দেবাশীষ দেব
স্বনামধন্য এই অঙ্কনশিল্পী নিজেই এক সম্পূর্ন প্রতিষ্ঠান | তাঁর হাত ধরে নতুন করে প্রাণ পেয়েছে বাংলার কার্টুন শিল্প | সিগনেচার বেড়াল আর স্ব-নেচারটি কোমল, আত্মবিশ্বাসী, রসিক | বেড়ানো তাঁর নেশা | তাই ঝুলিতে রয়েছে বহু গল্প, সঙ্গে অসাধারণ সব স্কেচ | সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নিরলস সাধনার অমর ফসল ‘রঙ তুলির সত্যজিৎ’ |
মনমাতানো জায়গা সেলেরিগাঁও

রেশিখোলা ছেড়ে আসার হতাশাটা যে খুব বেশিক্ষণ থাকবে না সেটা জানতাম কারণ আমাদের জন্য তখন ছ’হাজার ফিট উঁচু পাহাড়ের ওপর অপেক্ষা করে আছে সেলেরিগাঁও । সেও এক মন মাতিয়ে দেওয়ার মতো জায়গা বটে । পেডং হয়ে গাড়িতে বেশ খানিকটা লঝ্ঝড়ে খাড়াই রাস্তায় রীতিমত নাচানাচি করে তবেই পৌঁছতে হয় । এ নিয়ে আমার দ্বিতীয়বার হলো কারণ গিন্নি আগেরটায় আসেননি এবং বলা বাহুল্য শুধু গপ্পো শুনে আর ছবি দেখে তাঁর মন ভরেনি । প্রথমবার অবশ্য সঙ্গে ছিল আমার বেড়ানোর নিত্যসঙ্গী অভিজিৎ ও তার বউ । ওরাই কলকাতায় বসে এখানকার ‘আলিশা হোম স্টে’র দুখানা ঘর বুক করে ফেলে ।

Banglalive

সেলেরি গাছ থেকে নামকরণ হওয়া এই পাহাড়ি গ্রামটিকে সম্প্রতি ‘নিউ দার্জিলিং’ বলে কিছু লোক জোর প্রচার করতে শুরু করেছে, এই ধরণের বোকামির কোনো দরকার ছিল না । ঢাল বেয়ে নেমে যাওয়া পাহাড়ের ধাপে ধাপে ফুলের বাগানে ঘেরা ছোট ছোট বাড়িঘর, পিছনে তাকালে এমাথা থেকে ওমাথা শুধু ঠাসা পাইনের জঙ্গল, সেই সঙ্গে স্থানীয় ছেলেমেয়েদের মিষ্টি হাসি, সব মিলিয়ে ভারী অলস, শান্ত পরিবেশ । এটাই তো সেলেরিগাঁও-এর বড় সম্পদ, খামোখা দার্জিলিং-এর সঙ্গে রেষারেষি করতে যাবেই বা কেন! দিন ভালো থাকলে এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা লোকে শুয়ে বসেই দেখতে পায়. তার জন্য কোনো ভিউ পয়েন্টে গিয়ে ভিড় করার দরকার হয় না ।

আলিশা হোম স্টে

আলিশা চালায় কেশর মুখিয়া আর তার বউ, এককালে চালচুলোহীন অবস্থায় কাটিয়ে ইদানিং হোম স্টের কল্যাণে সবাই দিব্বি করে খাচ্ছে । এদের বড় মেয়ে রোজ পাহাড় ঠেঙিয়ে আলগাড়ায় স্কুলে যায় আর আমার পাশের খালি ঘরটাতে ভোর থেকে গলা ফাটিয়ে পড়া মুখস্থ করে । এদিকে আমার তো ঘুমের দফারফা । শেষে মুখিয়াকে বলে ওকে সরাতে হলো । এখানে দুপুরে ডিম্ আর রাতে মুরগির ব্যবস্থা, সকালে গরমাগরম পুরি-আলুচচ্চড়ি খেয়ে বেরিয়ে পড়তাম পায়ে হেঁটে ঘুরতে ।

