সরস্বতী কতটা সতী? ব্রহ্মার কামনা, পতিতালয়ে বারাঙ্গনা!

5755

পুরাণ থেকে মনের উড়ান, যুক্তি-তর্কে রমাপদ পাহাড়ি

  • অ্যায় বাঁড়ুজ্জে! মনে আছে তো ইস্কুলের পুজোটা …!

সাতসকালে সেলফোনে এভাবেই চুলকে দিয়েছিলেন ঘোষবাবু। অনাদিবাবুকে।

অনাদি, এই চুলকানির জন্য সেলিকল কিম্বা আদি ঢোল কোম্পানির মলম ব্যবহার করেন না। আবার চুলকানিটাও সহ্য করতে পারেন না। কতবার ঘোষবাবুকে ইনিয়ে-বিনিয়ে বিনয়ের অবতার হয়ে বলেছেন, ‘প্লি-ই-জ, আমাকে বাঁড়ুজ্জে বলে ডাকবেন না। কেমন যেন নিজেকে ‘বাঁকুড়া-বাঁকুড়া’ লাগে!’

কিন্তু ঘোষবাবুরই একই খুজলি স্বভাব। খোস-পাঁচড়া জাগিয়ে তোলা। সত্যি কোথায় যে চুলকোয় কে জানে! শুধু ঘোষবাবু নয়, সেদিন সন্ধ্যায় মেয়েটাও চুলকে চুয়াল্লিশ করে ছাড়ল অনাদিকে।

বামুনের ছেলে অনাদি। চেষ্টা করেন সংস্কৃত মন্ত্রের তলপেট টিপে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নামক নাড়িভুঁড়ি বের করে আনতে। জেনেবুঝে সেগুলি উচ্চারণ করতে। সামনেই সরস্বতী পুজো। বাড়িতে, এমনকি স্কুলের পুজোটাও তাকেই সারতে হয়। তাই সেদিন সন্ধ্বেবেলায় ‘মা সরস্বতীর পূজার্চনাদি’ নামে বইটি খুলে গুনগুন করে মন্ত্রটন্ত্র আওড়াচ্ছিলেন অনাদি। এমন সময় হাজির ‘বক্তিয়ার খিলজি’ (স্ত্রী লিঙ্গে) শান্তা। খইফোটানো একঝাঁক প্রশ্ন।

অনাদিবাবুর কাঁধ দুটো উত্তরপ্রাপ্তির ঝাকা ভেবে ঝাঁকিয়েই চলে শান্তা। প্রশ্নবাণে জর্জরিত শান্তার সার্চ-ইঞ্জিন অনাদি বাঁড়ুজ্জে। একসময় বলে ওঠেন, লক্ষ্মী মেয়ে আমার, একটু রেহাই দে। সামনেই সরস্বতী পুজো। মন্ত্রতন্ত্র গুলো একটু ঝালিয়ে নিই, তারপর তোর প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি।

ধাঁ করে প্রশ্নটা করে বসে শান্তা। … আচ্ছা বাবা, তুমি তো মা সরস্বতীকে এত মানো, কই কখনও তো আমাকে ‘লক্ষ্মী মেয়ে’ না বলে ‘সরস্বতী মেয়ে’ বলে ডাকো না!

  • তুই কখন যাবি?
  • হ্যাঁ, যাচ্ছি তো! কিন্তু কই বললে না তো, আমাকে তুমি কখনও ‘সরস্বতী মেয়ে’ বলে ডাকো না কেন?
  • উফ্‌ফ্‌ফ্‌, তুই যাবি!

পতিদেবকে বাঁচাতে সতীসাধ্যি সুমিত্রা সেদিন মেয়েকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন। ক্ষনিকের জন্য হলেও হাঁফ ছেড়েছিলেন অনাদি। অথচ, মেয়ের প্রশ্নটা ঘিলু চটকাতেই থাকে, কলুর বলদের মতো।

বাপের ঠিক নেই!

