‘নারী’ শব্দের অর্থ অবমাননাকর: কাঠগোড়ায় অক্সফোর্ড অভিধান

598

অক্সফোর্ড ডিকশনারি। তামাম দুনিয়ার ভাষা গবেষকদের বাইবেল। শব্দার্থের সামান্য বিভ্রান্তিতে আজও আমাদের ছুটে যেতে হয় অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে ছাপা সেই নীল মলাটের বইটির কাছে। তবে সম্প্রতি সেই আকর গ্রন্থই বিতর্কের শিরোনামে। কারণ আর কিছুই নয়, “নারী” বা woman শব্দের অর্থ। 

অক্সফোর্ড অভিধানের সাম্প্রতিকতম সংস্করণটিতে woman শব্দের অর্থ বা প্রতিশব্দ হিসেবে যুক্ত হয়েছে এমন বেশ কিছু শব্দ, যা আপত্তিকর এবং মেয়েদের পক্ষে অপমানজনক। তার মধ্যে রয়েছে bitch, besom, piece, bit, mare, baggage, wench, petticoat, frail, bird, biddy, filly ইত্যাদি শব্দ। এই নিয়েই গোল বেধেছে নারী অধিকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে অক্সফোর্ড আভিধানিকদের। 

ঘটনাটা কী? লন্ডনের বাসিন্দা তথা নারীর সমানাধিকার নিয়ে আন্দোলনরত মারিয়া বিয়াত্রিচ জিওভানার্দি সম্প্রতি তাঁর একটি প্রকল্পের নামকরণ করতে গিয়ে নারী শব্দের প্রতিশব্দ খুঁজতে অক্সফোর্ড অভিধানের দ্বারস্থ হন। তখনই তাঁর চোখে পড়ে এই ঘটনা। নড়েচড়ে বসেন মারিয়া, কারণ তাঁর মতে, শব্দগুলি শুধু যে আপত্তিকর তা-ই নয়, যে ভাবে তাদের ব্যবহার শেখানো হয়েছে তা-ও অত্যন্ত অপমানজনক। যেমন বলা হয়েছে – Ms September will embody the professional, intelligent yet sexy career woman… এখানে নারীকে “সেক্সি” বলা ছাড়াও yet শব্দের ব্যবহারের মাধ্যমে বাক্যের অন্তর্নিহিত ভাবটিতে প্রকাশ পাচ্ছে নারীর পেশাদারিত্ব এবং বুদ্ধিমত্ত্বার সঙ্গে যৌন আবেদনের বিরোধ। অর্থাৎ যে নারী পেশাদার এবং বুদ্ধিমতী, তাঁর যৌন আবেদন থাকাটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা নয়। আরেকটি উদাহরণে বলা হচ্ছে – I told you to be home when I get home, little woman… এই little woman শব্দটি সম্পূর্ণ পুরুষতান্ত্রিক সুপিরিয়রিটি থেকে উচ্চারিত হওয়া একটি অপমানজনক পরিভাষা যা বিশেষ ভাবে “বিবাহিতা স্ত্রী”-কে বোঝাতে প্রযুক্ত হয়। বাক্যটিতেও তার অর্থ স্পষ্ট। বোঝাই যাচ্ছে জনৈক পুরুষ তাঁর স্ত্রীকে বলছেন, “আমি যখন বাড়ি ফিরব তখন তোকে বাড়িতে থাকতে বলেছিলাম।“ অর্থাৎ পুরুষের অধীনস্থ পরাধীন ভৃত্যস্থানীয় হিসেবে নারীর অবস্থানকে স্পষ্ট করে দিচ্ছে এই একটি বাক্য। 

মারিয়া জিওভানার্দির মতে, এই ধরনের বাক্য নারীকে শুধু যে যৌন-বস্তু হিসেবে তুলে ধরছে তা-ই নয়, এ কথা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, যে অভিধানটি লেখা হয়েছে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে যেখানে নারী মাত্রেই পুরুষের অধীন এবং সময়ে সময়ে বিরক্তি-উদ্রেককারিণী। মারিয়ার নিজের কথায়, “অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের মতো একটি বিশ্ববিশ্রুত প্রকাশনা সংস্থার কাছ থেকে এটা কখনওই প্রত্যাশিত নয়। কোনওমতেই এটা মেনে নেওয়া যায় না। উপরন্তু, আমাদের রোজকার কথ্যভাষার নিয়ম ও বিধি প্রচলনের ক্ষেত্রে অক্সফোর্ডের প্রভাব যদি আমরা গণনা করি, তাহলে আশঙ্কা আরও বাড়ে, কারণ প্রতি দিন লক্ষ লক্ষ মানুষ ভাষাগত সমস্যা সমাধানের জন্য এই অভিধানের উপরেই সর্বাধিক নির্ভর করেন। এ ছাড়াও রয়েছে অজস্র সার্চ এঞ্জিন, যারা শব্দার্থ নির্ণয় করতে সরাসরি অক্সফোর্ড অভিধানের ভাষাই উদ্ধৃত করে।“ 

