(সাক্ষাৎকার ও ভাবলিখনঃ তন্ময় দত্তগুপ্ত)

আমার বাবার বদলির চাকরি ছিল।তিনি রেলে চাকরি করতেন।সেই সুবাদে নানা জায়গায় যেতে হয়েছে।আমার জন্ম ময়মনসিংহ জেলায়।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় আমরা এ দেশে চলে আসি।বাবার বদলির চাকরি ছিল বলে ছেলেবেলায় বিহার ,উত্তরবঙ্গের নানা জায়গায় ঘুরেছি।শৈশবের উত্তরবঙ্গের সঙ্গে আজকের উত্তরবঙ্গের কোনও তুলনা চলে না।উত্তরবঙ্গ ছিল সিলভার বিউটি।একদম ঘন জঙ্গল।

আমরা যখন মাল জংশনে(আজকের মালবাজার) ছিলাম তখন দুপুরে বাঘ বেরত।সেটা মনে হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়।আমেরিকান সোলজাররাও কিছু কিছু জায়গায় তখন ক্যাম্প করত।এখন ওখানকার জঙ্গল এত পরিমাণে কেটেছে,যে জঙ্গলের মর্যাদা হারিয়েছে।আগে এতো গভীর জঙ্গল ছিল যে সূর্যের আলো ঢুকত না।ছেলেবেলায় অনেক রিমোট জায়গায় গিয়েছি।অনেক চমৎকার মানুষের  সঙ্গে পরিচয় হয়েছে।ভ্রমণের যে নেশা,যে তাগিদ,সেটা তখনও অনুভব করিনি।তবে অনেক নতুন নতুন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি।

Banglalive-8

আমি বড় হলাম।দেশভাগের পর আমাদের পরিবার বিচ্ছিন্ন হল।শুরু হল আমার হোস্টেল জীবন।আমার হোস্টেল জীবন প্রায় কুড়ি বছরের।প্রথমে কোচবিহার।তারপর কলকাতার বিভিন্ন বোর্ডিং-এ আমি কাটিয়েছি।

Banglalive-9

বাবার সঙ্গে বাংলা বিহার উড়িষ্যা ঘোরা ছাড়া আমার ভারতবর্ষের কোনও জায়গাই ঘোরা হয়নি।একটা ঘটনার কথা খুব মনে আছে।বি এ ক্লাসে  পড়ার সময় আমার এক বন্ধু ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছিল কটকে।সে বলল তুমি আমার সঙ্গে কটকে চলো।কটকে থেকে ফেরার সময় পুরী ঘুরে আসবে।আমার ১৯ কি ২০ বছর বয়স।সেই প্রথম পুরী ভ্রমণ।প্রথম সমুদ্র দর্শন।সারাদিন সমুদ্রে স্নান।সারাদিন মানে কমপক্ষে দু তিন ঘন্টা।সুন্দরী সমুদ্র দেখে মুগ্ধতার মায়া লেগেছিল দু’চোখে।দীঘার সমুদ্র তখনও  দেখিনি।যাওয়ার কথাও মনেও হয়নি।এম.এ পড়ার সময় পরীক্ষা ড্রপ করে নারায়ণগড়ে খুব অল্প দিনের জন্য মাস্টারি করতে গিয়েছিলাম।কিন্তু সেখানে বেশিদিন থাকা হয়নি।মা টেলিগ্রাম করে আমাকে নিয়ে  এলেন। দিন কুড়ি ছিলাম নারায়ণগড়ে।জায়গাটা এখন খুব বিখ্যাত হয়েছে।সম্প্রতি আমার লেখা গল্প “মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি”র শুটিং হয়েছে ওখানে।নারায়ণগড় থেকে ফেরার পথে আমি দীঘা ঘুরে আসি।

