সব কিছু পালটে প্রায় যেন মূর্তিমান সঞ্জয় হয়ে উঠেছেন রণবীর!

আত্মজীবনী লেখার বোধহয় দুটো স্টাইল হয়। একটা হল, লিখতে গিয়ে গোপন যে সব ব্যাপার সেগুলো চেপে যাচ্ছি পুরো। জীবনের যে অংশটা সবাই জানে, সেটা লিখেই তার ওপরে চিপকে দিচ্ছি ‘অটোবায়োগ্রাফি’ লেবেল।

বাংলা ভাষায় এর খাপে খাপ উদাহরণ বলতে পারেন সুনীলের লিখে যাওয়া ‘অর্ধেক জীবন’ বই। পুরো বইয়ের কমা দাঁড়ি ফুলস্টপ ঘেঁটে এমন কিছু পাবেন না আপনি, যেটা পড়তে গিয়ে চমকে উঠবেন বা যেটা নিয়ে কোথাও কোন বিতর্ক হতে পারে।

আর ঠিক এর একশো আশি ডিগ্রি উলটো মুখে দাঁড়িয়ে আছে সেই লেখাগুলো, যে আত্মকথা পড়তে গেলে ধুমধাড়াক্কা ধাক্কা খাবেন মাথায়যেগুলোর পাতায় পাতায় এমন সব কথা, যে মামলা কিংবা তুমুল সব কনট্রোভার্সি শুরু হয়ে গেল বলে

এর উদাহরণ কেমন জানেন? সেটা জানতে হলে খণ্ডে খণ্ডে তসলিমার আত্মজীবনী পড়তে থাকুন প্লিজ।

সঞ্জয় দত্তের জীবন নিয়ে সিনেমা হচ্ছে শোনার পর প্রথম যে কৌতূহলটা হয়, যে এর টাইপটা কী হবে? অনেক অনেক গোপন কথা ফাঁস করে দেবে এটা? নাকি এটা নিরামিষ আর গা বাঁচানো কোন একটা বকচ্ছপের খেলার মতো কিছু?

ছবি শেষ হয়ে যাওয়ার পর বুঝলাম, এটা বোধহয় নতুন একটা স্টাইল। যেখানে কেতা থাকবে এমন একটা, যে দ্যাখ, কিচ্ছু লুকোচ্ছি না, বলে দিচ্ছি সব। কিন্তু ভেতরে ভেতরে স্টাইল হল, যেগুলো আমি গোপন রাখতে চাই, সেগুলো নিয়ে যথারীতি একটা কোন শব্দ সেখানে শুনতে পাবে না কেউ।

ছবির ট্রেলারে এরকম একটা ডায়ালগ আপনি পেয়ে যাবেন যে, সঞ্জয়ের থেকে জানতে চাওয়া হল যে, আপনে বিবি কি ইলাভা তুম আউর কিতনে আউরত কে সাথ শোয়ে হো? উত্তরটা দেখবেন ট্রেলারেই দিয়ে দেওয়া আছে যে, প্রসটিটিউটদের না ধরলে হিসেবটা দাঁড়াবে তিনশো আটের মতো!

এখন এটা থেকে আপনার একটা এক্সপেকটেশন তৈরি হতে পারে যে, সঞ্জয়ের সঙ্গে কোথায় কার কোন অ্যাফেয়ার ছিল, সেটা বোধহয় ছবি থেকে কিছুটা হলেও জানতে পারবেন আপনি।

২৩ বছর আগের একটা আনন্দলোক খুলে দেখছি সেখানে লেখা আছে এই নামগুলো একের পর এক। টিনা মুনিম, রতি অগ্নিহোত্রী, কিমি কাতকর, ফারহা, র‍্যাচেল রুবেন, মাধুরী দীক্ষিত, রবিনা ট্যান্ডন। লেখা আছে এই লাইনটা যে, ‘একের পর এক নারীকে ভালবেসেছেন সঞ্জয় দত্ত, বিনিময়ে পেয়েছেন শুধুই নিঃসঙ্গতা।’ [আনন্দলোক, ১২ আগস্ট, ১৯৯৫]।

কিন্তু এরকম অ্যাফেয়ার তো অনেক দূরের কথা ভাই। ছবিটা দেখতে গিয়ে আপনি দেখবেন সঞ্জয়ের প্রথম দুই বৌকে ওর জীবন থেকে ঝেড়ে-পুঁছে কেটে সাফ করে দিয়েছে ছবিটা! প্রথম বৌ ছিল রিচা শর্মা, বিয়ে হয়েছিল ’৮৭ সালে, ব্রেন টিউমারের জেরে তিনি চিরতরে বিদায় নেন ’৯৬তে এসে। পরের বৌ রিয়া পিল্লাই, বিয়ে হয় ’৯৮তে, আর বছর সাতেক একসঙ্গে থাকার পর সেই সম্পর্কের নটেগাছটা মুড়নো হয় ২০০৫ সালে পোঁছে

ভাবতে পারেন, সিনেমায় এই দুটো বৌয়ের একটা বৌও নেই!

