কুকথা ৪

394
cartoon with words

আবার আসিয়াছি ফিরি/‌ এই নদীটির তীরি/‌ 
‌মনে লইয়া ভয়/‌ হাতে লইয়া বর্ণপরিচয়।
এই প্রিয় বাংলায়/ কী হয়, কী হয়।

নমস্কার, আমি শ্রী ঘঞ্চি। আমাকে মনে আছে তো?‌‌ আমিই সেই বাঁশঝাড়ের নাতি। কু’কথায় ডক্টরেট। ডক্টরেট শুনে চমকে উঠলেন‌?‌ আরে!‌ ডক্টেরট হওয়া কোনো ব্যাপারই না? লেখাপড়া করা শক্ত, ডক্টরেট উপাধি সংগ্রহ অনেক ইজি। আপনি যদি আমার পরামর্শ শোনেন, বলব, লেখাপড়ার ফ্যাঁচাং –‌‌এ যাবেন না, স্ট্রেট একটা ডক্টরেট নিয়ে নিন। এই দেশে ডক্টরেট নিয়ে ফক্টরেট অনেক হয়েছে। এই তো সেদিন খবরের কাগজে দেখলাম, কোন মাননীয় মন্ত্রীর ডক্টরেট উপাধি নিয়ে প্যাঁচাল শুরু হয়েছে। এমন জিনিস নতুন নয়, আগেও ঢের দেখেছি। আপনিও দেখেছেন। দেখেননি?‌ বুকে হাত দিয়ে বলুন। আরে বাপু, রেট ঠিক থাকলে ডক্টরেটে কী সমস্যা? সবাই‌ জানে— ফেল কড়ি মাখো তেল / ডক্টরেটে পাশ, লেখাপড়ায় ফেল।  বিদেশের নাম গোত্রহীন বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি শিশি বোতলে করে উপাধি বিক্রি হয়। ওদেশের কেউ পাবে না শুধু এদেশের জন্য।  টুয়েন্টি পার্সেন্ট অফ। পাশপোর্ট দেখালে চলবে। আমিও ভাবছি নেব। কীসের ওপর নেব সেটা ঠিক করিনি। যেটা সস্তা হবে সেটাই নেব। সায়েন্স আর্টস নিয়ে আমার কোনো বাছাবাছি নেই। আমার কাছে সায়েন্স যা, আর্টসও তাই। সব সমান।

যাই হোক, এবার কুকথার গোড়ায় কেন অমন ছড়া লিখেছি, সেটা বলি। 
সেদিন এক কাণ্ড হল বটে। খর্‌খরে দুপুরে বিডন্‌ স্ট্রিট দিয়ে ফর্‌ফর করে হাঁটছিলাম। দেখি, উলটো দিক থেকে এক বুড়োমানুষ আসছে। মাথায় ছাতা, হাতে বই, গায়ে ফতুয়া, পরণে হাঁটু পর্যন্ত ধুতি। দূর থেকেই চেনা চেনা ঠেকল। দেখে যেন মনে হয়, চিনি উহারে। বুড়োর‌ মাথায় গুরিগুরি চুল। আরও খানিকটা কাছে এলে চিনতে পারলাম।
আরে!‌ এ যে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর!‌ ইনি কোথা থেকে উদয় হলেন। তাও আবার জন্মের দুশো বছর পর‌!‌
আমি স্যাট্‌ করে একটা পেন্নাম ঠুকে নিলাম। দাঁত বের করা স্মাইলি দিয়ে বললাম,‘‌পণ্ডিতমশাই যে!‌ আপনি এই ভরদুপুরে কোথা থেকে?‌‌’‌
বিদ্যাসাগরমশাই  ভুরু কুঁচকে অতি বিরক্তি নিয়ে বললেন,‘যেখান থেকেই হই, ভরদুপুরে আমার পথে