দীঘা ছিল ঝাউবনে ঘেরা।বিশাল বিশাল ঝাউবন।ঝাউবনের পরে ছিল বিচ।বিচের বালিগুলো ছিল সিমেন্টের মতো শক্ত।জমাট।কিন্তু কী আশ্চর্য মসৃণ !পুরীর বালিগুলো যেমন হালকা; তেমন দীঘা ছিল না।দীঘার বীচে ছোট ছোট এরোপ্লেন নামত।সেই প্লেনে কমপক্ষে দু থেকে তিনজন বসতে পারত।এটা মনে হয় ১৯৬০ কি ৬১ সালের ঘটনা।এখনকার দীঘার সঙ্গে তখনকার দীঘার আকাশ পাতাল ফারাক।দীঘায় সেই সময় একটা ক্যাফেটেরিয়া ছাড়া কোনও রেস্টুরেন্ট ছিল না।ছিল না কোনও ঘর বাড়ি।একদম পরিত্যক্ত অঞ্চল।ক্যাফেটেরিয়ার খাবার প্রায় শেষ।কিন্তু আমাদের পেটে খিদে।খিদে তো কারোর কথা শোনে না।তাই ক্যাফেটেরিয়ার মলিকের সঙ্গে একপ্রকার ঝগড়া করে পেটপুজো সারলাম।দীঘায় রাত্রিবাস করিনি।সে সময়ে তা ছিল স্বপ্নাতীত।তাই ফিরে এলাম।আমার প্রথম জীবনের বেড়ানো প্রায় এখানেই শেষ।

আমি বিবাহ করলাম।শুরু হল সংসার জীবন।সংসার সংগ্রাম বললে বেশি ভালো হয়।ভ্রমণের ইচ্ছে বিবর্ণ হতে থাকল।হাতে তেমন অর্থ নেই।সারাদিন উদয়অস্ত খাটনির পরে জীবনের রূপকথাগুলো ফিকে হচ্ছিল।ট্রেনে করে হাওড়ায় আসা।তারপরে কালীঘাটের একটা স্কুলে  শিক্ষকতা।মাস মাইনে মাত্র একশো টাকা।আমার বাসস্থান ছিল বালিতে।কিছুদিন বাদে আনন্দবাজারে চাকরি পেলাম।আমার অবস্থা ফিরল।আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল হল।ভ্রমণের প্রতি তেমন আকর্ষণ তখনও হয়নি।কারণ বিছানা বেডিং বাঁধা আমার কাছে বিড়ম্বনা মাত্র।

আমি ভবঘুরে নই।ভবকুঁড়ে।আনন্দবাজারে চাকরির সুবাদে আমাকে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়েছে।প্রথমে আমাকে পাঠানো হল এলাহাবাদ।

তারপরে পাঠানো হল রাম বনবাসের পথে।ট্রেনে কিছু মানুষ বলেছিল,রামনবমীর সময় অযধ্যা?থাকবেন কোথায়?

অযোধ্যায় ট্রেন থামল।রিকসা আমাকে নিয়ে চলল।এই সেই অযধ্যা।যেখানে রাম সীতা লক্ষ্মণের কত কথা কত কাহিনি।রামায়ণের পাতায় পাতায় যে অযোধ্যার বর্ণনা আছে,তার সঙ্গে কোনও মিল নেই এই অযোধ্যার।ধুলোয় ধুলোময়,ঘিঞ্জি সব রাস্তা।রামায়ণের অযোধ্যার খোঁজ পাননি প্রত্নতত্ত্ববিদরা।নানা কারণে আমরা কিংবদন্তীর কাছে ঘুরে ফিরে আসি।সেই কারণেই রামচন্দ্রের অযোধ্যার জন্ম।রূপকথা এভাবেই ছড়িয়ে পরে ইতিহাসের আবছায়ায়।

আরও পড়ুন:  মঙ্গন এবং এবং উত্তর সিকিমের বিশেষ অতিথিরা

অযোধ্যার বয়স কিছু কম হল না।প্রাচীনত্বের বলিরেখা অযোধ্যার সারা শরীরে উজ্জ্বল।রাস্তা ধরে রামঘাটের কাছে পৌছানোর সঙ্গে সঙ্গে  বাঁদিকে দেখলাম অযোধ্যার রাজবাড়ি।দেওয়ালগুলো নোনা ধরা।রামঘাটের এক মন্দিরে আশ্রয় নিলাম।যে চারজনের সঙ্গে রুম শেয়ার করলাম তার মধ্যে তিনজনই কলকাতা বা তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বাঙালি।এই মন্দিরে দুবেলায় প্রসাদ খেয়েছি।মোটা মোটা পুরি, ডাল, সব্জি ভাত।কিন্তু এদের রান্নায় একটা অদ্ভুত গন্ধ।তাই কিছু গ্রাস মুখে তুলে চুপ করে বসেছিলাম।রামচন্দ্র বাঙালির ঘরে ঘরে আজও তেমন ভাবে পৌছায়নি।তুলনায় কৃষ্ণ, চৈতন্য,রামকৃষ্ণ বাঙালির মণিকোঠায়।স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এমন আক্ষেপ করেছিলেন।

