পাল্টা আত্মঘাতী আক্রমণই কি প্রতিরোধের একমাত্র উপায়?

162

গত ১৪ই ফেব্রুয়ারি কাশ্মিরের পুলওয়ামাতে যে ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় চল্লিশ জনের বেশি সি আর পি এফ জওয়ানের মৃত্যুর পর সমগ্র ভারতবর্ষে যে একটা অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, একথা স্বীকার করতে কোন দ্বিধা দ্বন্দ্ব থাকা উচিত নয়, এর কারণ খুঁজতে গেলে ইতিহাসের অনেক অলিগলিতে নাড়া দিতে হবে সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন ভাবে দেশপ্রেমকে কেন্দ্র করে বার্তার আদানপ্রদান যেমন হচ্ছে তেমনিই এক শ্রেণির অতিমাত্রায় উন্নাসিক মানসিকতার মানুষ সব কিছুর মধ্যেই রাজনৈতিক অভিসন্ধি বা আগতপ্রায় ইলেকশন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবার একটা চক্রান্ত খুঁজে পাচ্ছেনআমাদের রাজ্যের কথা এখন এক্ষেত্রে ছেড়ে দেওয়াই ভালো কারণ এখানকার একটা ঐতিহ্য হল রাজনীতি বঙ্গবাসীর মস্তিষ্ক চিবিয়ে খায়, একটা সময় সেই ‘আমরা এবং ওরার’ অংশ বিশেষ হয়ে বেঁচে থাকবার পরে এখন যেভাবে অনুপ্রেরণাতে বেঁচে থাকা হচ্ছে সেখানে হিরে থেকে জিরে সবই অনুপ্রেরণার ফসলএখন এই অনুপ্রেরণা না থাকবার জন্যে এই বঙ্গের বেশ কিছু মানুষ এক পা এগিয়ে দু’পা পিছিয়ে যাচ্ছে এই ভেবে যদি জঙ্গি হামলার নিন্দা করলে কোথাও কোন অনুপ্রেরণা থেকে বঞ্চিত হতে হয়? স্বভাবতই এখানে স্বদেশের নাম গান গাওয়া বা না গাওয়া দুটোই অনুপ্রেরণা ছাড়া এক রকম অসম্ভব

এটা গেল আমাদের রাজ্যের অবস্থা, কিন্তু দেশের বাকি অংশের অবস্থা একটু আলাদা, কেউ চাইছে যুদ্ধ কেউ বা কূটনৈতিক ভাবে মোকাবিলার কথাও বলছেন | অনেকে বলছে জিডিপি রেটে ছয় একটি দেশ খুব সহজেই জিডিপি রেটে একশ সাতাশে থাকা আরেকটি প্রতিবেশী দেশকে খুব সহজেই অর্থনৈতিক ভাবে দূর্বল করে দিতে পারে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিকতা প্রভৃতি সব বিষয়ে এক্কেবারে আলাদা করে অন্যান্য দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এই জঘন্য আক্রমণের প্রতিশোধ নেওয়া যায়, আবার পাকিস্তানের ভিতরে বেলুচিস্তানে যে স্বাধীনতার ঢেউ উঠেছে তাকে আরো উস্কানি দিয়েও একটা কূটনৈতিক যুদ্ধ করাবার কথাও অনেকে বলছেনএর মাঝেই ভারতীয় সেনা বাহিনীর এক অবসরপ্রাপ্ত কর্তা আমাদের প্রতিবেশী দেশের এধরণের আক্রমণের বিরুদ্ধে আমাদের দেশেরও আত্মঘাতী বাহিনী তৈরী করে প্রতি আক্রমণ চালানোর পক্ষেই মতামত দিয়েছেনতবে বিষয়টা বলা যতটা সহজ, কার্যকর করা ততটা সহজ নয়

