যে দক্ষিণের বারান্দার জন্য আকুল সুবর্ণলতা‚ তার বাতাসেই উড়ত দরজার পর্দা

তাঁর স্বরবর্ণ শুরু হয়েছিল  দিয়ে | ব্যঞ্জনবর্ণর প্রথম অক্ষর তাঁর কাছে ছিল চন্দ্রবিন্দু | শেষ থেকেই পথ চলা শুরু | সাহিত্যের অনেক না পাওয়ার আশা পূর্ণ করার লক্ষ্যে | 

উত্তর কলকাতার পটলডাঙায় যে বাড়িতে জন্ম‚ তা ছিল নবজাগরণের আলোয় উদ্ভাসিত | তাই সেই বাড়ির মেয়ে সরলাসুন্দরীর অক্ষরজ্ঞান তো বটেই | বাংলা সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক হওয়ার পথেও আসেনি বাধা | সরলাসুন্দরী তাঁর পিতৃগৃহে এসে জন্ম দিলেন কন্যার | ১৯০৯-এর ৮ জানুয়ারি | 

নাতনির নাম ঠাকুমা রাখলেন আশাপূর্ণা | কিন্তু একরত্তির শৈশবে দুরাশার অনুঘটক ছিলেন ঠাকুমা-ই | বৃন্দাবন বসু লেনের সাবেক একান্নবর্তী সেই পরিবারে মেয়েদের জন্য গঙ্গাজলের অভাব ছিল না | অভাব ছিল বাইরের আলোর | মেয়েদের পড়ানোর প্রাণপণ ইচ্ছে সরলাসুন্দরীর | কিন্তু জাঁদরেল শ্বাশুড়ির কাছে সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ | 

বাড়িতে গৃহশিক্ষক আসতেন | শুধুমাত্র বালকদের জন্য | বালিকাদের জন্য কড়ি দিয়ে বাঁধা হয়েছিল পুতুলখেলাকেই | তবে আইনের মতোই পর্দা থাকলে তার ফাঁকও থাকবে | যে দক্ষিণের বারান্দার জন্য আকুল ছিল সুবর্ণলতা‚ সেই দক্ষিণের বাতাসে উড়ত ঘরের দরজার পর্দা | চৌকাঠের পাশেই বসে থাকত বালিকা | ওই এক চিলতে অনুমতিই যথেষ্ট | পা না পারলেও চৌকাঠ পেরিয়ে গেল চোখ আর একাগ্র মন | দাদারা শ্লেট ধরে আছে | ফলে শেষ থেকেই শুরু হল পড়া | 

সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় অক্ষরজ্ঞান সম্পূর্ণ হল আশাপূর্ণার | তা যেন ছিল গুপ্তধন পাওয়ার চাবিকাঠি | ওই গুপ্তধন আসলে রাশি রাশি গল্পের বই | যা গোগ্রাসে পড়তেন সরলাসুন্দরী | ভোর থেকে নিরলস পরিশ্রমের পর দুপুরের সঙ্গী ছিল সাহিত্য | এ বার সেই আনন্দের ভাগীদার কন্যারা | পরবর্তী কালে আশাপূর্ণা জানিয়েছিলেন‚ তাঁর মায়ের জন্য পাড়ার পাঠাগার থেকেই বই এনেও কুলিয়ে ওঠা যেত না | গল্পের বইয়ের পাতায় সাদা কালো অক্ষরগুলোই ছিল নোনা ধরা শ্যাওলামাখা উঠোনে মুক্ত বাতাস |  

মুক্ত বাতাসের যোগান আরও বাড়ল | যখন আশাপূর্ণা দেবীর বাবা হরেন্দ্রনাথ গুপ্ত সপরিবারে উঠে এলেন নতুন বাড়িতে‚ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোডে | নতুন পাড়া‚ নতুন পাঠাগার‚ আরও অনেক বই | মা এবং তাঁর মেয়েদের আনন্দ আর ধরে না | কৈশোরেই বহু ধরণের বই পড়ে ফেলেছিলেন আশাপূর্ণা | মাত্র তেরো বছর বয়সে শিশুসাথী পত্রিকার দফতরে পাঠিয়েছিলেন নিজের লেখা | কবিতা‚  বাইরের ডাক  | সে লেখা প্রকাশিত তো হলই | সঙ্গে এল সম্পাদক রাজকুমার চক্রবর্তীর আর্জি | আরও লেখা চাই | 

কিন্তু তখন হরেন্দ্রনাথের মনে হল‚ এবার তো সুপাত্র চাই | কন্যা আশাপূর্ণার জন্য | ১৯২৪ সালে বিয়ে হয়ে গেল আশাপূর্ণার | এক বদ্যিবাড়ির মেয়ে অন্য বদ্যিবাড়ির বউ হলেন | পদবী গুপ্ত-ই থাকল | সেইসঙ্গে সুপ্ত রয়ে গেল অনেক গুপ্ত স্বপ্নই | কিশোরী ভেবেছিলেন‚ শ্বশুরবাড়ি গিয়ে দেখবেন সেখানে দেওয়ালজোড়া আলমারি ভর্তি বই | পঞ্চদশী দুধেআলতা পায়ে তাঁর নতুন ঠিকানায় গিয়ে দেখলেন সেখানে পঞ্জিকা ছাড়া আর কোনও বইয়ের অস্তিত্ব নেই | 