অযোধ্যার সরযূ নদীর কথা মনে আসে বারে বারে।সরযূর পথে ঘন্টা ধ্বণি আমাকে টেনেছিল।সেই শব্দ কীসের ইঙ্গিত করছে সহজেই বোঝা যায়।নশ্বর মানুষ তা বুঝে নেয় আপনা আপনি।ক্ষুধা তৃষ্ণা ছাপিয়ে তা চলে যায় অন্য দিগন্তে।পথে হাজার হাজার নারী পুরুষ।ভিড় ছাড়িয়ে ফাঁকা জায়গায় আবার সেই ঘন্টাধ্বণি।রুম মেট মুখুজ্জে মশাইয়কে আমি জিগ্যেস করি —‘কীসের শব্দ জানেন মুখুজ্জে মশাই?মুখুজ্জ্যে মশাই আমার মতোই সহমত পোষণ করেন।পথের একটা বাঁক ঘুরতেই দেখা গেল শবযাত্রা।তবে একটু অন্যরকম।শববাহকরা জটাধারী।শবদেহটি একজন সাধুর।

মৃতদেহএগিয়ে চলল।সামনে সাদা বালিয়াড়ির ওপর নীল আকাশের ঢাকনা।সেই নীল আকাশের রং বুকে নিয়ে বয়ে যাচ্ছে সরযূ।কে কাঁদবে সাধুর জন্য?অন্য এক সাধুর হাতে একটা পেতলের কাঁসি।তাতে অবিরল বেজে চলেছে বিষণ্ণ এক ধ্বণি।সেই রাম নেই,অযোধ্যা নেই।শুধু সরযূ আছে।তার তীরে বহুকাল আগে যে ইতিহাস তৈরি হয়েছিল,তার কোনও সাফাই সে দেবে না।

আমি ফৈজাবাদেও গিয়েছি।অযোধ্যার মতো ফৈজাবাদ পুরোনো শহর নয়।সারা শহর জুড়ে রয়েছে মস্ত এক বাজার।তার চারধারে রয়েছে নবাবী আমলের চারটি তোরণ।অযোধ্যার রামচৌড়া ঘাট বিখ্যাত।এখান দিয়ে রামচন্দ্র গঙ্গা পাড় হয়েছিলেন।ঘাট বলতে বাঁধানো ঘাট নয়।একটু ঢালু জমি জল নেমে গেছে।মাঝখানে অনেকটা জায়গায় তিমির পিঠের মতো চর জেগে আছে।ওপারে ঝোপজঙ্গল আর বালিয়াড়ি।চারদিকে বাড়ি নেই।বসতি নেই।চারদিকে রোদে রোদারণ্য।

অযোধ্যা ভ্রমণের শেষ প্রান্তের কথা এবার বলি।চিত্রকূটের পথপ্রান্তরের দিকে চেয়ে আছি।মন ভালো নেই।ফেরার পালা।আরো কিছুদিন থাকার জন্য মন চাইছে।মালপত্র নিয়ে জয়পুরিয়া গেস্ট হাউসে এসে উঠলাম।গেস্ট হাউসের মানুষ হৃদয়বান।অমন নিরলস কর্মী বেশি দেখিনি।খাওয়ার চমৎকার ব্যবসস্থা।চারপাইয়ের ওপর শুয়ে নিশ্চিন্তে চোখ বুজে আছি।হঠাৎ উঠে পড়লাম।আমাকে যেতে হবে।ম্যানেজার বললেন,এখনই চলে যাবেন?আমি বললাম,যেতে তো হবেই।চিত্রকূট ছাড়িয়ে বিশাল বিস্তার ভেদ করে চলেছে আমাদের বাস।আমি বাইরের রোদ আর গরম টেরই পেলাম না। আমার বুক জুড়ে মন খারাপের তাপে বাইরের উত্তাপ জল হয়ে গেল।

