্ডে মিট করার, পার্টি করার, লং ড্রাইভে যাওয়ার, কিন্তু ওই পর্যন্তই! যে যার কাজে এত ব্যস্ত যে প্ল্যান করা হয় গন্ডা গন্ডা কিন্তু বাস্তবে যোগাযোগ ঘটে খুবই সামান্য | সে ফোন ধরল পৃথার করণের শরীরের নিচ থেকে বাত বাড়িয়ে, ‘হাই চিক! হোয়াটস আপ্?’

‘আমি এখন কোথায় দাঁড়িয়ে কথা বলছি বলত অলিভিয়া?’

সে কান পাতল, ‘হেই, ইউ আর ইন ক্যাল?’

‘ইয়েস বেবি? কি করে বুঝলি?’

‘ এত হর্নের আওয়াজ আর কোন সিটিতে আছে?’

‘ধ্যাৎ,একটা যা হোক গেস করে দিল্লি, হায়দ্রাবাদে এর থেকেও বেশি স্ট্রিট ক্যাকোফোনি!’

‘কিন্তু বাস পেটানোর আওয়াজ আর কোথায় পাওয়া যাবে বল?’

‘আমি এখন শ্রীরাম আর্কেডের সামনে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাচ্ছি!’

‘ইস! সত্যি?’

‘অ্যান্ড গেস হুম আই মেট জাস্ট নাউ?’

‘কে? কে?’

‘রঘুবীর চৌধুরী!’

‘রিয়ালি?’ করণের দিকে তাকিয়ে হাসল অলিভিয়া |

‘তিন সত্যি,গ্র্যান্ডের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন | কি ভীষণ হ্যান্ডসাম দেখাচ্ছিল সোনালী আলোয় ওঁকে বিশ্বাস করতে পারবি না! আমি গিয়ে দাঁড়াতে মনে হল জল্লাদ এসেছে ওঁকে ধরতে এত ভয় পেলেন! ভীষণ হাসি পাচ্ছিল আমার, ইচ্ছে করছিল আরও ভয় পাইয়ে দিই | তোর নাম করলাম, হি অলমোস্ট পিড!’

‘ কোনও চেঞ্জ নেই’ কোনও চেঞ্জ হয়নি লোকটার?’ করণ উঠে গেল তাকে ইশারা করে টয়লেটে |

‘কোন চেঞ্জ? অফকোর্স!’

‘তাই?’ কৌতূহলে উঠে বসল অলিভিয়া |

‘একটা মেয়ে, বাইশ তেইশের একটা মেয়ে এসে মিট করল ওকে, ওর জন্যই দাঁড়িয়ে ছিলেন | মেয়েটা এসে দাঁড়াতে মনে হল রঘুবীর চৌধুরীর ধড়ে প্রাণ এল | অ্যান্ড দে ওয়াকড অ্যাওয়ে টুগেদার |’

‘যাবাব্বা!’

‘ ইস, সত্যি! এই একটাই পিস আছে গোটা ভারতবর্ষে! রঘুবীর চৌধুরী!’ পৃথা চিৎকার করে উঠে বলল |

‘পৃথা, তুই রঘুবীরের ফোন নম্বরটা আমাকে প্লিজ প্লিজ জোগাড় করে দে!’

‘উফঃ, খুব এক্সাইটেড দেখছি?’

‘ফোন করব লোকটাকে, মাঝে মাঝে ফোন করে ধমকাবো!’ দুজনেই হা, হা করে হাস্তে লাগল তারা ফোনের দু-প্রান্তে | ফোন ছেড়েছে কি ছাড়েনি বেল বাজল ফ্ল্যাটের | একটা হাউসকোট চড়িয়ে অলিভিয়া দরজা খুলে দেখল পাশের ফ্ল্যাটের শিবাঙ্গী গোড়কর | ভীষণ ভয় পেয়েছে শিবাঙ্গী কিছু একটা কারণে, সদ্য বিবাহিত তরুণী, স্বামী পুলিশে আছে | স্পেশাল টাস্ক ফোর্স! প্রায়ই ওর হাজব্যান্ড রাত বিরেতে কোন অ্যাসাইনমেন্টে বেরিয়ে গেলে শিবাঙ্গী তার ফ্ল্যাটের দরজা ধাক্কায়, ‘আমার ভীষণ ভয় করছে জানো অলিভিয়া! ঠিক মতো ফিরে আসবে তো বল?’ সে তখন ফ্রি থাকলে শিবাঙ্গীকে ভেতরে এনে বসায়, কফি অফার করে | সান্টাক্রজ এয়ারপোর্টের একদম কাছেই এই কমপ্লেক্সটা | ব্যালকনিতে বসে কথা বলতে বলতে দুজনে রাতের আকাশে প্লেনের ওঠা নামা দেখে | শিবাঙ্গী তখন শুধু নিজের ভয়ের কথাই বলে যায় ক্রমান্বয়ে, ‘বম্বে মে হাম কো হর বাত পর ডর লাগতা হ্যায় অলিভিয়া!’ শিবাঙ্গী নাগপুরের মেয়ে, বিয়ের পর বম্বে এসেছে |

