রেল তো বাপের সম্পত্তি; এ সি কামরা থেকে চাদর‚ কম্বল‚ তোয়ালে ঝেড়ে দেওয়া জন্মগত অধিকার

সম্ভাব্য কথোপকথনটা অনেকটা এই রকম।

অ্যাই ওঠো এবারে। গাড়ি স্টেশনে ঢুকছে তো আর মিনিট দশেকে।

কি যে বলো! আমি তো সেই থেকে জেগেই আছি। গুছোচ্ছি তো।

সব দেখে টেখে নিয়েছ তো? কিছু ফেলে যাবে না কিন্তু।

আরে না না। সে আর বলতে। আর ক’বার শেখাবে?

চাদরটা নিয়েছ?

অলরেডি ব্যাগে।

কম্বলটা?

ব্যাগে।

বালিশের কভার?

হি হি।

ছোট তোয়ালেটা?

ইয়েস স্যার।

জলদি ওঠো। বালিশটাও নিয়ে নি।

ঠিকাছে ঠিকাছে। আমি একটু টয়লেটে যাই। নতুন হ্যান্ডওয়াশ দিয়েছে দেখলাম। ফাঁকা শিশিটায় ভরে নিই

হি হি। দুপুরে এগ রোল। রাত্তিরে বেড রোল।

রেলযাত্রীরা চৌর্যবৃত্তিতে শৌর্যবৃত্তি লাভ করেছেন সম্প্রতি। ভারতীয় রেল ইঞ্জিনের ভোঁ নয়, দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানিয়েছে ২০১৭১৮ সালে কোটি কোটি টাকার জিনিস গায়েব করে দিয়েছেন রেলযাত্রীরা। এর সিংহভাগটাই করেছেন কলার উঁচু করে এসি কামরায় যাঁরা ঢোকেন, তাঁরা। হিসেব শুনলে চোখ ছানাবড়া নয়, পিজার মতো হবে। বারো লক্ষ তিরাশি হাজার হাত মোছার তোয়ালে, তিন লক্ষ চোদ্দ হাজার বালিশের কভার, চার লক্ষ একাত্তর হাজার চাদর, সাড়ে ছেচল্লিশ হাজার কম্বল আর ছাপ্পান্ন হাজার বালিশ। ভ্যানিশ! এর বাজারদর চোদ্দ কোটি টাকার কাছাকাছি। শুধু বিছানাপত্তর নয়, লোপাট হয়েছে টয়লেটের মগ, কল, ফ্ল্যাশপাইপ, আয়নাও। টিকিটের মধ্যেই দাম ধরা আছে ভেবে আমার আপনার সহযাত্রীরাই তা আপন করে নিয়েছেন। রেলের হিসেবে ভুল ছিল। সপ্তাহখানেক আগে এক লম্বা যাত্রায় এসি কামরায় উঠে দেখলাম, বেডরোল দিতেই এক ভদ্রমহিলা ক্যান্ডিক্রাশ খেলতে খেলতে তাঁর ক্লাস ওয়ানে পড়া ছেলেকে বলছেন, ‘বেবি। কালেক্ট দ্য ব্রাউন পেপার্স। জলদি।’ বেবিও ক্যান্ডিক্রাশ খেলছিল। মায়ের আদেশ মুখ থেকে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে সারাদিনের দুষ্টুমিতে পুষ্টি বাকি না থাকা বাচ্চা সবকটা বালিশের কভার, চাদর বড় বড় ব্রাউন খাম থেকে বের করে খামগুলো ব্যাগে ভরতে শুরু করে দিল। বেবিরা নিষ্পাপ হয়, বেবিদের সাদা মনে কাদা থাকে না, তাই নিজেদেরটার পাশাপাশি কামরার অন্যদেরটাও নিল। আঙ্কল, তোমারটা? আন্টি, ইওর্স? কালেকশন শেষ হলে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এত ব্রাউন পেপার দিয়ে কি হবে, বেবি?’ নিষ্পাপ বেবি বলে উঠেছিল, ‘আঙ্কল, বইয়ের মলাট দেব। আর এক্সেস যেটা হবে সেটা মামমাম আর পা কাগজওয়ালাকে সেল করে দেয়। তুমি জানো? নাইন রুপিজ এ কেজি। আমরা তো এভরি উইকএন্ডে ট্র্যাভেল করি।’ ইনসাইড ট্রেডিংয়ের গন্ধ পেতেই ভদ্রমহিলা আশি ডেসিবেলে বলে উঠলেন, ‘বেবি, তুমি আবার টাইম ওয়েস্ট করছ?’ ‘সরি মম’ বলে ক্লাস ওয়ান আবার ক্যান্ডি ক্রাশে মন দিল।