এরপর ডাক এলো আমেরিকা থেকে।আমার মনে হল বাঙালের আমেরিকা ভ্রমণ।আমেরিকা পুরো দেশটাই দর্শনীয়।আমেরিকার ন্যাচারাল বিউটি অতুলনীয়।অসামান্য।কী নেই ওখানে!রেড ইন্ডিয়ানদের গুহা থেকে বহু কিছু দেখার আছে।

আমি ওখানে এক মাস থেকে দেড় মাস ছিলাম।ওই বড়লোক দেশে যাওয়ার যে আমন্ত্রণ পেলাম সেটা বেশ দরিদ্র।ভ্রমণ ভ্রাতা নেই।শুধু যাতায়াত ভাড়া আর হাত খরচ।আনন্দবাজার পত্রিকার দফতরে এক লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে এক বিনয়ী যুবক প্রস্তাবটি দিল।প্রবাসী বাঙালিদের বঙ্গ সম্মেলন উপলক্ষে। পাসপোর্ট যখন হাতে এলো তখন সময়ের পুঁজি বড্ড কম।বিমানে বিদেশ যাত্রার কথা শুনে আমার স্ত্রীর চোখ কপালে উঠল।ওর বেশি ভয় প্লেনটা আটলান্টিকের ওপর দিয়ে যখন যাবে তখনে যদি কিছু হয়।আমি মজা করে বলেছিলাম, ডাঙায় পড়লে ততটা লাগবে না।

বিমান চলছে নিউইয়র্ক।বিমানের তিনভাগে তিনটি চলচ্চিত্র শুরু হল।আমাদের ভাগে ইংরেজি।রগরগে থ্রিলার।

আমার ঘড়ি অনুযায়ী কলকাতায় এখন বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা।বিমান থেকে দেখতে পাচ্ছি বাইরে এখন দুপুর।নীচের এই সমুদ্রপথ ধরে একদা কাঠের দাঁড়টানা জাহাজে ভারত আবিষ্কার করেছিলেন কলম্বাস।

আমেরিকা পদার্পণের পর থেকেই আমি চোখ কান ও বোধকে সজাগ রেখেছি।স্বল্প সময়ের মধ্যেই আমাকে যতদূর সম্ভব বুঝে ও জেনে নিতে হবে।নির্জন নিঃশব্দ মশাহীন পোকাহীন বেসমেন্টের ঘরে শুতে যাওয়ার সময় মনে মনে ভাবলাম টেনে ঘুমোব অনেক বেলা পর্যন্ত।কিন্তু আমার শরীরের টিউনিং হয়ে আছে কলকাতার দিন রাত্তির সকাল বিকেলের সঙ্গে।আমেরিকার দিন রাত্তির সকাল বিকেলকে আমি বোধ বুদ্ধি দিয়ে মানলেও আমার শরীর মানবে কেন!আমেরিকার এই সব পল্লী শহরের নির্জনতা এতই পরিপূর্ণ যে কানে তালা ধরে যায়।মাটির নীচেকার ঘর বলে নৈঃশব্দ একেবারে জমে বসে গেছে।ভারি অদ্ভুত লাগছিল।দক্ষিণ কলকাতার আমার যে বাসা সেখানেও যথেষ্ট নির্জনতা রয়েছে,কিন্তু তা এমন জমাট নয়।ঘড়িতে সাতটা বেজে গেছে।আমি বাইরে এলাম।ঘাসের লন,রাস্তা আর অরণ্যের দিকে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলুম।যা দেখছি তা যেন সত্যি নয়,যেন আঁকা।ব্রেকফাস্ট সারলাম।তারপর চলল পরিকল্পনা।একদিনে নিয়ইয়র্ক শহরের কতোটা দেখা যাবে।

আরও পড়ুন:  মঙ্গন এবং এবং উত্তর সিকিমের বিশেষ অতিথিরা

হুহু করে গাড়ি চলল নিইয়র্কের দিকে।একটু দূর থেকে যখন নিউইয়র্কের আকাশরেখা দেখা গেল তখন নড়েচড়ে বসলুম।ঝলমলে রোদ দেখা যাচ্ছে।টেমস নদীর তলা দিয়ে ট্রেন চলে।আমেরিকার প্রযুক্তিবিদরা কত কাণ্ডই না ঘটিয়েছেন।তাদের কাছে হাডসন নদীর তলা দিয়ে প্রশস্ত সুড়ঙ্গপথ নিতান্তই ছেলে খেলা।হাডসন পেরিয়ে  ম্যানহাটনে ঢুকবার মুখে একটু ট্রাফিক।

