আমার কাছে পথ মানে একটা জার্নি – শ্রীকান্ত আচার্য 

(সাক্ষাৎকার ও ভাবলিখন: তন্ময় দত্তগুপ্ত)

ছোটবেলায় ঘোরা হতো না।কারণ বাবা খুব কড়া ছিলেন।আমার সর্বপ্রথম ভ্রমণ দীঘা।সেটা স্কুল এক্সকারশনের সময়।ক্লাস সেভেনে গিয়েছি পুরী।তবে স্বাধীন ভাবে ঘুরেছি বড়বেলায়।মাইথন ভ্রমণ করেছি কলেজে পড়ার সময়।সেটা আশির দশকে।তারপর সেভাবে আর ভ্রমণ হয়নি

কলেজের গণ্ডি পার হওয়ার অনেক পরে ঘুরতে গেছি।নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পেশাগত ভাবে গান বাজনার সময় প্রকৃত অর্থে ভ্রমণ হয়েছে।রবীন্দ্রগানের বিভিন্ন পর্যায়।প্রেম, পুজা , প্রকৃতি।ভ্রমণের প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে রবীন্দ্রগানের প্রকৃতি পর্যায়ের মিল পাওয়া যায়।ঘুরতে গিয়ে সেই অনুভূতি হয়ত হয়েছে।বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে স্পার্কও করেছে। 

আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ।বা আমি পথ ভোলা এক পথিক এসেছি।পথ আমার কাছে নানা ভাবে ধরা দিয়েছে।আমার কাছে পথ মানে একটা জার্নি।গন্তব্যের তুলনায় যাত্রাপথের আনন্দ অনেক বেশি ।জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের ভাষায়,গন্তব্যের থেকে জরুরি হলো পথ চলা।ট্রেন জার্নি আমার খুব প্রিয়।ট্রেনের গতি বাড়ে।তার সঙ্গে পালটায় বাইরের ছবি।এ যেন চলমান চিত্রমালা।

একটা কথা খুব মনে পড়ে।এক সময় আমি উত্তরবঙ্গে প্রায় সাত আট বছর চাকরি করেছি।যতদূর মনে পড়ছে মার্চ মাসের এক সন্ধ্যা।আমি জলপাইগুড়ি থেকে শিলিগুড়ি আসছি।ছুটছে আমাদের বাস।বাস দাঁড়াল রাজাভাত খাওয়ার রিভারবেডের ওপর।চা পানের বিরতি।তখন অফিসে কাজের চাপ ছিল প্রচণ্ড।খুব টেনশন।আমার চোখ চলে গেল নদীর জলে।সন্ধ্যা গাঢ় হচ্ছে।পালটাচ্ছে জঙ্গলের রঙ।উত্তরবঙ্গের জঙ্গল;আর তার রূপসী রূপ।চোখ জুড়ায় প্রাণ ভরায়।কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গেলাম সব। অফিস, বস,কাজের চাপ এমন কী স্নায়বিক যন্ত্রণা। আজও ওই সন্ধ্যার কথা মনে পড়ে।মনে পড়লেই স্মৃতিতে বেজে ওঠে—তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা।তুমি আমারও সাধেরও সাধনা।জঙ্গলের সেই রূপ আজও লেগে আছে দুচোখে। 

আরেকটা জার্নির কথা বলতে পারি।আমি আর আমার পরিবারের ইউরোপ ভ্রমণ।২০১২ সাল।রোম থেকে ভিয়েনা,ভিয়েনা থেকে প্যারিস,প্যারিস থেকে লণ্ডন।পুরোটাই ছিল ট্রেনে ভ্রমণ।ওখানকার ইউরো রেল খুব বিখ্যাত।সন্ধ্যায় রোম থেকে ট্রেন ছাড়ল।সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত।রাত থেকে আরো গভীর রাত।ঘুম নেমে এলো চোখে।ঘুম ভাঙ্গল পরদিন সকালে।আমাদের ট্রেন প্রবেশ করল অস্ট্রিয়ায়।বদলে গেলো আবহাওয়া।দৃশ্য পরিবর্তিত হোল কয়েক লহমায়।আকাশে বাতাসে সবুজের সুর।সবাই একে একে বলে উঠল—আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ।খেলে যায় রৌদ্র ছায়া বর্ষা আসে বসন্ত।আমার মন বলছিল —এই পথ যদি না শেষ হয়,তবে কেমন হতো।আমার স্মরণীয় ভ্রমণ এটাই।