সে বলে, ‘তুমি এসব ভয়টয় ছাড়ো তো, একটা ভাল কোর্সটোর্স জয়েন করো, বসে বসে থেকো না বাড়িতে, ডু সামথিং দ্যাট ফিটস ইউ!’

‘হাঁ, কর না তো চাইয়ে!’ খুব মাথা নাড়ে শিবাঙ্গী তখন | এখন শিবাঙ্গীকে দেখে সে ভাবল আবার বোধহয় ওর হাজব্যান্ড কোথাও এনকাউন্টার করতে গেছে | অজিত গোড়করকে দেখলে কিন্তু কেউ বলবে না ছেলেটা কথায় কথায় বন্দুক চালাবার অনুমতি পেয়েছে খোদ সরকারের থেকে | ভীষন হাসিখুশি আর গল্পবাজ | মদ খায় না, সিগারেট খায় না! সে শিবাঙ্গীকে বলল, ‘বলো শিবাঙ্গী?’

‘দুটো বিল্ডিং পরে আগুন লেগেছে অলিভিয়া!’ বলে উঠল শিবাঙ্গী! ‘খুব বড় আগুন |’

ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে সে ছুটে গেল জানলায়, আগুন দেখতে পেল না কিন্তু প্রচু পাকিয়ে পাকিয়ে ওঠা কালো ধোঁয়া দেখতে পেল | বৃহাণ মুম্বাই-এর প্রায় দশ-বারোটা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি চোখে পড়ল তার | কমপ্লেক্সের লোকেরা অনেকেই নিচে নেমে গেছে | তলায় প্রচুর লোক জড়ো হয়েছে | এদিকটা ঘন জনবসতিপূর্ণ | বেডরুমে এসে খবরটা দিল সে করণকে | করণ বলল, ‘তোমার আগুনে ভয় লাগে?’

‘ভয় লাগার ব্যাপারই নয় | আমি ভয় পাই আর না পাই আগুন আগুনের কাজ করবে | আগুনের সঙ্গে শুধু সেফটির সম্পর্ক !’

পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল করণ | সে আর একবার জানলার ধার থেকে ঘুরে এসে বলল, ‘এতদূর ছড়াবে না বলো’
জিভে শব্দ করল করন, ‘ডিনার খেতে বাইরে যাবে? দেন গেট রেডি |’

বিছানার পাশে রাখা টেবিল থেকে বাদামের কৌটোটা তুলে নিয়ে কটা বাদাম মুখে ফেলল সে, ‘যেখানে আগুন জ্বলে সেখান থেকে দূরে যাওয়ার কোনও মানেই হয় না! বাড়িতেই থাকি?‚” |