মানবঢেঁকি পাতালে গেলেও ধান ভাঙে। মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষ ইদানীং জব্বর বুঝেছেন, সকলি ফুরোল টোকেনপ্রায়। ‘ওয়েলকাম টু কলকাতা মেট্রোরেল’ কিংবা পরবর্তী স্টেশন ডানদিকেবাঁদিকে সুরেলা ঘোষণার পরেই গুঁজে দেওয়া হচ্ছে, ‘টোকেন মেট্রোরেলের সম্পত্তি। এগুলোকে বাইরে নিয়ে যাবেন না।’ এই ঘোষিকার গলায় মিষ্টত্ব নেই বিলকুল। হয়তো ইচ্ছে করেই। ‘দয়া করে আমার পকেটটি মারিবেন না’ বলার সময় কি গলায় মধু দিতে হয়? মেট্রো রেলে হালে টোকেন নামে একটা খুব জরুরি জিনিস চালু হয়েছে। মামাটিমানুষ খুব দ্রুত বুঝেছে, পাতালে প্রবেশ এবং প্রস্থানে সাহায্য করা ছাড়াও এই টোকেনের বহুমুখী প্রতিভা রয়েছে। টোকেন দিয়ে ক্যারমের আদর্শ ঘুঁটি হয়। নড়বড়ে বেঞ্চিচৌকির অক্ষম পায়ার তলায় ঠিকঠাক খাপে খাপ হলে সমস্যার সমাধান হয়ে যায় চুটকিতে। গোটা দশেক যোগাড় করে ফেলতে পারলেই দেওয়ালের দারুণ ইন্টেরিয়র। দু’স্কোয়ার ফিট জায়গায় এলোমেলোভাবে দশটা চিপকে দিলে চমকদার অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট। বিশ্ববাংলা এই সুযোগ ছাড়বে কেন? মেট্রোরেলের কর্তারা এ নিয়ে অনেক ভাবনাচিন্তার পর কি পাইনি তার হিসাব মিলাতে রাজি হয়েছেন। জানা গিয়েছে, প্রতিদিন গড়ে নশোটা টোকেন খোয়া যায়। একটা টোকেনের দাম কুড়ি টাকা। এ বারে সোজা ঐকিক নিয়ম। মানে দিনে আঠেরো হাজার টাকার টোকেন মিশে যায় পঞ্চভূতে। মাসে সাড়ে পাঁচ লাখ। বছরে ষাট লাখ। কোনও প্রভাবশালী যদি মাথায় হাত রাখেন এবং অভয় দেন, তাহলে আসছে পুজোয় টোকেন দুর্গা হল বলে। ভাবনা রাজ্যের, মেটেরিয়াল কস্ট কেন্দ্রের! দিল্লির বঞ্চনার যোগ্য জবাব। প্রতিটা মেট্রো স্টেশনেই সিঁড়ি লাগোয়া দেওয়ালে দেখেছি সেঁটে রাখা হয়েছে একটা ছোট প্লাস্টিকের বাক্স, লেটারবক্সের মতো। তার গায়ে লেখা, অব্যবহৃত টোকেন এখানে জমা করুন। বাক্সগুলোতে মাকড়সা আর আরশোলার মধ্যে সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্টের খেলা চলে। মেট্রোকর্তারা ভুরু কুঁচকে বলছেন, লোকে প্ল্যাটফর্মে ঢোকার সময় বাচ্চার জন্য টোকেন কেনে। মেশিনে পাঞ্চ করে। আর বেরনোর সময় বাচ্চা কোলে থাকলে বাচ্চার টোকেনও পকেটে থেকে যায়! হায় রে! নিজের চোখে প্রায়ই দেখি, সামনের জন টোকেন ঠেকানোর পর চিচিং ফাঁক হলেই গলে বেরিয়ে যান একের বদলে দুই। হয়তো বা তিনও। দুই বা তিন নম্বর পাঁচ টাকার টোকেন কিনে পঁচিশ টাকার যাত্রা করলেন কি না তার হিসাব কে রাখে। মেশিনগুলো সার্কিটের গভীরে ‘কেন করলে এ রকম’ বলে চলে। আর যাত্রীদের চোখে চোখে রাখার দায়িত্ব নিয়ে মেশিনগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন যে জনা দুই মেট্রো কর্মী, তাঁদের দৃষ্টি এ সব লঘু পাপের অনেক ঊর্ধ্বে থাকে।