আছে শুধু তৃতীয় বৌ, মানে মান্যতা যাঁর নাম। বয়সে যিনি স্বামীর থেকে কুড়ি বছরের ছোট। বর যখন বৌয়ের সামনে এটা বলছে যে নিজের বৌ ছাড়াও তিনশো আট জনের সঙ্গে শুয়েছি আমি, আর বেশ্যা-টেশ্যা ধরতে গেলে সংখ্যাটা আরও বেশি, তখন সেই সিনে মান্যতার মুখটা একটু আপনি খেয়াল করে দেখবেন ভাই প্লিজ।

দেখবেন বরের দিকে এমন মুগ্ধ নেত্রে তাকিয়ে রয়েছে যে, এই সংখ্যাটা জানতে পেরে জীবন যেন ধন্য হল ওর।

যে বায়োপিক একটা লোকের জীবন থেকে তাঁর প্রথম দুটো বৌকে কেটে বাদ দিয়ে দ্যায়, সে তাঁর বাকি অ্যাফেয়ার কোন আক্কেলে দ্যাখাতে যাবে, বলুন? ‘রুবি’ (অভিনয়ে সোনম কাপুর) নামের কারুর সঙ্গে প্রেমের একটা রিলেশন ছবিতে দ্যাখান হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে তো আবার চরম সব রগড় করে এটা বোঝান হল যে, সেক্স-টেক্স করার চেয়ে সারা রাত্রি মদ্যপানে ভেসে যাওয়াই তরুণ হিরোর বেশি ফেভারিট কাজ!

যে মহিলাকে সঞ্জয়ের স্ত্রী হিসেবে দেখতে পাবেন স্ক্রিনে, সেই মান্যতাকে নিয়েও এখানে কথা রয়েছে কিছু। সঞ্জয় আর মান্যতার রিয়্যাল লাইফ ছবি যদি দ্যাখেন, তাহলে দেখতে পাবেন দুজনের বয়সের মাঝখানে ওই কুড়ি বছরের ফারাকটা জ্বলজ্বল করে জ্বলছে সেখানে বেশ। মজা হল, ‘সঞ্জু’ ছবিতে কিন্তু সেরকম কোন ফারাক-টারাক পাবেন না খুঁজে কোথাও। লুক দেখে মনে হবে, দুজনের বয়স যেন কম-বেশি আর পাঁচটা কাপ্‌লের মতো প্রায়!

আর হ্যাঁ, তার সঙ্গে এটাও দেখে অবাক হবেন, নিজের বরকে দোষমুক্ত প্রমাণ করতে সর্বক্ষণ এই মান্যতার (দিয়া মির্জা) কী আকুল চেষ্টা চলে! কখনও সঞ্জয়ের জীবনীকার উইনি ডিয়াজের (অভিনয়ে অনুষ্কা শর্মা) কাছে পৌঁছে দিয়ে আসছে জেলবন্দী বরের রেডিও শোয়ের অডিও রেকর্ডিংটুকু, আবার কখনও নিজের বরের ক্যারেকটার যে ‘হার্মলেস’ আর নিষ্কলুষ প্রায়, সেটা নিয়ে সার্টিফিকেট জুগিয়ে যাচ্ছে জীবনীকারের কাছে!

