জলদ গুপ্ত
জলদ গুপ্ত লেখেন না, ভাবেন। নিজেকে মনে করেন মুদির দোকানের মালিক। কোথায় কোন মশলা আছে শুধু সেটুকুই উনি জানেন, খদ্দেরের চাহিদা অনুযায়ী কাগজে মুড়ে দিয়ে দেন...ব্যস। সিধুজ্যাঠার মত অনেক কিছু করার ক্ষমতা থাকলেও অন্যদের অসুবিধা হবে বলে কিছুই করেন নি। কবিতা, নাটক লিখতে পছন্দ করেন আর পাগলের মত পছন্দ করেন সঙ্গীত। পাহাড়ি জঙ্গলের টিলায় বসে হেঁড়ে গলায় গান আর দিনে ১৫ কাপ চায়ের জন্য সব কিছু করতে প্রস্তুত। আদিখ্যেতাকে ঘেন্না করেন, তর্ক করতে ভালোবাসেন। এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন যেখানে কোন লেখক থাকবে না।

এবারে আর কাউকে কিছু বলিনি। ‘কৈলাস বার্তা’য় আমার একজনের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। তাকে ধরে সোজা কৈলাশ। ও বলেছিল সকাল বেলা সবাই হ্যাংওভারে থাকে, ঝিমোয়। স্মার্টলি ঢুকে যেতে হবে। ‘ভোলা ভবন’এর গেট থেকে সোজা ঢুকে গিয়ে ডান হাতে বাবার প্রাসাদ। ওই প্রাসাদের পিছন দিকে একটা দরজা আছে। ওখানে নন্দী গাঁজার নেশায় বুঁদ হয়ে পাহারায় থাকে।  ওর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ও নেশার ঘোরেই ‘কে..’ বলবে । উত্তরে বেশ ষাঁড়ের মতো হাম্বা বললেই কেল্লা ফতে। ও বুঝবে বাবার ষাঁড়। ব্যস, একেবারে সটান ভিতরে।

Holi Hai

ষাঁড়ের ডাক প্র্যাকটিস করে, ওর প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে বাবার ঘরের কাছে এলাম। শিবরাত্রি নিয়ে বাবার একটা ইন্টারভিউ নোব। একেবারে ফার্স্ট পেজে যাবে, লিড নিউজ। কিন্তু ঘরের কাছে এসে বেশ চমকে গেলাম, দূর থেকে হাতে একটা কাপের মতো কি নিয়ে মা আসছেন। তড়িঘড়ি করে ঘরের লাগোয়া বারান্দায়, জানলার ধারে লুকিয়ে পড়লাম। মা ঘরে ঢুকলেন। তারপর মা আর বাবার কথোপকথনটা পুরো শুনলাম এবং রেকর্ড করলাম। যেটা পুরোটাই আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করছি।        

 

পার্বতী – শুনছো, তোমার সিদ্ধি… ইসস কত বেলা হয়ে গেছে…  

শিব – (আড়মোড়া ভেঙ্গে ঘুরে শোয়) শরীরটা একদম ঠিক নেই, ভাল লাগছে না, কটা বাজে ?

পার্বতী – আটটা পাঁচ…

শিব – কি! আটটা বেজে গেছে ? তুমি আমাকে ডাকো নি ?

পার্বতী – ডেকে ডেকে গলায় ব্যাথা হয়ে গেছে। সারারাত গাঁজা, ভাঙ খেয়ে শ্মশানে পড়ে থেকে ভোরের দিকে ঘরে এসে রাবনবাবুর ভাই…

শিব – কে রাবন ?