গঙ্গার দৈর্ঘ্য আড়াই হাজার কিলোমিটার। আর ভারতীয় রেলের সব কটা ট্র্যাক মেলালে যে দৈর্ঘ্য হয়, তা হল এক লক্ষ পনেরো হাজার কিলোমিটার। বিস্তীর্ণ দুপারের অসংখ্য মানুষের হাহাকার এরা দু’জনেই শোনে। হাহাকার করেও। গঙ্গার হাহাকার শোনার জন্য এখন মোদীবাবু আছেন। এ দেশ নদীমাতৃক, অধুনা মোদীমাতৃকও বটে। কিন্তু রেলের হাহাকার শোনার জন্য আছে কে? স্টোনচিপ, ফিশপ্লেট তো ছেড়েই দেওয়া গেল। ব্যাক্তিগত প্রয়োজনে চুরি হয়েছে রেলের লাইন, এমন নজিরও আছে। এবং সেই সংখ্যাটা হাতে গোণা নয়। ব্যাপারটা অনেকটা এক ধুঁকতে থাকা রোগীর শরীর থেকে কিডনিটা, লিভারটা বের করে নেওয়ার মতো, তাও বিনা অ্যানেস্থেশিয়ায়। রেলমন্ত্রক নাকি সরকারের মধ্যে থাকা আরও একটা সরকার। কিন্তু বছরের পর বছর ঘুরে যায়। দগদগে ঘা আর শুকোয় না।

রেলকর্তারা বলেছেন, টহলদারি করে কিছু হবে না। দরকার জন সচেতনতা। কিন্তু অপ্রিয় প্রশ্নটা হল, এই জন সচেতনতা বাড়ানোর জন্য যেটুকু করা দরকার, তার সিকিভাগও কি করছে রেলমন্ত্রক? হেডফোন কানে দিয়ে লেভেল ক্রসিং পারাপার না করার জন্য মাঝে মধ্যে বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। কিন্তু নিজের জীবন কিভাবে বাঁচে, তার কথা কি রেল ভাবে? নাকি সরকারি সংস্থা মাত্রই লোকসানের তিলক কপালে এঁকে নিয়ে পথ হাঁটাকে ভবিতব্য বলে মেনে নেওয়া হয়? টোকেন হাঁটে লাখে, কম্বলচাদর হাঁপায় কোটিতে। একটা সোজা প্রশ্ন, বোকার মতো। সামান্য মাল্টিপ্লেক্সে ঢুকতে গেলে ফ্রিস্কিং হয়। আমরা সেটাকে মেনে নিতে পারি, কিন্তু ট্রেন থেকে নামার সময়, বিশেষত এসি কোচগুলো থেকে, ফ্রিস্কিং চালু করার কথা ভাবতে পারি না। তাতে কি স্ট্যাটাস খর্ব হয়? প্রতিটা এসি কামরায় একজন অ্যাটেনডেন্ট থাকেন। তাঁর কাজ তো রাত্রে নাক ডেকে ঘুমনো নয়। যাত্রীদের যেন কোনও অসুবিধা না হয় তা দেখাটা যেমন তাঁর দায়িত্ব, একইভাবে কোনও যাত্রীর জন্য রেল যেন উল্টে অসুবিধায় না পড়ে, তা দেখাটাও অ্যাটেনডেন্টের উপরে বর্তায়। তাঁর কাছে তো চার্ট থাকে। কোন সিট নম্বরের যাত্রী কোথা থেকে উঠবেন আর কোথায় নামবেন, সেই তথ্যভান্ডার তাঁর হাতের মুঠোয়। একটা সামান্য চেকলিস্ট তৈরি করে কি মেলানো যায় না, রেল যা দিয়েছে তা ফেরত পাচ্ছে কি না? এতে অ্যাটেনডেন্টদের কাজ বাড়বে। কিন্তু এর ফলে আখেরে লাভ কার? ঠিকঠাক সময়ে বুক করা হলে আজকের দিনে বিমান আর রেলের এসি টু টায়ারের ভাড়া মোটামুটি হাত ধরাধরি করে চলে। বিমান থেকে নামার সময় তো সিটের উপরে রাখা ছোট্ট টাওয়েলটা ব্যাগে পুরে নিতে সাহস পাই না আমরা। লোকে দেখে ফেলার ভয়টা কাজ করে বলেই হয়তো সাহসে কুলায় না।

