নাঃ। পুরনো কলকাতার সরস্বতী পুজো কিন্তু পথের মোড়ে মোড়ে হতো না । গাড়ি থামিয়ে ছেলেপুলের দল বলত না, ‘দাদা চাঁদা…’ চাঁদা তুলতেও বেরোত না কেউ । তাই ‘সরস্বতী’ বানানটা বলার মত কষ্টসাধ্য ব্যাপারটাও করতে হতো না সদ্য ক্লাস থ্রি অথবা ফোরে ওঠা ছাত্রকে ।

কী ভাবছেন, পুরনো কলকাতায় সরস্বতী বন্দনার কেন্দ্র ছিল গৃহস্থ বাড়ি ? সেটাও কিন্তু ক্বচিৎ কদাচিৎ দেখা যেত । তাই সরস্বতী পুজোর সকালে পুরোহিতদের দৌড়াদৌড়ি বা হাইজ্যাকের দৃশ্যও চোখে পড়ত না । বরং সরস্বতী পুজোর জন্য পুরোহিতদের অনীহা ছিল বেশ । আসলে সরস্বতী তখন নিষিদ্ধপল্লীর দেবী । ‘ভদ্দরলোক’-এক cup of tea নয় । বাবুবিলাসের কলকাতার বিদ্যার দেবী আসলে চৌষট্টি কলা অধ্যয়নের আগে আরাধ্যা ।

কিন্তু কেন এমন নিয়ম ? বাৎস্যায়ন কামশাস্ত্রে লিখেছেন, কামদেবের আরাধনার জন্য চৌষট্টি কলার অধ্যয়নের কথা । আর সেই কলা অধ্যয়নের সূচনার দিন সরস্বতীপুজো । সুতরাং নিষিদ্ধপল্লীতে যে হৈ চৈ হবে, এ তো স্বাভাবিক ।

কেমন ছিল সেদিনের সরস্বতী বন্দনা ? শোনা যায়, সরস্বতী পুজোর অনেক আগে থেকেই তার আয়োজন তুঙ্গে উঠত । সঙ্গে আমোদ প্রমোদও । তার বিবরণ দিয়েছেন হুতোম—‘‌সরস্বতী পুজোর আর পাঁচদিন আছে । রাত্রি ঘোর অন্ধকার, তথাপি ইয়ার দলের শঙ্কা অথবা বিরামের নাম নাই.‌.‌.‌সকল বেশ্যাবাড়ির দরজাতেই প্রায় জুড়ি, তেঘুড়ি, চৌঘুড়ি খাড়া রয়েচে । গৃহমধ্যে লালপানির চক্‌চক্‌, চেনাচুরের ছপ্‌ছপ্‌ ও বোতল গেলাসের ঠন্‌ঠন্‌ শব্দ শুনা যাচ্ছে.‌.‌.সরস্বতী পুজোর খরচের কল্যাণে অনেকস্থলে গাঁটকাটা, রাহাজানি, সিঁদ, হত্যা, ডাকাতি, জুয়াচুরি ইত্যাদি ঘটনা হচ্ছে । শহর টল্‌টোলে ।’‌

Banglalive-8

সরস্বতী পুজোর আগে থেকেই জমজমাট নিষিদ্ধপল্লী । সেখানে নাচ-গান-যাত্রার আয়োজন । বেলফুলের সুবাস। মদের গেলাসে ঠনঠন শব্দ । এলোমেলো হয়ে যাওয়া ময়ূরপুচ্ছ ধুতি । আর পুজোর দিনে হুড়োহুড়ি । নিষিদ্ধপল্লীতে ‘বারাঙ্গনা’-দের সরস্বতী পুজোর জন্য ‘গৌরী সেন’ বাবুরা কার্যত ‘কল্পতরু’ হয়ে যেতেন । ‘বাঁধা’ বিবিদের বিলাসী সরস্বতী পুজোয় তাঁরা ছিলেন মুক্ত হস্ত । আসলে এর মধ্যে যে লুকিয়ে ‘সেরা’-র অহঙ্কার । উপপত্নীকে কে কীভাবে ‘পোষে’, সরস্বতী বন্দনার থেকেও তা প্রমাণের তাগিদটা ছিল বেশি ।