অনাদিবাবু মনে করতে শুরু করেন, ব্রহ্মবৈবর্ত্য পুরাণের কথাগুলো। মর্ত্যধামে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নাকি শ্রীশ্রী সরস্বতী পুজোর প্রচলন করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ যখন মাত্র সাত বছর, তখনই তিনি মাঘমাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পুজো করেছিলেন। এই পূজা স্বর্গ-মর্ত্য দুই লোকেই দেবতা, কিন্নর, ঋষি, মহর্ষি, রাজা-প্রজা সবাই শ্রদ্ধার সঙ্গে করে আসছেন। অনাদিবাবু এবার ভাবতে থাকেন মা সরস্বতীর বংশ পরিচয়ের কথা। একটি মত বলছে, সরস্বতী নাকি ব্রহ্মার মেয়ে। আরেক মতে কৃষ্ণ তাঁর পিতা। অন্য মতে, বিষ্ণুর স্ত্রী। এক মতে, ব্রহ্মা সরস্বতীর স্বামী। কোথাও আবার ব্রহ্মার বোন রূপে সরস্বতীর পরিচয়। এক জায়গায় আবার তিনি ইন্দ্রের মা। অনাদিবাবু এবার ভির্মি খেতে শুরু করেন। নানা মুনির নানা মতের কথা যদি মেয়ে একবার জানতে পারে, তাহলে প্রশ্নে-প্রশ্নে প্যান্টালুনে পেন্টুলুন কিনিয়েই ছাড়বে।

ছিলেন দেবী হলেন নদী

আচ্ছা মেয়েকে কি এই গল্পটা বলা যায়? গঙ্গা, লক্ষ্মী আর সরস্বতী-তিনজনেই বিষ্ণুর স্ত্রী। তিন সতীন। আর ‘সতীন’ মানেই তো একে অপরের সঙ্গে চুলোচুলি।

সেদিন বৈকুণ্ঠে তুমুল ঝগড়া। স্বর্গের ঝগড়া বলে কথা। সেখানে শাপ-শাপান্ত মাস্ট। কী শাপ? না, ‘তোকে মর্ত্যে নদী হয়ে জন্মাতে হবে! আর সেই নদীতে যত পাপী-তাপীরা আসবে, তারা চান করবে তোর জলে। তাদের যত পাপের বোঝা, সব তোকেই বইতে হবে! এই আমি বলে দিলুম!’ – এই শাপশাপান্ত কোনো একজনের নয়, প্রত্যেকে প্রত্যেককে দিয়েছেন। দেবীর শাপ বলে কথা, অতএব ‘ফলিবেই ফলিবে’। হয়েছেও তাই। গঙ্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী তিন দেবীকেই নামতে হয়েছে মর্ত্যে। নদীরূপে। একমাত্র নাম বদলে গেছে মা লক্ষ্মীর। মর্ত্যবাসী তাঁকে চেনে পদ্মা নামে। সরস্বতী নদীর দুই তীরে আর্য ঋষিরা নিত্য বেদপাঠ করেছেন। অধ্যয়ন, অধ্যাপনা করেছেন। সেই পাঠ দু-কান খুলে শুনেছেন সরস্বতী। তাঁর জিভ থেকে প্রতিধ্বনিত হয়েছে বেদমন্ত্র। সরস্বতী হয়েছেন বেদস্বরূপা। বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। একরূপে তিনি নদী হলেও, অন্যরূপে তিনি বীণাপুস্তকধারিণী। জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রদায়িনী। অন্ধকারনাশিনী।

সগগধামে কেলেংকারি

না ফুরোনো পুরাণকথা না হয় মেয়েকে শোনালেন অনাদিবাবু, কিন্তু এর দ্বারা ‘সরস্বতী মেয়ে’ নয় কেন, নাঃ বোঝানো যাবে না। আবারও তিনি পুরাণকথা ঘেঁটে ঘণ্ট বানান। দেখেন, কোনো কোনো পুরানে সরস্বতীর চরিত্রে চ্যবনপ্রাশ লাগিয়ে চ্যাটচ্যাটে চাটনি বানিয়ে ছাড়া হয়েছে। শিবপুরাণ খুলে বসলেন। সেখানে পেলেন, ব্রহ্মা বসে ধ্যান করছেন। ধ্যানের ফলে তাঁর শরীরে সত্ত্বগুণ ক্রমশ জাগছে। সেই সত্ত্বগুণই এক পরমাসুন্দরী বিদুষী কন্যার রূপ ধরে ব্রহ্মার মুখ থেকে বেরিয়ে এল। ব্রহ্মা তাঁর নাম রাখলেন ‘সরস্বতী’। মেয়েকে ডেকে ব্রহ্মা বললেন, শোনো মা, তুমি সকলের জিভের ডগায় অবস্থান করবে। এছাড়া, তুমি নদীর রূপ ধরে পৃথিবীতে চরকি কাটবে।

