অতিথি বিতাড়ন

Bengali ramyarachona

অবনীবাবু থাকেন আমাদের আগের পাড়া বেনেপুকুরে। এককালে বেনেপুকুরের মানুষ একডাকে চিনতেন ভদ্রলোককে। নেতা, মাফিয়া, বাবাজী বা গণৎকার নন, অবনীবাবুর নামডাক একজন দক্ষ ম্যানেজার হিসেবে। ভুল করবেন না; কারখানা, স্টেজ বা কাপড়ের দোকানের ম্যানেজার না, অবনী চাকলাদার প্রতিভাবান গেস্ট ম্যানেজার। অতিথি নিয়ন্ত্রণ, আসলে অতিথি বিতাড়নে অবনীবাবু স্বনামধন্য।

এককালে বাঙালি অতিথিকে নারায়ণ ভেবে যথেষ্ট খাতিরযত্ন করত। তারপর আকাল আসায় সরকার অতিথি নিয়ন্ত্রণ বিধি চালু করে। প্রবীণ পাঠক মনে করতে পারবেন, বিয়েবাড়িতে ছানার লেডিকিনির বদলে কাঁচকলার পান্তুয়া, বাড়িতে কেউ এলে শুধু এক গ্লাস জল। মান্যগণ্য কেউ হলে চিনিছাড়া এক কাপ চা। অতিথিকে সিঙাড়া মিস্টি দূরের কথা, বিস্কুট বাতাসা গুজিয়া এমনকি নকুলদানা খাওয়ালেও পুলিশ ধরার ভয় ছিল।

অতিথিপরায়ণ মানুষ নানা কায়দায় সরকারি আইন এড়াতেন তখন। আমাদের পাড়ার যুগল বল ছেলের বৌভাতে একশোজনের সীমা ভেঙে তিনশোজনকে ভোজ খাওয়ালেন। পরে জানা যায়, ভোজের খরচ যুগলবাবু আদায় করেছিলেন নববধূর পিতার কাছ থেকে। এরকম অনৈতিক ও বেআইনি অতিথিসেবার জন্য যুগলবাবুর ডবল হাজতবাসের আশঙ্কা ছিল।

কারাবাস এড়াতে আমাদের থানার চার দারোগা, আট হাবিলদার, পাঁচ জমাদার, দুই হাজতদারকে সবান্ধবে , সপরিবারে পেটপুরে খাওয়ালেন যুগল বল। গোটা থানা নাকি আত্মীয়পরিজন সহ লাইন দিয়ে মার্চ করতে করতে খেতে এসেছিল। পাছে ফাঁকা থানা পেয়ে লকাপের আসামীরা পগারপার হয়ে যায়, কোমরে দড়ি বেঁধে চোর ডাকাতদেরও ভোজ খাওয়াতে নিয়ে আসা হয়। বড়বাবুর শালা, ছোটবাবুর শালী, মেজবাবুর শ্বশুরও সপরিবারে প্রীতিভোজে খেয়ে যান।

অবনীবাবুর গল্পে ফেরা যাক। যে কোনো অতিথিকে ভদ্রলোক সাড়ে তিন মিনিটে বাড়ি ফেরার পথে নামিয়ে দিতে জানেন। দাঁত কিড়মিড় করে বা তাড়া করে না, বাক্যের জালে অতিথিকে বেঁধে ফেলে ফেরার পথে রওনা করে দেন অবনী, হাসতে হাসতে । গেস্ট বুঝতেই পারেন না, তিনি বিতাড়িত হয়েছেন। অতিথি ঝাঁটানো বা গেস্ট কাটানোর নিত্য নতুন পদ্ধতি আবিস্কার করে পাড়া পড়শি আত্মীয় বা অনাত্মীয়দের ওপর সেগুলো প্রয়োগ করেন চাকলাদার।