Banglalive-9

কিন্তু কারা বিচার করবেন ? শুনলে অবাক হবেন, এর বিচারক ছিলেন বাবুর বাড়ির চাকর-ঝি’রা । তাঁরা সরস্বতী পুজোর সকালে হালসিবাগান থেকে রামবাগান, সোনাগাছি থেকে হাড়কাটা গলি ঘুরতে যেতেন বাবুর বিবিদের পুজো দেখতে । ছিলেন বাবুর ‘ইয়ারদোস্ত’-রা । তাঁরা অতিথি হয়ে আসতেন । সকলের মুখে মুখেই ‘দরাজ’ বাবু ‘ফেমাস’ হতেন ।

আরও পড়ুন:  ঝন্টিপাহাড়ির বনবাংলোয় খাটের নিচে হারমোনিয়ামটায় আরও গাঢ় হল ধুলোর প্রলেপ

তা বলে বিদ্যার দেবী ? বাবু হতে গেলে যে সরস্বতী পুজো একটা অবশ্য কর্ম সে কথা জানিয়েছেন বঙ্কিমচন্দ্র মহাশয় । তিনি লিখছেন—‘যিনি উৎসবার্থ দুর্গাপূজা করিবেন, গৃহিণীর অনুরোধে লক্ষ্মীপূজা করিবেন, উপগৃহিণীর অনুরোধে সরস্বতী পূজা করিবেন এবং পাঁঠার লোভে গঙ্গাপূজা করিবেন, তিনিই বাবু।’‌ অর্থাৎ ‘বাবু’ নিষিদ্ধপল্লিতেও রাত কাটাবেন আর ‘বারাঙ্গনা’-র বাড়িতে সরস্বতী পুজো
করবেন ।

কিন্তু কেন ? তার উত্তর বোধহয় দিয়েছে ‘‌আর্য্যদর্শন’‌ পত্রিকা । ১২৮৫ বঙ্গাব্দের বৈশাখে নিষিদ্ধপল্লী সম্পর্কে সেখানে লেখা হচ্ছে—‘‌সেখানে থাকিয়া যখন তুমি সন্ন্যাস অবলম্বন কর, তখন সংসার মায়া তোমাকে কিছুতেই অভিভূত করিতে পারে না, স্ত্রী–‌পুত্রের নয়নজল তোমাকে ফিরাইতে পারে না।’‌ তাহলে সে মঠের দেবীই কি তবে ‘সরস্বতী’ ? প্রশ্নটা খুব সিরিয়াস। কারণ, বাবুর ‘সন্ন্যাস’ জীবনে শ্রীপঞ্চমীর রাতেই যে আসতেন ‘সাধনসঙ্গিনী’-রা । হ্যাঁ, সেকেলে কলকাতায় শ্রীপঞ্চমীর রাতে মানেই ‘নথ ভাঙা’। মানে, কোনও তরুণীকে ‘নিষিদ্ধ’ পেশায় নিয়ে আনার জন্য তাঁর কৌমার্যহরণ। এর জন্য আগে নাকি নিলামও হতো। বাবুরা ‘নথ ভাঙা’-র খেলায় অংশ নেওয়ার জন্য দর হাঁকতেন।

শুধু কলকাতায় আমোদ প্রমোদ হতো এমনটা কিন্তু মোটেই নয় । সুধীর চক্রবর্তী মহাশয় ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকার একটি অংশ থেকে তথ্য দিয়েছেন, “১৮২৬ সালের ১১ মার্চের ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রে দেখা যাচ্ছে কৈকালা গ্রামের কৃষ্ণকান্ত দত্তের বাড়িতে সরস্বতী পুজোয় কলকাতা থেকে গোলকমণি, দয়ামণি ও রত্নমণি এই তিনদল ‘নেড়ি কবি’ গান করতে গিয়েছিলেন।” অর্থাৎ বাড়ি বাড়ি যে পুজো হতো সে তথ্যও মিলছে । হ্যাঁ, বাড়ির পুজোতে ঘটা করতেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর । ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণের আগে তিনি সরস্বতী পুজোতে এতটাই ঘটা করতেন যে সেদিন নাকি শহরে গাঁদা ফুল পাওয়া যেত না। মিলত না সন্দেশ ।

