সোনার পাহাড় : এ কেমন ভয়ংকর ছবি আপনি বানালেন পরমব্রত!?

এটা স্বীকার না করলে পাপ হবে যে, ছবিটা দেখতে বসে খুব মনে পড়ছিল সেই প্রবীণ মহিলাকে।

প্রায় বছর পনের আগের কথা হবে। মহিলা তখন কলকাতার সিনেমা-চর্চার এক নামী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, আর তার পাশাপাশি স্ক্রিপ্ট লেখার কাজও করেন এদিকে-ওদিকে। সেই স্ক্রিপ্ট লেখার সূত্র ধরেই তাঁর সঙ্গে তখন আলাপ হয় আমার।

অল্প কিছুদিন আগে তখন প্রয়াত হয়েছেন সেই মহিলার স্বামী। ওঁর একমাত্র পুত্র তখন কুড়ির কোঠায় পা দিয়েছে বছর কয়েক হল। খুব স্বাভাবিক যেটা, মা-ছেলে দুজনে তখন একই সঙ্গে থাকে।

ঠিক এরপরেই হঠাৎ করে অদ্ভুত সেই গণ্ডগোলের শুরু।

সেই ছেলে তখন সিনেমা আর টেলিভিশনে অভিনয়ের কাজ শুরু করেছে একটু-আধটু সবে। কাজের সূত্রে ছেলেটির আলাপ হল বয়সে বেশ কিছুটা বড় এক অভিনেত্রীর সঙ্গে। আর তারপরেই সেই আলাপটা খুব তাড়াতাড়ি গড়িয়ে গেল প্রেম-ভালবাসার দিকে। বিষয়টা দ্রুত খুব জটিল আকার নিল, কারণ ওই অভিনেত্রী বয়সে শুধু বড়ই নন, তার সঙ্গে তখন তিনি বিবাহিতাও বটে।

ইন্ডাস্ট্রিতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল মুচমুচে সব গসিপ আর সঙ্গে চেনা সব ছি-ছি-ক্কারের ধুম। প্রবীণ যে মহিলার কথা লিখে এই লেখা শুরু করেছি, ছেলেকে নিয়ে তিনি তখন বিধ্বস্ত-মন প্রায়। ‘ওকে এটা কি পাগলামিতে পেয়ে বসেছে, বুঝতে পারছি না কিছু। আমার কোন কথা শুনতে চায় না ও। বুঝিয়ে কিছু বলতে গেলে তেরিয়া তেরিয়া কথা বলে যায় শুধু। এই বাড়িতে আমার সঙ্গে আর থাকছেও তো না ও। নিজের রোজগারের টাকা দিয়ে কোথায় একটা ফ্ল্যাট নিয়েছে যেন।’ ছেলেকে নিয়ে বলতে গেলে তখন কেঁপে যেত সেই একা মহিলার স্বর। মনে হত, চোখের জলকে সামলে রাখার তুমুল কিন্তু গোপন একটা চেষ্টা হচ্ছে কোথাও

পনের বছর আগের কথা, কিন্তু ‘সোনার পাহাড়’ দেখার পর মনে হচ্ছে এসব ঘটনা ঘটে গেল যেন এই তো সেদিন বলে।

হ্যাঁ, ‘সোনার পাহাড়’ নতুন করে উসকে দিল পুরনো সেই স্মৃতি। ছবির সঙ্গে ওই ঘটনার হয়তো ডিরেক্ট কোন যোগসূত্র নেই। কিন্তু ছবির উপমা মুখার্জি (অভিনয়ে তনুজা) নামে ওই মহিলার চোখ থেকে যখন গড়িয়ে পড়ছে নিঃসঙ্গ অভিমানের জল, কে বলবে এই উপমা আর লেখার শুরুতে লেখা সেই মহিলা একই মানুষ নন!

পরমব্রত, আপনিও তো এই ইন্ডাস্ট্রির মানুষ? দেড় দশক আগের সেই ঘটনার কথা কোথাও থেকে শুনেছেন কিনা, সে বিষয়ে খুব একটা ধারণা নেই আমার। কিন্তু শুনুন কিংবা নাই শুনুন, মনে হচ্ছিল আপনার এই নির্মাণে যেন ফেলে আসা সেই সময়ের নির্যাস মিশে আছে।

ভাবছিলাম, দেখা করে জানতে চাই, এ কী ভয়ানক ছবি আপনি তৈরি করলেন স্যর?