নিউইয়র্কের প্রাণকেন্দ্র হোল ম্যানহাটন। ম্যানহাটন ঘুরে দেখলে নিউইয়র্কের শতকরা পঞ্চাশ ভাগ দেখা হয়ে যায়।লোকজন গমগম করছে  এখানে।পথচলতি মানুষের ভিড়।এমনটি নিউজার্সি বা অন্যত্র চোখে পড়বে না।এখানে মানুষজন ভারি বিচিত্র।পাগড়ি মাথায় শিখ,চিনে,কাফ্রি,জাপানি,গুজরাটি বাঙালি সব মিলিয়ে এক বিশাল বৈচিত্র।

আমাদের গাড়ি আবার চলল।শহরের অতিকায়, সুবিশাল যেগুলো রয়েছে  সেগুলো আমাদের ঘাড় ঘুরিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।নিউইয়র্কের বড় বড় বাড়িগুলো ঘাড় তুলে দুচোখ ভোরে দেখার মতোই।শহর কাকে বলে  তা নিউইয়র্কে না এলে জানাই হত না।আমাদের গাড়ি থামল রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছে।ইস্ট নদীর জলে নিজের প্রতিবিম্ব ফেলে দাঁড়িয়ে আছে  আধুনিক স্থাপত্য।উড়ছে রাষ্ট্রপুঞ্জের পতাকা।

হাডসনের ধারে চমৎকার লন রয়েছে,আছে বসবার জায়গা।নদীটি মন দিয়ে দেখছিলুম।প্রশস্ত নদী।আর তাতে কত রকমের লঞ্চ,স্টীমার চলছে তার সীমা সংখ্যা নেই।প্রচণ্ড তেষ্টা পেয়েছিল বলে ফোয়ারায় জল খেয়ে নেওয়া হল।এই পানীয় জলের ফাউন্টেন আমেরিকার সর্বত্র।বোতাম টিপলেই ঊর্ধ্বমুখী কলের মুখ থেকেই জল উপরের দিকে উৎসারিত হয়।জল খুব ঠাণ্ডা,তাই দাঁত ঝন ঝন করে।গলা বসে যায়।ফাউন্টেন থেকে তাই আমি আকন্ঠ জল পান করতে পারিনি।

নিউইয়র্কের সাফার্ন শহরের কথা বলব।সাফার্ন শহরটিতে যখন পৌছালাম তখন সন্ধে। অরণ্যসংকুল পাহড়ের সানুদেশে বিশাল একটি হাউসিং কমপ্লেক্স।গায়ে গায়ে ঘেঁষা।অথচ চমৎকার।বাড়ির পিছন দিক থেকেই পাহড়ের ঢাল বেশ খাড়া ভাবে উঠে গেছে।নতুন নতুন নানা শহরের পত্তন আমেরিকায় নিয়তই ঘটছে।পাশাপাশি আছে পরিত্যক্ত ভুতূড়ে শহর।এক সময় সেখানে লোকবসতি ছিল,তারপর বাস উঠে গেছে।আমেরিকার এসব ঘোস্ট টাউন নিয়ে কতো গল্প আছে।আমেরিকা বিশাল দেশ, পথপ্রদর্শক বা উপযুক্ত সঙ্গী ছাড়া এই বিশাল দেশ দেখে ওঠা সম্ভব নয়।

আমেরিকার বুশকিল জলপ্রপাত খুব সুন্দর।বুশকিল কে বলা হয় ‘নায়গ্রা অফ পোকারোজ’।সাফার্ন থেকে বুশকিলের দূরত্ব কম নয়।আমাদের দেশ হলে একদিনে বুশকিল দেখে ফিরে আসা সম্ভব হত না।আমাদের দেশে রাস্তার অভাব আছে।এ দেশের রাস্তা সর্বত্র বুক পেতে আছে।