মারিয়া জিওভানার্দি ছাড়াও লন্ডনের একটি সংস্থা ইস্ট লন্ডন ফসেট-ও এই বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে। মারিয়ার মতো এরাও লিঙ্গসাম্য সংক্রান্ত বিষয় নিয়েই কাজ করে। Change.org ওয়েবসাইটের মাধ্যমে একটি আবেদনপত্র অনলাইনে ছড়িয়ে দিয়েছেন মারিয়া ও ইস্ট লন্ডন ফসেট। সেখানে woman শব্দের অর্থ ও পরিভাষা পরিবর্তনের জন্য অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের উদ্দেশে আবেদন জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যেই ত্রিশ হাজার মানুষ তাতে সাড়া দিয়ে সই করেছেন। 

কিন্তু এ বিষয়ে অক্সফোর্ড কর্তৃপক্ষের বক্তব্য কী? সংস্থার এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক ক্যাথারিন কনর মার্টিন জানিয়েছেন, কোনও বিশেষ শব্দের অর্থ অবমাননাকর হলেও, তার ব্যবহার যদি বহুল প্রচলিত হয়, তাহলে অভিধানে তা অন্তর্গত করতেই হবে। কারণ, অক্সফোর্ড থেসরাস এবং ডিকশনারি লেখা হয় ভাষার ব্যবহারিক এবং বাস্তব প্রয়োগের উপর নির্ভর করে। কাজেই শুধু সামাজিক ভাবে আপত্তিজনক বা অশ্লীল বলে একটি শব্দকে অভিধান থেকে বাদ দেওয়া কখনওই সম্ভব নয়। কেউ কেউ আবার এ কথাও বলেছেন যে, এই শব্দগুলিকে অভিধান থেকে বাদ দিলে এদের সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে নারী নির্যাতনের এক কলঙ্কিত ইতিহাস। যুগ যুগান্তর ধরে ভাষার বিবর্তনের মধ্যে নিহিত সামাজিক ইতিহাস পাঠের যে চেতনা ও রীতি রয়েছে, মুছে যাবে তা-ও। 

তাহলে উপায়? ইতিহাসচেতনা এবং ব্যবহারিক প্রয়োগের নামে নারী শব্দের আপত্তিকর প্রতিশব্দের উল্লেখ কি চলতেই থাকবে? একুশ শতকে বিশ্বে কিন্তু এমন অনেক সংস্থাই রয়েছে যারা শব্দার্থের লিঙ্গসাম্যের দিকটি নিয়ে যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করছে। যেমন Dictionary.com তাদের সাইটে woman শব্দের বিকল্প বানান হিসেবে womyn শব্দটি চালু করেছে। সেক্ষেত্রে নারী বোঝাতে man সাফিক্সটির আর প্রয়োজন পড়ছে না। কেম্ব্রিজ এবং মরিয়ম ওয়েবস্টারের মত বিখ্যাত অভিধান সংস্থাগুলিও লিঙ্গসাম্য সংক্রান্ত সচেতনতার কথা মাথায় রেখে শব্দার্থের ক্ষেত্রে এ ধরনের বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে। ফলে ক্রমেই জোরদার হচ্ছে জিওভানার্দির দাবি। অক্সফোর্ড কর্তৃপক্ষের কাছে তাই আবেদন, অবমাননাকর শব্দগুলি বাদ না-দিলেও সেগুলির ব্যবহার যে ‘অবমাননাকর’ বা ‘অপমানজনক’ সে কথাটুকুর অন্তত উল্লেখ থাক না অভিধানে?  

2 COMMENTS

  1. অপ্রয়োজনীয় তর্ক। সমাজে যে ব্যাধি বিদ্যমান তা-ই প্রতিফলিত হয়েছে অক্সফোর্ডের সংকলনে। এটা ডিকশনারি কোনও নীতিমালার সংকলন নয়। যেভাবে লোক বলে অভিধানের কাজ হল তাকেই সংকলিত করা। যা হওয়া উচিত বা উচিত নয় ইত্যাদি বিবেচনার দায় অভিধান নিতে পারে না।

    • সংকলনে বাধার কথা জিওভানার্দি বলেননি। পরিমার্জনের কথা বলেছেন। অর্থাৎ শব্দগুলি যে ইতরার্থে ব্যবহৃত হয় তার উল্লেখ রাখার কথা বলা হয়েছে। সেটা সম্ভবত আভিধানিকেরই দায়িত্ব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.