অবনীভূষণের প্রয়াত পিতৃদেব অমূল্যভূষণ ছিলেন পরম অতিথিবৎসল। সুখাদ্যে, সুশয্যায়, পান-তামাকে গল্পে আড্ডায় অতিথিদের মাত করে দিতেন অমূল্যবাবু। একবেলার জন্য গিয়ে কেউ দিন দুয়েকের আগে তার বাড়ি থেকে ফিরতেন না। কোনো কোনো অতিথি মাসাধিককাল কাটিয়ে দেবার পর বাড়ির লোক এসে জোর করে বাড়ি ধরে নিয়ে যাচ্ছে, এমন ঘটনাও অনেকে নিজের চোখে দেখেছে। বাবা মারা যেতে অবনী বাড়ির মালিক হয়েই এক মাতাল দারোয়ান ও এক দাঁতাল কুকুর বাড়িতে নিয়ে আসে। বাড়ির দরজায় অতিথির ছায়া দেখা মাত্র মাতাল তর্জন ও কুকুর গর্জন করতে করতে অতিথির দিকে ছুটে যেত। অতিথির জন্য অবারিত দ্বার ‘অমূল্য ভবন’ রাতারাতি অতিথিদের আতঙ্ক হয়ে যায়।

এসব বহুকাল আগের কথা। পাড়ার মুক্তমঞ্চে ‘বাপের কুলাঙ্গার ছেলে’ উপাধি লাভ করে অবনী পাতিপুকুরের বাড়ি বিক্রি করে বেনেপুকুরে চলে আসেন। বড় রাস্তা থেকে আর বাড়ি যাবার গলিপথ রহস্যময় কারণে প্রায়ই চলনসই থাকে না। বর্ষায় এক হাঁটু জল, বছরভর খোঁড়াখুঁড়ি। তবু কিছু আত্মীয়স্বজন না জেনে চলে আসেন। ফোনে কেউ আসবেন বললে অবনীবাবু রাস্তার দুরবস্থা সবিস্তারে জানিয়ে নার্সিংহোমে একটা বেড বুক করে, আসতে বলেন বলে শোনা যায়। না জানিয়ে কেউ এসে পড়লে অবনী সদর দরজায় ছুটে যান। ‘খুব সাবধান…দেখেশুনে পা…আমাকে না দেখে নীচের গর্ত দেখুন…একটু এদিকওদিক হলেই…পরশু মতিবাবু গাড্ডায় পড়ে পা ভেঙেছেন! ভয় পেয়ে অতিথি দাঁড়িয়ে পড়লে, ‘দাঁড়ান ওখানে, আমি যাচ্ছি’ বলে গেস্টকে বড়রাস্তার ওপর রামরিজের চায়ের দোকানে নিয়ে যান। রামরিজ বাবুটিকে ছোট একভাঁড় চা ও একটি লেড়ো বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করে খাতায় লিখে রাখে। অবনী ‘বড়বাবুকে চা খাওয়াও’ বললে বড় ভাঁড়ে চা দেয় রামরিজ, অতিথি ‘ছোটবাবু’ হলে ছোট ভাঁড়ে!

রাস্তা চলনসই, অতিথি এসে পড়েছেন। দরজা খুললেন গৃহকর্তা। ‘ও, এসেছেন, তা বসুন, ওরে এ ঘরে এক গেলাস জল…ইস! এমন দিনে এলেন…জরুরি কাজ, আমাকে এখনই বেরোতে হবে, ওরে এক কাপ চা…ওহো! আপনার তো আবার অম্বলের রোগ, চা চলবে না…শুনছিস, চা খাবেন না। তাহলে চলুন, দেরী হয়ে যাচ্ছে, একসঙ্গে বেড়িয়ে পড়ি…ওরে আমরা বেরোলাম…দরজাটা আটকে দে।’

এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় দুম করে চলে এসেছেন। ‘এসো, জানতাম আসবে…গাড়িতে এলে তো…চলো আগে একটু নিউ মার্কেট থেকে ঘুরে আসি…কয়েকটা জরুরি কেনাকাটা…চলো চলো।’ গাড়ি নিউ মার্কেট পৌঁছোতেই, ‘গাড়িতেই বসো, যাব আর আসব’, বলে অবনী চাকলাদার হারিয়ে গেলেন ভিড়ে…টানা আড়াই ঘন্টা অপেক্ষা করে, ‘ধুত্তোরি! মোবাইলটাও সুইচ অফ, এই শেষ’, আত্মীয় ফিরে চললেন বেহালার বাড়ির দিকে।