অন্যদিকে এই আত্মঘাতী আক্রমণের ইতিহাস কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়কালীনসেই সময় জাপানি সৈন্যদের কামিকাজি( kamikaze) পাইলটরা এই ধরনের আক্রমণ আরম্ভ করেছিল তখন থেকে আরম্ভ করে চৌদ্দ তারিখের এই ভয়াবহ ঘটনা, এই পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি আত্মঘাতী আক্রমণ হয়েছেকত যে মানুষ মারা গেছেন তার আর সঠিক সংখ্যা কারোর কাছেই নেইঅবশ্য জাপানের আগে আমেরিকা এই সুইসাইড শব্দটি ব্যবহার করে তাদের জার্মানিদের একটি বিশেষ যুদ্ধ নীতির সম্পর্কে জানানোর জন্য যা বর্তমানে এই আত্মঘাতী আক্রমণের নামান্তর।অনেকে বলেন সারা বিশ্বের প্রায় পঞ্চাশটির বেশি দেশে এই আক্রমণ হয়ে প্রায় ষাট হাজারেরও বেশি মানুষ এতে মারা গেছেন যুদ্ধ বিশারদরা বলেন অন্যান্য আক্রমণের থেকে এই আত্মঘাতী আক্রমণ অনেক বেশি ভয়াবহ কারণ এতে সেই আক্রমণকারীর নিজস্ব মৃত্যু ভয় থাকে না, তাই অবস্থাকে আরো বেশি ভয়াবহ করাটাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, প্যালেস্টাইন, ভারত এই আত্মঘাতী জঙ্গি আক্রমণের মূল কেন্দ্রভূমি, অবশ্য আমরা কেউ আমেরিকার ০৯/১১ এর আক্রমণের ঘটনা ভুলতে পারিনি, ওটাও একটা আত্মঘাতী আক্রমণই ছিলসংখ্যাতত্বের বিচারে যেখানে ২০০৬ পর্যন্ত যেখানে মাত্র দুই শতাংশ আত্মঘাতী আক্রমণ হয়েছে সেখানে ২০০৬ এর পরে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের বত্রিশ শতাংশই আত্মঘাতী আক্রমণ, এবং আরো অবাক ব্যাপার হল এই আক্রমণর সিংহভাগই হয়েছে পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা প্যালেস্টাইন বা শ্রীলঙ্কার মত দেশগুলিতে। একটি অবাক করা তথ্য হল শ্রীলঙ্কায় এল.টি টি ই রা কিন্তু আত্মঘাতী আক্রমণের সপক্ষে প্রথম দিকে না থাকলেও পরে কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় এইরকম আত্মঘাতী আক্রমণ করতে আরম্ভ করেসময়ের সাথে আত্মঘাতী আক্রমণের চরিত্র পাল্টেছে, একসময় সন্ত্রাসবাদীরা শুধু মাত্র নামী দামী লোকদের মেরে তাদের অস্তিত্ব জানান দেবার চেষ্টা করত সেখান থেকে আজ তারা খোলা জায়গায়, বা যে জায়গা সাধারণ মানুষ তুলনামূলক ভাবে নিজেদের সুরক্ষিত ভাবে সেই সব জায়গায় আক্রমণ আরম্ভ করে, এতে ক্ষয় ক্ষতি অনেক বেশি হয়। এই আত্মঘাতী জঙ্গি আক্রমণের সাথে আরেকটি শব্দ খুব ওতঃপ্রতো ভাবে জড়িত তা হল ইসতিসাদ( istishhad) এই আরবি শব্দের অর্থ হল বীরের মৃত্যু যার সাথে আবার পারাঙ্গ সাবিল নামে এক ব্যক্তিগত ধর্মীয় জিহাদের কথা জড়িয়ে আছে যেখানে এক মুসলিম ধর্মালম্বী সৈনিক নিজের রাজ্যের সাথে যুদ্ধ করতে আসা ডাচদের বিরুদ্ধে এই আত্মঘাতী যুদ্ধ করেপরবর্তী কালে অন্যান্য আরো অনেক দেশের ইতিহাসে এই আত্মঘাতী আক্রমণের কথা শোনা গেছে, যদিও সেইসব খুবই সাধারণ ঘটনার মধ্যেই পড়ে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা নিজের দেশের স্বার্থে অন্য কোন দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণ, কিন্তু এই ধর্মের জন্য আত্মঘাতী আক্রমণ খুব বেশিদিনের পুরানো নয়কিছু কিছু মানুষকে ভুল বোঝানো হচ্ছে এই বলে যে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে আত্মঘাতী আক্রমণ করে মানুষ মারলে তাড়াতাড়ি স্বর্গে যাওয়া যায় ও বিভিন্ন ধরণের সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায়

আমাদের দেশ কিন্তু ভারি মজার এখানে জাতীয় পতাকা নিয়ে বাইরে মিছিলে বের হলে তারপরের দিন খবরের কাগজে খবর হয়ে যায়, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলা কোন অপরাধ নয়, অথচ প্রতিবেশী দেশেই একটি স্কুলে “ ইণ্ডিয়া জিন্দাবাদ” বলবার জন্য পুরো স্কুলকে সাসপেন্ড করা হয় আর আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীকে শুনতে হয়, ‘ উনি ভোটের জন্য এই আক্রমণ করিয়েছেন‘ দেশে বিভিন্ন সংবাদপত্রে ক্রমাগত দেশবিরোধী সংবাদ সম্প্রচার করা হয় এবং তার প্রতিবাদ করলেই শুনতে হয়, ‘ এটা নাকি উগ্র জাতীয়তাবাদ‘ এটা সত্যি কাউকে দেশপ্রেম শেখানো যায় না, তাই জোর করে কাউকে দিয়ে ভারতমাতার জয় বলিয়েও অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন যে সম্ভব নয় সেটাও পরিস্কারএমন সময়ে লড়াই শুধুমাত্র দেশের ভিতরেই নয়, বাইরেও একই রকমের লড়াই কয়েকদিন আগেই একটি খবর ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে, দেখা যায় ভারতের একটি রাজ্যে বেশ কয়েকশো যুবক রাস্তায় নেমে এই মর্মে আন্দোলন আরম্ভ করে যে তাদের জন্য আবিলম্বে আত্মঘাতী বাহিনী তৈরী করে সেখানে তাদের রিক্রুট করে দেশের জন্য আত্মবলিদান দিয়ে একই ভাবে সন্ত্রাসবাদীদের ধ্বংস করতে দেবার সুযোগ দিতে হবেএই আলোচনার প্রথমে ঠিক যা বলে শুরু করা হয়েছিল সেই আত্মঘাতী বাহিনী তৈরী করে একই কায়দায় আক্রমণ করাকূটনেতিক স্তরে যেভাবে জব্দ করবার চেষ্টা হচ্ছে তার পাশাপাশি এই রকম আক্রমণ যদি আমাদের দেশও চালিয়ে যেতে পারে একমাত্র তাহলেই কিছুটা হলেও প্রকৃত বদলা নেওয়া যাবে, কারণ কাউকেই খুব বেশি বার সুযোগ দেওয়া যায় না

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.