কোন মিল নেই হয়তো, কিন্তু এই জায়গাগুলো দেখতে গিয়ে আমার খালি মনে পড়ে যাচ্ছিল অ্যানাস্টেশিয়া স্টিল নামের সেই মেয়েটির কথাসেই ‘ফিফটি শেডস অফ গ্রে’। ধনপতি ছেলেটা যেখানে কন্ট্রাক্ট পেপারে সই করিয়ে কিনে নিচ্ছে কচি মেয়েটার মন আর ইচ্ছে-টিচ্ছে সবযেখানে ছেলেটা যাই করুক না কেন, মেয়েটাকে সব কিছুতেই বলতে হবে, হ্যাঁ। সব কিছু মুখ বুঁজে সইয়ে নিয়ে পুরো জীবন সমর্পণে বাধ্য হবে কচি বয়সের দাসী-বাঁদি কন্যে

ছবিতে ওয়ান নাইট স্ট্যান্ডের গল্প একটা দ্যাখান হল বটে। কিন্তু সেটা তো এমন ভাবে দ্যাখান যে,দেখতে গিয়ে মনে হচ্ছিল, সঞ্জয় কী নিষ্পাপ আর নাদান ছেলে ভাই! সাদা মনে ওর যেন কাদা নেই কো কোন। নিজে চাইছে না কিছু করতে। কিন্তু বন্ধুর গার্লফ্রেন্ড এসে নাইটি খুলে সিডিউস করতে শুরু করলে পরে, তাঁর সঙ্গে সেক্স না করে কী আর করে ও!

একটা ব্যাপার ভাল লাগল যে, ছবিটা যে ঠিক কী কারণে তৈরি, ছবির শুরুতেই সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন পরিচালক হিরানিবাবু নিজে। কমিক একটা সিন দেখিয়ে সাফ এটা শুনিয়ে দিয়েছেন যে, দুনিয়ার সবাই যখন একটা লোককে টেররিস্ট বলে লেবেল মারতে ব্যস্ত, তখন সেই লোকটা যে আসলে টেররিস্ট নয়, সেটা হাইলাইট করে দেখিয়ে দেওয়ার জন্যেই তৈরি হচ্ছে ছবিটা।

যেমন ছিল সেই আট বছর আগে তৈরি ‘মাই নেম ইজ খান’ (২০১০)। এটা যেন তারই একটা ফ্র্যাঞ্চাইজি পার্ট!

সিনেমায় দ্যাখান হচ্ছে নিজেকে না-টেররিস্ট প্রমাণ করতে খুঁজে পেতে লেখক ধরে এলাহি সব কাণ্ড করে তাঁকে দিয়ে নিজের গুণে-ভরা জীবনকথা লিখতে বসালেন সঞ্জু। এখন এই বই লেখার ব্যাপারটাকে পালটে ফেলে তার বদলে সিনেমা তৈরির ব্যাপার যদি বসিয়ে নেন তো দেখতে পাবেন, ছবি বানানোর আলটিমেট গোল ব্যাপারটা জলের মতো স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে আপনার কাছে।

এবার শুনুন ছবি দেখে কী কী জানতে পারবেন আপনি।

ছবি দেখলে আপনি জানতে পারবেন যে, আন্ডারওয়ার্ল্ডের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত সঞ্জয় ঠিকই। কিন্তু সে সব নিছক ভয়ের চোটে প্রাণ বাঁচাতে করা। তারপর বাবার থেকে সাহস পেয়ে দুষ্টু লোকগুলোকে মুখের ওপর সোজাসুজি সত্যি কথা শুনিয়ে দিতে বাধে নি ওর কিছু!

ছবি দেখলে আপনি জানতে পারবেন যে, হানিফ আর সমীর নামে দুই প্রোডিউসারের থেকে ‘একে ফিফটি সিক্স’ রাইফেল ও হাতে পেয়েছিল ঠিকই। কিন্তু এই রাইফেল ও নিয়েছিল বাবরি মসজিদের দাঙ্গার পর জনরোষের হাত থেকে বাবার প্রাণ আর বোনেদের মান বাঁচাবে বলে!

ছবি দেখলে এটাও আপনি জানতে পারবেন যে, অচেনা লোককে ঘায়েল করতে সঞ্জয়ের অভ্যেস হল, হঠাৎ করে সেই লোকটির অণ্ডকোষ টিপে দেওয়া!

আর ছবির স্ক্রিপ্ট এত সুকৌশলে লেখা যে, দেখবেন আপনার মনে একবারও এটা প্রশ্ন আসবে না যে, এই যা যা এখানে বলা হচ্ছে, এগুলো সব সত্যি কথা কিনা!