মামাতো শালা চলে এসেছে, স্ত্রী বাড়ি নেই। ‘এসো শালাবাবু, গরমে তেতেপুড়ে এলে, পাখার নিচে বোসো, ওরে শুনছিস, মিস্টি নিয়ে আয়’, চাকর জগা বেরিয়ে নিচে নামতেই লোডশেডিং। ‘ছি, ছি, কোনো মানে হয় …এখানে আবার দু’ঘন্টার আগে আসে না…কী আর করবে, অন্ধকারেই বসো!’ কিছুক্ষণ ঘেমে শালা অস্থির, ‘আজ চলি জামাইবাবু।’ দিদির বাড়িতে এসে…খারাপ লাগছে…চলো তাহলে…রামরিজের দোকানে একটু চা খেয়ে যাও।’ আশেপাশের সব বাড়িতে আলো জ্বলছে। দেখো কাণ্ড, শুধু আমারটাই গেছে…তার মানে আট দশ ঘন্টা…চা না খেয়ে বিরসমুখে শালাবাবু বিদায় নিতেই জগা আড়াল থেকে বেরিয়ে মেইন সুইচ অন করে দেয়। মিস্টি নিয়ে আসার রহস্য না বুঝলে অবনীবাবুর চাকর হওয়া যায় না!

একবার না বলে কয়ে চলে এসেছেন মাসতুতো শালী, সপরিবারে। অফিসে বসে ফোনে খবর পেলেন অবনী। দিদির বাড়িতে জমিয়ে বসেছেন শ্যালিকা, দাঁত কিড় মিড় করছেন জামাইবাবু। ফিরতে রাত হল অবনীর। এক বড় হাসপাতাল ঘুরে আসতে হয়েছে। মাংস রান্নার গন্ধ পেলেন ঘরে ঢুকেই। খাওয়াদাওয়ার পর চলে গেলেন সিঁড়ির ঘরে। লুকিয়ে হাসপাতাল থেকে আনা থলেটি চুপিচুপি বসার ঘরে সোফার নিচে রেখে থলের মুখের বাঁধন দিলেন খুলে।

শোবার ঘরে আড্ডা আর গল্পে মেতে আছেন শ্যালিকা গার্গী আর তাঁর দুই কন্যা, হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ করে নারী বাহিনীর আর্ত চিৎকার। ‘ওরে বাবা রে, বাঁচাও’, শুনে অবনী দৌড়ে গেলেন শয়নকক্ষের দরজায়। ঘরে তখন দক্ষযজ্ঞ। দুই হুলো বিড়াল দর্শনে চার কন্যা নাচছেন, কাঁদছেন, দৌড় মারছেন। স্ত্রী ও শ্যালিকাদের মার্জারভীতির কথা অজানা ছিল না। শালীর মেয়ে দুটিকেও নৃত্য করতে দেখে মনেমনে আহ্লাদে আটখানা হলেন চাকলাদার।

বিড়াল তাড়ানো গেল না। অগত্যা শ্যালিকা দিদি ও দুই কন্যাকে নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে যাদবপুরে অন্য এক দিদির বাড়ি চলে গেলেন ট্যাক্সি নিয়ে। তিনদিন বাদে স্ত্রী ফিরলেও এই ঘটনা শুনে অবনীবাবুর বোন, শালী আর কোনোদিন তার বাড়িতে অতিথি হবার সাহস পাননি। মহিলা অতিথিদের বিতাড়নে বিড়াল বাদ দিলে অবনী আরশোলা, মাকড়সা অন্য নানা প্লাস্টিকের তৈরি পতঙ্গ ব্যবহার করেছেন বেশ কয়েকবার। সর্পভীতিতে আক্রান্ত খুড়তুতো শ্বশুরকে হাওড়া স্টেশন থেকে কেনা প্লাস্টিকের সাপ পায়ের সামনে ছেড়ে বাড়িছাড়া করেছিলেন একবার। এমন গল্প বেনেপুকুরের পুরোনো প্রতিবেশীদের মুখে মুখে ঘুরত কিছুদিন আগেও।