কৃষ্ণনগরের এক বইহীন বাড়িতেই শুরু হল আশাপূর্ণার সংসার | স্বামী কালিদাস গুপ্তর সঙ্গে | স্বামী-সন্তান-সংসার‚ এতগুলো নতুন -এর আড়ালে চাপা পড়ে গেল আর এক ‚ সাহিত্য | কিন্তু তাঁর মনের দৃঢ়তার জন্যই সেই চর্চায় মরচে ধরল না | আবার যখন তিনি কলম ধরলেন‚ একের পর এক হিরের আলোয় উদ্ভাসিত হল অন্ধকার খনি | 

তাঁকে লেখিকা থেকে সাহিত্যিক হতে দিতে চাননি অনেক বোদ্ধাই | তাঁর লেখা সুরভিত রান্নাঘরের তেল-নুন-হলুদের গন্ধে | তিনি নাকি শুধু মেয়েদের কথাই বলতে চেয়েছেন | যতদিন মেয়েদের মানুষ বলে ধরা হবে না‚ ততদিন অন্দরমহলের কথা-কে ধরে নেওয়া হবে মেয়েলি বলেই | তাই‚ সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক‚ স্থান কাল পাত্র‚ শশীবাবুর সংসার‚ তিন প্রহর‚ ত্রিমাত্রিক‚ দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে‚ বালুচরী‚ অবগুণ্ঠিতা‚ উত্তরলিপি‚ উত্তরণ‚ শুক্তি সাগর‚ সুখের চাবি-র কথাশিল্পী আজও অনেকের কাছেই পরিচিত  নারীবাদী কলম বলে | যদিও লেখকরা মেয়েদের কথা বললে অবশ্য তাঁদের  নারীবাদ তকমা পেতে হয় না |

কৈশোরে সাহিত্যচর্চা শুরু করা আশাপূর্ণা দেবী প্রথম দিকে লিখেছেন শুধুই শিশু ও কিশোরদের জন্য | বিয়ের পর ছোটদের জন্য লেখার সময় মাথায় থাকত একমাত্র ছেলে সুশান্তর কথা | পরবর্তী সময়ে দুই নাতনি শতরূপা আর শতদীপার কথা | তাঁর পাকশালে তৈরি স্বপ্নের রেলগাড়ি‚ পাড়ার ছেলে‚ মাত্র একখানা থান ইট‚ ভাগ্যে থাকলে কী না হয়‚ মজারু মামা‚ ছুটিতে ছোটাছুটি‚ নিখোঁজ নিরুদ্দেশ হতে গেলে‚ হারানো থেকে প্রাপ্তি‚ মানুষের মতো মানুষ‚ রাজকুমারের পোশাকে‚ চার বুড়োর আড্ডা‚ ভূতুড়ে কুকুর‚ অঙ্ক স্যর ও মোজার্ট‚ গজ উকিলের হত্যারহস্য‚ বোমার চেয়ে বিষময়-সহ আরও অনেক মণিমুক্তো আছে | পরের প্রজন্মের হাতে ওঠার অপেক্ষায় | বড়দের জন্য লেখা প্রথম ছোটগল্প পত্নী ও প্রেয়সী‚ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৬ সালে | তার আট বছর পরে প্রথম উপন্যাস‚ প্রেম ও প্রয়োজন |

কোনওদিন স্কুলের গণ্ডি না পেরোনো নিয়ে জীবনভর আক্ষেপ ছিল তাঁর | কিন্তু কী অনায়াস দক্ষতায় পাঠকের মনের আঙিনা পেরিয়ে আসন পেতে বসেছিলেন হৃদয়ে | সেখানেই পরম যত্নে বিছিয়ে দিয়েছেন প্রথম প্রতিশ্রুতি-সুবর্ণলতা-বকুলকথার নক্সীকাঁথা | সত্যবতী-সুবর্ণলতা-বকুল‚ এই তিনজনেই মিলেমিশে আছে তাঁর সত্তা | সেই আশাপূর্ণার সত্তা‚ যিনি সমাজকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে পড়াশোনা করেছেন | আবার সেই আশাপূর্ণাই সবরকম আচার বিচার মেনে শ্বাশুড়ির সেবা করেছেন | নিজে কড়ায় গণ্ডায় গুনে পালন করেছেন বৈধব্যের নিয়মকানুন | আবার খাটের উপর পাশবালিশ পেতে ভর দিয়ে উপুড় হয়ে জন্ম দিয়েছেন অন্তহীন রত্নরাজিতে ভরা সমুদ্রের | আবার তিনিই পুত্রবধূকে হাতে ধরে‚ শ্বাশুড়ির ভূমিকা পালন করে শিখিয়েছেন সাংসারিক খুঁটিনাটি | পুত্রবধূ নূপুরের কাছে তিনি শুধু ডাকসাইটে শ্বাশুড়ি বা বিখ্যাত সাহিত্যিক নন | বরং সেই অভিভাবক‚ যিনি জীবনের পাঠ দেন | 

বিয়ের পর কৃষ্ণনগর-ভবানীপুর-বেলতলা রোড হয়ে আশাপূর্ণা জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছিলেন গড়িয়ার কানুনগো পার্কের বাড়িতে | সংসার আর কলম চলত সমান তালে | একদিন ছুটি চাইলেন দুজনের কাছেই | সেই ছুটি এল ১৯৯৫-এর ১৩ জুলাই | সংসার আর সাহিত্যের চাবির গোছা দিয়ে গেলেন উত্তরসুরীদের হাতে | নিখুঁত নিকোনো খাটের উপর পড়ে রইল পাশবালিশ‚ সাদা পাতা‚ কলম, মোটা কালো ফ্রেমের চশমা | আর সাজানো থাকল জ্ঞানপীঠ পুরস্কার‚ পদ্মশ্রী সম্মান‚ সাহিত্য অ্যাকাডেমি ফেলোশিপ-সহ অজস্র স্বীকৃতি |  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here