রাঙিয়ে দিয়ে যাও

সাধুবাদ দিই গো মশাই আপনাদের। রবিঠাকুর পড়ে বা না পড়েও – তাঁর গানের কলিতে আপনারা এতটাই মজতে পেরেছেন যে আর কথাটি নেই। আপনারা যুগে যুগান্তে রাঙিয়ে দিয়ে এসেছেন, রাঙিয়ে দিতে দিতেই চলেছেন এবং ভবিষ্যতেও আপনারা রাঙাবেন। কাজেই, জয় হোক মশাই আপনাদের।

আপনাদের মহিমায়, আপনাদের যুগযুগান্তের কল্যাণস্পর্শেই, তিলোত্তমা এই আমাদের কলকাতা – যে ক্রমশই একটি ‘কর্তাবাবার পিকদানি’তে পরিণত হতে পেরেছে, তাতে আর সন্দেহ থাকতে পারে না। আপনাদের বাড়বাড়ন্ত হোক।

লোকে বলে ব্রিটিশদের কেরামতি। সেই কেরামতিতে ‘বানরে সঙ্গীত গায়, অট্টালিকা খাড়া থাকে সহস্র বছর’ – আপনাদের কীর্তিতে তাতেও নাড়া পড়তে পেরেছে। আমাদের যে সাধের হাওড়া ব্রীজ, ঈশ্বর না করুন, আপনাদের স্নেহ-ভালোবাসায় কোনদিন না সেটিও মাঝেরহাট হয়ে দাঁড়ায়। দুর্গা শ্রীহরি – শ্রীহরি মধুসূদন … রক্ষে কোরো মা।

এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝেছেন – যে, আমি গুটখা আর পানপরাগের বিজ্ঞাপন দিচ্ছিলুম। চোয়াল বটে মশাই আপনাদের। অবিশ্যি কলকাতার মানুষ চিরটাকালই ইন্টেলেক-চোয়াল। বুদ্ধি একেবারে, কি বা দিন কি বা রাত্রি, চোয়ালের মুখটাতে এসেই গজগজ ভসভস করতে থাকে। এই পড়ে কি সেই পড়ে – এমনটাই অভ্যাস। কাজেই ভালো কিছু দেখলেই, অহো কি দেখিলাম – দূরাদয়শচক্রটক্র বলতে বলতেই পিচিক। নীল-সাদার উপরটাতেই লালরঙা সূর্য-টিপ। লজ্জায় তিলোত্তমার মুখ রাঙা হয়ে ওঠে।

১৯৪৩এ উদ্বোধন হওয়া হাওড়া ব্রীজ বা রবীন্দ্রসেতুর অবস্থাও তথৈবচ। গুটখা আর পানপরাগের বিষে তার লোহার শক্ত কাঠামোতেও জং ধরিয়ে ছেড়েছেন ইন্টেলেক-চোয়ালরা। আর শুধুই কি গুটখা বা পানপরাগ – শীতগ্রীষ্মবর্ষা আমাদের অম্বল আর ঠান্ডা লাগাই ভরসা। গলায় সর্বদাই সর্দি ঘড়ঘড়ায়মান। আর বাড়ি থেকে বেরিয়ে ফুটপাথ দেখলেই, মুখপথ বেয়ে তা নিঃসৃত হবার লাগি গড়গড়ায়মান।

বলি ও মশাইরা, শহরটাকে কি সত্যি সত্যিই নিজেদের পিকদানি বলেই ভেবে নিয়েছেন ? নাকি রাঙিয়ে দেবার এই জন্মজন্মান্তরের অভ্যাসটিকেই ‘স্বরাজ আমাদের বার্থরাইট’-এর মতো জন্মগত অধিকার হিসেবে ক্লেম করে রেখেছেন ? শহরটাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতেই বা কিসের এত আপত্তি মশাই আপনাদের ? আবার আপনারাই নাকি সিভিক সেন্স নিয়ে গলা চড়ান।

[এক্ষণে, কাল্পনিক একটি সংলাপ শোনাই আপনাদের। ক-বাবু আর খ-বাবু’র কথোপকথন।]

ক বললেন, “বিলেতে কি আমেরিকায় বুঝলেন মশাই, (পিচিক) রাস্তাঘাট একেবারে চকচক চকচক (পিচিক), হ্যাঁ – যা বলছিলাম” …

খ তখন কেটে বললেন, “আরে তুমি আবার কী বলবে হে মোক্তার, (ঘড়ঘড় ঘড়ঘড়) দেখেছিলাম বটে জার্মানীর হেডেলবার্গের ওখানে (ঘড়ঘড় ঘড়ঘড়) এত পরিষ্কার, এত পরিষ্কার – ওখানে সিভিক সেন্সটা মানে (ঘড়াৎ), ওদের থেকেই শেখা উচিত”।

মশাইরা, ওরা-আমরা-তে কোন্দল করবো না। কিন্তু, নিজেরাও তো নিজেদেরকেই প্রশ্ন করতে পারি। স্বচ্ছ ভারত হোক, অথবা মিশন নির্মল বাংলাই হোক – শহর-গ্রাম-পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখতে চাওয়াটাই কি আমাদের উদ্দেশ্য হতে পারে না আজ ?