বেশ তো ছিলেন ‘জিও কাকা’ (২০১১), ‘হাওয়া বদল’ (২০১৩) বা ‘লড়াই’য়ের (২০১৫) মতো খাজা সিনেমা নিয়ে। ‘লড়াই’ দেখুন, দেখতে পাবেন, লজিকের তো সেখানে কোন মাথা-মুণ্ডু নেই। আর ‘হাওয়া বদল’ ধরেন যদি, সে তো আবার হলিউডের ‘দ্য চেঞ্জ-আপ’ (২০১১) থেকে ঝেড়ে তুলে আনা প্লট। ফেলুদাকে নিয়ে যে তিনটে ওয়েব সিরিজ (‘শেয়াল দেবতা রহস্য’, ‘ঘুরঘুটিয়ার ঘটনা’, ‘গোলোকধাম রহস্য’) বানিয়ে ফেললেন, সেগুলোর কথা যত কম বলা যায়, ততই বোধহয় ভাল।

এর মধ্যে হঠাৎ কে মাথার দিব্যি দিল আপনাকে, যে ‘সোনার পাহাড়’-এর মতো একটা ছবি বানিয়ে ফেললেন আপনি?

ছবির স্টোরি, স্ক্রিনপ্লে আর ডায়ালগে দেখতে পাচ্ছি আপনার সঙ্গে পাভেলের নামও আছে। ছবির কাহিনী, চিত্রনাট্য আর সংলাপে যে ম্যাজিক টাচ, দুজনের মধ্যে সেটা কার অবদান, ভাই? আর এই পাভেল মানে কি পাভেল ভট্টাচার্য, ‘ফেকবুক’-এর (২০১৫) স্ক্রিপ্ট লিখেছিলেন যিনি, আর তারপর ‘বাবার নাম গান্ধীজি’ (২০১৫) ডিরেক্ট করেন যিনি?

গল্প আর স্ক্রিপ্ট নিয়ে প্রথমে লিখছি, তার বিশেষ একটা কারণ আছে। হালে বাংলায় যে সব সিনেমা তৈরি হচ্ছে, সেগুলোর বেশিরভাগ তো ওই গল্প আর স্ক্রিপ্টে এসে ধেড়িয়ে মাত হয়। স্ক্রিপ্ট লেখাটাই শেষ হয় নি, এদিকে হুড়মুড়িয়ে শুটিং শুরু, চোখের সামনে এরকম তো একের পর এক দেখি। সেখানে এই ‘সোনার পাহাড়’-এর স্ক্রিপ্ট দেখে চমক লাগলে শুরুতে সেটা নিয়ে না বলে থাকবো কী করে, বলুন?

মনে হচ্ছিল, অন্য গ্রহ থেকে এসে কেউ এর স্ক্রিপ্ট লিখল নাকি? যে কাঁচা কোন ভুল-টুল প্রায় নেই? যেখানে ঠিক যে মোচড়টা থাকার কথা, সেখানে ঠিক সেই মোচড়টাই আছে! কোথাও যেমন চোখা কথার বাণ, আবার কোথাও নীরবতার দুরন্ত সব টান! মাইরি বলছি! বহুদিন পর বাংলা ছবির স্ক্রিপ্ট আর ডায়ালগ শুনতে শুনতে বলতে হচ্ছে, বাহ!

এইটুকু এক কুচোর মুখে তো এমন সব ডায়ালগ আছে, যেগুলো শুনে হেসে আকুল হচ্ছে পুরো ‘হল’। আবার রবীন্দ্রনাথের গান বা কবিতা ছবির এমন মোমেন্টে এক পশলা দেওয়া, যে সেটা শুনতে পেয়ে মনের মধ্যে দ্রব হয়ে সেই জল উপচে আসছে চোখে!

আবার লিখছি, বাংলা ছবিতে এই স্ট্যান্ডার্ড অবিশ্বাস্য যেন!