বুঝতে পারবেন না এটা যে, একই বাড়িতে একসঙ্গে থেকেও কী করে মা নার্গিসের ক্যান্সারের রোগযন্ত্রণা একেবারে অজানা রয়ে গেল সঞ্জয়ের কাছে। মায়ের অসুখের খবর শুনে সঞ্জয়ের মন ভেঙে গেলে ওর অভিনয়ে তার এফেক্ট পড়তে পারে। তাই পরিকল্পনা করে ওর মা আর বাবা এই খবরটা লুকিয়ে গেছেন, এরকম একটা ব্যাখ্যা আছে স্ক্রিনে। কিন্তু সত্যি ওঁদের পরিবার কি সুসংহত এত? যেখানে অভিনয়ের ফোকাস বজায় রাখার স্বার্থে এমন একটা কটু সত্য দিনের পর দিন চেপে রেখে দেওয়া যায়?

বিশেষ করে যখন এটা দ্যাখান হচ্ছে যে, ছেলে সারা রাত বাইরে মদ আর আনুষঙ্গিক নিয়ে ফুর্তি করার পর ভোরবেলা বাড়ি ফিরছে এটা দেখেও বাবা সুনীল দত্ত (অভিনয়ে পরেশ রাওয়াল) বুঝতে পারছেন কিছু!

মানে লজিকটা ঠিক কী? কিশোর ছেলে সারা রাত বাইরে থেকে ফুর্তি করলে ধরতে পারছে না কেউ আর এর ফলে পরের দিনের অভিনয়েও এফেক্ট পড়ছে না কিছু। শুধু মায়ের শরীর খারাপের কথা জানতে পারলেই অভিনয়ের তেরোটা বেজে যাবে? এটা কোন যুক্তি হল কিনা, হিরানি আপনি বলুন প্লিজ।

কিন্তু ওই যে বললাম না? এমন চূড়ান্ত সব দৃশ্য রচেছেন ডিরেক্টর, আর আবেগ নিয়ে খেলেছেন এমন চরম ভাবে যে, এসব জিজ্ঞাসা-ফিজ্ঞাসা ছবি দেখতে গিয়ে সব হাওয়া হয়ে যাবে আপনার।

যখন ‘কর হর ময়দান ফতে’ গানটা হবে ছবিতে, তখন দেখবেন গায়ে কাঁটা দিতে শুরু করেছে রীতিমতো। ড্রাগ খেয়ে ভেসে যাওয়া লাফাঙ্গা ছেলেটাকে মনে হচ্ছে মনের জোর দেখিয়ে দেওয়া তুমুল এক হিরো আইকন বলে! এরপর যখন দেখবেন এই গানটার সঙ্গে নাচের তালে প্রয়াত মা নার্গিসের (অভিনয়ে মনীষা কৈরালা) সঙ্গে পা মেলাচ্ছে সঞ্জয়, তখন টের পাবেন সামলাতে না পেরে চোখের কোল দিয়ে জল বের হয়ে আসছে আপনার।

এই যে ছবিতে একটা মোমেন্ট তৈরি করে আপনাকে কাঁদিয়ে দেওয়া, এটা আসলে যেন একটা ট্রিকসের মতো। নেক্সট সিনে গিয়ে অন্য একটা টানাপড়েন দেখতে গিয়ে চোখের জলটা হয়তো শুকিয়ে গেল, কিন্তু ইমোশনালি আপনি তখন এত অবশ হয়ে গেছেন যে, ছবির আর কিছু নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলার জায়গাতেই থাকলো না আপনার মন

ছবির ফার্স্ট হাফে মায়ের সঙ্গে সঞ্জয়ের ওই মুহূর্তগুলো দেখে যদি চোখে জল এসে থাকে, তাহলে ছবির সেকেন্ড হাফে সেম কিকটা আবার ফেরত পাবেন বাবা সুনীল দত্তের সঙ্গে সঞ্জয়ের মোমেন্টগুলো দেখে। একটা বলছি শুনুন। এখানটায় যেটা ঘটছে, সেটা আবার ‘ফিল্ম উইদিন ফিল্ম’, মানে ছবির মধ্যে অন্য একটা ছবি দ্যাখার মজা।

শুটিং চলছে ‘মুন্নাভাই এম বি বি এস’-এর, আর সেই ছবির শট দিতে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরার সিনে আবেগে চোখে জল এসে যাচ্ছে সঞ্জয়ের। যখন সত্যি সত্যি বহু বছর আগে মুন্নাভাইয়ের এই সিনটা দেখেছিলাম, এত কিছু ফিল করি নি তখন। এখন এই ছবিটার মধ্যে সেই ছবির টুকরো সিনের এমন প্রয়োগ মনে হল ব্রহ্মাস্ত্রের মতো!

