ক্রিস্টিনা কিম্বা জুলিয়া

661

অশোক ভাল চাকরি করে | গাড়ি আছে, পিৎজা-চকোলেট মিল্ক লাইক করা মেয়ে আছে, ওয়াক্সিং করা বউ আছে, হিরো হন্ডা গাড়ি আছে, কিন্তু কবিতা লেখাটা ছাড়তে পারেনি | পুরনো জীবনেরও কিছুটা ছাড়তে পারেনি, পুরনো বন্ধুদেরও অনেককেই ছড়েনি এখনও | সময় পেলেই একা একা সদর স্ত্রিট, কিড স্ত্রিট, পারলে শোভাবাজার আহেরিটোলার গলিতে হাঁটে, ছোট গ্লাসে চা খায়, তেলেভাজা খায় | উত্তর কলকাতায় থাকত ছোটবেলায়, — এখন গল্ফ গ্রিন | কিন্তু উত্তর কলকাতার প্রতি টান রয়ে গেছে | এখনও উত্তর কলকাতার গলিতে হাঁটতে গেলে কবিতা আসে — যেমন – ‘লাল সিমেন্টের রকে বাঘ বন্দী খেলে দুই বুড়ো, জানে না বোসেদের ছোট ছেলে ফিরেছে দিল্লি থেকে, রোয়াক ঢেকে দেবে লোহার কাঁটায়… | শেষ হয় না সব সময় | মাঝে মাঝে কফি হাউস যায় | দু মাসে দু-একবার | পুরনো কারুর সঙ্গে দেখা হলে ভাল, নইলে দু-চারজন তরুণ কবিরা আছে, যারা ওকে চেনে, বসে কিছুক্ষণ, কী লিখছো বল, — কবিতাও শোনে | কখনও কেউ কেউ বলে একটু মদ খেতে ইচ্ছে করছে অশোকদা, অশোক বলে চলো অলি পাব-এ |

পুরনো বন্ধুদের একজন চাকরি বাকরি করল না | বলা ভালো পেলো না | অজিত কুণ্ডু | এখনও কবিতার কাগজটা চালাচ্ছে | ওকে বিজ্ঞাপন জোগাড় করে দেয়, কবিতা লিখলে ওই কাগজেই ছাপে, অন্যত্রও ছাপা হয় না এমন নয় | ও জানে এসব হুইস্কির প্রতিদান | তবে দেশ পত্রিকাতেও দুটো কবিতা ছাপা হয়েছে ওর | এখন আর পাঠায় না | ও জানে, কবি হিসেবে ও খুবই সাধারণ | তবু কবিতা সঙ্গটা ছাড়তে পারে না | ভালোই লাগে |

অজিত কুণ্ডুর একটা পৈতৃক সূত্রে পাওয়া মুদি দোকান ছিল | এখন ওটা জেরক্স্-এর দোকান | বই-খাতা পেন পেন্সিলও রাখে | অজিত ওর পত্রিকার জন্য রোজগারের অনেকটাই খরচ করে ফেলে | বিজ্ঞাপনের টাকায় কাগজের খরচ পুরোটা ওঠে না | অশোক সাহায্য করতে চায়, অজিত বলে তোর ক্যাশ নেব না, পারিস তো বিজ্ঞাপন জোগাড় করে দে | অশোক দু-একটা পারে, বেশি পারবে কী করে? ওর কাজটা তো সার্ভে সংক্রান্ত | অঙ্ক-নির্ভর একাডেমিক কাজ | কমার্সিয়াল হাউসের সঙ্গে অতটা চেনাজানা নেই | অশোক তবুও গুড উইশেস ফ্রম ওয়েল উইশার বলে হাফ পাতা-একপাতা বিজ্ঞাপন দিয়ে দেয় | অজিতের জন্যই এখনও কিন্তু তরুন কবিদের সঙ্গে যোগাযোগটা হয় | ওদের সঙ্গে মিশতে ভালই লাগে অশোকের | যে পাঁচ সাতজন তরুণ কবিদের সঙ্গে কথা হয় অশোকের, তাদের মধ্যে কেউ প্রেসিডেন্সিতে মাস্টার্স করছে, কেউ সদ্য চাকরি পেয়েছে স্কুলে, কেউ বেকার, মেক-আপ ম্যান — একটু মেয়েলি | কিন্তু শ্রেণীভেদ নেই | কবিতা এটা পারে, অনেককে একাসনে বসিয়ে দেয় |

