শতাধিক বছর আগে অবলীলায় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের মুখে মাথা ঢুকিয়ে দিতেন এই বাঙালিনী…মৃত্যুও বাঘের থাবাতেই

5722

তাঁর নাম সুশীলা সুন্দরী | তবে যে কাজ তিনি করতেন তার থেকে সুশীল বিশেষণের অবস্থান কয়েক যোজন দূরে | এটা তাঁর আসল নাম কিনা তাও প্রমাণিত নয় | ছিলেন সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে | জন্মেওছিলেন বড় অসময়ে | আজ থাকলে সম্মান যশ অর্থ প্রতিপত্তি সবই যে কয়েকশো গুণ বেশি হতো তাতে কোনও সন্দেহ নেই | 

জন্মেছিলেন ১৮৭৯-এ | সেকালের বাবু কলকাতার লালবাতি এলাকা‚ রাম বাগানে | জন্মদাত্রীর নাম রয়ে গেছে অন্ধকারেই | অভাগী পতিতার মেয়ে পেটের দায়ে এসেছিলেন সার্কাসে | অতঃপর তাঁর নাম বিখ্যাত হয়েছে গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস-এর সুশীলা সুন্দরী হিসেবে | তিনি প্রথম ভারতীয় নারী যিনি সার্কাসে খেলা দেখিয়েছেন | একবার ভেবে দেখুন‚ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে একজন বাঙালি নারী সার্কাসে জিমন্যাস্টিক্স‚ ট্র্যাপিজ-কসরত করছেন | সবথেকে ভয়ঙ্কর হল‚ সুশীলা ছিলেন বাঘের প্রশিক্ষক | অবলীলায় ওঠবোস করাতেন রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারদের | শুয়ে থাকতেন তাদের পিঠে হেলান দিয়ে | মাথা ঢুকিয়ে দিতেন বাঘের মুখে | এখন এসব দৃশ্য জলভাত | কিন্তু আজ থেকে ১২০-১৩০ বছর আগে ছিল বিরলতমর মধ্যে বিরলতম দৃশ্য | আর একটা সময়ে দর্শকদের গায়ে কাঁটা দিত | যখন মাটিতে পোঁতার পরে হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসতেন ঝলমলে মেমসাহেবি পোশাক পরা সুশীলা |

সুশীলাসুন্দরীর বোন ছিলেন কুমুদিনী | তিনিও খেলা দেখাতেন প্রিয়নাথ বোস বা প্রোফেসর বোস-এর গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসে | নিজের দক্ষতায় খেলা দেখানো আয়ত্ত করেছিলেন সুশীলা-কুমুদিনী | ছিলেন যেকোনও শো-য়ের স্টার পারফর্মার | শো শুরুর আগে সুশীলা এবং কুমুদিনী ঘোড়া ছুটিয়ে রিং-এ আসতেন | দর্শকরা দেখার জন্য মুখিয়ে থাকতেন | কুমুদিনী শুধু ঘোড়সওয়ারি খেলাই দেখাতেন | দিদি সুশীলা তো বাঘ সিংহকে পোষা কুকুর বিড়ালের মতো বশ করতেন | বীর বাদল চাঁদ নামে আর একজনের সঙ্গে বাঘ সিংহর বিপরীতে কুস্তি লড়তেন এই সাহসিনী |

পুরনো কলকাতায় কান পাতলে শোনা যায়‚ গ্রেট বেঙ্গলের খ্যাতনামা জাদুকর‚ প্রিয়নাথের ডানহাত ম্যাজিশিয়ান গণপতির সঙ্গে মন দেওয়া নেওয়া হয়েছিল সুশীলার | কিন্তু তিনি পুরনো দল ছেড়ে যাননি গণপতির নতুন দলে | সুশীলাকে ছাড়া নাকি নতুন দলে ভোজবাজি জমাতে পারতেন না গণপতি |

উনিশ শতকের শেষে‚ সম্ভবত ১৮৯৬ সালে গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস আমন্ত্রিত হয়েছিল মধ্যপ্রদেশের রেওয়া রাজপরিবারে | সেখানে সুশীলা সুন্দরীর বাঘের সঙ্গে খেলা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন রেওয়ার রাজা | বখশিস হিসেবে দিয়েছিলেন আস্ত একজোড়া রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার |

সেই বাঘ-বাঘিনীকে বশ করেছিলেন সুশীলাসুন্দরী | তাঁদের নিয়ে খেলা দ্রুত জনপ্রিয় হয় | সার্কাসের এত রাজস্ব লাভ হতে থাকে‚ যে নতুন অতিথিদের নাম দেওয়া হয় লক্ষ্মী নারায়ণ | বিশ শতকের শুরুতে সবাই গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসকে একডাকে চিনত‚ সুশীলাসুন্দরীর বাঘবন্দি দেখবে বলে | বহুদিন লক্ষ্মী নারায়ণের সঙ্গে খেলা দেখিয়েছেন সুশীলাসুন্দরী | তারপর একটি বাঘ মারা যাওয়াতে খেলা প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যায় |

পরে ফরচুন নামে আর একটি নতুন বাঘের সঙ্গে খেলা দেখাতে শুরু করেন সুশীলা | কিন্তু নতুন পোষ্য অত বশংবদ হয়নি | একদিন ফরচুনের থাবার ঘায়ে মারাত্মক আহত হন সুশীলা | আর উঠে দাঁড়াতে পারেননি | চলার শক্তি হারিয়ে বাকি জীবন কেটেছিল শয্যাশায়ী হয়ে | সৌভাগ্যের বদলে সুশীলার জীবনে দুর্ভাগ্যকেই ডেকে আনে ফরচুন | যে পশুরাজ ছিল সুশীলার খেলার সঙ্গী তার আঘাতেই সুশীলাকে শয্যাশায়ী থাকতে হয় জীবনের বাকি দিনগুলো | ১৯২৪ সালে মৃত্যু হয় অকুতোভয় সুশীলাসুন্দরীর |

তাঁর মতোই লালবাতি পাড়ার আর এক মেয়েকে দলে এনেছিলেন সুশীলা | রাম বাগানের সেই মেয়ের নাম ছিল মৃন্ময়ী | সুশীলা-কুমুদিনী-মৃন্ময়ী ছিলেন প্রিয়নাথ বোসের তিন তুরূপের তাস | পরে বিয়েও করেছিলেন মৃন্ময়ী | কিন্তু সার্কাস ছাড়েননি | কোনও এক সময়ে বৈধব্যের নিয়মনীতি মানা মৃন্ময়ী সাদা থান ছেড়ে ঝলমলে খোলামেলা পোশাকে সেজে আসতেন সার্কাসের রিং-এ | রং মেখে খেলা দেখিয়ে আবার ফিরে যেতেন সামাজিক অনুশাসনের বেড়াজালে‚ নিজেকে গুটিয়ে নিতেন রক্ষণশীলতার খোলসে |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.