ভিক্ষে করে‚ গান গেয়ে ১৪০০রও বেশি অসহায় শিশুকে অলোর পথ দেখিয়েছেন ভারতের ‘অনাথ জননী’ সিন্ধুতাই

377
Mother Of Orphans

৭০ বছরের সিন্ধুতাই সাপকাল মানুষ করেছেন ১৪০০’ র ওপর অনাথ শিশুকে। যোগালেন খাবার, দিলেন আশ্রয়। আর দিলেন নিঃস্বার্থ স্নেহ, ভালোবাসা। প্রকৃত পরিবারের স্বাদ পেল সেইসব অনাথেরা যাদের একদিন ফেলে যাওয়া হয়েছিল আস্তাকুঁড়ে। তাঁর এই কাজ স্বীকৃত হয়েছে, পেয়েছে প্রায় ৭৫০টি পুরস্কার। নতুন নামও দেওয়া হয়েছে তাঁকে – ‘অনাথ জননী’।

দারিদ্র্য, অতি প্রজননের এই পোড়া দেশে শিশুদের প্রতি এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এক দৃষ্টান্তই বটে ! দারিদ্র্যের কারণে অনেকেই সন্তানের জন্ম দিয়ে তাদের ফেলে রেখে চলে যায়। পরম মমতায় তাদেরই কুড়িয়ে বুকে তুলে নেন সিন্ধুতাই। একজন দু’জন নয়, হাজারের ওপরে এমন সব শিশুর খাওয়া পরার দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। মহারাষ্ট্রের পুণেতে চারটি অনাথ আশ্রম আছে তাঁর। এর মধ্যে দু’টি মেয়েদের জন্য, দু’টি ছেলেদের জন্য। নিজের মেয়ে মমতা তাঁকে সাহায্য করেন। আর প্রথম পালিত পুত্রটিও সহায়তা করেন অনাথ আশ্রমগুলি পরিচালনার কাজে। এই পরিত্যক্ত শিশুদের বেশিরভাগই পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন নিজেদের জীবনে। কেউ কেউ এমনকী হয়েছেন আইনজ্ঞ, ডাক্তার কিংবা অধ্যাপকও।

রেল স্টেশন,পরিত্যক্ত আস্তাকুঁড়, আবর্জনার স্তূপ, এমনকী রাস্তার কুকুরের মুখ থেকেও ছোট ছোট শিশুদের উদ্ধার করে সিন্ধুতাই ঠাঁই দিয়েছেন নিজের কোলে। একবার তাঁর আশ্রমে কোনও অনাথ শিশু এলে কখনও তিনি তাদের তাড়িয়ে দেন না। সরকার চালিত অনাথ আশ্রমগুলির মত তিনি কখনই ১৮ বছর হতে না হতেই তাদের বের করে দেন না। ‘আঠারো বছরের পরেও বাচ্চারা আমার কাছেই থাকে। আমি তাদের বিয়ের ব্যবস্থাও করি। তারা সংসার পাতালে সেখানেও সাহায্য করি’ –জানান সিন্ধুতাই ‘আঠারো বছর হয়ে গেলেই তো তারা খুব বিচক্ষণ হয়ে যায় না। বরং এই সময়টাতেই আরও বেশি করে অভিভাবকের ভালোবাসা জরুরি। নয়ত বিপথগামী হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। পাখির ডানা আছে মানেই সে উড়তে শিখে গেছে এমন ভাবাটা ঠিক নয়’, মনে করেন সিন্ধুতাই।

সিন্ধুতাই সাপকালের এই সেবামূলক কাজে আসার পেছেনে রয়েছে তাঁর নিজের জীবনের দুঃখ কষ্ট। খুব গরিব ঘরে জন্ম। নয় বছর বয়সে পড়াশোনা ছাড়তে হয় আর দশ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। এরপর আরও দশ বছর কাটে নানা দুঃখ দুর্দশায়। তারপর নয় মাসের অন্তসত্বা অবস্থায় স্বামী তাঁকে ঘর থেকে বের করে দেয়। গোয়াল ঘরে সন্তানের জন্ম দেন তিনি। করুণ এই জীবন কাহিনীর স্মৃতিচারণ করতে করতে সিন্ধুতাই বলেন ‘গোয়ালে সন্তানের জন্ম দিলাম। মেয়ের নাড়ি পড়ে আছে দেখে নিজেই পাথর দিয়ে তা কাটলাম। তারপর আত্মীয় স্বজনের দুয়ারে দুয়ারে গেলাম, মায়ের কাছেও গেলাম। কেউ আশ্রয় দিল না। সবাই তাড়িয়ে দিয়েছিল আমাকে’।

ভিক্ষে করে, ট্রেনে গান গেয়ে গেয়ে তিনি নিজের আর সদ্যজাত কন্যার পেট চালিয়েছেন। সেই সময় রাস্তায় রাস্তায় তিনি অনেক অনাথকে দেখেছেন, তাঁরই মত বেঁচে থাকার লড়াই করছে। খাবার ভাগ করে খেতেন তাদের সঙ্গে, শুনতেন তাদের জীবনের কথা। মৃত্যুপথযাত্রী একজন ভিক্ষুকে একটু খাবার আর জল দিয়ে মনে হয়েছিল, পরের জন্য কিছু করতে পারাটাই জীবনের আসল কাজ। তখন থেকেই তাঁর ইচ্ছে, সাধ্যমত আশ্রয় আর খাবার তুলে দেবেন আশ্রয়হীন, অন্নহীনদের। নিজের জীবনের দারিদ্র্য বাধা হয়নি এই মহৎ কাজে। ৪০ বছর ধরে বহু গ্রাম ঘুরে ঘুরে তিনি বক্তৃতা দিয়ে দান সংগ্রহ করেছেন। ভিক্ষে করে, গান গেয়ে পয়সা তুলে অনাথদের মুখে ভাত জুগিয়েছেন। অর্থ সাহায্যও পেয়েছেন অনেকের কাছ থেকে। তা দিয়েই তৈরি হয়েছে অনাথ আশ্রম। এভাবেই আশ্রয়হীন এক ভিখারিনি নিজেই হয়ে উঠেছেন ভারতের ‘অনাথ জননী’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.