একটা শনিবার | রবীন্দ্রসদন চত্বরে কবিতা উৎসব চলছে | অজিত কুণ্ডু কবিতা পড়বে, অজিত ব্রিগেডের তরুণ কবিদের মধ্যে দু’জনেরও কবিতা পড়ার কথা আছে | অশোকের কবিতা পড়ার কথা নেই, তবে অশোকও গেল ওদের সঙ্গে | কথা ছিল, ওদের কবিতা পড়া হয়ে গেলেই একটু বসা হবে |

সৌম্য নামের বেকার ছেলেটি বলল বারে যেতে হবে না, অনেক খরচ, দেড়খানা ভদকার টাকা দিন অশোকদা, মাঠে গোল হয়ে বসে খাব | অশোক দিয়েছিল | সৌম্য মিনারেল ওয়াটারের বোতলে সব রেডি করে রেখেছিল কবিতা উৎসবে ঢোকার আগেই |

তখন সবে শুরু হয়েছে | খোলা আকাশের তলায় একটা মঞ্চ | সামনে প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা | ৩০/৪০ জন লোক বসে আছে, তাঁরা কবিতা পড়বেন, তাঁরা এবং ওদের সঙ্গে আসা প্রিয়জন |

অশোক দেখল দর্শকদের মধ্যে একজন মেম সাহেব | মেম সাহেবটার পাশের দুটো চেয়ারই ফাঁকা | তার মানে ওই বিদেশিনী একাই এসেছে | ওকি বাংলা বোঝে? কিছু কিছু সাহেব দেখেছে অশোক, যেমন দ্যাঁতিয়েন, ওরা অনেকদিন ধরে এদেশে থেকে এদেশের সংস্কৃতি বোঝার চেষ্টা করেন | বেশিদিন থাকা বাসি সাহেব আর টাটকা সাহেব দেখলে আঁচ করা যায় | এটা টাটকা মেম সাহেব | গালে লাল আভা, সোনালি চুল, গলায় কালো মুক্তোর মালা, একটা গাউন, এবং নামাবলী কেটে বানানো একটা টপ | নিউ মার্কেটে পাওয়া যায় | নতুন আসা সাহেব-মেমরা এসব পরে | থিতু হওয়া সাহেব মেমরা এসব খুব একটা পরে না | ঠোঁটে গাঢ় রং লিপস্টিক | চোখের তলায় একটু কালো | মন দিয়ে কবিতা শুনছে |

অশোকের খুব কৌতূহল হল | বাংলা বোঝে এই মেম? কোন দেশ থেকে এসেছে?

বেশিরভাগ কবিই সাহেব মেমদের এড়িয়ে চলে | কারণ ইংরিজি বা বিদেশি ভাষা না জানা | জানলেও ওদের উচ্চারণ বুঝতে পারাটা সমস্যার ব্যাপার | তবে কেউ কেউ খুব ওস্তাদ | অবশ্য এভাবে সরলীকরণ ঠিক নয় | অনেক কবিই ইংরিজিতে পটু, ভাল বলেন, ওরা অবশ্য হাইফাই কবি | ইংরিজি-পটু কবিদের খুব ইজ্জত | ওরা এরকম পিছনদিকের সারিতে বসে থাকেন না | ওদের স্থান সর্বদা সামনের সারিতে |

অশোক মেম সাহেবের পাশের চেয়ারটায় বসল |

একজন কবি কবিতা পড়ছে — ছাগলটা চ্যাঁচাচ্ছে খুব পাল খাবে বলে | পটিয়ে আনছি পাঁঠা এক্ষুনি তা হলে… |

মেম সাহেব মিটি মিটি হাসছে | এই মেম সাহেব এত ভালো বাংলা জানে? পাল খাওয়া, পটানো — এসবও বুঝতে পারছে? পরবর্তী কবির নাম ঘোষণার ফাঁকে অশোক ওকে ইংরিজিতে বলল এক্সকিউজ মি ম্যাডাম, আমার খুব কৌতূহল হচ্ছে জানতে এত ভালো বাংলা কোথায় শিখলেন |

মেম সাহেব অশোকের চোখের দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসল | বলল ‘বিটে!’ পরক্ষণেই বলল সরি | সরির মধ্যে একটা জিজ্ঞাসা চিহ্ন মেশানো ছিল | ‘বিটে’ শব্দটা জার্মানরাই বলে | এক্সকিউজ মি বোঝাতে ব্যবহার করা হয় | এই মেম সাহেব অশোকের প্রশ্নটা বুঝতে পারেনি মনে হচ্ছে | অশোক এবার ভেঙে ভেঙে জিজ্ঞাসা করল হোয়ার কাম ইউ ফ্রম?