হাঁটা কি বারণ হয়েছে?‌’‌
আমি লম্বা জিব বের করে বললাম,‌‘‌ছিছি। আপনার হাঁটা কে বারণ করবে?‌ এমন সাধ্যি আছে কার?‌’‌
বিদ্যাসাগরমশাই বললেন,‘বাজে কথা রাখো হে ছোকরা। হাঁটা তো দূরস্থান। একটু দাঁড়তেই দাও না। হয় মাথা কাটছো, নয় তুলে আছাড় মারছো।’‌‌
আমি হাত জোড় করে বলি,‘‌ক্ষমা করবেন।’‌‌
বিদ্যাসাগরমশাই আমার ক্ষমায়ে ফ্যাচাৎ করে একটা হ্যাঁচ্চো দিলেন। বললেন ‘বাজে কথা ছাড়ো। তুমি কোন ইয়ার?‌’‌
আমি বললাম,‘আমি কোন ইয়ার ‌মানে! ডেট অব্‌ বার্থ?‌‌’‌
বিদ্যাসাগরমশাই আরও বিরক্তি সহযোগে বললেন,‘ওহে মূর্খ তোমার জন্ম তারিখ কে জানতে চেয়েছে?‌ ‌কোন ইয়ার মানে হল‌, তুমি কোন্‌ ইয়ারের ছাত্র?‌ সবাই তো পথে সাক্ষাৎ হলেই আগে পেন্নাম করে। চিতে পারি না। এরমধ্যে দেখেছি বেশিরভাগই চোর ছ্যাঁচোড়। আমার ছাত্র তো দূরের কথা, কোনোদিন লেখাপড়ার ধারে কাছ দিয়ে যায়নি। ‌তাই এখন আগে জিগ্যেস করে নিই। তারপর আশীর্বাদ করি। নইলে পেন্নাম থাকে পেন্নামের মতো, আমি থাকি আমার মতো।’‌
আমি গদগদ প্রক্রিয়ায় হেসে বললাম,‘‌পণ্ডিতমশাই, ইয়ার বললে মনে করতে পারবেন না। আমি কিছু চাই না। আপনার পায়ের ধুলো মাথায় লাগাতে পেরেছি তাই যথেষ্ট। তার থেকে বরং আসুন আপনাকে একটু মিষ্টিমুখ করাই। না বলবেন না, এটা আমার পেন্নামি।’‌
বিদ্যাসাগরমশাই একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘‌এই কথাটা মন্দ বললে না হে। একটু খিদে পেয়েছে। সেই সকালে সাবুর শরবত খেয়ে বেরিয়েছি কিনা। তারপর এই পাঠশালা, ওই ইস্কুল সেরে ফিরছি। তা কোন দোকানে মিষ্টি খাওয়াবে?‌ সেই সব ভাল ভাল দোকান কি আর আছে?‌’‌
আমি হেসে বললাম,‘সবাই নেই, তবে কেউ কেউ আছে। ‌চিন্তা করবেন না ভাল জিনিসই খাওয়াব। রস ঘোষের দোকানের রসগোল্লা এখনও অতি স্বাদু।’‌
‘‌রস ঘোষ মিষ্টান্নভাণ্ডারে’‌তে ঢুকে রসগোল্লার অডার্র দিলাম। ঈশ্বরচন্দ্র আর আমি বসেছি মুখোমুখি। পুরোনো বেঞ্চ আর টেবিল। প্রথম চোটে চারটে রসগোল্লা খেয়ে গেলাস করে জল পান করলেন। তারপর নরম গলায় বললেন,‘‌তোমার আপায়্যনে আমি খুশি হয়েছি। ফুলের মালার বদলে রসগোল্লা অনেক ভাল। ফুলের মালা গলায় পরতে পরতে হাঁপিয়ে পড়েছিলাম বাপু।’‌