মেয়ে সরস্বতী, বাবার কথায় রাজি। কিন্তু সগগধামে কেলেংকারিটা যে হওয়ারই ছিল। হল কী, ব্রহ্মা নিজেই সরস্বতীর রূপজালে জড়িয়ে পড়লেন। আদর পাওয়ার ইচ্ছা বুক-পেট-নাভি ছাড়িয়ে তলপেটে হাজির হল। পিতা হয়েও তিনি সরস্বতীর পিছু নিলেন। সরস্বতীর তখন লজ্জায় মজ্জা বিঁধে যাওয়ার অবস্থা। তিনি ব্রহ্মার হাত থেকে বাঁচতে পটাং-পটাং করে এদিক-ওদিক পালাতে শুরু করেন। কিন্তু স্বর্গধামের কাণ্ড, তাই সরস্বতী যেদিকে যান, সেদিকেই ব্রহ্মার একটি মুখ গজিয়ে ওঠে। নিরুপায় সরস্বতী অবশেষে ওপরের দিকে উঠে গেলেন। ব্রহ্মাও নাছোড়বান্দা। তাঁর কামাগ্নি ভিসুভিয়াসের অগ্নুৎপাত হওয়ার অপেক্ষায়। মাথার চাঁদি থেকে বের করলেন পাঁচ নম্বর মুখ। সরস্বতী তখন করলেন কী, ব্রহ্মাকে শাপ দিয়ে বসলেন, তোমার এই পঞ্চম মুণ্ডু উড়ে যাবে।

সরস্বতীর ‘মনু’ লাভ

অভিশাপও বিনা হজমিগুলিতে হজম করে ফেললেন ব্রহ্মদেব। কামশরে জর্জরিত ব্রহ্মার হাত থেকে মুক্তি পেলেন না সরস্বতী। ফল, পুত্রলাভ। সেই ছেলেই নাকি ‘মনু’। প্রথম মনু। যাঁর বংশধর আমরা মানুষেরা।

গণিকালয়ে গণ উৎসবে

এমন সময় বামুন-কাম শিক্ষক-কাম শান্তার সার্চ ইঞ্জিন অনাদিবাবুর মনে পড়ে যায় অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণের লেখা ‘সরস্বতী’ বইটির কথা। পাতা উলটে দেখেন, আমাদের দেশে নাকি এই সেদিনও সরস্বতীর মূর্তিপুজার প্রচলনই ছিল না। অমূল্যচরণ বইটি লিখেছেন ১৩৪০ বঙ্গাব্দে। এখন ১৪২৪। চুরাশি বছরের বিস্তর ফারাক। যাই হোক, তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘সত্তর-আশি বৎসর পূর্বে কলিকাতায় গণিকাদের বাড়িতে কলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী রূপে সরস্বতী পূজায় বেজায় ধুম হইত।’ তাছাড়া গণিকালয়ে দুটো পুজোর খুব রমরমা ছিল – কার্তিক এবং সরস্বতীর। বিদ্যাভূষণমশাই বলছেন, ‘সরস্বতী নিজে স্ত্রী দেবতা, কিন্তু স্ত্রী লোকেরা অঞ্জলি দিতে পাইত না। বাঙালির বোধহয় ভয় ছিল, পাছে মেয়েরা দেবীর অনুগ্রহে লেখাপড়া শিখিয়া ফেলে।’ –এই তো ক্লু পেয়েছেন অনাদিবাবু, ‘সরস্বতী মেয়ে’ না বলার। কিন্তু পতিতালয়ের খবর কি মেয়ের কানে তোলার মতো? তাছাড়া, মা সরস্বতীকে যখন তারা বিদ্যার দেবী রূপে মান্যিগন্যি করে! তাহলে?

সিন্ডারেলা নাকি পরী!