আসুন এবার ছবির গল্পে। লেখার শুরুটা যে মহিলার গল্প লিখে করেছিলাম, এভাবেও ভাবতে পারেন যে এটা সেই মহিলারই স্টোরি! শুধু ওই বেশি বয়সী ম্যারেড একটা মেয়ের সঙ্গে ছেলের মাতোয়ারা হয়ে প্রেমের ট্র্যাকটা এই সিনেমায় নেই। বলতে গেলে, এটুকু ছাড়া বাকি পুরোটাই আছে!

মায়ের নামটা তো আগেই লিখেছি, উপমা। ছেলের নাম সৌম্য (অভিনয়ে যীশু সেনগুপ্ত) আর ছেলের বৌ মৌমিতা (অরুণিমা ঘোষ)। ছবি শুরু হওয়ার একটু পরেই আপনি জানতে পারবেন, তিন বছর হয়ে গেছে ওরা আর উপমার সঙ্গে থাকে না। শেষ ছ’মাসে ওরা একদিনও আসে নি। মায়ের সঙ্গে সৌম্যের রিলেশনটা বুঝতে পারবেন এই ডায়ালগ শুনলে, ‘বাজে কথা বলাটা বন্ধ করবে মা? তোমাদের বুড়োদের কী সমস্যা জান? সারা দুনিয়ার সামনে দুখী সেজে কাঁদুনি গাওয়া – দ্যাট্‌স অল!’

এসব কথা শুনতে শুনতে অভিমানের পাহাড় জমে বুড়ো মায়ের বুকে। তাঁর বাড়িতে এখন কে থাকে? কী তীক্ষ্ণ শ্লেষে চুবিয়ে তিনি কথা বলছেন শুনুন, ‘নমিতা (কাজের লোক), আমি আর এই বাড়িটার ভূত থাকে।’

বয়সের কারণে শরীর অশক্ত, পড়ে গেলে ধরে তোলার লোক অবধি নেই! মা ফের পড়ে গেছেন, আর তাঁকে ধরে তুলতে পারছে না কেউ, কাজের লোকের থেকে ফোনে সেই খবরটা পেয়ে ছেলে-ছেলের বৌয়ের রিয়্যাকশন হল, কাছের একটা হোমে খবর দেওয়া। যেখান থেকে বয়স্কদের কেয়ার নেওয়ার লোক পাঠানো হয়।

দেখছি আর মনে হচ্ছে ভদ্রলোকদের দুনিয়াটাকে ঠাসঠাসিয়ে চড়ানো হচ্ছে যেন!

মোমেন্টগুলো এত জীবন্ত যে মনে হচ্ছিল, যাঁরা ছবির স্ক্রিপ্ট লিখেছেন, তাঁদের মধ্যে কারুর জীবন সত্যি এত রিক্ত ছিল কিনা।

যাই হোক, ফেরত আসুন গল্পে। উপমার এই করুণ হাল, শুনতে পেয়ে চমকে ওঠেন ‘আনন্দঘর’ সেবা-সংস্থার কর্ণধার রাজদীপ (অভিনয়ে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়)। ঘটনাচক্রে এই রাজদীপ হল আবার উপমার ছেলে সৌম্যের ছোটবেলার বন্ধু। বন্ধুর মায়ের শুশ্রূষা করার জন্যে নিজেই সটান উপমার কাছে পৌঁছে যায় ও।

এরপর ছবিটা আস্তে আস্তে ঢুকে পড়ে চমকে দেওয়ার মতো একটা সোশ্যাল এক্সপেরিমেন্টের মধ্যে। উপমাকে অদ্ভুত একটা অফার দেয় রাজদীপ। মহিলাকে সারাদিন একলা থাকতে হয় বলে, রাজদীপ বলে, ও ওর অনাথ আশ্রম থেকে একটি ছোট্ট বাচ্চাকে রেখে যাবে উপমার কাছে রোজ সক্কালবেলা। আবার রাত হলে এসে ফেরত নিয়ে যাবে। এর ফলে লাভ এটাই হবে যে, সারাদিন ছোট্ট শিশুর সান্নিধ্যে উপমার সময় কিছুটা বেটার কাটতে পারে!