মেমসাহেব বললেন — ওহ! ইয়া, বার্লিন |

অশোক আবার জিজ্ঞাসা করল — তুমি কি বাংলা বুঝতে পারো?

মেমসাহেব নো-নো বলে মাথা নাড়িয়ে আবার মন দিয়ে কবিতা শুনতে লাগলেন | এই কবিটি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের স্টাইলে কবিতা পড়ছেন — আর্তনাদ নাদ ব্রহ্ম ব্রহ্মতালু বাজে / আমি তার মন্ত্র সাপ আমি তার বাঁশি … মেমসাহেব মন দিয়ে শুনছেন… | কবিতাটি শেষ হলে অশোকের কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে আস্তে বললেন — উড ইউ প্লিজ এক্সপ্লেন মি দ্য পোয়ম? অশোক মাথা চুলকে বলে লেট ইট ওভার, লেট দিস পোয়েম কমপ্লিট |

অজিত কুণ্ডুর কবিতা পড়া হয়ে যায় | সৌম্য আর অঞ্জনেরও কবিতা পড়া হয়ে গেল | নিজেদের কবিতা পড়া হয়ে গেলে কবিরা বেশিক্ষণ আর কবিসভায় না থাকাটাই নিয়ম | অশোক উঠবে | ওঠার আগে মেমসাহেবকে ছোট্ট করে বলল আউফ উহদারজেহেন | এটা বিদায় সম্ভাষণ | মানে আবার দেখা হবে | অশোক একটু, মানে অল্প জার্মান জানে | ম্যাক্সমুলার ভবনে ভর্তি হয়েছিল, মাস চারেক ক্লাস করেছিল, তারপর আর যায়নি |

মেমসাহেব চোখ বড় বড় করে অশোকের দিকে তাকাল | বলল এর ইসট আউস সেসেন্ট | মানে এটা একসিলেন্ট | জার্মান ভাষায় জিজ্ঞাসা করল তুমি জার্মান জান জেন্টল ম্যান?

অশোক বলল ওহ! নো – নো – নো | ওনলি এ ফিউ ওয়ার্ডস |

মেমসাহেব বলল আই নো ইংলিশ এ ফিউ ওয়ার্ডস | অশোক বলল দ্যাট উইল ডু | কমেন জি… |

অন্যরা সব অশোককে দেখতে লাগল — একটা মেম সাহেবের সঙ্গে গল্প করছে বলে | অশোকের সঙ্গে মেমসাহেব কবি সভার পিছনে গেল | অশোক মেয়েটার কাছে জানল ও একা একাই ইন্ডিয়া ঘুরতে এসেছে | রাজস্থান-মধ্যপ্রদেশ ঘুরে কলকাতা এসেছে | ও শুনেছে কলকাতায় অনেক কবি থাকে, এখানে কবিতার খুব কদর | ও নিজেও কবি | এখানকার কবিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চায় হোটেল হিন্দুস্থান ইন্টারন্যাশনালে উঠেছে | হোটেলে জিজ্ঞাসা করেছিল বাঙালি কবিদের সঙ্গে আলাপ করতে চায় | ওরা বলেছিল বাংলা একাডেমিতে যাও | বাংলা একাডেমিতেই আসছিল, এসে জানল এখানে কবিতা উৎসব চলছে | বসে গেল | বাংলা ভাষার বিন্দুবিসর্গ জানে না, তবু বসে বসে কবিতা শুনেছে | ও বলল ওর নাম ক্রিস্টিনা | বলল তোমরা অমাকে ক্রিস ডেকো | ও বলল ওর এখানে আসা সার্থক, এতগুলো কবির সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল | কী ভালোই না লাগছে | তোমাদের সঙ্গে গল্প করব, তোমাদের সময় হবে?