অফিসের তিন সহকর্মী এসেছেন হঠাৎ করে। চাকর জগন্নাথ অতিথিদের বসাল ড্রয়িংরুমে। একটু বাদে ভেতর থেকে সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে মাথা ঢেকে এলেন অবনীবাবু। জ্বরে কাঁপছেন। একজন কপালে হাত দিয়ে জ্বর কতটা বুঝতে যেতেই পেছিয়ে গেলেন অবনী। ‘ছোঁবেন না, ছোঁবেন না, চিকেন পক্স, আজই বেরিয়েছে, ইনফেকশাস স্টেজ’ শুনেই সহকর্মীরা দৌড়ে পালালো। পেছনে চাকরের গলা, ‘আপনাদের না হয়ে যায়!’

একবার কালবৈশাখীর ঝড়ে চাকলাদার বাড়ির একটা আমগাছের ডাল ভেঙে পড়ল গেটের মুখে। আরও অনেকের বাড়ির পথ গাছ ভেঙে অবরুদ্ধ, সবাই লোক ডেকে গাছের ভাঙা ডাল সরালেন। সরালেন না একমাত্র অবনীবাবু। বহুদিন, টানা প্রায় সপ্তাহ দুই ভাঙা ডালে চড়ে বিচিত্র কায়দায় বাড়ির বাইরে বেরোতেন ও বাড়ি ঢুকতেন অবনী। ক’জন অতিথি এলেন আর ফিরে গেলেন।

অতিথি বিতাড়ন করতে গিয়ে একবারই ল্যাজেগোবরে হয়েছিলেন অবনীবাবু। জাঁদরেল শ্বশুর রাখালদাস জোয়ারদার এসেছেন মেয়ের বাড়ি। ঠাকুরঘরে শিবমূর্তির সামনে বসে নিরম্বু উপবাস করছেন জামাই। থলি হাতে বাজার গেলেন রাখালবাবু, মেয়ে দিদির বাড়ি গেছে। বাজার সেরে ফিরে নিজের হাতে খাসির মাংস রান্না করলেন করিৎকর্মা শ্বশুর। নিরম্বু জামাইকে সামনে বসিয়ে মাংসভাত খেলেন তারিয়ে তারিয়ে। রাতে রাঁধলেন চিংড়ির মালাইকারি। আর পারলেন না জামাই, ‘উপবাস একবেলার। এবেলা আমিও খাব।’ ‘বেশ, তবে উপোষ করা পেটে চলবে না। ওবেলার মাংসর ঝোল আছে, ডাল মিশিয়ে ফুটিয়ে সুপ বানিয়ে দিচ্ছি।’ শ্বশুর সশব্দে গলদা চিংড়ির মালাইকারি খাচ্ছেন গরম ভাত দিয়ে। জামাইবাবাজি ট্যালট্যালে মাটন স্যুপ।

Advertisements
Previous articleপ্রকল্প
Next articleনারীমুক্তি ও স্তন বিযুক্তি
শ্যামল চক্রবর্তী
শ্যামল চক্রবর্তী পেশায় শুধু চিকিৎসক নন, পুরোদস্তুর লেখক। আনন্দ থেকে প্রথম বই ' স্বপ্ন দেখেন কেন' প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ তে। রম্যরচনা , রবীন্দ্রনাথ, ভ্রমণ , বাচ্চাদের গল্প, শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে এ পর্যন্ত প্রকাশিত বই ৩১ টি। রম্যরচনার বই ' খোশগল্প' প্রকাশিত হয়েছে দে'জ পাবলিশিং থেকে। ' ডাক্তারবাবু হাসুন ' ও ' গণৎকার ডাক্তার ' পত্রভারতী থেকে। আরও তিনটি বই প্রকাশিত হবার পথে। বাংলাভাষায় ধারাবাহিক অবদানের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাব্দীপ্রাচীন ' জগত্তারিণী স্বর্ণপদক ' পেয়েছেন ২০১৬ সালে।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.