শিলং … টেস্টি বাড-এর ব্রেকফাস্ট এবং সিলেট দর্শন

1869
shillong travelogue
শিলং-এর বিখ্যাত ল্যান্ডমার্ক 'সেন্টার পয়েন্ট হোটেল'

খুব সকাল সকাল মানস থেকে ওই বর্মণের গাড়িতেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম শিলং-এর উদ্দেশ্যে | হাইওয়ে ধরে যত এগোচ্ছি ততই আমার মন পিছিয়ে পড়ছে, ভাবছি সেই ছোটবেলায় বাবা মার সঙ্গে প্রথম শিলং পাহাড়ে আসার কথা, তখন আমরা থাকতাম গৌহাটিতে, বাবা ওখানেই বদলি হয়ে এসেছিলেন দুবছরের জন্য | তবে সেই স্মৃতি খুবই ঝাপসা | দ্বিতীয়বার শিলং আসি বছর তেরো আগে গিন্নি আর ছেলেকে নিয়ে | সেবার কাজিরাঙার জঙ্গলেও ঘুরেছি, ছিলাম বনদপ্তরের বিশাল দোতলা কাঠের বাংলোয় | অক্টোবরে জলকাদা থাকে বলে জঙ্গলে হাতি ঢোকে না তাই আমাদের জিপসি চড়ে ঘুরতে হয়েছিল | তেমন মজা পাইনি | শিলং-এর ব্যাপারেও অনেকে সতর্ক করে দিয়েছিল ওখানে নাকি খাসি বনাম নন খাসিদের মধ্যে একটা গণ্ডগোল পেকেই রয়েছে |

shillong travelogue
কাজিরাঙার ‘বনানী টুরিস্ট লজ’

নন খাসিদের প্রায় সবাই বাঙালি এবং তারা পাহাড়ে দিব্যি জাঁকিয়ে বসেছে বহুকাল যাবৎ | পুলিশবাজার হল শিলং-এর নিউ মার্কেট, দোকান – বাজার – হোটেল – রেস্তোরাঁ সব ছড়িয়ে আছে এলাকা জুড়ে | এই অঞ্চলেই নাকি থাকাটা নিরাপদ | রাতের দিকে বেশি দূরে কোথাও না যাওয়াই ভালো | আমরা উঠেছিলাম ‘ব্রডওয়ে’তে, দু’পা গেলেই একটা গোল চক্কর যার একপাশে মাথা উঁচিয়ে রয়েছে শিলং-এর বিখ্যাত ল্যান্ডমার্ক ‘সেন্টার পয়েন্ট হোটেল’ | বেশ জমজমাট জায়গা, বসে বসে এঁকে ফেললাম | চক্করের একদিকে জেল রোড অন্য আরেকটা ঘুরে ঘুরে চলে গেছে ওয়ারড’স লেক অবধি | উল্টো দিকে কাছেরি রোড, একটু ঢুকেই ছোট্ট রেস্তোরাঁ ‘টেস্টি বাড’ | আমাদের ব্রেকফাস্টটা ওখানেই বাঁধা ছিল | সদাহাস্যমুখ নিতিন ছোকরা দারুণ মোমো আর চাউমিন খাওয়াত |

shillong travelogue
জেল রোডের সুপার মার্কেট

পাহাড়ি শহর হিসেবে শিলং আমাদের কতটা মনে ধরবে এ নিয়ে চিন্তা ছিল | কিন্তু ঘুরে ঘুরে দেখলাম ইংরেজ আমলের কটেজ, পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট, শাক সবজি আর ফলের দোকান, বার্চ আর পাইন গাছের সারি, পিছনে পাহাড় | সব মিলিয়ে ছবি আঁকার চমৎকার সব উপকরণ ছড়িয়ে রয়েছে চারদিকে | একদিন সকালে এ গলি সে গলি পেরিয়ে চলে গিয়েছিলাম এখানকার অভিজাত পাড়া ধানক্ষেতি অবধি | পথে হঠাৎ চোখে পড়ল একতলা একটা ছোট্ট কাঠের বাড়ির সামনের একফালি বারান্দায় বসে কাগজ পড়ছেন এক বয়স্ক ভদ্রলোক | গেটের বাইরে ফলক, তাতে লেখা ‘আর. ভট্টাচার্য’ | অযাচিত হয়ে ঢুকে পড়ে আলাপ করলাম, উনি খুশি হয়ে ভেতরে নিয়ে গেলেন | ১৯৫৮ সাল থেকে আছেন, ফিজিক্সের ‘হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট’ ছিলেন এখানকার কলেজে, অবসর নিয়ে শিলং-এই থেকে গেছেন | দেখলাম দেওয়ালে আইনস্টাইনের বিশাল ছবি ঝোলানো | আসার সময় উনি যদিও আমার ঠিকানা লিখে নিলেন তবে পরে আর কোনও যোগাযোগ করেননি |

