চারদিকে অতল খাদ‚ জীবনকে কচি মুঠোয় নিয়ে ওরা খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে ২৬২৫ ফিট নামে ২ ঘণ্টা ধরে‚ স্কুলে পৌঁছতে

2150

কচি কচি হাতগুলোয় শক্ত ধরে ধরে আছে বাঁশের মই | মুঠো আলগা হলেই চলে যেতে হবে অতল খাদে | ওরা নামছে

পিঠে রঙিন ঝোলায় আছে বইপত্র | মলিন মুখে উজ্জ্বল হাসি | তেলহীন রুক্ষ চুলে রঙিন ফিতে | ওরা নামছে

বয়স ৬ থেকে ১৫ বছর | সংখ্যায় এক ডজনের কিছু বেশি | স্কুলে যেতে হলে ওদের খাড়াই পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে হয় | বাঁশের মই বেয়ে | চারদিকে ধূ ধূ খাদ | এভাবেই মৃত্যু উপত্যকার মধ্যে দিয়ে ওরা বাঁশের মই বেয়ে পাহাড়ের ঢাল বয়ে নামে ২৬২৫ ফিট | তবে পৌঁছতে পারে স্কুলে | ওদের অপরাধ ওরা আতুলিয়ের গ্রামের বসিন্দা | দক্ষিণ পশ্চিম চিনের সিচুয়ান প্রদেশের এই ছোট্ট গ্রামটা এতই প্রত্যন্ত এখান থেকে বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ হল ওই বাঁশের সিঁড়ি |

জীবন হাতে করে নিয়ে না নামলে বাইরের জগতের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে এই জনপদ | তাই ছোটদের স্কুল বা বড়দের জীবিকা সবকিছুর মাঝে দাঁড়িয়ে থাকে খাড়াই ২৬২৫ ফিট ধরে বাঁশের মই | দুজন অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে শিশুরা মাসে একবারই যায় স্কুলে | দু সপ্তাহ থাকে বোর্ডিং-এ | আবার ফিরে আসে গ্রামে | এভাবেই চলে এদের পঠনপাঠন | গ্রামবাসীদের জীবিকা বলতে আলু‚ বাদাম‚ লঙ্কার মতো শাক সব্জি ফলিয়ে বিক্রি করা | তার জন্যও নামতে হবে ওই সিঁড়ি বেয়ে |

এক চিলতে আতুলিয়ের গ্রামে বাস মাত্র ৭২ টি পরিবারের | সংখ্যালঘু য়ি গোষ্ঠীর এই মানুষগুলোর নিত্যসঙ্গী হল চরম দারিদ্র্য | তারা মেনে নিয়েছে‚ গ্রাম ছেড়ে বাইরে কোথাও যেতে হলে দেড় ঘণ্টা ধরে নামতে হবে | তারপর উঠতে হবে দু ঘণ্টা ধরে | সঙ্গে বাচ্চা থাকলে সময় লাগবে আরও বেশি | অশক্ত বৃদ্ধ থাকলে তাকে বেঁধে নিতে হবে পিঠে |

সম্প্রতি আতুলিয়ের গ্রামের উপর তথ্যচিত্র বানিয়েছেন ফোটোগ্রাফার চেন জি | তিনি জানতেন না এই গ্রামের কথা | হঠাৎ দেখেন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বিপজ্জনক ভাবে নেমে আসছে শিশুরা | তখনই তাঁর অনুসন্ধানে প্রকাশ্যে আসে সবকিছু |

টানা তিনদিন আতুলিয়ের গ্রামে থেকে তথ্যচিত্র তৈরি করেন জি | তাঁর দৌলতে বাকি দুনিয়া জানতে পারে বিশ্বের ভয়ঙ্করতম স্কুলপথের কথা | সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় হতে টনক নড়েছে চিন সরকারের | জানানো হয়েছে খুব দ্রুত আতুলিয়ের গ্রাম ঘিরে পাহাড়ের গা বেয়ে তৈরি হবে ইস্পাতের সিঁড়ি |

শুনে বিস্মিত হয়ে গেছে এই গ্রামের মানুষগুলো | তাদের কাছে এসব কিছুই স্বপ্নসম | কারণ জন্ম থেকে তারা দেখে আসছে বাঁশের মই বৃষ্টিতে পচে গেলে লাগানো হয় নতুন মই | এক আজনবি ছবি-বাবু এসে কেমন যেন ওলট পালট করে দিল তাদের ছোট্ট জীবন | যেটা নাকি হাতে করে নিয়ে চলতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে তারা |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.