মা সরস্বতীকে যতই ছেলেপুলেরা ‘ম্যা-ম্যা’ করে ডাকতে থাকুক, তবুও জবজবে ভক্তি-শ্রদ্ধা আদায় করে নেবার ক্ষমতা রাখেন তিনি! সত্যিই কি, সরস্বতীর মূর্তি দেখে তেমন কোনো মাতৃভাব জাগে? পেখমমেলা হাঁসের বাহারি ঘেরাটোপে সরস্বতী। সিন্ডারেলা নাকি! নাকি কোনো পরী! কেমন যেন সেই বয়সেই রক্ত চলকে উঠত।

ভারী স্তন, আহা কি বর্ণন!

সরস্বতীর ধ্যানমন্ত্রটা মনে করেন অনাদি।

ওঁ তরুণশকল মিন্দোর্বিভ্রতী শুভ্রকান্তিঃ                                           
কুচভরনমিতাঙ্গী সন্নিষন্না সিতাব্জে।                                                  নিজকরকমলোদ্যল্লেখনীপুস্তকশ্রীঃ                                          
সকলবিভবসিদ্ধৈ পাতু বাগ্‌দেবতা নমঃ।।

চাঁদের নতুন কলা, অর্থাৎ একফালি চাঁদ যিনি মাথায় ধারণ করে আছেন। যাঁর গায়ের রং সাদা, যিনি কুচভরনমিতাঙ্গী (অর্থাৎ, স্তনভারে যার শরীর নুয়ে পড়েছে), যিনি সাদা পদ্মের ওপর বসে আছেন, হাতে যাঁর কলম আর বই, সেই বাগ্‌দেবী সমস্ত বিভবপ্রাপ্তির জন্য আমাদেরকে রক্ষা করুন।

পতিতালয়ে মেমসাহেব

মা সরস্বতীর এমন আকর্ষণীয় শরীরী বর্ণনার গুনেই কি তিনি পতিতালয়ে একসময় ধুমধামের সঙ্গে পুজিতা হতেন? শুধু বিদ্যা নয়, বাদ্যি অর্থাৎ গান-বাজনায় পারঙ্গমতার জন্যও কি তিনি গনিকাদের এত আদরণীয়? তাছাড়া, সরস্বতী পুজোর দিনটাই তো অনাদির মতো একটু শ্যাওলা পড়া পাবলিকদের ভ্যালেন্টাইন ডে!

অনাদি আরও যুক্তি খুঁজতে থাকেন।, ‘সরস্বতী মেয়ে’ না বলার যুক্তি। বুদ্ধিকে প্রখর করে তোলেন। এবার আর পুরাণ নয়, একজন তার্কিকের চোখে দেখতে চান মা সরস্বতীকে। পুরাণ বলছে, সরস্বতী ধবধবে ফরসা, পরমাসুন্দরী। চাঁদ, কুন্দফুল, তুষারের মতো সাদা। মেমসাহেব। এমনকি শাড়ি-ব্লাউজও শ্বেতশুভ্র। বড়ো বড়ো টানা টানা পদ্মফুলের মতো চোখ। স্তনের ভারে সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে পড়েছেন। স্তনযুগলের ওপর মুক্তর হার দুলছে। হাতে সাদা রুদ্রাক্ষের মালা। এছাড়া সাদা বীণা এবং বই। কখনও কলম ও বই। বসে আছেন সাদা পদ্মের ওপর। সারা গায়ে সাদা চন্দনের আতর। গায়ের গয়নাও সব সাদা ফুলের। বাহনটিও ধবধবে। তাই সরস্বতী, ‘মানসে রমতাং নিত্যং সর্বশুক্লা সরস্বতী’। – এমন ফ্যাশনেবল দেবী মূর্তি শুধুই কি দেবী’? নাকি, আমাদের ‘স্বপ্নেদেখা রাজকন্যা’!

ইচ্ছে হয় হাঁটু গেড়ে বসি

সরস্বতীর অস্তিত্ব খুঁজতে গিয়ে অনাদি তখন সরস্বতীময়। হাতের কাছেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাব্যগ্রন্থ। সেখানেই তো পড়েছিলেন,

  • তুমি তো জানো না তুমি কে!
  • কে আমি?
  • তুমি সরস্বতী, শব্দটির মূল অর্থে যদিও মানবী, তাই কাছাকাছি পাওয়া                                            
    মাঝে মাঝে নারী নামে ডাকি।

………।

  • তুমি দেবী, ইচ্ছে হয় হাঁটু গেড়ে বসি মাথায় তোমার করতল, আশীর্বাদ

…………

  • কী চাও আমার কাছে?
  • কিছু নয়। আমার দু-চোখে যদি ধুলো পড়ে আঁচলের ভাপ দিয়ে মুছে দেবে?