যতই তাই মনে হোক না যে, জীবনী-চিত্র বানাবে বলে, অর্ধসত্য বলছে আসলে ছবিটা। এত তীক্ষ্ণ এবং প্রায় নিখুঁত একটা স্ক্রিপ্টের তারিফ না করে থাকি কী করে, বলুন?

আর একটা ব্যাপার খুব ভাল লাগলো জানেন। দেখতে পেলাম, নিউজ মিডিয়াকে ছবিতে একেবারে ন্যাংটো করে ছেড়ে দিয়েছেন হিরানি। দেশে রেজিস্টার্ড সংবাদ মাধ্যমের সংখ্যা হল এক লাখের বেশি। লাভের গুড় খাওয়ার জন্য হাড্ডাহাড্ডি কম্পিটিশন চলে তাদের মধ্যে। আর এটা করতে গিয়ে তারা কী ভাবে পাতার পর পাতা জুড়ে মিথ্যে খবর ছাপে, সেই ব্যাপারটা ছবির হিরোর মুখ দিয়ে ইন ডিটেল পেশ করেছেন তিনি।

কী ভাবে সুকৌশলে স্রেফ একটা কোশ্চেন মার্ক ইউজ করে দিনকে রাত আর রাতকে দিন বানিয়ে দ্যায় নিউজ মিডিয়া, খুব যত্ন করে সেটা দেখলাম দ্যাখান হল ছবিতে। দেখতে গিয়ে মনে হচ্ছিল, ‘পিকে’ (২০১৪) ছবিতে ধর্ম-ব্যবসার মুখোশ খোলার পর এবার কি তাহলে নিউজ-ব্যবসার মুখোশ খোলার পালা?

এর আগেও বেশ কিছু হিন্দি ছবিতে এই ব্যাপারটা এসেছে, মানছি সেটা। কিন্তু আজিজ খানের ‘আন্ডারট্রায়াল’ (২০০৭) বা রামগোপাল ভার্মার ‘রণ’ (২০১০) ছবির কথা এখন আর ক’জন মনে রেখেছেন, বলুন?

ছবিতে সঞ্জয় দত্তের ভূমিকায় রণবীর কাপুরের অভিনয় নিয়ে বলার কিছু নেই। ছবি দেখতে দেখতে সন্দেহ হচ্ছিল, নিজের ভূমিকায় নিজে সঞ্জয় এমন অভিনয় করতে পারতেন কিনা। সে আপনি ‘খলনায়ক’ (১৯৯৩) বলুন, বা ‘মুন্নাভাই’ (২০০৩, ২০০৬) – সব ছবিতেই তো সঞ্জয় কেমন যেন নিজের ছাঁচটা ছেড়ে বেরতে পারতেন না আদৌ। মুখের পেশি স্টিফ হয়ে থাকতো, আর কথা বলার ম্যানারিজমেও তো খুব একটা বদল হতো না কিছু।

আর এখানে? হাঁটা বলুন, চলাফেরার স্টাইল বলুন, কিংবা বলুন কথা বলার ঢং। সব কিছু পালটে প্রায় যেন মূর্তিমান সঞ্জয় হয়ে উঠেছেন রণবীর! তবে খুঁত কি আর নেই? আছে। মেক-আপে একটু খামতি রয়ে গেছে এখানে, দাদা! শুধু চুল-দাড়ি কাঁচা-পাকা করে দিলেই কি একটা বছর পঁয়ত্রিশের ছেলে কখনও আটান্ন বছর বয়সের লোক হয়ে যায়, বলুন? বয়স বেড়ে গেছে বলে দ্যাখান হচ্ছে স্ক্রিনে, কিন্তু বয়স্ক সঞ্জয়ের মুখের মধ্যে কোথাও সময়ের ক্ষতগুলোকে ফুটতে কিন্তু দেখতে পাবেন না আপনি।

কী বলতে চাইছি সেটা আরও পরিষ্কার বুঝতে হলে নেট সার্ফ করে হাল আমলের সঞ্জয় দত্তের মুখের সঙ্গে এই ছবির বয়স্ক সঞ্জয়ের মুখ ম্যাচ করিয়ে দেখুন, তাহলেই বুঝতে পারবেন সেটা।

তবে চরম চমক যেটায় খেলাম, সেটা হচ্ছে ভয়েস! ছবির শুরু থেকে শেষ অবধি অনেকটা জুড়ে সঞ্জয়ের মুখে নিজের জীবন নিয়ে ন্যারেশন আছে টানা! রয়েছে রেডিও শো বক্তা হিসেবে সঞ্জয়ের ইয়া বড় সব স্পিচ। আর গোছা গোছা ডায়ালগ তো আছেই। এগুলো সব যে সত্যি প্রায় সঞ্জয় দত্তের গলার মতোই শুনতে! কে বললেন এত কথা? রণবীর কি পুরো ছবি এইভাবে ভয়েস দিয়ে ডাব করেছেন? নাকি অন্য কোন কৌশল করা হল? ছবি দেখে উঠেছি চব্বিশ ঘণ্টা হয়ে গেছে, কিন্তু এই ব্যাপারটা এখনও আমার কাছে যেন ধাঁধার মতো লাগছে! 