কেশর মুখিয়া

নিচ থেকে উঠে আসা একটাই গাড়ির রাস্তা উত্তর দিকে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে মাইল দুয়েক গিয়ে পাহাড়ের ধরে শেষ হয়েছে । সেখানটাকে এরা বলে ‘রামিতে’ । খাদের ধরে একটা বড়সড় পাথর রয়েছে যার ওপর উঠে উল্টো দিকে সিকিমের পাহাড় আর অনেক নিচে দেখা যায় তিস্তা আর রঙ্গীত দুটো নদী দুদিক থেকে এসে মিশেছে, দুটো জলের আলাদা রংগুলোকেও স্পষ্ট বোঝা যায় । পাইন গাছের জঙ্গল চারপাশে নিয়ে ইচ্ছেমত বেড়ানোর মধ্যে যে বেশ একটা রোমান্টিক ব্যাপার রয়েছে সেটা সেলেরিগাঁওতে এসে সত্যি জমিয়ে উপভোগ করলাম, সঙ্গে স্কেচ করাটাও বাদ গেল না ।

প্রথমবার ২০১৩’র ফেব্রুয়ারিতে এসে দেখেছিলাম সেলেরিগাঁও বিদ্যুৎবিহীন ফলে সন্ধেবেলা কাঠের দোতলা বাড়ির বারান্দায় আধো অন্ধকারের মধ্যে মুড়িশুড়ি দিয়ে বসে দারুন আড্ডা জমত । মুখিয়ার বউ ক্যাসারোল ভর্তি করে পকৌড়া দিয়ে যেত, তারপর ন’টা বাজতে না বাজতেই  ডিনার হাজির । হ্যারিকেনের আলোয় রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে ওটাকে বাথরুমে রেখে দিয়ে শুয়ে পড়তাম সবাই । পাহাড়ের ঢালের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় ছিল আলিশা, সরু পথ বেয়ে ওঠানামা করা যায় ।

পুরোনো ঘরবাড়ি আর খেলার মাঠ

একদম নিচের দিকটায় রয়েছে এ অঞ্চলের পুরোনো বেশ কিছু বাড়িঘর আর একটা খেলার মাঠ. যার একপাশ দিয়ে পায়ে চলা পথ নেমে গেছে পেডং অবধি । অনেককাল আগে এটাই ছিল  এখানে আসা যাওয়ার একমাত্র রাস্তা । মাঠটায় দাঁড়িয়ে ওপরের দিকে তাকালে জঙ্গল সমেত গোটা সেলেরিগাঁওয়ের একটা দারুন প্যানোরামিক দৃশ্য চোখে পড়ে । সময়টা যেহেতু পুরোপুরি  অফ সিজন তাই মনে হলো ওপরের দিকের হোটেলগুলোর সম্মন্ধে একটু খোঁজ খবর নেওয়া যেতে পারে । কারণ ততক্ষনে ঠিক করে ফেলেছি গিন্নিকে নিয়ে আসতেই হবে । 

জঙ্গল সমেত সেলেরিগাঁওয়ের প্যানোরামিক দৃশ্য

দূর থেকেই চোখে পড়েছিল পাশাপাশি একজোড়া বড় বড় কাঁচের জানলাওলা আধুনিক কটেজ, যার ঠিক পেছন থেকেই শুরু হয়ে গেছে পাইনের জঙ্গল । সামনে গিয়ে বেশ তাক লেগে গেল, লংকোট পরা ছিমছাম চেহারার এক মহিলা এগিয়ে এলেন, ইনি মালকিন রেণুজী, সুন্দর হাসিখুশি মানুষ, বসিয়ে চা খাওয়ালেন, ভাড়া নিয়ে কথা হলো, জানিয়ে এলাম পরেরবার আপনার এখানেই থাকছি । সেই  কথা রেখেছিলাম, গিন্নি সমেত পরের বছরই রেশিখোলা থেকে সোজা এসে উঠলাম রেণুজীর কাছে ।

 

 

NO COMMENTS