অশোক বলল নিশ্চই, নিশ্চই… | তবে এটা তোমার জেনে রাখা ভালো, আমরা কেউ বড় কবি নই | যদি বলো তো বড় বড় কবিদের ফোন নম্বর দিতে পারি |

ক্রিস বলল — না, কোনও দরকার নেই, আমিও ছোট কবি |

সৌম্য বলল — মেমসাহেব নিয়ে মাঠে বসব? বরং বারে যাই |

অশোক ভাবল — এতজন মিলে বার-এ গেলে ওর অনেক খসবে | বরং কফিই ভালো |

ওরা বাইরে এল | কয়েকজন মাটির ভাঁড়ে চা খাচ্ছিল | ক্রিস জিজ্ঞাসা করেছিল ওরা কী করছে?

অজিত কুণ্ডু বলেছিল টি ম্যাডাম, ইটিং টি সরি, ড্রিংকিং টি |

টি? ইন দিস কিউট কাপ? লেটস হ্যাভ টি |

অশোক ভাবল বেশ | আরও পয়সা বেঁচে গেল |

কিন্তু চা খেতে খেতে তো বসে গল্প করা যাবে না এখানে | ময়দানে বসলে বেশ হ’ত, এখন ভ্রাম্যমান চা-ওলাও পাওয়া যায় না যারা ছোট কয়লার উনুনে কেটলি চাপিয়ে ঘুরতো |

ভাঁড়ে চা খেয়ে খুব মজা পাচ্ছিল ক্রিস | ধরতে অসুবিধা হচ্ছিল, আঙুলে গরম লাগছিল, ব্যাগ থেকে একটা টিস্যু পেপার বের করে ভাঁড়টা পেঁচিয়ে ধরল | আর একটা করে চায়ের বায়না করল | এত যে আনন্দ কলকাতার মধ্যে গোপনে রয়ে গেছে, জানাই ছিল না যেন | ক্রিস খুব মজা পাচ্ছে | তারপর ভাঁড়গুলো তুলে নিল | বলল একটা ব্যাগে রেখে দেবে, স্যুভেনির হিসেবে | বাকিটা কোথায় ফেলবে খুঁজতে‚ ও জায়গা খুঁজতে লাগল | একজন বলল এখানেই থাক এটা, আমরাও তো ফেলে রেখেছি | ক্রিস খুব আশ্চর্য হ’ল | বলল এখানে এভাবে পড়ে থাকবে নাকি? সবার ভাঁড়গুলো তুলে একটু দূরে একটা ড্রামের মধ্যে ফেলল | বলল আমাদের দেশে এভাবে রাস্তা নোংরা করে রাখা ভাবাই যায় না |

এরপর সবাই মিলে ময়দানে বসা হ’ল | পায়ের তলার ঘাস যেন পায়ের তলার ঘাস | ওখানেই বসা হ’ল | ক্রিস ঠিকমতো বসতে পারছিল না | ওদের এভাবে বসার অভ্যেস নেই | বসল | ব্যাগের ভিতর থেকে বের হল পানীয় | অশোক বলল ভদকা | চলবে নাকি? ক্রিস উৎফুল্ল | ওকে দিয়েই শুরু হ’ল | ও আলগোছে খেতে পারে না, ঠোঁট লাগিয়েই খেল | ওর ঠোঁট স্পর্শ করা বোতল ঘুরতে লাগল হাতে হাতে | ক্রিস বলল এবার আমার কবিতা শোনো | ব্যাগ থেকে ডায়রি বের করল | জার্মান ভাষায় কবিতা পড়তে লাগল | ডায়রি দেখে পড়তে হচ্ছিল না ওর | মুখস্থই ছিল | কবিতাগুলো ছোট ছোট | অশোক দু-চারটে শব্দের মানে বুঝতে পারছিল, কিন্তু মানে বুঝতে পারছিল না | অজিত বলল ট্রানশ্লেশন প্লিজ, ট্রনশ্লেশন ইনটু ইংলিশ | ক্রিস হাল্কা হেসে ইংরিজিতে মানে বোঝাচ্ছিল | শীতের পর রোদ্দুর উঠেছে | আমি আমার গায়ের চামড়া ছাড়িয়ে হ্যাঙারে ঝুলিয়েছি | রোদে মুচমুচে হয়ে গেলে আবার পরে নেব | আমার ছাড়ানো চামড়া দেখবার জন্য ভিড় করেছে মানুষ | আমার কঙ্কাল রগড় দেখছে | ইটস এ ফান, ইটস এ ফান, মাই ফ্লেশ লেস বোনস অবজার্ভস | সবাই হাততালি দিল | গ্রেট, গ্রেট, এক্সিলেন্ট | ওয়ান মোর |