ছবিতে নার্গিস দত্তের ভূমিকায় মনীষা যেটুকু অভিনয় করেছেন, সেটা নিয়ে কোন কিছু বলার ক্ষমতা নেই আমার। বলবো কী করে বলুন, এই মহিলা যে আসলে আমার কম বয়সের ক্রাশ! যখন সবে বড়দের দুনিয়ায় পা রাখতে শুরু করেছি, তখন ইনি আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছিলেন ‘ফরটি টু আ লাভ স্টোরি’ (১৯৯৪) আর ‘বম্বে’ (১৯৯৫) সিনেমা দিয়ে। কাগজ থেকে কেটে কেটে ওঁর ছবি জমাতাম আমি, সেগুলো এখনও আছে! তারপর একটা সময় বুঝতে পারলাম, মেনস্ট্রিম ছবির জগত থেকে প্রায় হারিয়ে যাচ্ছেন উনি। আর হালে তো খবরের কাগজ থেকে জানতে পেরেছি ওঁর ক্যানসারকে হারিয়ে দিয়ে বেঁচে ফেরার কথা।

কিন্তু ওসব কথাবার্তা কাগজে পড়া একরকম, আর চোখের সামনে অন-স্ক্রিন ওঁকে প্যানক্রিয়াস ক্যানসারে ভুগতে-থাকা নার্গিস দত্তের ক্যারেকটার প্লে করতে দ্যাখা আরেক রকম যে! চোখের কোল বসে গেছে। শরীরের যে অংশটুকু পোশাকের আড়াল নেই, সেটা দেখে স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছে সময় কী বিষাক্ত ভাবে ছোবল মেরেছে তাঁকে।

সিনগুলো দেখতে দেখতে শক্‌ড হয়ে যাচ্ছিলাম যেন তাই। মনে হচ্ছিল, একসময় স্বপ্নে দেখতাম যাঁকে, সেই তাঁকে এভাবে দেখতে না হলেই ভাল হত বোধহয়।

সুনীল দত্তের ক্যারেকটারটা শুনেছি প্রথমে নাকি আমির খানকে অফার করা হয়। আমির ‘না’ বলে দেওয়ার পর ওটা আসে পরেশ রাওয়ালের কাছে। এখন এরকম একটা অথর-ব্যাকড রোল পেয়ে সেটাকে যে পরেশ কোন লেভেলে নিয়ে যেতে পারেন, সেটার কিছুটা আন্দাজ তো আপনারা যাঁরা ভদ্রলোককে এর আগে ‘সর্দার’-এর (১৯৯৪) মতো ছবিতে দেখেছেন, জানেন নিশ্চয় সেটা।

ছবির কথা অনেক হল, এবার একটু হল-এর কথা বলি। সাতসকালে মাল্টিপ্লেক্সে শো দেখছি, টিকিটের দাম তখনই দুশো ছুঁই-ছুঁই প্রায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভিড়ে ঠাসা হল ফোন সাইলেন্ট করার কথা আগে থেকে বলে দ্যায় নি কেউ। কিন্তু একটা লোকের ফোন বাজতে শুনতে পাই নি আমি! নিস্পন্দ হয়ে সবাই যেন গিলে খেল পুরো স্ক্রিন!

হিরোর ইমেজ পালিশ করতে তৈরি বলে ছবি হিসেবে হিরানির বাকি সব ছবির থেকে হয়তো পিছিয়ে থাকবে এটা। কিন্তু এ সপ্তাহে একলা দেখে নেক্সট উইকে প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে আবার যে এটা দেখতে ইচ্ছে করছে আমার, আপনি বলুন, সেই ইচ্ছের মুখে লাগাম পরাবে কে?

2 COMMENTS

  1. মনীষার প্রেমে পড়েছিলেন সেটা রিভিউ তে লেখার কি দরকার?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here