উত্তরপূর্ব পেনসিলভানিয়ার পোকোনো পর্বত শ্রেণীর মধ্যে বুশকিল জলপ্রপাতে যাওয়ার পথেই পড়বে ডেলওয়্যার ওয়াটার গ্যাপ।প্রকৃতির এক আশ্চর্য খেয়ালে একদা সমভূমি এই অঞ্চলে ভূমিক্ষয় ও ভূমি উত্থানের ফলে তৈরি হয়ে গেছে জলাশয় ও উপত্যকা।ডেলওয়্যার নদীটি তারই ভেতর দিয়ে এস অক্ষরের মতো বাঁক খেয়ে গেছে ।রাজপথ ধরে এগোলে হঠাৎ চোখে পড়বে একটা পাহাড়,যা হঠাৎ কুড়ুলের কোপে দুভাগ  হয়ে গেছে।এ হোল নিউজার্সির কিট্টাটিনি মাউন্টেনের অংশ।রুট এইট্টি তাকে ভেদ করে ডেলওয়্যার পেরিয়ে ঢুকে গেছে পেনসিলভানিয়া।ওই ফাটলের ভেতর দিয়ে এগোলে চোখে পড়বে ডেলওয়্যার ওয়াটার গ্যাপ।এই গ্যাপকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বহু বিস্তৃত নানা নির্মাণ।পার্ক,হোটেল, পিকনিক এরিয়া ইত্যাদি।পর্যটক আকর্ষণের সামান্যতম সুযোগ থাকলে সেটাকে কাজে লাগান বাণিজ্য মনস্ক মার্কিনরা।

আরও পড়ুন:  মঙ্গন এবং এবং উত্তর সিকিমের বিশেষ অতিথিরা

পরবর্তী মধ্যবর্তী জলাশয়টির ধারে বিশাল পার্কিং লট এবং বাগান।জুলাই মাসে যখন রডডেনড্রন ফোটে তখন গোটা উপত্যকা হয়ে ওঠে নন্দন কানন।

অনেকক্ষণ ঘুরে ঘুরে এই প্রাকৃতিক দৃশ্য, পাহাড়,জলে মৎসশিকারি ও ভ্রমণকারীদের অজস্র নৌকা দেখলুম।জঙ্গলের সুড়ঙ্গপথে অশ্বারোহণ,সাইকেলবাজদের নিঃশব্দ সঞ্চার দেখে বেড়ালুম।হানিমুনারদের জন্য বুশকিল চিহ্নিত জায়গা।কাছাকাছি তাই নব বিবাহিতদের থাকবার ও মধুময় দিবস রজনী যাপন করার ব্যবস্থা রয়েছে।বুশকিল জলপ্রপাতকে কেন্দ্র করে বেশ অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে বসতিরও ব্যবস্থা।বুশকিল দেখার দিন কুড়ি পর আমি নায়গ্রায় গেছি।কোথায় নায়গ্রা আর কোথায় বুশকিল।বুশকিল নায়গ্রার ছায়াও না।তবু পাবলিসিটির জন্য বুশকিল কে নায়গ্রার সাথে তুলনা করা হয়।

যে উপলক্ষে আমেরিকায় আমার আগমন সেই বঙ্গসম্মেলনের নির্ধারিত তারিখ এগিয়ে এলো।প্রবাসী বাঙালির কাছে এই সম্মেলনের কতটা গুরুত্ব ছিল সে বিষয়ে যথেষ্ট কৌতূহল ছিল।তিন দিনের বঙ্গসম্মেলনে আমার বক্তৃতা ছিল মাত্র আধঘন্টা।বঙ্গ সম্মেলনের তৃতীয় অর্থাৎ শেষ দিনে দূরের সম্মেলন চলাকালীনই দূরের যাত্রীরা একে একে বিদায় নিচ্ছিলেন।সম্মেলন চলবে রাত অবধি।আজ রাতেই মোটামুটি সবাই স্বস্থানে ফিরে যাবেন।কাল থেকে অফিস কাজ কর্ম সংসার।

নিউইয়র্কে এ যাত্রায় শেষ রাত্রিটি খুব দ্রুত ঘনিয়ে এলো।পরদিন বিকেলে ফ্লাইট।আমেরিকায় আর আসা হবে কিনা জানি না।হয়তো এটাই  প্রথম ও শেষ।আমি এক গরিব দেশের মানুষ।সেখানেই আমার শান্তি ও স্বস্তি।কলকাতা বাসের দিনগুলিতে আমেরিকা স্বপ্নের মতো ভেসে উঠবে।কিছু স্বপ্ন স্মৃতির মাঝে থেকে যায় চিরকাল।