এই ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ ফ্যাক্টরটা ট্রেনে চালু করা কি খুব কঠিন? শতাব্দীদুরন্তরাজধানীতে দেওয়া টমেটো স্যুপে পোকা পাওয়া গেলে অনেক যাত্রী সরাসরি রেলমন্ত্রীকে ট্যুইট করে দেন আজকাল। খবরের কাগজ বলে, মন্ত্রীর চোখে পড়লে অনেক সময় ব্যবস্থাও হয়ে যায় জলদি। ট্যুইট অনেক দূরের বিষয়, কিন্তু পাশের যাত্রী যখন যাত্রা শেষে সরকারি কম্বলটাতোয়ালেটাচাদরটা নিজের ব্যাগে ঢুকিয়ে নিতে শুরু করেন নির্দ্বিধায়, তখন কি নিদেনপক্ষে কামরার অ্যাটেনডেন্টকেও সেটা জানানোর কথা আমরা ভাবতে পারি না?

এখন তো অফারময় জীবন আমাদের। একটা অফার চালু করা গেলে কিন্তু বেশ হত। কেউ যদি জানাতে পারেন সহযাত্রীর চুরির কথা, তাহলে তাঁর টিকিট ভাড়ার ফিফটি পার্সেন্ট ক্যাশব্যাক।

সাত টাকার বদলে আট টাকা ভাড়া নিলে যে দেশের বাস কন্ডাক্টরের ঠোঁট ফাটে ঘুষিতে, সে দেশে এর থেকে ভাল উপায় হতেই পারে না।

অম্লানকুসুম চক্রবর্তী
অম্লানকুসুমের জন্ম‚কর্ম‚ধর্ম সবই এই শহরে|বাংলা ছোটগল্পের পোকা|একেবারেই উচ্চাকাঙ্খী নয়‚অল্প লইয়া সুখী|

3 COMMENTS

  1. সেপ্টেম্বরে রাজধানী এক্সপ্রেসে দিল্লি তারপর মেবার এক্সপ্রেসে এসি থ্রি টিয়ারে উদয়পুরে গেছিলাম | ফেরার সময় চেতক এক্সপ্রেসে দিল্লি এসে ইন্ডিগোতে কলকাতা | ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছনোর আগেই কর্মীরা যাত্রীদের চাদর কম্বল গুনে মিলিয়ে ফেরত নিল | এরপরেও এসব অভিযোগ কাগজে পড়ছি | জানতে ইচ্ছে হয় কতটা সত্যি এই অভিযোগে | অন্য কোনও কেউ যদি কর্মীদের অসাবধানতা দেখে থাকেন জানালে অভিযোগের সত্যতা বুঝব নাহলে ভাবব এই চুরির কাজটা কর্মীরাই করে যাত্রীদের দোষী করছেন |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here