কিন্তু ভেবে দেখুন, উপমা নামে ওই মহিলা তো জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গিয়ে সারা দুনিয়ার ওপর এখন তিতিবিরক্ত প্রায়। এখন এসব এক্সপেরিমেন্টে মন সায় দেবে কেন তাঁর?

উপমাকে শেষ অবধি রাজদীপ রাজি করাল কী ভাবে, সেটা দেখে চমক খেলাম আবার। বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, এটা নিয়ে স্ক্রিপ্টে এক্সট্রা কোন ভ্যান্তারা নেই! ছোট্ট একটা কথার প্যাঁচে কুশলী একটা খেলার গমকে এক নিমেষে কার্যোদ্ধার হল! আর সেখান থেকে কাট টু সোজা নেক্সট সিনে পৌঁছে আপনি দেখতে পাবেন উপমার বাড়ি গিয়ে হাজির হচ্ছে খুদে মূর্তিমান বিটলু (অভিনয়ে শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়)!

ডায়ালগে বলতে গেলে কোন শব্দ না খসিয়ে এই যে প্রায় লক্ষ কথার সমান একটা অ্যাক্টিভিটি দেখিয়ে দেওয়া হল, এ তো দাদা যাকে বলে, পাকা হাতের কাজ! আর শুনুন, এটা জাস্ট শুরু। এরপর এরকম উদাহরণ একের পর এক আছে!

বিটলুর মুখে যে ডায়ালগগুলো দেওয়া হচ্ছিল স্ক্রিনে, পরম নাকি পাভেল, সেগুলো যে ঠিক কার লেখা, জানা নেই কো আমার। আমি শুধু বলতে পারি ডায়ালগগুলোর ইমপ্যাক্ট কেমন হচ্ছিল ‘হল’-এ। একটা করে কথা বলছিল বিটলু, আর প্রায় প্যাক্‌ড আপ ‘নন্দন’ এক সুরে এক তালে ফেটে পড়ছিল হাততালি প্লাস হাসির তুমুল চোটে। দর্শককে ভেতর থেকে এক সুরে মাতিয়ে দেওয়ার এই পারফরম্যান্স বাংলা ছবি শেষ কবে দ্যাখাতে পেরেছে, মনে করতে পারি নি আমি।

সবচেয়ে বেশি ভাল লাগল আমার এটা দেখে যে, কোথাও কোন সিনে নিজেকে জাহির করার চেষ্টা নেই কোন। কেত দেখিয়ে বেড়ানোর তো কোন কথাই ওঠে না, ভাই! একটা সিকোয়েন্স থেকে পরের সিকোয়েন্সে যাওয়ার সময় ফেড-ইন ফেড-আউটটাও এত নরম ভাবে হচ্ছে যে, মনে হচ্ছিল ঠিক যেন পাতা উলটে উলটে আমি বই পড়ছি কোন!

ছবির ভিস্যুয়ালগুলো যত মনোরম, ছবির সাউন্ডস্কেপ তার থেকে কিছু কম মনোরম নয়। ছবি দেখতে দেখতে টের পাবেন কখন যেন আপনার ভেতরে ঢুকে বাসা বেঁধে বসে গেছে ছবির সিগনেচার থিম মিউজিকখানা। তবে সেটাও আছে হাতে গোনা অল্প কিছু সিনে। বাকি জায়গাগুলোতে আবহ হিসেবে শুনতে পাবেন চারপাশের এই দুনিয়াটারই শব্দ! পুরনো পাখা ঘোরার ঘ্যাস ঘ্যাস থেকে শুরু করে গলির মধ্যে আইসক্রিম ফেরিওয়ালার ডাক – কী সেখানে নেই!

বয়স্ক মহিলা আর খুদে বিচ্ছুকে সঙ্গে নিয়ে এরপর ছবি ঘুরতে থাকে এই সময়ের আনাচ-কানাচ জুড়ে। ঝলকে ঝলকে পুরো রিয়্যালিটি উঠে আসতে থাকে যেন! শাহরুখ এসে বাইপাসের ধারের যে হোটেলে থাকে, সেই হোটেল যেমন আছে, সেরকম ওলা ক্যাব এসে শহরের হলুদ ট্যাক্সির বারোটা কী ভাবে বাজিয়ে দিল, এক লাইনে বোঝানো রয়েছে সেটাও! কী আর বলবো বলুন, বলতে পারি, সাবাশ পরম সাবাশ!