আরও দু-তিনটে কবিতা পড়ল ক্রিস | এরপর অন্যরাও পড়ল বাংলায় | অশোক ইংরিজিতে অনুবাদ করে দিল | ক্রিসও বলছিল এক্সিলেন্ট | ওয়ান্ডারফুল | ভদকা ও খাচ্ছিল | ওর ব্যাগ থেকে একটা রথম্যান সিগারেটের প্যাকেট বের করল | সবাইকে দিল | অনেকটা ধোঁয়া ছাড়ল ক্রিস | বলল জীবন পোড়া ধোঁয়া | জীবনকে বার্ন করে একটা আনন্দ আছে, তাই না? সৌম্য, কৃশ্নেন্দু — সবাই ঘাড় নাড়াল | সবারই অল্পবিস্তর নেশা হয়ে গেছে | হঠাৎ ক্রিস বলল — তোমরা সবাই কি গে?

অশোক জিজ্ঞাসা করল এ কথা জিজ্ঞাসা করছ কেন? ক্রিস বলল তোমাদের মধ্যে কোনও মেয়েকে দেখছি না যে | সৌম্য বলল আছে, আমাদের মেয়ে বন্ধুও আছে |

এবার উঠতে হবে | সৌম্য হাত বাড়িয়ে দিল | সৌম্যর হাত ধরে উঠে দাঁড়াল ক্রিস | তারপরও হাত ছাড়ল না | তারপর ছোট্ট করে একটা চুমু দিল ক্রিস |

অশোক জানে, ও কিছু না | ছোট্ট করে একটু হাগ করা ভদ্রতা | কাজের সূত্রে একবার আমেরিকা গিয়েছে অশোক | পরদিন ওর হোটেলে ডাকল সবাইকে ক্রিস |

ক্যামাক স্ট্রিটের একটা মাঝারি হোটেলে উঠেছে ক্রিস | ওখানে সবাই গেল | ক্রিস বলল সারা বছর কাজ করে পয়সা জমিয়ে বছরে দুবার বিদেশ ঘোরে | জানালো একটা কোম্পানির রিসেপশনে কাজ করে ও | বিয়ে করেনি, বয়ফ্রেন্ড আছে, জার্মানির বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকায় কবিতা ছাপা হয় ওর | কাজের চাপে বেশি লেখা হয় না, কিন্তু মনের মধ্যে সব সময় কবিতা ঘোরে |

আবার মদ্যপান হল | সৌম্যর মোবাইলে চাঁদ বদনী ধোনি’ লোড করা ছিল | ওটা চালিয়ে নাচা হ’ল | সৌম্য ক্রিসের কোমর জড়িয়ে একটু নাচলো | যেন সৌম্যরই অধিকার, কারণ আগের দিন ক্রিস সৌম্যকেই চুমু খেয়েছিল |

কবিতা টবিতা নিয়েও কিছু গল্প হয়েছিল | বলছিল ওদের দেশে সাহিত্য পত্রিকা খুব কম | লিটারাটুর নামে যে পত্রিকাটা আছে, ওখানে লেখা ছাপানো সহজ নয় | হাই কোয়ালিটি না হলে ওরা ছাপে না | বছরে ওর দু-একটা কবিতা ওই পত্রিকায় বের হয় |

এখানকার লিটল ম্যাগাজিনগুলোর কথা শুনে ক্রিস বলল তোমরা খুব ভাগ্যবান | পরদিনই কাঠমান্ডু চলে যাবে ক্রিস | অনেক রাত হ’ল | ফোন নম্বর এবং ই-মেল আইডি দেয়া নেয়া হ’ল | ক্রিস জার্মান হলেও বেশ ভালো ইংরিজি বলে | অশোকের মনে হ’ল ওর চাইতে ও ভাল | ফেরার সময় সবাইকেই একটু একটু চুমু খেল ক্রিস, সৌম্যকে একটু বেশি | সৌম্যও চালু হয়ে গেছে বেশ | রিটার্ন দিল |

অত খরচ করে কেউ ফোন করত না ক্রিসকে | অশোক করেছিল একদিন | ক্রিস ফোনটা ধরেই বলেছিল হাউ আর ইউ অশোক? থ্যাংকস টু রিমেমবার মি | তার মানে ওর মোবাইলে অশোক সেভ করা আছে | ক্রিসও ফোন করতো, বলতো এখন ‘ফল’ চলছে | পাতা ঝরছে | পায়ের তলায় মৃত পাতাদের শবদেহ, একদিন বলল আজ গ্যেটের জন্মদিন | তোমাকে গ্যেটে থেকে চারটে লাইন শোনাই… |