পার্বতী –  উফফ, কাকে নিয়ে আমি… আরে বাবা তোমার ভক্ত, লঙ্কার রাবন… তার ভাই কুম্ভকর্ণ…

শিব – ও… তাই বলো, কুম্ভর কথা বলছো ? আরে বাবা, ওর কেসটা আলাদা। তোমরা জানো ও ছয়মাস ঘুমোয়… আসলে তা নয়, ও ছ’মাস কোমায় থাকতো। ও কোমায় থাকতে এবং কোমা থেকে বেরোতে পারতো। এটা একটা অভ্যেস বুঝলে, এটা অনুশীলন করে রপ্ত করতে হয়।

আরও পড়ুন:  বইমেলার দূষণ, দূষণের বইমেলা

পার্বতী – নিকুচি করেছে তোমার অনুশীলন। আজ এতো বড় একটা প্রোগ্রাম, কতো ধকল… সেই নিয়ে তোমার কোন ভাবনা আছে ?

শিব – (সিদ্ধির গ্লাসে চুমুক দিয়ে)  ইসস, সিদ্ধিতে একটুও মিষ্টি দাও নি ? মিষ্টি ছাড়া সিদ্ধি খাওয়া যায় ?

পার্বতী – খেও না, চারশো সুগার…ইনসুলিন চলছে…মিষ্টি শব্দটা উচ্চারণ করবে না। 

শিব – বয়স হলে এভাবে, ধুর… (বিরক্ত), কী প্রোগ্রামের কথা বলছিলে ?

পার্বতী – ওরে বাবারে… একে নিয়ে আমি কি করি রে… এখনও রাতের গাঁজার হ্যাং-ওভার কাটে নি… (শিবের কানের কাছে গিয়ে) আজ তুমি-রাত্রি ।

শিব – আমি-রাত্রি !

পার্বতী – হ্যাঁ আজ তুমি মানে…কী করে বলি, আমি কি তোমার নাম ধরতে পারি ?

শিব – ও, তাই বলো, শিবরাত্রি (হাসি)… হ্যাঁ যাব তো, গিয়ে চান করব, মনে আছে।

পার্বতী – শুধু চান করবে ? আর হাজার হাজার মেয়ে বউ আমার সামনে তোমায় নিয়ে যে রাত জাগবে ?

শিব – সে দিন আর নেই গো… সেই খুশির দিন…মানে খুশির রাত…

পার্বতী – মানে ?

শিব – মানে ? সেই সময়টা…যখন হাজার হাজার মেয়ে বউ’এরা উপোস করে আমার সঙ্গে রাত জাগত। কত গান, গল্প, ঠাট্টা… আসলে এটা তো আমাদের বাসর রাত। মর্তের মানুষ এই রাতটা ভক্তিভরে পালন করত। এখন সব গেছে পারো… পুজো দিয়ে এখন সব যেতে পারলেই বাঁচে। মেয়েগুলো এখন মোবাইল কানে দিয়ে রাতের পর রাত জাগছে তবু শিবরাত্রিতে রাত জাগবে না…অদ্ভুত।   

পার্বতী – এখানে আবার অদ্ভুতের কি আছে! আমি তো মনে করি ওরা ঠিক করে। টন টন বেলপাতা, গ্যালন গ্যালন দুধ, ধুতরো, আকন্দ, বাতাসা… ওফফ, অসহ্য। একটা মিনিমাম স্টেটাস নেই। আমার পুজো দেখে শিখতেও পারো না। প্যান্ডেল, লাইট, থিম, পদ্ম, হাজারো মিষ্টি, এক এক দিন এক এক রকম ভোগ..। তারপর ধরো মন্ত্রী, আমলা, নায়ক, নায়িকা…একেবারে রাজকীয় ব্যাপার বুঝলে।

আরও পড়ুন:  প্রজাতন্ত্র, পাবলিক ও পরিণত জনমানস

শিব- বুঝলুম…

পার্বতী – কিস্যু বোঝ নি। তুমি চেষ্টা করলেও কোনদিন এই জায়গায় আসতে পারবে না। ওরাও তোমাকে চিনে গেছে। জানে, ভোলেভালা মানুষ ওই ধুতরো, আকন্দ, বাতাসাতেই ম্যানেজ হয়ে যাবে। নাহলে কোন মন্ত্রী বা নায়ক নায়িকাকে ’তুমিরাত্রির’ উদ্বোধন করতে দেখেছো ?