আমি লণ্ডনে গিয়েছি।দেখেছি লেক ডিস্ট্রিক।লেক ডিস্ট্রিকের ফোটোগ্রাফিক বিউটি অসাধারণ।অনেকগুলো লেক পাহাড় নিয়ে লেক ডিস্ট্রিক্ট।দেখেও দেখা ফুরায় না।এখানে গ্রাসমেয়ারে কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের বাড়ি।ওনার বাড়ির সামনে এখন পাড়া।বাড়িটা সংরক্ষিত।অবিকৃত।বিদেশে মণীষীদের জন্মভিটে সংরক্ষণের রীতি রেওয়াজ তারিফ যোগ্য।ভ্রমণের দুটো দিক আছে।প্রথমটা শরীরী ভ্রমণ।দ্বিতীয়টা মানস ভ্রমণ।আমার এখনও অনেক কিছু দেখার বাকি।আমার মনতো তাই চায়।আমার খুব ইচ্ছে ইস্তানবুল বা টার্কি দেখা।ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলওয়েতে ভ্রমণেরও খুব ইচ্ছে। 

বিদেশের আলো বাতাসে প্রচুর প্রোগ্রাম করেছি।পরিপূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে রবীন্দ্রগান।প্রেক্ষাগৃহ জুড়ে বাঙালি সমাবেশ।রবীন্দ্রগানে মগ্ন হলে আন্তর্জাতিক আঙিনায় ভেসে ওঠে বাঙালি মুখ।রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং শান্তিনিকেতন, এই দুইয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক গভীর।মনে আছে প্রথম শান্তিনিকেতন দেখার অভিজ্ঞতা।১৯৭৭।ক্লাস ইলেভেনে পড়ি।তখন শান্তিনিকেতন ঘুরেছি।কিন্তু খুব সিরিয়াসলি ঘুরিনি।পরেও গেছি।মোহর দি আমাদের খুব স্নেহ করতেন।মোহরদির কথার মধ্যে একটা সাবেকি  ভঙ্গী ছিল।আজকের শান্তিনিকেতনে  সেই ফ্লেবার পাওয়া যায় না।শান্তিনিকেতন এখন রিসর্টের মতো হয়ে গেছে।শান্তিনিকেতনের একটা নিজস্ব ছন্দ ছিল।গতি ছিল।কলাভবনের মধ্যে গিয়ে আমি অনেক বেশি করে শান্তিনিকেতনকে পাই।এখন এতো ভিড় যা এখানকার চরিত্রের সঙ্গে মেলে না।আমি মেলা বা দোলের সময় ওখানে যাই না।হুল্লোড় ভালো লাগে না।বর্ষা আর শীতের শান্তিনিকেতন আমার আজও পছন্দের।রতন পল্লীর অলি গলি দিয়ে আজও হাঁটি।আগে আমাদের একটা বাড়ি ছিল প্রান্তিক স্টেশনের কাছে।ওই বাড়ির বারান্দায় দাড়ালে পশ্চিম দিকে খোয়াই দেখ যেত। এখন কিছুই দেখা যায় না।চারদিকে অপ্রত্যাশিত কংক্রিটের জঙ্গল।

আমাদের বাড়ি এখন গড়িয়া কোঅপারেটিভের ভেতর।সেখানে গাছ গাছালি আছে।আমাদের এই অঞ্চলে এতো ওয়াটার লগিং হয় যে ওই বৃষ্টি বিলাসী রোমান্টিসজমের অবকাশ নেই।আমার মানসিক তরঙ্গের সঙ্গে অপরের মিল হলে মরুদ্যানেও ফুল ফোটে।একে কি বলা যায় চিন্তার ভ্রমণ?বা চেতনার মিলন?দুজনের মন একই সুরে বাজলে,তৈরি হয় সাঙ্গীতিক মুহূর্ত — মোর বীণা ওঠে কোন সুরে বাজি। 

2 COMMENTS

  1. এতো সুন্দর লেখনী,পড়তে পড়তে মনে হলো যেন সাক্ষাৎকারটা আমি পাশে বসে শুনছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here