আমি বললাম, ‘‌আছেন কেমন?‌’‌
‘এক সময়ে ছিলাম ভাল, তোমাদের টানাটানিতে প্রাণ ওষ্ঠাগত।’‌
আমি অবাক হয়ে বললাম,‘‌আমাদের টানাটানি!‌ আমরা আবার করলামটা কী?‌’‌
বিদ্যাসাগরমশাই বললেন,‌‘‌বাকি কী রেখেছো হে?‌ কদিন ধরে আমার মানসম্মান নিয়ে হেঁচড়াহেঁচড়ি কম করলে?‌ এই বুড়ো বয়েসে কম অপমান সইতে হল?‌’‌
আমি বললাম,‘‌ওহো, আপনি মূর্তি ভাঙার কথা বলছেন? কাজটা যে অন্যায় হয়েছিল, কে কথা তো বাংলার সব মানুষই বলেছে। পণ্ডিতমশাই, আমরা তো প্রায়শ্চিত্তও করেছি। আপনার নতুন মূর্তি বসিয়ে ঠেসে পুজ্জো আচ্চা করে দিলুম। লাঠালাঠি, আগুন, মারামরির পর ওং শান্তি।’‌
বিদ্যাসাগরমশাই একথা শুনে দিলেন জোর ধাবড়ানি।
‘‌রাখো তোমাদের পায়শচিত্তি। পেটে ব অক্ষর বর্ণপরিচয়, উনি এয়েচেন পায়েশ্চিত্তির করতে।’
আমি মাথা নামিয়ে বললাম,‘‌খুবই অন্যায় হয়েছে। ভাঙচুর মোটে ঠিক হয়নি।’‌
বিদ্যাসাগরমশাই বললেন,‘‌এখন আর মাথা নামিয়ে কী হবে?‌ দুটো মালপোয়া বলো। অনেকদিন উত্তরকলকাতার মালপোয়া খাওয়া হয়নি। আরে বাপু, আমাকে নিয়ে টানা হেঁচড়া কি আজ থেকে?‌ কতবার আমার গলা কাটা হয়েছে বলো দেখি? একসময়ে আমাকে তো সবাই স্কন্ধকাটা বলে ডাকতো। বাপু মরে গেলে স্কন্ধকাটায় অসুবিধে নেই, কলেজস্ট্রিটে স্কন্ধকাটা হলে বিপদ। আমার খ্যাতি বলো কুখ্যাতি বলো সবই তো ওই মুন্ডু ছাড়া হয়েছে। মু্ণ্ডু যাওয়ার আগে যত লোকে চিনতো, তার থেকে ঢের বেশি লোকে চিনেছে মুন্ডু কেটে। কেন যে বিদ্যাসাগর হতে গিয়েছিলুম। আর হলামই যদি এই বাংলায় কেন হলুম।’‌
আমি বললাম,‘‌শুধু গলা কাটা, মাথা ভাঙা বলছেন কেন?‌ একসময়ে আপনাকে নিয়ে মেলাও তো করেছি। গ্রামে গ্রামে বিদ্যাসাগর মেলা হয়নি?‌ বিমানে না উড়ে পায়ে হেঁটে আপনাকে নিয়ে শোভযাত্রা হয়েছে। বীরসিংহ গ্রাম টু কলকাতা ধাম/‌ বিদ্যাসাগর, বিদ্যাসাগর তোমায় জানাই লাল সেলাম। হয়নি?‌ ভুলে গেলেন?‌ সেই ট্রাডিশন তো আজও চলছে। কত মমতায় কলেজস্ট্রিট ধরে আপনার মূর্তি নিয়ে এই তো সেদিনও যাত্রা হল। ভাঙা বিদ্যাসাগর আস্ত হলো। শুধু রাগ করলে হবে ‌পণ্ডিতমশাই? আমাদের এই বিদ্যাসাগর চেতনার কোনো দাম নেই?‌ বাঙালির শুধু ভাঙাভাঙিটাই মনে রাখলেন?‌ এই যে খাতিরখুতির?‌ সে সব হালকা?‌‌’
