পূর্ণিমায় স্নানযাত্রার পরে একপক্ষ পুরীর মন্দিরে গোপন ঘরে থাকেন জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা

5931

হিন্দু পৌরাণিক উৎসে মিলেমিশে যায় মানুষ ও দেবতা | তাই মানবিক‚ জাগতিক সুখ দুঃখ থেকে দেবতাও দূরে থাকেন না | প্রখর গ্রীষ্মে স্নান করে যে তৃপ্তি পাওয়া যায় তা অন্য কিছুতে বিরল | সেই প্রশান্তি থেকে দেব বিগ্রহই বা বঞ্চিত হবে কেন ! তাই বৈষ্ণব ধর্মের মানুষ জগন্নাথ দেবের বিগ্রহকেও নিয়ে যান স্নান-পার্বণে | পোশাকি নাম জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা | পালিত হয় জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমায় | এ বছর আষাঢ়ের পূর্ণিমায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই পার্বণ |

এই পুণ্যক্ষণ জগন্নাথ দেবের জন্মতিথিও | পুরীর মন্দিরে মহা সমারোহে পালিত হয় জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলভদ্রর স্নানযাত্রা | এই তিন দেবতা‚ সঙ্গে সুদর্শন ও মদনমোহন‚ পাঁচ বিগ্রহকে মন্দির থেকে বাইরে এনে স্নানবেদীতে মহা সমারোহে স্নান করানো হয় | তারপর সাজানো হয় নতুন রূপে |

স্কন্ধপুরাণ অনুযায়ী রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন প্রথম এই রীতি শুরু করেছিলেন | সেই থেকে পালিত হয়ে আসছে স্নান যাত্রা | ভক্তদের বিশ্বাস‚ স্নানযাত্রার সময় দারুব্রহ্ম দর্শনে পাপমোচন ঘটে | তাই জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমায় কয়েক লক্ষ ভক্তের ভিড় উপচে পড়ে পুরীতে |

গর্ভগৃহ থেকে দেববিগ্রহ এনে রাখা হয় স্নানবেদীতে | তারপর লেপন করা হয় তুলসি পাতা‚ চন্দন‚ ঘি ও অন্যান্য উপাচার | যথাবিধি নিয়ম মেনে ১০৮ ঘড়া জলে স্নান করানো হয় | এই জল আনা হয় মন্দিরের উত্তরের কুয়ো থেকে | এই কুয়ো থেকে বছরে একবারই জল তোলা হয় | তারপর ঘড়ায় করে ওই জল আনা হয় ভোগমণ্ডপে | দয়িতারা সেই জল পরিশুদ্ধ করেন | জলে মেশানো হয় হলুদ‚ আতপ চাল‚ চন্দন‚ ফুল ও অন্যান্য সুগন্ধি | এরপর ওই ১০৮ ঘড়া জল শোভাযাত্রা করে নিয়ে আসা হয় স্নানবেদীতে | তারপর বৈদিক মন্ত্রপাঠ ও শঙ্খধ্বনির সঙ্গে হয় দেবতার জলাভিষেক | স্নানের পরে দেবতারা সেজে ওঠেন গজাননের রূপে | একে বলা হয় জগন্নাথদেবের গজবেশ বা হাতিবেশ | সুভদ্রাকে পরানো হয় পদ্মবেশ |

স্নানযাত্রার পরে ঠান্ডা লেগে সুস্থতায় বিঘ্ন ঘটে দেবতাদের | রীতি মেনে এই সময়ে তাঁদের রাখা হয় সম্পূর্ণ আলাদা ঘরে | রাজবৈদ্যর তত্ত্বাবধানে চলে চিকিৎসা | উৎসর্গ করা হয় পাঁচন | প্রসাদে থাকে মাখন‚ ফল ও জল | এই সময়ে কিন্তু ভক্তরা তাঁদের দর্শন পান না | পরিবর্তে রেখে দেওয়া হয় তিনটি পটচিত্র | এক পক্ষকাল পরে সুস্থ হয়ে তিন দেববিগ্রহ ফিরে আসেন পুজোর বেদীতে | 

প্রকৃতপক্ষে ১০৮ ঘড়া জলে সিক্ত বিগ্রহের রঙ নষ্ট হয়ে যায় | তাই এই সময়ের মধ্যে রং করে আবার আগের উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে এনে বিগ্রহদের স্থাপন করা হয় গর্ভগৃহের রত্নবেদীতে | এই এক পক্ষকালে ভক্তরা ব্রহ্মগিরি পর্বতে যান | প্রচলিত বিশ্বাস হল‚ সেখানে জগন্নাথদেব আবির্ভূত হন আলরনাথ হিসেবে |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.