শিব – না তা দেখি নি, কিন্তু ওরা আমাকে ভালোবাসে, সত্যিই খুব ভালোবাসে। নাহলে এভাবে নির্জলা উপোস করে আমার মতো বর প্রার্থনা করতে পারে ? শুধু তুমিই আমাকে চিনলে না পারো…

পার্বতী – তুমিও ওদের চেনোনি…ওরা তোমার মতো বর চায় না, ওরা তোমার মতো বর যেন না হয় সেটাই প্রার্থনা করে। নাহলে তুমি একটা কেস দেখাও যেখানে একটা মেয়ে তোমার মতো বাঘছাল পরা, মাতাল,বেকার, শ্মশানে থাকা মানুষকে পছন্দ করেছে। দেখাতে পারবে না।

শিব – এটা তো ভেবে দেখিনি, সত্যিই তো, ওরা না খেয়ে শিবরাত্রি করছে অথচ বিয়ে করবার সময় একেবারে হিসেব মিলিয়ে নিচ্ছে। না এটা তো মেনে নেওয়া যায় না…পারো, এর একটা বিহিত করতেই হবে (রাগ) ।

পার্বতী – থাক, আর কিচ্ছু করতে হবে না। ওরা যা পারে করছে করুক। তুমি তোমার কাজ করে আবার কৈলাসে ফিরে আসবে। আসলে, সমস্যাটা আমাদের নিজেদের। আমরা সময়ের সাথে সাথে নিজেদেরকে আপডেট করতে পারিনি। আদ্দিকালের সেই বারানসীর ব্যাধের গল্প দিয়ে আর কতদিন চলে বলো ! পাপী, নিষ্ঠুর ব্যাধ রাত কাটাবার জন্য বেল গাছে উঠল। ঘুমের ঘোরে বেলপাতা আর শিশির তোমার মাথায় পড়লো, তুমি খুশি হয়ে ব্যাধের সব পাপকাজ ক্ষমা করে দিলে। সেদিন ছিল চতুর্দশী। ব্যাস শুরু হয়ে গেল ‘তুমিচতুর্দশী’ পালন করার রেওয়াজ। ব্যাক ডেটেড বুঝলে এক্কেবারে ব্যাক ডেটেড। মর্তের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আনুমানিক চোদ্দশো শতাব্দীতে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনার পর আর একটা কেস দিতে পেরেছো?

শিব – আরে কেস তো অনেক ছিল পারো, কিন্তু…

আরও পড়ুন:  প্রজাতন্ত্র, পাবলিক ও পরিণত জনমানস

পার্বতী – প্রচার… প্রচার করতে পারোনি। তাই ‘তুমিরাত্রি’ আজ প্রতীকী হয়ে গেছে। এই হোয়াটস আপ, ফেসবুকের যুগে কে আর তোমার সঙ্গে রাত কাটাবে বলো ? মোবাইলে তোমার ছবি দেখে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে হোয়াটস আপে রাত কাটানো অনেক মজার।

শিব – যাকগে, ছাড়ো। ওরা যা পারে করুক। আমাদের যাওয়ার কর্তব্য, আমরা যাব। নাও, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও, এক্ষুনি তোমার সিংহ আর আমার ষাঁড় এসে পড়বে।

পার্বতী – না, আমার একটু দেরি হবে। কাল ‘সিঁদুর ছুঁয়ে বলছি’ সিরিয়ালটা দেখতে পারি নি। ওটা পরের দিন সকালে রিপিট হয়। ওটা দেখে তবে যাব।

পার্বতী বেরিয়ে যায়, শিব হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। আমি লুকিয়ে বেরিয়ে মর্তে ফিরে এসে সোজা অফিসে।                

NO COMMENTS