ঈশ্বরচন্দ্র মালোপোয়া খাওয়া শেষ করে বললেন,‌ ‌‘‌যাই বল বাপু, মালপোয়ায় আগের মতো টেস্ট নেই। থাকবেই বা কী করে,‌ খাঁটি দুধ কই ?‌ ঘিতেও ভেজাল। ভেজাল তোমাদের বিদ্যাসাগর প্রেমেও। আমায় নিয়ে মেলার সময়ে মেলা টাকা পয়সার কাণ্ড হয়েছিল। তোলা হয়েছিল দেদার টাকা। তোলাবাজি না বিদ্যাসাগরবাজি যে দিয়েছে, সে জানে আর জানে যে নিয়েছিল। কমিটি, সম্মেলন কিছুই তো বাদ যায়নি তখন। ভাষন হলো, তোষন হলো। লাভটা কী হল?‌ বাঙালী আরও বেশি করে বাংলা ভুলল। বাংলা ভাষার ঘজং হলো। বাংলা স্কুলের ভজং হল। আরে বাপু, মেলা করে কেউ বাংলার বিদ্যাসাগর‌ নামে খেতাব পেতে পারে, তার বেশি কিছু হয়নি। শুনেছি, তোমাদের ‘‌কমরেড’‌রা আড়ালে হাসাহাসি করত। আর এখন?‌ হাসাহাসি তো সামনে চলে এসেছে। ভাবটা এমন যেন ভাগ্যিস গুরু তুমি ভাঙলে, নইলে আমাদের পলিটিকসি কেমন করে সাঙলে ‌?‌’‌
আমি বললাম,‘‌পণ্ডিতমশাই, সাঙলে মানে কী!‌’‌
ঈশ্বরচন্দ্র বললেন, ‘‌সে পরে বলব। মোদ্দা কতা হল, না ভাঙলে আমায় নিয়ে রাজনীতি হতো কী করে?‌ ভাঙলেও লাভ, জুড়লেও লাভ। এতেও খরচ, আবার ওতেও খরচ। এতে ধড়ং, ওতো ভড়ং। আমার কতা, শিক্ষে ছড়াতে এর কানাকড়ি খরচ হলেও কিছু কম্মে লাগত।’‌
আমি এবার ভেঙে পড়লুম। বললুম,‘সেকী!‌ ‌আপনাকে নিয়ে এতো হুড়োহড়ি, এতো লাফালাফি, এতো মারপিটে আপনি খুশি নন পণ্ডিতমশাই ?‌’
‘‌আ‌মার আর খুশি হয়ে কাজ নেই। একশো বছর ধরে আমাকে নিয়ে যা খেল্‌ দেখালে বাপু, আর আমার সন্মানে কাজ নেই। আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি ।’‌
আমি অতিশয় আগ্রহ নিয়ে বললাম,‘‌কী সিদ্ধান্ত?‌’‌
ঈশ্বরচন্দ্র ‌বিদ্যাসাগর বললেন, ‘ভাঁড়ে কটা পান্তুয়া দিতে বলো দেখি। বাড়িতে নিয়ে যাই। তবে দাম কিন্তু আমি দেব।’‌
পান্তুয়ার ভাঁড় হাতে নিয়ে, দোকান থেকে বেরোতে বোরোতে ঈশ্বরচন্দ্র বললেন,
‘‌ঠিক করেছি, আমার বর্ণপরিচয়গুলো সব এখান থেকে তুলে নিয়ে যাব। একেবারে ফাঁকা করে দেব। অনেক হয়েছে, আর নয়। সেই কথা বলতেই কদিনের জন্য এসেছি।’
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মাথায় ছাতা খুলে এই দুশো বছরেও পিঠ সোজা করে হাঁটা দিলেন।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.