মেলও করত ক্রিস | বরফ পড়া ঠাণ্ডার দিনে ঝাপসা কাঁচের সার্সি, মন কেমন করা বিকেল, এসব নিয়ে লিখত, ইহুদি পাড়ার ফুটপাথে নিখোঁজ কোনও মানুষের উদ্দেশে পেতলের ফলক, গত যুদ্ধে বোমা বিধ্বস্ত ভাঙা চার্চ নিয়ে লিখত | কবিতার ইংরিজি তর্জমাও |

অশোকও লিখত | অশোক ওকে স্বপ্নেও দেখেছে, সুইৎজারল্যান্ডের বরফ পাহাড়ে | স্কি করছে দুজনে | স্বপ্নই যখন শুধু সুইৎজারল্যান্ড কেন? আইফেল টাওয়ার, নীলনদের ক্রুজ, মিশরের পিরামিড, আঙ্কোরভোটের মন্দির, সর্বত্র নিয়ে গেছে | স্বপ্নে পাসপোর্ট ভিসা লাগে না, পয়সাও না | মেল-এ আসা কবিতা অশোক বাংলায় অনুবাদ করে অজিত কুণ্ডুর নির্বাণ পত্রিকায় ছাপিয়েছে | ক্রিস্টিনা গেলমার-এর গুচ্ছ কবিতা | স্ক্যান করে ক্রিস্টিনাকে পাঠিয়েছে অশোক |

একটা সুযোগ ঘটে গেল | অশোককে বার্লিন পাঠাচ্ছে ওর অফিস | দিন সাতেক থাকতে হবে | ক্রিস্টিনাকে কিচ্ছু বলল না আগে | গিয়ে সারপ্রাইজ দেবে |

লুফৎহানসা জার্মানির এয়ারলাইনস | ওদের প্লেনে পাশের সিটে এক জার্মানের সঙ্গে আলাপ হ’ল অশোকের | উনি যোসেফ রাইমার | জয়পুরের কবি সম্মেলনে আমন্ত্রিত ছিলেন | উনিও বার্লিনে থাকেন | ওঁকে ক্রিস্টিনার কথা জিজ্ঞাসা করল | উনি বললেন এই নামে কোনও কবির কথা উনি জানেন না | অশোক বলল লিটারাটুর-এ লেখা বের হয় ক্রিস্টিনার | উনি বললেন হতেই পারে না | উনিই তো ‘লিটারাটুর’-এর সম্পাদক |

ব্যাপারটা বোঝা গেল না |

বার্লিনে ওর নির্দিষ্ট হোটেলে গিয়ে একটা লোকাল সিম কার্ড কিনল অশোক | প্রথম ফোনটাই ক্রিসকে করল | নিজের নাম বলল না | দেখা যাক গলাটা চিনতে পারে কিনা | এই নম্বরটা ওর অচেনা |

একটু মজাই করল অশোক | ‘হেলো’ শুনেই বলল হাউ আর ইউ ডার্লিং?

ওপাশ থেকে উত্তর এল | ওয়েল, ফাইন | রেডি উইথ হট পুসি ফর গেটিং ফাকড | হোয়ার ইউ আর ডার্লিং? কাম কাম উইথ ডিক… |

ভ্যাবাচাকা খেয়ে ফোনটা রেখে কেটে দিল অশোক | হ্যাঁ, এটা তো ক্রিস্টিনারই গলা | গলা চিনতে কোনও ভুল হয়নি | ক্রিস্টিনা এরকম অশ্লীল কথা বলছে কেন? এবার ফোন বেজে উঠল অশোকের | ক্রিস্টিনা কলব্যাক করেছে | হোয়াট হ্যাপেনড ম্যান? ইজ ইয়োর রড গোয়িং ডাউন? কাম, আই উইল মেক ইট আপ | ট্রিমেন্ডাস ব্রাজিলিয়ান টাইপ সাক…

অশোক কথা বলছে না |

ওপাশ থেকে আবার বলছে হোয়াট হ্যাপেনড ম্যান? লাইক টু হিয়ার শ্ল্যাংস ওনলি? গো টো ইয়োর ইয়োর মাম এন্ড ফাক | স্টুপিড | এবার ফোন ওপাশ থেকেই | ফোনটা কেটে দিল অশোক |