করণ তার হাউসকোটের দড়িতে হাত দিল, খুলে ফেলল হাউসকোটটা, ওর শরীর আবার ভয়ংকর জেগে উঠেছে, সে মেলে ধরল দুটো পা, করণ প্রবেশ করল তার ভেতরে, আবার দমকলের ঘন্টি বাজার আওয়াজ পেল অলিভিয়া, এক পাশে দাউ দাউ জ্বলছে আগুন, বোঝাই যাচ্ছে পুড়ে যাচ্ছে অনেক কিছু, ঘর-বড়ি, আসবাবপত্র, সম্পদ, জীবনের সহায়ক যত জিনিসপত্র, হয়ত পুড়ে যাচ্ছে জলজ্যান্ত মানুষও, একদম কাছেই এসব ঘটছে, সত্যি সত্যি ঘটছে, টিভিতে, যত বড় ডিজাস্টারই হোক না কেন দেখতে দেখতে মনে হয় বোধহয় সেটা ভারচুয়ালি ট্রু — এ সেরকম নয়! বেডরুমের জানলা থেকেই এখন আকাশ কালো করা ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার, তবু এই সত্যের মাঝখানে দাঁড়িয়েই উভয়ে মিলনটাকে সার্থক করার জন্য প্যামপার করছে পরস্পরকে | করণ পাগলের মত চুমু খাচ্ছিল তাকে, অলিভিয়া ভাবল, ‘নাহ, এই দেড় বছরে করণের তার ওপর টান ভালবাসা বিন্দুমাত্রও কমেনি! আর সে এটাও ভাবল করণের ওপর টান ভালবাসা এখন অনেক বেড়েছে তার | এখন সে জানে কাউকে জোর করে ভালবাসা যায় না! ভাল না বাসতে পারাটা কোন অপরাধও নয়! করণের সঙ্গে যে সম্পর্ক তার সেখানে বেদনার, জটিলতার, কোনও স্থান নেই | রঘুবীর চৌধুরীর কাছে প্রেম চেয়ে না পাওয়ার যন্ত্রণা এখন মুছে গেছে অলিভিয়ার মন থেকে | একটা সময় ‘রঘুবীর’ ‘রঘুবীর’ করে পাগল হয়ে গেছিল অলিভিয়া | প্রত্যাখ্যাত হতে হতে হতে আত্মধ্বংসের পথে চলে যাচ্ছিল সে | তখন যদি তাকে বিদেশে না পাঠিয়ে দিত বাড়ি থেকে তাহলে কি হত বলা যায় না! প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে একা নির্বান্ধব জীবনে সে রঘুবীরের জন্য কাঁদত | মেল করত, ফোন করত! কোন সাড়া দিত না রঘুবীর | দীর্ঘতম একটা বছর ধরে নিজের ছোট্ট মুখে অতিকায় একটা অজগর সাপ গিলে নেওয়ার মত করে সেই যন্ত্রণা হজম করেছে সে, একাকী!

এখন সে সব ভাবলে তার হাসি পায় প্রবল! মনে হয় কি ছেলেমানুষই না ছিল | এখন আর বাবা, মা, জেঠুদের ওপর তার কোনও রাগ নেই | কলকাতা শহরটার প্রতিও তার কোনও বিদ্বেষ নেই | যায়, ঘুরে বেরিয়ে চলে আসে, প্রাণান্ত করে কিছু ভোলার চেষ্টাও করতে হয় না | মনেই পড়ে না আসলে | পৃথাকে যে বলল ‘নাম্বারটা দিস, রঘুবীর চৌধুরীকে ফোন করব, ধমকাবো!’ এটা কেন বলল সে জানে, পৃথাকে বোঝালো পৃথার মতো তার কাছেও রঘুবীর একজন হাস্যকর মানুষ | সত্যি সত্যি অলিভিয়া কোনওদিন যোগাযোগ করবে না রঘুবীর চৌধুরির সঙ্গে! আজ ভাবলে খারপই লাগে, নির্লজ্জের মতো, উন্মাদের মত নগ্নিকা সে মাটিতে ফেলে দিয়ে রঘুবীরকে, বুকের ওপর চেপে বসেছিল! কামড়ে, খিমচে একাকার করে দিয়েছিল লোকটাকে | রঘুবীর বলেছিল, ‘পারবে না! পারবে না!’ সে পারেনি, একবারও পারেনি রঘুবীরকে ভেতরে নিতে!

করণ ডাকছে তাকে, ‘আসব অলিভিয়া? আসব তোমার ভেতরে?’

অলিভিয়া সড়া দিল ‘এসো, এসো!’

‘চেপে ধরো আমায় |’

‘ধরেই আছি করণ!’ বলল সে | আর তখনই তার হঠাৎ মনে হল রঘুবীর চৌধুরীর কথা করণকে সে কক্ষণো বলেনি! আর তার খারাপ লাগল এই ভেবে যে করণের হাত, চোখ বেঁধে দিয়ে করণের সঙ্গে সেক্স করার মধ্যে এখন আর কোনও ফ্যান্টাসি নেই! না, এটা সে আর কখনও করবে না!

একজন অসহায়, ভীত, সংকুচিত কেন্নোর মত গুটিয়ে যাওয়া মানুষকে কবজা করে ফেলার, বাধ্য করার স্মৃতি পুরোনো ক্যালেন্ডারের পাতার মত ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে অলিভিয়া প্রাণপণ জড়িয়ে ধরল করণকে |)

গত পর্বের লিংক : http://www.banglalive.com/Magazine/Dharabahik/7352

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.