অতিরিক্ত ঘেমে যাওয়া থেকে মুক্তির ঘরোয়া উপায়

2129

ঘাম হওয়া শরীরের স্বাভাবিক প্রবণতা। ব্যায়াম করা, উষ্ণ আবহাওয়া, ভয় বা রাগের কারণে ঘামার প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে। তাছাড়া মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা,হরমোন ক্ষরণ ইত্যাদি নানান কারণে শরীর অতিরিক্ত ঘামতে পারে। পাশাপাশি ডায়াবেটিস, জ্বর, হৃদযন্ত্রের সমস্যা, মেনোপজ ইত্যাদি কারণেও বেশি ঘাম হতে পারে।  অতিরিক্ত ঘাম হলে তার দুর্গন্ধও সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। শরীরের বিভিন্ন জায়গা, যেমন-হাতের তালু, পায়ের নিচে, বগল, গলা, কপাল, এমনকি মাথার স্ক্যাল্পেও অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার ফলে ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। ঘাম নিয়ন্ত্রণের সহজ কিছু ঘরোয়া উপায় সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

১| শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সবথেকে উপকারি হল যথেষ্ট পরিমানে জল খাওয়া। এর ফলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে না। সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে সারাদিনে প্রচুর পরিমাণ জল খাওয়া দরকার। জলের পরিমাণ বেশি আছে এরকম সমস্ত শাক সবজি বা ফলমূল খাওয়া দরকার। পাতিলেবুর রস দিয়ে বানানো সরবত‚ নানারকম ফলের রস‚ ডাবের জল খেতে পারেন মাঝে মাঝে।

২| আপনি কীরকম খাওয়াদাওয়া করছেন তার উপরেও ঘাম হওয়া নির্ভর করে। যেসব খাবারে ফাইবারের পরিমাণ কম সেগুলোকে হজম করাতে পাচনতন্ত্রকে অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। সোডিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খেলে শরীরের অতিরিক্ত নুন বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার খেলেও ফ্যাটের পাচন ঘটাতে গিয়ে দেহের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। তাই এইধরণের খাবার খাওয়া এড়িয়ে  চলতে হবে।

৩| ধূমপান, অ্যালকোহল ও ক্যাফিন গ্রহণ করলে স্বাভাবিকের চেয়ে শরীর বেশি ঘামে। তাই যতটা সম্ভব এগুলোকে এড়িয়ে চলতে হবে।

৪| টমেটোতে আছে অ্যাস্ট্রিনজেন্ট যা ঘর্মগ্রন্থিকে সংকুচিত করে। এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান অতিরিক্ত ঘামানোর প্রবণতা কমায়। ১ সপ্তাহে প্রতিদিন টানা ১ কাপ করে টমেটোর রস খান। পরের সপ্তাহ থেকে ১ দিন পরপর ১ কাপ করে টমেটোর রস খেলে ভাল ফল পাবেন। বেশি ঘাম হয় এমন স্থানগুলোতে টমেটোর রস লাগিয়ে ১০ বা ১৫ মিনিট পর ঈষদুষ্ণ জল দিয়ে স্নান করে নিলেই ঘাম কম হবে। ঘাম নিয়ন্ত্রণ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন এভাবে স্নান করলে উপকার পাওয়া যাবে।

৫| ঘাম নিয়ন্ত্রণ করতে অ্যাপেল সাইডার ভিনিগার কার্যকরী। ঘাম নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি অ্যাপেল সাইডার ভিনিগার নিয়মিত খেলে ত্বকের পিএইচ স্তর ঠিক রাখতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত ঘাম হওয়া স্থানগুলো ভাল ভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে। অ্যাপেল সাইডার ভিনিগার একটু তুলোয় লাগিয়ে নিয়ে স্থানগুলোতে লাগিয়ে সারা রাত রেখে দিন। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে স্নান করে নিন। অ্যাপল সাইডার ভিনিগার খাওয়ার অভ্যাস করলেও অতিরিক্ত ঘাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ১ গ্লাস জলে ২ চামচ অ্যাপেল সাইডার ভিনিগার ও ২ চামচ মধু মিশিয়ে নিয়ে প্রতিদিন সকালবেলা খালি পেটে খেলে উপকার পাবেন।