ব্যাপারটা জটিল মনে হচ্ছে | এখানে আসার দু-দিন আগেই এই নম্বরেই ফোন করেছিল কলকাতা থেকে | একটা কবিতার আইডিয়ার কথা বলেছিল | সবুজ, টক একগোছা আঙুর ক্রমশ মিষ্টি হয়ে উঠছে | এবার ওকে চটকানো হবে ওয়াইন বানাবার জন্য | আঙুর জানে না | টক থেকে মিষ্টি হয়ে ওঠাটাই ওর কাজ | কী সুন্দর করে বলছিল | কিন্তু আজ এরকম করছে কেন? ও যদি বলত আমি অশোক, তোমাদের দেশে এসেছি, তাহলেও কি এরকম করত ক্রিস?

অশোকের কাজ আলেকজেন্ডারট্রাসেতে | ও থাকছে ওই অফিসের কাছেই | বার্লিনের ভাঙা দেয়ালটার অংশ দেখল | কেবলই মনে হচ্ছিল ক্রিস-এর সঙ্গে দেখা হয়ে যাক | ও রাস্তায় হাঁটার সময় মেয়েদের দিকে তাকাতো | ওখানে নানা রকম যানবাহন | দ্রুতগামী ট্রেন | মাটির উপর দিয়ে ইউ বান | মাটির তলা দিয়ে এস বান | বান-এর সঙ্গে বাহনের কী অদ্ভুত ধ্বনিগত মিল |

যে ছেলেটি অশোককে দেখভাল করার জন্য দেওয়া হয়েছে, ওকে জিজ্ঞাসা করল অশোক, কবিতা পড়ে কিনা | ছেলেটা মাথা নাড়ালো |

বলল স্কুল লেভেলে যা পড়ার পড়েছে | কবিদের খবরও জানে না | তবে ওর এখনকার গার্লফ্রেন্ড লাইফস্টাইল জার্নালিস্ট | ও জানতে পারে | অশোক জানতে চাইল ক্রিস্টিনা গেলমার নামে কোনও কবির কথা | ছেলেটা খবর দিল, না, এই নামে কোনও কবি নেই — যার লেখা ভালো কোথাও ছাপা হয় | কবি তো অনেকেই | কত লোক তো নোট বইয়ে কবিতা লিখে যায় সারা জীবন |

রাতে হোটেলে অশোক | খাওয়া দাওয়া হয়ে গেছে | আগস্ট মাস | ঠাণ্ডা নে ই | জানালা দিয়ে নানা রঙের বিজ্ঞাপনের আলো | টিভি আছে | রিমোটের বোতামগুলো টিপতে লাগল | অনেক জার্মান চ্যানেল ছাড়াও সারা দুনিয়ার চ্যানেল আসতে লাগল | কলকাতার বাইরে গিয়ে মাছ ভাত আলু পোস্ত পাওয়ার মতোই বাংলা চ্যানেল দেখতে ইচ্ছে করল | অশোক চ্যানেল শিফট করে বাংলা চ্যানেল খুঁজতে লাগল |

সার্ফিং করতে করতে পরপর কিছু স্থানীয় চ্যানেল ফুটে উঠছিল স্ক্রিনে | হঠাৎ একটা চ্যানেলে ক্রিস্টিনাকে দেখল | ওখানেই স্থির হল অশোক | ক্রিস্টিনা! নাকি ক্রিস্টিনার মত? এরকম কেন! চুম্বন উড়িয়ে দিয়ে বলছে হাই, ইগ ইস্ট জুলিয়া | গ্র্যাব ববস্লেড… | উর্ধাঙ্গ অনাবৃত করে দিচ্ছে বারবার | চুমু উড়িয়ে দিচ্ছে | জার্মান ভাষায় বলছে আমি জুলিয়া, দেখ কী সুন্দর আমার স্তন | তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছি… তারপরই স্ক্রিনে ফুটে উঠছে ফোন নম্বর |