আর হ্যাঁ, এই করতে করতেই ছবিটা একসময় আপনাকে নিয়ে পৌঁছে যাবে পুলিশখানার ভেতর-মহলে ‘বুড়িপড়া’র ঘরে।

ভাবছেন, সেটা আবার কী?

সেটা হল এই সমাজের বাতিল করা বুড়োবুড়িদের ঘর। আরেকটু খুলে বলছি দাঁড়ান। সিচুয়েশনটা এরকম যে, খুদে বিটলুকে সঙ্গে নিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেছেন সেই উপমা মুখার্জি। তাঁর খোঁজে তাঁর ছেলে-ছেলের বৌ আর ছেলের বন্ধু গিয়ে হাজির হয়েছে থানায় সোজা। আর থানার অফিসার তখন মিসিং ডায়েরি লেখার আগে তাঁদেরকে নিয়ে যাচ্ছে ‘বুড়িপড়া’র ঘরে।

এটা হল এমন একটা ঘর, যে ঘরে ঠাঁই হয় সেই সমস্ত বুড়োবুড়িদের, নিজের ছেলে কিংবা মেয়েরা যাঁদের রাস্তাঘাটে আলগোছে ফেলে রেখে ফিরে গেছে। যাঁরা নিজের নিজের বাড়ি ফেরার রাস্তা গেছেন ভুলে। বা – সত্যি বলতে গেলে কী, যাঁদের ফেরার আর বাড়িই নেই কোন!

সেই ঘরের মানুষগুলোর মুখের ওপর দিয়ে যখন ক্যামেরা যাচ্ছে, শক লাগছে যেন। থুত্থুড়ে এক মহিলা যখন আকুল আবেগে বলে উঠছেন, ‘বুলান এসেছিস বাবা?’ তখন ভেতরে ভেতরে যে ইমোশন জেনারেট হল, মাফ করবেন, লিখে সেটা বোঝাতে পারি – আমার আদৌ সেই সাধ্যি নেই।

শুধু ‘বুড়িপড়া’র ঘর-ই নয়, এর সঙ্গে কাট করে করে আপনি দেখতে পাবেন এক মা (এই ভূমিকায় গার্গী রায়চৌধুরী) আর তার কিশোর ছেলের গল্প। যে ছেলে রোজ রাতে শুতে যাওয়ার আগে তার জাদু-পেন্সিলে এঁকে রেখে দ্যায় তার সাধের স্বপ্নখানা আর সকাল হতে না হতে সত্যি রূপ নেয় সেই আঁকা! আর তারপর মায়ের সঙ্গে হাঁটা দ্যায় সোনার পাহাড় খুঁজে বের করবে বলে। চরম সব রিয়্যালিটির মধ্যে এই ম্যাজিক রিয়্যালিটি কী করে এল, আমি লিখব না, আপনি নিজে হল-এ গিয়ে দেখুন সেটা।

দুয়েকটা ছোটখাটো খটকার জায়গা রয়েছে ছবিতে, ঠিকই। যেমন ধরুন, বিটলুকে সঙ্গে নিয়ে নিরুদ্দেশে হারিয়ে যাওয়ার পর, উপমাকে ফোন নম্বরে ট্রাই করলো না কেন কেউ? যতক্ষণ না বিটলুর ওষুধ নিয়ে ফোনের সিন এল। বা ধরুন, ওই যে সিনটা, যেখানে দ্যাখান হল যে গাড়ি চালাতে চালাতে ফোনে কথা বলছে রাজদীপ, ট্র্যাফিক আইন ভাঙার ওই দৃশ্যটা ছবিতে রাখার আদৌ কোন দরকার ছিল কিনা।

কিন্তু এগুলোকে যদি ভুল বলে মানতেই হয়, তাহলে এটাও বলি যে ভুল হিসেবে এগুলো এতই খুচরো যে এসবে বিশেষ পাত্তা দেওয়ার দরকার নেই কোন।

আসুন ছবির শেষ দিকে।

আস্তে আস্তে পরত খুলবে জটের, আর আপনি বুঝতে পারবেন ‘সোনার পাহাড়’ মানে আসলে ঠিক কী। চমকে উঠে দেখবেন যে, ছবির ক্লাইম্যাক্সটা আবার আসলে হল সত্যজিতের ছবির পায়ে বিনম্র হয়ে প্রণাম করার মতো! আর হ্যাঁ, এই মুহূর্ত আসার আগে ছবির কোথাও কিন্তু এই প্রণামটা উচ্চকিত নয়। ট্রিবিউট দেওয়ার নামে ছবিতে জোর করে ঢোকান কোন আদেখলাপনা নেই!  