৬| সাদা চন্দন গুঁড়ো ত্বক শুষ্ক রেখে ঘাম নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এতে থাকা বিভিন্ন উৎসেচক ত্বকের অতিরিক্ত ঘাম শোষণ করে নেয়। এছাড়া চন্দনের সুগন্ধ ঘাম থেকে তৈরি দুর্গন্ধ দূর করতে সাহায্য করে। পরিমাণমত গোলাপ জলের সঙ্গে ১ চামচ সাদা চন্দনের গুঁড়ো মিশিয়ে ঘন মিশ্রণ তৈরি করে নিন। এর সঙ্গে অল্প পরিমাণ পাতিলেবুর রস মিশিয়ে নিন। তারপর শরীরের যে অংশে বেশি ঘাম হয়, সেই অংশ ভাল ভাবে পরিষ্কার করে এই মিশ্রণ লাগিয়ে শুকিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত রাখুন। এরপর জল দিয়ে পরিষ্কার করে ধুয়ে নিন। অতিরিক্ত ঘাম না কমা পর্যন্ত এই মিশ্রণ নিয়মিত লাগাতে হবে।

৭| লেবু প্রাকৃতিক ডিওডরেন্ট হিসেবে কাজ করে যা ঘাম থেকে হওয়া দুর্গন্ধ দূর করতে সাহায্য করে। ১ গ্লাস জলে পরিমাণমতো পাতিলেবুর রস মিশিয়ে তাতে তোয়ালে ভিজিয়ে সারা শরীর ভালোভাবে স্পঞ্জ করে ২০ থেকে ৩০ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। তারপর ঠান্ডা জল দিয়ে স্নান করে ফেলতে হবে। এভাবে প্রতিদিনই স্নানের আগে গায়ে পাতিলেবুর রস মিশ্রিত জলে গা স্পঞ্জ করে নিতে হবে। এছাড়াও লেবুর রস ও বেকিং সোডা মিশিয়ে ঘন মিশ্রণ তৈরি করে নিয়ে  মিশ্রণটি তুলোয় লাগিয়ে নিয়ে বেশি ঘামে এমন জায়গাগুলোতে লাগিয়ে নিন। ২০ মিনিট অপেক্ষা করে ঈষদুষ্ণ জল দিয়ে পরিষ্কার করে ধুয়ে নিতে হবে। রোদে বেরোনোর আগে এই মিশ্রণ ব্যবহার করবেন না।

৮|  অতিরিক্ত ঘাম কমাতে লাল চা বা লিকার চা বেশ কার্যকারী। লিকার চায়ে থাকা ট্যানিক অ্যাসিড ঘাম প্রতিরোধ করতে পারে। এছাড়া লিকার চা ঘর্মগ্রন্থি সংকোচন করে অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার হাত থেকে শরীরকে রক্ষা করে। দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী জীবাণু ধ্বংস করতেও লিকার চা উপকারী। ৩ থেকে ৪ কাপ গরম জলে ১ বা ২ টি টি-ব্যাগ ভিজিয়ে ১০ মিনিট রেখে দিতে হবে। তারপর ওই লিকার চায়ে পরিষ্কার কাপড় ভিজিয়ে বগল ও গলায় লাগাতে হবে। হাত ও পায়ের ঘাম নিয়ন্ত্রণ করতে একই পদ্ধতিতে ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাত ও পা লিকার চায়ে ভিজিয়ে রাখতে হবে, সেক্ষেত্রে জলের পরিমাণ বাড়িয়ে নিতে হবে।  প্রতিদিন ২ থেকে ৩ কাপ লিকার চা পান করলে ভালো ফল পাবেন।

৯|  স্নানের সময় অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবান ব্যবহার করুন। নাইলন ও পলিয়েস্টার কাপড়ের পোশাক ঘাম শোষণ না করে ঘাম আটকে রাখে। তাই সহজেই ঘাম শুষে নেয় এমন সুতি ও সিল্কের তৈরি পোশাক পরুন।

১০|  নারকেল তেলে আছে লরিক অ্যাসিড যা দুর্গন্ধ রোধ করতে সাহায্য করে। এছাড়া নারকেল তেলের হালকা সুগন্ধ শরীরকে সারাদিন তরতাজা রাখবে। খানিকটা নারকেল তেল এবং শিয়া বাটার একসঙ্গে নিয়ে মাইক্রোওয়েভে এক মিনিট গরম করে নিন। এরপর এই মিশ্রণের সঙ্গে ৩ চামচ বেকিং সোডা ও ২ চামচ অ্যারারুট পাউডার দিয়ে সঙ্গে কয়েক ফোঁটা সুগন্ধী তেল মিশিয়ে নিন। এই মিশ্রণ ডিওডরেন্ট হিসেবে ব্যবহার করুন।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.