ইন্টারনেটে খবর ছড়াচ্ছে, ভারতীয় রেলের কত হাজার কোটির লোকসান হয়েছে এই বিগত আর্থিক বছরেই – এবং তার কারণ কি ? না, যাত্রীরাই নাকি তাদেরকে দেওয়া বালিশ-বিছানা-কম্বলকে সুটকেসস্থ করে পাততাড়ি গুটিয়ে পগারপার হয়েছেন। এসি-কামরার ভদ্দরলোকেরাও যদি কম্বল-চুরি করেন, নেতারাই বা কথায় কথায় পুকুরচুরি করবেন না কেন ?

তেজস এক্সপ্রেস চালু হলো, মাল্টি-ডিলাক্স অভিজ্ঞতা দেবার লক্ষে – মাস ঘুরতে না ঘুরতেই দেখা গেলো – শৌচাগারের আয়না ভাঙ্গা, হেডফোনের তার ছেঁড়া, এলসিডি স্ক্রীনের পর্দা ফাটা – গর্বের সাতকাহন।

আমাদের কি মশাই পরিষ্কার থাকতে, পরিষ্কার রাখতে – সামান্য কিছু নিয়মকানুন-অভ্যাসকে মেনে চলতে এতটাই অসুবিধা বোধ হয় ? তাহলে কোন মুখেই বা আমরা অন্যের সমালোচনা করি ? রাজ্যসরকারের তত্ত্বাবধানে দক্ষিণেশ্বরে তৈরী হওয়া স্কাইওয়াক উদ্বোধনের ২৪ঘন্টাও কাটেনি – ঝকঝকে রঙের উপরে টকটকে রাঙা রূপসজ্জার বাহার। নীল-সাদাকে হটিয়ে, লাল বা গেরুয়ার প্রতিষ্ঠা দিতেই এঁরা বোধকরি বদ্ধপরিকর হয়ে নেমেছেন। দেশকে রঞ্জিত করে তোলাতেই এদের সুখ ও সিদ্ধি। তাও যদি বা এরা লাল-নীল কোনও মতাদর্শকেই বুঝতেন! – অবিশ্যি তাতেও থুতু ফেলাটা জাস্টিফায়েড নয়।

অগ্নীশ্বর চাটুজ্জেকে মনে পড়ে আপনাদের ? ‘অগ্নীশ্বর’এর উত্তমকুমার। অধঃস্তন এবং চিরটাকাল কের্দানি মেরে আসা এক কর্মচারীকে ঘাড় ধরে নিজের নস্যির থুতু সাফ করিয়েছিলেন। শুনেছি নাকি, আমাদের পূর্বতন মহানাগরিক সুব্রত মুখোপাধ্যায় মশাইও রাস্তাঘাটে কাউকে চটজলদি ‘ছোটো-বাইরে’ করতে দেখলেই কান ধরে ওঠবোস করাতেন। তাতেও অবিশ্যি লজ্জার মাথা খেয়ে উপকার হতো কি না সন্দেহ – তবে মনস্তত্বে বদল না এলেও শাস্তির ভয়ে ‘নিখরচায় জলদান’ কমতে পেরেছিলো।

এর পরে পরেই এলো ‘সুলভ ইন্টারন্যাশনাল’ – ভাবছি এখন সেই বাথরুমগুলিতেও একখানি করে পিকদানি রাখবার প্রস্তাব জানাবো। অবিশ্যি তাও তো বোধহয় রেলগাড়ির গাড়ুর মতোই লোহার শেকল দিয়ে বেঁধে রাখবার দরকার পড়বে – নচেৎ তেরাত্তিরও পেরুবে না। আমরা যে গায়েব-গায়েবীর দেশ।

মশাইরা, মাপ করবেন আমায়। ‘আমাদের-আপনাদের’ বলে, গাল দিতে দিতেই লিখলুম। সাহিত্যের মুখে পিচিক – এ কি লেখা লেখালে তুমি হে ঈশ্বর! সমালোচনাটা যখন প্রায় চোখে-আঙুলের পর্যায়েতেই পৌঁছিয়ে যায়, তখন বড় অসহায় লাগে জানেন। আমি-আপনি-আপনারাই তো মিলেমিশে সমাজের ধারক ও বাহক। দেশের গৌরবকে নন্দিত না করে, দেশের ফুটপাথকে রঞ্জিত করার দিকটাতেই আমাদের ঝোঁক যাবে কেন ? কেনই বা আমাদের এমন একখানি লেখা লিখবারও প্রয়োজন হবে ?

না মশাই, রাঙিয়ে দিয়ে যান – আপনারা রাঙিয়েই দিতে থাকুন। আমার বদ-মন্তব্যগুলিকে নিজগুণে ক্ষমা করে দেবেন।

অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম – ১৯৯২, কলকাতায়। ২০১৪-এ পশ্চিমবঙ্গ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক্স এঞ্জিনিয়রিং-এ স্নাতক, পরে আইআইইএসটি, শিবপুর থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ ২০১৬-এ। বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক। নেশা বলতে বই আর বেড়ানো। শখের তাগিদে নানারকম বিষয়ে লিখে থাকেন। পছন্দ বলতে পরিবেশ আর মানুষের গল্প বলা।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here