shillong travelogue
খাসি এম্পোরিয়ামে গিন্নির কেনাকাটা

শিলং-এ এলে সবাই নিয়ম করে চেরাপুঞ্জি ঘুরতে যায়, আমরাও গেলাম | কাজিরাঙাতে এক টুরিস্ট দলের কাছ থেকে পেয়েছিলাম এখানকার এক বাঙালি গাড়িওয়ালার নম্বর, ওরা পই পই করে বলে দিয়েছিল কোনও খাসির গাড়িতে না উঠি, ওরা নাকি খুব ঝামেলা বাধায় | আমাদের কপাল ভালো সিলেটি রিতেশ দাসকে পেয়ে গেলাম | ও আর ওর দাদা এই ব্যাবসায় আছে | রিতেশ চমৎকার ছেলে, খেলোয়াড় সুলভ চেহারা আর হাসিখুশি, বুবুলের সঙ্গে প্রথম থেকেই জমে গেল |

Shillong travelogue
খাসি সেলস-গার্ল সীমা কাহিত

চেরাপুঞ্জি কিন্তু আমাদের হতাশ করেছিল | পরপর দুবছর গোটা মেঘালয় অনাবৃষ্টির কবলে পড়েছে | ফলে সেই কুয়াশা মাখা রাস্তা, ঘন ঘন বৃষ্টি সবই রূপকথার গল্প হয়েই থেকে গেল | সেভেন সিস্টার ঝর্ণা দেখলাম শুকিয়ে কাঠ | একটা বোর্ডে বড় বড় করে লেখা বৃষ্টি পেতে গেলে মউসিংরাম যান, আর ঝুঁকি নিলাম না বরং রিতেশ এরপর আমাদের ‘ডাউকি’ বলে একটা জায়গায় নিয়ে গেল যেটা ভারত-বাংলাদেশের সীমানা | এখানে প্রচুর টুরিস্ট আসেন ওই সীমানার টানেই আর পাহাড়ের ওপর থেকে ওপাশে বহু দূরে আবছামত কিছু গাছপালার দিকে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে সিলেট দর্শনের বিমলানন্দ অনুভব করেন | পূর্ব বাংলা নিয়ে আমাদের হৃদয় অহেতুক ব্যাকুল হয়ে ওঠেনা | ফলে পাশের রেস্তোরাঁয় বসে চা সহযোগে কিঞ্চিৎ জলযোগ সেরে নেওয়া ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার ছিল না | ফেরার পথে একটা ছবির মত সুন্দর গ্রাম পড়ল ‘মোওডক’ | রিতেশকে গাড়ি থামাতে বলে নেমে গিয়ে জায়গাটার একটা স্কেচ করে নিয়েছিলাম | বেশ একটা বিলিতি মেজাজ রয়েছে চারদিকে, কাছে কোনও বাড়ি থেকে গিটারের সঙ্গে ইংরেজি গান ভেসে আসছে, বিকেলের পড়ন্ত আলো এসে পড়ছে লম্বা পাইন গাছগুলোর মাথায় |

shillong travelogue
মওডক-এর স্কেচ

কথায় কথায় জানা গেল রিতেশের বাবা শিলং-এর সবচেয়ে নামী ( এবং দামীও ) হোটেল ‘পাইন উড’ এর প্রধান শেফ, ওরা সব ওখানেই থাকে | শহরের মাঝখানে একেবারে পাহাড়ের মাথায় পেল্লায় এই হোটেল ইংরেজদের বানানো, রিতেশের গাড়ি বোঁ করে উঠে গেল | বাইরে থেকে উঁকি ঝুঁকি মেরেই তো আমাদের চোখ কপালে উঠে যাবার জোগাড় | রিতেশদের থাকার জায়গাটা পিছনদিকে, বাবা মা খুব খুশি হয়ে বসাল, চা খাওয়াল আর সেই সঙ্গে হদিস পেলাম আমাদের হোটেলের কাছেই এক চিনা রেস্তোরাঁর, যেখানে শুয়োরের মাংসের খাবার এ অঞ্চলের এক নম্বর | বলা বাহুল্য পারে দিন-ই ওখানে হানা দিয়ে প্রচুর চর্ব-চোষ্য আমরা উদরস্থ করেছিলাম |

shillong travelogue
‘ওয়ার্ড-স’ লেক

শিলং-এর ‘ওয়ার্ড-স’ লেক শহরের মাঝখানে এক মনোরম জায়গা | জলের চারধারে সবুজ ঘাসজমি বেশির ভাগটাই ঢালু আর গাছপালা, মাঝখানে বাঁধানো রাস্তা | টিকিট কেটে ঢুকে এক কিংবা সঙ্গী-সাথী নিয়ে সারাদিন দিব্যি আয়েস করে কাটানো যায় | সেবার এই লেকের যে স্কেচটা করেছিলাম, ভালোই হয়েছিল | এবার সঙ্গে এনেছি আরো বড় খাতা | দেখা যাক | আমরা বড়াপানি পেরিয়ে আপাতত শিলং শহরে ঢোকার মুখে |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.