আগে পেট, পড়ে মাথা

অনাদি আবারও ভাবতে থাকেন, সরস্বতী আসলে কে? দেবী, নাকি পুরুষের মানুষপ্রতিমা? তাছাড়া, এ সমাজে বিদ্যেবতীর চেয়ে যে অন্ন-লক্ষ্মীরই কদর বেশি। ঐশীর মায়ের কথাটা মনে পড়ে যায় অনাদির।

  • জানো তো, এবারে সরস্বতী পুজোটা বেশ ধূমধামের সঙ্গে করতে হবে!
  • কেন গো ঐশীর মা?
  • আরে, মেয়েটা এবারে মাধ্যমিক দেবে না!
  • তাই বলো! আমার বাবা ওসব পাট চুকেই গেছে। ছেলে তো এবার ইঞ্জিনিয়ারিং কমপ্লিট করে চাকরিতে যোগ দিয়েছে।

তার মানে, বিদ্যে-বৈতরণী পার হতেই শুধু সরস্বতীর আরাধনা প্রয়োজন? গিভ এন্ড টেক! এ পোড়া দেশে বিদ্যে না হলেও চলে, কিন্তু লক্ষ্মীকে ট্যাঁকে রাখতেই হয়। ক্লাস নাইনে পড়া মেয়ে শান্তাকে এসব ‘বড়োদের কথা’ বোঝাবেন কীভাবে? তাই নিজের মনেই দু-একটা সহজ যুক্তি তৈরি করে নেন অনাদি।

মা সরস্বতী বছরে সাকুল্যে আসেন মাত্র দু-বার। একবার তাঁর মায়ের সঙ্গে, আরেকবার একা-একা শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে। অন্যদিকে মা লক্ষ্মী মায়ের সঙ্গে তো আসেনই, কোজাগরী রাতে এবং বৃহস্পতিবার বাঙালির ঘরে ঘরে তাঁর সাপ্তাহিক ভ্রমণ। তাছাড়া পেটে বিদ্যে না নিয়েও তো একটি মেয়ে পৃথিবীতে কতরকম কাজই না করতে পারে। আগে তো পেট, পরে মাথা।। মা  লক্ষ্মীর দয়া না হলে পেট ভরে না, আর পেট ভরলে তবেই পড়াশোনা-গানবাজনা-সাহিত্যচর্চা। অনাদি মেয়েকে এও বলবেন যে, ‘সরস্বতী’ শব্দটি ‘লক্ষ্মী’র চেয়ে একটু বড়ো শব্দ। ‘সরস্বতী’ উচ্চারণে জিভ জড়িয়ে জটিঙ্গা পাখি হয়ে যায়। ফলে, দেশগাঁয়ের মানুষ সেই যে ‘লক্ষ্মী মেয়ে’ বলে কোন আদ্যিকাল থেকে ডাকতে শুরু করেছে, তা মুখে মুখে চলে আসছে অনাদি অনন্তকাল ধরে।

বাদবাকি ব্যাখ্যা না হয় মেয়ে বড়ো হয়েই জানবে! অনাদি মনে মনে মাথা ঠোকেন মা সরস্বতীর পায়ে। যুক্তি-তর্কগুলো একে একে ঠোঁটের ডগায় সাজিয়ে দেওয়ার জন্য। শিক্ষক-পিতা অনাদির মনে পড়ে যায়, ব্যাধের শরে ক্রৌঞ্চীর মৃত্যুতে শোকাহত বাল্মীকির কথা। ঠিক ওই সময় যদি মা সরস্বতী তাঁর কণ্ঠে-জিহ্বায় ঠাঁই না নিতেন, তাহলে পৃথিবীর প্রথম শ্লোকটি লেখা হত কি! লেখা হত কি রামায়ণের মতো মহাকাব্য!