স্ক্রল করেযাচ্ছে নম্বরগুলি | তিনটে ফোন নম্বর | এর মধ্যে একটা নম্বর খুব চেনা | ওটা ক্রিস্টিনার নম্বর | এই নম্বরে অনেকবার ফোন করেছে অশোক | কিন্তু ও তো বলছে ওর নাম জুলিয়া | মিনিট খানেক পরই বন্ধ হয়ে গেল | লেখা ফুটে উঠল আরও দেখতে হলে ‘পে’ করতে হবে | এটা পে চ্যানেল | হোটেলে জেনে নিল ‘পে’ চ্যানেল কীভাবে দেখতে হয় | এটাও জানতে পারল, প্রতি মিনিটে এক ইউরো করে খরচ | দশ মিনিট দেখতে হলে দশ ইউরো — মানে সাত-আটশো টাকা খরচ | হোটেল টাকাটা কেটে নেবে |

হোটেলের টাকা কোম্পানি দেবে | এর মধ্যে পে চ্যানেলের বিলটাও থাকবে | কী ভাববে ওরা | ছিঃ | ক্রিস্তিনার নম্বরে আবার ফোন করল ওর ফোন কার্ড থেকে | কয়েকবার বৃথা বেজে গেল | তারপর ফোন ধরল কৃস্টিনা | বলল হাই, ইগ ইস্ট জুলিয়া — হট চিক | প্লাজেনটেন |

অশোক চুপ করে থাকে | ওপার থেকে এবার গালাগাল শুনতে পায় | অশ্লীল | বলছে কেন বারবার বিরক্ত করছ? অশোকের কার্ডের পয়সা ফুরিয়ে যাচ্ছে | অশোক ছেড়ে দেয় ফোন |

ওর নেশার মতো হয়ে যায় | হোটেলে ফিরে এসে আবার ওই চ্যানেলে স্থির হয় | নগ্ন সুন্দরীদের কয়েক ঝলক দেখায়, ওদের আহ্বান দেখায়, শরীর বিভঙ্গ দেখায় | জুলিয়াকেও দেখতে পায় আবার | জুলিয়া নয়, ক্রিস্টিনা | জুলিয়া আর ক্রিস্টিনা জমজ বোন হলে ভালো হত | জুলিয়ার এই কাজ, ক্রিস্টিনা কবি | কিন্তু ফোন নম্বরটাই তো গুবলেট করে দিল | ক্রিস্টিনার ফোন নম্বর ধরছে জুলিয়া | জার্মানিতে থাকার দিন শেষ হয়ে আসছে | একদিন একটা সেক্স শপ-এ গেল | দেখল বড় স্ক্রিনে ব্লু হচ্ছে | নানা রকম সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে | অনেক সিডিও | একটা সিডির নাম রোজেনস্টামচেন | মানে গোলাপ ফুলের গাছ | জুলিয়ার আবরণহীন ছবি, কোমরে গোলাপের বেল্ট | হতে সিগারেট | বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনিতে ধরা | এভাবেই সিগারেট ধরেছিল ক্রিস্টিনা | সিডিটা কিনেই ফেলল ষোল ইউরো দিয়ে | হোটেলে ওর ল্যাপটপে চালালো | ও স্নান করছে, স্কিপিং করছে, ক্রিম মালিশ করছে, নাচছে, স্ব-মৈথুনও করছে |

পরদিন বার্লিনে সকাল থেকে মেঘ | দমকা হাওয়া | ক্রিস্টিনার মেল পেল | বলছে আজ সকাল থেকে দমকা হাওয়া | ঠাণ্ডা | রাস্তায় নেমেছি | হাওয়া কি ক্লেদ উড়িয়ে নিতে পারে? … তোমাকে ফোনে পাচ্ছি না কেন?

উত্তর দেয় না অশোক |

ফিরে আসে কলকাতা | সিডিটা ঘরের নোংরা ফেলার বাস্কেটে ফেলে দিয়ে আসে | কলকাতার বন্ধুদের বলে — ক্রিস্টিনার সঙ্গে দেখা হয়নি যদিও, শুনে এসেছে ও খুব নামী কবি | দেখা হয়নি, সেই সময় ও পোল্যান্ডে ছিল |

একটা ফোন পেল অশোক | হোয়ার হ্যাড ইউ বিন? ফোন করে পাচ্ছি না | মেল-এর উত্তর দাওনি | ভাল আছ তো! অশোক বলে মোবাইলটা খারাপ হয়ে গেছিল | কাজের চাপে মেল-এর উত্তর দেয়া হয়নি | কবিতা শোনাবে? কবিতা?

ক্রিস্টিনা কবিতা শোনায় |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.