আমি আধ্যাত্মবাদী।গঙ্গাসাগরের কুম্ভমেলায় গিয়েছি।কুম্ভমেলা সাধকদের মেলা।সাধকদের কথা না বললে তাই ওই ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।আমার মূল আগ্রহ ছিল সাধুদের জীবনযাপন দেখা।তাদের সাহচর্য পাওয়া।সাধুদের সঙ্গে ওখানে আমি খুব ঘনিষ্ঠ ভাবে কাটিয়েছি।সাধুরা আমাকে নেমন্তন্ন করে খাইয়েছে।ওদের আধ্যাত্মজীবনের কথা আমি মন দিয়ে শুনতাম।তখন তো হোয়াটস্অ্যাপ, ইন্টারনেট ছিল না।ওই ভ্রমণের  কথা আমি রোমান এবং ইংরাজি হরফে লিখে একটা পোস্ট অফিস পোস্ট করতাম।আর ওখানে একটাই পোস্ট অফিস ছিল।সেই লেখা কলকাতায় আসত।পরদিন সেটা বাংলায় ছাপা হত।সেটা প্রচুর পরিশ্রমের কাজ।

আমি দু’বার কুম্ভমেলায় গিয়েছিলাম।প্রথম কুম্ভমেলা ছিল এলাহাবাদে।পরের কুম্ভমেলা ছিল হরিদ্বারে।হরিদ্বারে আমার সঙ্গে ছিলেন সমরেশ মজুমদার।সেখানেও প্রচুর সাধুর সান্নিধ্য পেয়েছি।আমার একটা সহজাত প্রবৃত্তি আছে।সেটা হল আমি খুব সহজে সাধুদের সঙ্গে মিশে যেতে পারি।সাধুদের সামান্য প্রণামী দিলে তাঁরা খুশি হতেন।আমাকে অনেক কিছু খাওয়াতেন।বহু প্রকৃতির সাধু দেখেছি।নাগা সন্ন্যাসীও আমার দৃষ্টি এড়ায়নি।

খুব লজ্জার কথা রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন ভ্রমণ করেছি অনেক পরে।তখন আমার ছেলে মেয়ে হয়ে গেছে।আমার ছেলের বয়স দশ।মেয়ে আঠারো ঊনিশ।সেই সময় আমি প্রথম শান্তিনিকেতন গিয়েছি।সঙ্গে আমার পরিবার।সেই অভিজ্ঞতা সুখকর নয়।আমি উত্তরায়ণ  গেস্ট হাউসে ছিলাম।সেই গেস্ট হাউস আমার ভালো লাগেনি।এখন শুনেছি অনেক সুন্দর হয়েছে।এখন শান্তিনিকেতনে আমি ফ্ল্যাট কিনেছি। মাঝে মাঝে আমার ছেলে মেয়েরা সেখানে থাকে।রবীন্দ্রনাথের জায়গায় গেলে একটা রোমাঞ্চ হয়।শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক পরিবেশ অন্যরকম।সেই আবহাওয়া আমার ভালো লাগে।এই আশ্রমিক পরিবেশ আজও শান্তিনিকেতনে আছে।যদিও বিশ্ববিদ্যালয় এসে যাওয়ার পরে একটা জমজমাট পরিবেশ হয়েছে।ব্যবসা বাণিজ্য ওখানে এখন বেড়েছে।তবুও নীরবতার ডাকে আজও শান্তিনিকেতন যাই।

জীবনে আমি অনেক কিছু দেখেছি আবার দেখিওনি।এখনও গ্র্যাণ্ড ক্যানিয়ন দেখিনি।ফ্লোরিডা যাইনি। ডিজনিল্যাণ্ড দেখিনি।দেখার ইচ্ছে আছে।

ইচ্ছা হোক কিংবা অনিচ্ছা,ভ্রমণ আমার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।জড়িয়ে যাবেও।এ যেন নিয়তির নির্দেশের মতোই।তাকে উপেক্ষার প্রশ্নই আসে না।

(শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় তাঁর সাক্ষাৎকারে কিছু জায়গার উল্লেখ করেছেন।সেই সমস্ত জায়গার কিছুটা বিস্তারিত বর্ণনার জন্য আমরা তাঁর ভ্রমণ সমগ্রের সাহায্য নিয়েছি।)

NO COMMENTS