Advertisements
Previous articleভানুমতী কিংবা সরস্বতী কা খেল!
Next articleসরস্বতীর সাতকাহন
রমাপদ পাহাড়ি
মাতৃপদত্ত নাম। যারা ‘নামেন পরিচিয়তে’ বিশ্বাস করেন, তাদের কাছে শ্যাওলা পড়া সত্তরোর্ধ্ব জনৈক ‘বুডঢা আদমি।’ আদতে কচি ঢ্যাঁড়স। পিছন টিপে পরীক্ষা প্রার্থনীয়। আগ্রহ সাহিত্য ও অর্থনীতিতে। জন্ম পূর্ব মেদিনীপুরে, কর্ম কলকাতায়। পত্রিকা সম্পাদনার পাশাপাশি এফ এম রেনবো ও গোল্ডে বকবকম। কাঠিবাজিতে সুনাম নেই। জীবনের আপ্তবাক্য, ‘মাথা গরম করবেন না, খুসকি বাড়বে’।

7 COMMENTS

  1. অনেক অজানা ও জানা তথ্য অসাধারণ ভাবে জানলাম

  2. লেখাটি নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মতামত শেয়ার করলাম, সৌজন্যে বইপোকা

    Ayan Basu
    সংস্কৃত ব্যাকরণের জ্ঞান না থাকায় অনেকেই এই মন্ত্রটির অপব্যাখ্যা করেন।এটি একমাত্র আমাদের বঙ্গভূমিতেই কেবল প্রচলিত আছে।
    এখানে “কুচযুগশোভিত” তে ৩টে শব্দ যুক্তাক্ষরের দ্বারা যুক্ত হয়ে আছে। যথা – কুর্চ+যুগঃ+শোভিত, এখানে “কুর্চ” শব্দের রেফ টি যুক্তাক্ষরের সময় লোপ পেয়ে হয়েছে”কুচ”, কিন্তু এখানে মূল শব্দটি হল “কুর্চ”। এর বাংলাতে উচ্চারণ হয় “কুর্চ” হিসাবে ও সংস্কৃতে উচ্চারণ হয় “কুর্চ” হিসাবে। সুতরাং, উক্ত মন্ত্রের শুদ্ধ অনুবাদ নিম্নরূপ-

    (মন্ত্র)
    ওঁ জয় জয় দেবি চরাচরসারে কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।
    বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতি ভারতি দেবি নমোহস্তুতে।।

    (শব্দার্থ)
    (ওঁ)পরমাত্মা/ঈশ্বর (জয় জয়)জয় জয়কার (দেবি) হে দেবী (চরাচরসারে)সর্বব্যাপী, (কুর্চ)বৃদ্ধা ও মধ্য অঙ্গুলীর অগ্রাংশ (যুগঃ)দীপ্তিময় (শোভিত)শোভাবর্ধক (মুক্তাহারে)মুক্তো মালা দ্বারা। (বীণারঞ্জিত)বীণা দ্বারা রঞ্জিত (পুস্তক হস্তে)পুস্তক হাতে,(ভগবতি)হে নারী রূপিণী পরমাত্মা/ঈশ্বর (ভারতি)হে বাণী (দেবি)হে দেবী (নমোহস্তুতে)আপনাকে করজোড়ে প্রণাম/নমস্কার।।

    (ভাবার্থ)
    উক্ত সর্বব্যাপী পরমাত্মারূপিণী দেবীর জয়,যাঁহার অঙ্গুলীর অগ্রাংশ দীপ্তিময় মুক্তোমালা দ্বারা শোভিত।
    যাঁহার কর বীণা দ্বারা রঞ্জিত, হস্তে পুস্তক(বেদ) ধারণকারিণী,সেই পরমাত্মারূপিণী বাণীদেবীকে করজোড়ে প্রণাম করি।

    (মন্তব্য)
    দেবীভাগবত পুরাণে , নবম স্কন্ধ, অধ্যায় ১, ২ ও ৪ তে উল্লেখ আছে মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে শ্রীকৃষ্ণ নিজে দেবীর পূজা করে দেবী পূজার প্রবর্তন করেন এবং দান স্বরূপ তিনি দেবীকে সর্ব্বোত্তম একটি মু্ক্তোমালা দান করেন, যা দেবী জপমালা হিসাবে গ্রহণ করেন। যার জন্য দেবীমূর্তিতে দেবীর এক হাতে মুক্তোর জপমালা বর্তমান।