একটা সিনে রাজদীপকে বলতে শুনবেন, ‘যখন মা চলে যাবে, তখন যদি মনে হয় আমি মা’র জন্যে কিছু করি নি, খারাপ ব্যবহার করেছি, তখন রাতে বুকের ভিতরটা হু-হু করে উঠবে, আর হাউ-হাউ করে কাঁদা ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না।’ এরপর হালকা পজ দিয়ে শেষ করলো কথা, ‘এই কিছু মনে করলি না তো কথাটা বললাম বলে? আমার পার্সোনাল এক্সপেরিয়েন্স থেকে বললাম।’ ওর সামনে দাঁড়ানো সৌম্য তখন চুপ। আর তখন দেখবেন গায়ে কাঁটা দিয়ে আপনারও এটা মনে হচ্ছে যে, এটা নিছক সিনেমা নয়, যেন অন্য একটা কিছু – যেন সত্যি ওই রাজদীপের আত্মজীবন-কথা।

কে কেমন অভিনয় করেছেন, এতটা লেখার পর সেটা নিয়ে আলাদা করে কিছু লেখার দরকার আছে কিনা, আপনি বলুন। ইন ফ্যাক্ট মনে হচ্ছিল, কেউ কোন অভিনয় করছেন না ছবিতে। সবাই নিজের নিজের যাপিত জীবন পর্দায় নিয়ে আসছেন যেন।

এর আগে এই কলামে পরমব্রতের ‘লড়াই’ নিয়ে লিখতে গিয়ে এটা না লিখে পারি নি যে, সিনেমা বানানোর পরীক্ষাতে ডাহা ফেল করলেন তিনি। আর হ্যাঁ, এখনও কিন্তু আমার মত ঠিক সেই রকমই আছে।

কিন্তু আজ এই ‘সোনার পাহাড়’ দেখে এটা লিখতে আমি বাধ্য যে, এসব ছবি রিভিউ লিখে রেটিং দেওয়ার ঊর্ধ্বে। কারণ, আমার মতে এই ছবি তো ক্লাসিক হওয়ার যোগ্য।

আশা রাখব পরমের আগামী সব ছবি থেকেও এই দ্যুতি আর অনেস্টিটাই পাবো।

3 COMMENTS

  1. বর্তমান যে সব বাংলা ছবি হচ্ছে মানে আমি বলতে চাইছি যে সব ছবি নন্দনে রিলিজ হয় কিন্তু শহরের বাইরে সিনেমা হলের মুখ দেখে না আর যে ছবির বাইরে অভিলাষ রায় রিভিউ লেখে না । সেই সব ছবির প্রায় অধিকাংশ সোজা কথায় খাঁজা । ” সোনার পাহাড় ” দেখলাম । মাতা পুত্রের মধ্যে মনোমালিন্য আর শেষে চোখের জলে তাদের মিলন । ঘিসি পিটি, তাই শেষ পর্যন্ত ছবি দেখার ধৈর্য থাকে না । “হামি” হোক কি ” রাখী বন্ধন ” , শিশুদের মুখে পাকা পাকা কথা দিলেই পাব্লিক খুশ । এ ছবিতে আবার শিশুর মুখে খিস্তি ঢুকিয়ে ছেড়েছেন । তাই শুনে নন্দনের পাব্লিক তো খুশিতে ডগমগ । ভাবা যায়? সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আছেন । বেশ ছক কষে চরিত্রটা বানিয়েছেন । তনুজা আছে আর কে তুমি নন্দিনী গাইয়ে ছাপিয়েছেন । পরমব্রত টায় টায় পাস মার্ক পেয়ে এবার উতরে গেলেন ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here