নিজে ডাক্তার হতে পারেননি‚ কিন্তু বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক স্বামীর ছায়ায় মিলিয়েও যাননি

তাঁর নামকরণ কে করেছিলেন জানা যায় না | যিনি নাম দিয়েছিলেন তাঁকে চরম ভুল প্রমাণ করেছিলেন লেডি অবলা বসু | অবস্থান করতেন  অবলা শব্দের ৩৬০ ডিগ্রি বিপরীত মেরুতে | যোগ্য সহধর্মিণী ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক স্বামীর | কিন্তু কোনওদিন তাঁর ছায়ায় বিলীন হয়ে যাননি |

অবলার জন্ম ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দের ৮ অগাস্ট | আজকের বাংলাদেশের বরিশালে | তাঁর পৈতৃক পরিবার ছিল মেধা ও মননে অত্যন্ত সমৃদ্ধ | ঢাকার বিক্রম পুরে তেলিরবাগে বাস ছিল তাঁদের দাস পরিবারের | পরে চলে আসেন বরিশালে | সেখান থেকে কলকাতায় |

অবলার বাবা দুর্গামোহন ছিলেন ব্রাহ্ম আন্দোলনের অন্যতম হোতা এবং সংস্কারক | তাঁর এবং পরিবারের বাকি সদস্যদের সন্তানরা এক এক জন দিকপাল | দুর্গামোহনের ছেলে সতীশরঞ্জন ছিলেন বাংলার অ্যাডভোকেট জেনারেল | এক মেয়ে সরলা ছিলেন শিক্ষাবিদ ও গোখেল মেমোরিয়াল স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা | আর এক মেয়ে অবলাও কোনও অংশে কম যান না |

দুর্গামোহনের এক ভাই ভুবনমোহনের ছেলে ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস | আর এক ভাই রাখালচন্দ্রের ছেলে সুধীরঞ্জন ভারতের পঞ্চম চিফ জাস্টিস | এরকম এক আলোকিত বৃত্তে বেড়ে উঠেছিলেন অবলা | বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয় এবং বেথুন স্কুলের প্রথমদিকের ছাত্রী ছিলেন | ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে বৃত্তি-সহ উত্তীর্ণ হয়েছিলেন এন্ট্রান্সে | 

ইচ্ছে ছিল ডাক্তারি পড়ার | কিন্তু কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে সুযোগ পেলেন না | কারণ তিনি মহিলা | আরও পাঁচ বছর পরে এই অচলায়তন ভেঙেছিলেন কাদম্বিনী গাঙ্গুলি | কিন্তু অবলা বঞ্চিত হয়েছিলেন | বাধ্য হয়ে‚ ১৮৮২ সালে চলে যান মাদ্রাজ | বেঙ্গল গভর্নমেন্টের সাম্মানিক বৃত্তি নিয়ে | সেখানেই শুরু করেন ডাক্তারি পড়া | কিন্তু শেষ করতে পারেননি শারীরিক দুর্বলতার জন্য |

১৮৮৭ সালে অবলার বিয়ে হয় বিখ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বোসের সঙ্গে | সংসার ধর্ম পালনের সময়েও নিজের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি অবলা | আজীবন ব্রতী ছিলেন রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আদর্শে | এই দুই মহাপুরুষ ছিলেন তাঁর জীবনের ধ্রুবতারা | ১৯১৬ সালে নাইট উপাধি লাভ করেন জগদীশচন্দ্র | অবলা বোস-এর নতুন পরিচয় হয় লেডি অবলা বোস |

জীবনভর অবলা কাজ করে গেছেন স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারে | মেয়েদের জন্য শিক্ষার দ্বার খুলে দেওয়া | এবং বাল্যবিবাহ রোধ করা | ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য | ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন নারী শিক্ষা সমিতি | মহিলাদের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের জন্য স্থাপন করেছিলেন মহিলা শিল্প ভবন | মোট ৮৮ টি প্রাথমিক ও ১৪ টি হাই স্কুল স্থাপন করেছিলেন তিনি |

স্বামী বিবেকানন্দ ও ভগিনী নিবেদিতার খুব কাছের মানুষ ছিলেন বোস দম্পতি | হিন্দুত্ব-ব্রাহ্ম ধর্ম কিছুই সম্পর্কের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি | দার্জিলিঙে জগদীশ ও অবলার বাড়িতেই ১৯১১ সালে প্রয়াত হন ভগিনী নিবেদিতা | পরবর্তীকালে অবলা বোস প্রতিষ্ঠা করেন সিস্টার নিবেদিতা উইমেনস এডুকেশন ফান্ড | স্বামীর প্রয়াণের পরে এই ফান্ডে মোট ১ কোটি টাকা দান করেছিলেন তিনি | এই শিক্ষাব্রতীর আরও অসংখ্য কল্যাণমূলক কাজের মধ্যে অন্যতম ছিল বিদ্যাসাগর বাণী ভবন | অসহায় স্বামীহীনাদের আশ্রয়স্থল |

স্বামীর বিজ্ঞানসাধনায় যাতে কোনও ব্যাঘাত না ঘটে সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি ছিল অবলার | তাঁর একমাত্র সন্তান খুব অল্প বয়সে মারা যায় | স্বামীর ছাত্রদের অপত্যস্নেহে দেখতেন তিনি | প্রখ্যাত স্বামীর সঙ্গে একাধিকবার বিদেশসফর করলেও ব্যক্তিগত ভাবে অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন অবলা | যখন তাঁর বিয়ে হয়‚ তখন স্বামীর ঘাড়ে বহু দেনাকর্জের বোঝা | দানধ্যানের জন্য বিখ্যাত ছিলেন বিজ্ঞানীর বাবা মা | ফলে সংসারে জমা হয় দেনার ভার | সেই অবস্থায় দাঁড়িয়ে শক্ত হাতে হাল ধরেছিলেন অবলা |

১৯৫১-র ২৬ অগাস্ট প্রয়াত হন ৮৭ বছর বয়সে | গলাবন্ধ ফুলহাতা জামার সঙ্গে আটপৌরে শাড়ি পরা‚ ঘোমটা দেওয়া এই বঙ্গনারীকে বলা হয় উনিশ শতকের ফেমিনিস্ট | মর্ডান রিভিউ পত্রিকায় বিগত শতকে তিনি লিখেছিলেন‚ ‘…মেয়েদের বিস্তৃত ও গভীর শিক্ষা দেওয়া উচিত | শুধু ভাল পাত্র পাওয়ার লক্ষ্যে নয় | কারণ একজন পুরুষের মতো নারীর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হল তার মন | পরে শরীর …’

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.