ক্রমে বাড়ি বাড়ি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরস্বতী বন্দনা শুরু হল। যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি (১৮৫৯–১৯৫৬) জানিয়েছেন সে কথা, ‘‌আমরা পাঠশালায়.‌.‌. শুক্ল পঞ্চমীতে সরস্বতী পূজা করিতাম । কিন্তু ইস্কুলে সরস্বতী পূজা হইত না । আমরা বাড়িতে শ্লেট দোয়াত কলমে পূজা করিতাম। সে বই বাংলা কিংবা সংস্কৃত, ইংরেজি হইতে পারিত না। ইংরেজি ম্লেচ্ছ ভাষা।’‌

আরও পড়ুন:  ট্যুইটার থেকে বিরতি নিতে বলছে স্বয়ং ট্যুইটার

পাঠশালায় সরস্বতী পুজো সম্পর্কে আরও একটি তথ্য পাওয়া যায় । বি কে পালের পাঠশালায় সে সময় সরস্বতী পুজোকে কেন্দ্র করে আনন্দে মেতে উঠত ছাত্ররা । শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরা বিলি করা হতো। তাতে থাকত লুচি, নানা রকমের ফল, মিষ্টি । শিশুদের মধ্যে সরস্বতী পুজোর প্রসাদের উৎসাহ নিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মশাই ছড়াও লিখেছেন—

লুচি কচুরি মতিচুর শোভিতং
জিলেপি সন্দেশ গজা বিরাজিতম।
যস্যাঃ প্রসাদেন ফলার মাপ্লুমঃ
সরস্বতী সা জয়তান্নিরস্তরম্‌॥‌

ক্রমে সরস্বতী পুজোতে মূর্তি পুজো চালু হল কলকাতার বাড়িতে বাড়িতে । রামচাঁদ শীল, বি কে পালের বাড়িতে সরস্বতী পুজোর ধূমধামের উল্লেখ পাওয়া যায় । রামচাঁদ শীলের বাড়িতে তৈরি হতো বিশেষ ধরনের মিষ্টি ‘তিলকুটা’। এই তিল আসত বাংলাদেশ থেকে । আর বি কে পালের বাড়িতে প্রতিমায় চমক । দুপাশে চার সখী পরিবেষ্টিতা সরস্বতী মূর্তি । হাতে রুপোর বীণা । আর দেবীর বাহন হাঁস নয় ।

এবার আসা যাক সর্বজনীন সরস্বতী পুজোয় । শরীরচর্চার আখড়ায় সর্বজনীন পুজোর উল্লেখ মেলে । মণ্ডপসজ্জা হতো ঘুড়ির কাগজ কেটে শিকল বানিয়ে । তার সঙ্গে হ্যাজাকের আলোয় ঝলমল করত মণ্ডপ । কলকাতায় সরস্বতী পুজো উপলক্ষে তারস্বরে গান বাজানোর রীতিটা কিন্তু দীর্ঘদিনের । নির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও তা ১৯৫০-এর দশকের অনেক আগে থেকেই । সবিতেন্দ্রনাথ রায় লিখছেন প্রথমনাথ বিশির কথা । ১৯৫০-এর দশকে সরস্বতী পুজো উপলক্ষে একটি ছড়া লিখেছিলেন প্রথমনাথ—‘দেবীর মাথার পিছন ঘুরল চাকা যন্ত্রেতে / চলল পুজো লারেলাপ্পা লারেলাপ্পা মন্ত্রতে।’ প্রসঙ্গত ১৯৪৯ সালে মুক্তি পেয়েছিল ‘এক থি লড়কি’ ছবিটি । আর সেই ছবিতে লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে ‘লারেলাপ্পা’ গানটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। সে বছর প্রায় সব অনুষ্ঠানেই গানটি মাইকে বাজানো হতো ।সেই ট্র্যাডিশন এখনও চলছে | মা সরস্বতীর আরাধনা মানে এখনও বিদ্যাং দেহির সঙ্গে লারেলাপ্পা আর বাঙালির প্রেমের স্বাধীনতা দিবসের যুগলবন্দি |

আরও পড়ুন:  মুসলিম নর্তকীই পরে রঞ্জিত সিং-এর ময়ূরী মহিষী ও শিখ সাম্রাজ্যের দক্ষ প্রশাসক

NO COMMENTS