    এরপর যদি আমরা বেদ থেকে বিশ্লেষণ করি তবে বীণা, পুস্তক ও জপমালা এই তিনটির উল্লেখ পাবো প্রতীক হিসাবে! ঋগ্বেদের ১.৩.১০-১২ ও ৬.৬১.১-১৪ তে দেবী সরস্বতীকে মূলত সর্বব্যাপী সূর্যাগ্নি ও নারীরূপী ঈশ্বরের একটি স্বরূপ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ঋগ্বেদ ১.৩.১০-১২ তে তিনি বাণী, মূর্তিতে যার প্রতীক এই বীণা।ঋগ্বেদ ১.৩.১০ ঋগ্বেদ ৬.৬১.১-৩ তিনি জ্ঞান, মূর্তিতে যার প্রতীক এই পুস্তক(বেদ)। ঋগ্বেদ ৬.৬১.৪-৫ তিনি দীপ্তময় জ্যোতির্মাতা এবং অন্ধজ্ঞানের নাশক, মূর্তিতে যার প্রতীক এই মুক্তো জপমালা।
    2
    Aditi Sen
    Khub bhalo laaglo…dhonyobaad
    3
    Sonali Dasgupta
    Ki sundor bhabe explain korlen… apurbo!
    4
    Supratik Chaudhuri
    Osadharon…. copy korlm
    5
    Arindam Datta
    Uff nrisingho Prasad Bhaduri er porei apni…satyi bolchi,yarki noi
    6
    Soumi Jana
    Khub valo laglo pore…asha korbo eta pore kichhu manuser vul val dharona badlabe.
    7
    Mitra Mukherjee
    সরস্বতী কে ‘সতী’ হতেই হবে এমন মাথার দিব্যি কারা দিল বলুন দেখি!
    8
    Ujjwal Mahata
    ‘সতী’ হবার সংজ্ঞা কিরকম? এরকম কিছুর দায় কি কেবল নারীর? বিয়ের আগে তো বেশ করে ব্রহ্মা কে বেশ করে তেল মারা হয়। তারমানে কি মনুর ছেলেরা বাপের মতো মেয়েভোগী হতে চায়?
    9
    Sudeshna Raha
    অনেক ধন্যবাদ এই মন্ত্রের শব্দার্থ ব্যাখ্যা করার জন্য। জানাা ছিল না, ভুল অর্থ জেনে বা আদৌ না জেনে মন্ত্রপাঠ নিষ্ফলা, সে পুজোর কোনো মানেই হয় না।
    10
    Nistha Chatterjee
    Montrer byakhya na apobyakhya
    11
    Sirin Dutta Chowdhury
    সরস্বতী সতী কিনা তদন্ত না করে বরং এত বিদূষী কীভাবে হলেন সেটা বুঝিয়ে বলুন দেখি। তাতে আমার বেশী লাভ হবে। আসলে কি বলুন তো, যার যেদিকে নজর।
    12
    Sanghita De
    সমস্যা টা হল এইসব মন্ত্র, পুরান, ইত্যাদির ব্যখ্যা কোনোটাই সরস্বতী কিংবা কোনো নারী লেখেননি, হবেই বা কি করে তখন তো নারীদের শিক্ষা থেকে অনেক দূরে রাখা হতো, সব e one sided version of the story আর male chauvinism প্রসূত. এরপর আবার তারাই এসেছে সরস্বতী র virginity বিচার করতে, বলি তিনি virgin না থাকলে কি তার সমস্ত বিদ্যা, কলা, সঙ্গীত evaporate করে যাবে? যতো সব কাজ নেই তো খই ভাজ.
    13
    Sandeep Choudhary
    সতীর ধারণা যে পুরুষ কেন্দ্রিক অথবা VIRGINITY RELATED নয় তা আমাদের পূজ্য পঞ্চ সতীর নামেই পরিষ্কার। তবে মনে হয় আলোচনাটি সুস্থ দিকে এগোচ্ছে না।
    14
    Raunak Chatterjee
    একটা কথা শুধু বলতে চাই- প্রাচীন ভারতীয়রা কিন্তু মহিলাদের স্তন কে কিন্তু অনর্থক অব্জেক্টিফাই করতেন না। বস্তুত নারী দেহের একটি সাধারণ অঙ্গ হিসাবেই দেখতেন এবং তার সৌন্দর্য বর্ণনা করতেন। দুর্গা দেবীর ধ্যানমন্ত্রে তাই আছে পীন্নোনতপয়োধরাম। গত শতাব্দী তেও বালী দ্বীপে নারীরা বক্ষ অনাবৃত রাখত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.