স্বেদবিন্দুতেও গরল ! বিষকন্যাদের আলিঙ্গনেও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তেন কামুক রাজারা

4551

পুরাণ ও ইতিহাসের নানা কিংবদন্তিতে পাওয়া যায় রহস্যময়ী লাস্যময়ী সুন্দরী বিষকন্যাদের কথা | বিষকন্যা হল সেই কন্যা যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে বিষের শীতল স্রোত‚ যার শুধুমাত্র নিঃশ্বাস বা দৃষ্টিই শেষ করে দিতে পারে শিকারের জীবন |

কোনও বাস্তব প্রমাণ না থাকলেও নানা লোকসাহিত্য‚ পুরাণে বিষকন্যাদের উল্লেখ পাওয়া গেছে | কল্কি পুরাণ থেকে জানা যায় বিষকন্যাদের শুধুমাত্র একটি নজরেই ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যেতে পারত | গান্ধর্বপত্নী সুলোচনা নামে এক বিষকন্যার উল্লেখও পাওয়া যায় কল্কি পুরাণে | চাণক্য বা কৌটিল্যর রচিত অর্থশাস্ত্র‚ সোমদেব ভট্টের কথাসরিৎসাগর‚ লাতিন সিক্রেটা সিক্রেটোরাম ইত্যাদিতে এদের উল্লেখ রয়েছে |

জানা যায় রাজপুরুষদের লালসাতৃপ্তির সময় তাদেরকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার জন্য ছোটবেলা থেকেই বেছে নেওয়া বিশেষ বিশেষ কিছু মেয়েকে বিষকন্যা হিসেবে বড় করে তোলা হত | শত্রু নিধনের জন্য কিছু সুন্দরী মেয়েকে ছোটবেলা থেকে জোগানো হত বিষের খোরাক | তাদের খাবারে মিশিয়ে দেওয়া হত | সেই বিষের বিষক্রিয়ায় মারা যেত বেশিরভাগ মেয়েই | কিন্তু যে কয়েকজন মেয়ে বিষের বিষক্রিয়া সহ্য করেও বেঁচে থাকতে পারত‚ তারাই ক্রমে হয়ে উঠত বিষকন্যা | বিষের সরবরাহ পর্যাপ্ত না হলে ঘুমই আসত না সেসব মেয়েদের চোখে |

যে পদ্ধতিতে বিষকন্যাদেরকে বিষসহনে অভ্যস্ত করা হত তার নাম মিথ্রিডেটিজম | গ্রীসের পন্টাসের রাজা ষষ্ঠ মিথ্রিডেটস নিজের শক্তিশালী শত্রুদেরকে দমন করার জন্য প্রথম এই বিষকন্যাদের বিষময় করে তোলার পদ্ধতি ব্যবহার করেন | কিন্তু যে বিষ এক ফোঁটা শরীরে মিশে গেলেই মৃত্যু অনিবার্য তার থেকে নিজেদেরকে কীভাবে রক্ষা করতে পারত বিষকন্যারা ?

রয়েছে তারও বিস্তৃত ব্যাখ্যা | সরাসরি বিষ খেয়ে নিলে জ্বলে যেতে পারে খাদ্যনালী ও শিরা-ধমনী | তাই সরাসরি বিষ গ্রহণ করার পরিবর্তে বিষ সরবরাহ করে শুকিয়ে নেওয়া হত | সেই শুকিয়ে নেওয়া বিষ গুঁড়ি করে নিয়ে অল্প অল্প করে খাবারের সাথে মিশিয়ে নিয়ে গ্রহণ করত বিষকন্যারা | সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের শরীর সেই বিষের প্রতি সহনশীল হয়ে উঠলে সরাসরি বিষ গ্রহণে সক্ষম হয়ে উঠত তারা |

বিশ্বজয়ী রাজা আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেটকে বিষকন্যাদের সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন অ্যারিস্টটল | ভারতের বিষকন্যাদের থেকে সতর্ক থাকার উপদেশ দেন আলেকজান্ডারকে | ভারত থেকে আলেকজান্ডারকে উপহার হিসেবে পাঠানো হয়েছিল এক সুন্দরী কন্যা | কিন্তু আলেকজান্ডারের অভিজ্ঞ সভাসদরা তাঁকে বিষকন্যা হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলায় আলেকজান্ডার প্রাণে বেঁচে যান | নাহলে কেবলমাত্র তার স্বেদবিন্দুতে ও আলিঙ্গনেই মৃত্যু হতে পারত তাঁর |

খাবারের সঙ্গে যাতে বিষ মিশিয়ে রাজাদেরকে মারা না যায় সেজন্য রাজার খাবারের বিষয়ে অনেক রকমের কড়াকড়ি মেনে চলা হত |  এখানেই ছিল বিষকন্যাদের কৌশল | তারা নিজেরাই ছিল বিষ | ফলত রাজাকে সুরা পান করানোর আগে নৃত্যরতা বিষকন্যারা নিজে সেই সুরা পান করে রাজার বিশ্বাস অর্জন করতেন | অথচ তাদের নিজের শরীরের বিষেই সেই সুরা বিষাক্ত হয়ে যেত | তার একটিমাত্র ঢোকেই মৃত্যু ছিল অনিবার্য |

৩৪০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ২৯৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যর রাজত্ব ছিল | তাঁরই গুরু ও অন্যতম প্রধান উপাদেষ্টা ছিলেন চাণক্য বা কৌটিল্য | চন্দ্রগুপ্তকে বিষের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখতে তাঁকে রোজই খাবারে বিষ মিশিয়ে খাওয়াতেন চাণক্য | ফলত তাঁর শরীরও বিষের প্রতি সহনশীল হয়ে উঠেছিল | একদিন চন্দ্রগুপ্ত তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী দুর্ভারার সঙ্গে নিজের খাবার ভাগ করে খেলে দুর্ভারা সেই বিষের প্রকোপ সহ্য করতে না পেরে মারা গেলেও চন্দ্রগুপ্তর কোনও ক্ষতিসাধনই হয়নি |

প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত তিন চিকিৎসক – চরক ‚ সুশ্রুত ও ভাগবত বিষকন্যাদের উল্লেখ করেছেন | কিছু বিশেষ আচরণ দেখে বিষকন্যাদের চিহ্নিত করার উপায়ও বলেন সুশ্রুত | মুখ-চোখের ভাবভঙ্গিমা‚ মাটি আঁচড়ানো‚ চুলের মধ্যে বারবার হস্তসঞ্চালন‚ অকারণে হাসা‚ বারবার পিছু ফিরে তাকানো ইত্যাদির মত কিছু অচরণ দেখে বিষকন্যাদের সনাক্ত করে ফেলতে পারতেন বিশেষজ্ঞরা |

শুধুমাত্র মানুষকেই নয়‚ ছুঁয়েই ফুল‚ ফল‚ কীট‚ পতঙ্গ বা পাখিকে চিরকালের জন্য ঘুম পাড়িয়ে দিতে পারত বিষকন্যারা | আর শক্তিশালী সত্রু রাজার বিরূদ্ধে মানব-ঘাতক বিষকন্যাদের ব্যবহার করার সবথেকে বড় সুবিধা ছিল এই যে তাদেরকে বিষকন্যা হিসেবে চিনতে পারা ছিল না খুব একটা সহজ | তাই ভোগলালসায় ডুবে থাকা রাজারা খুব সহজেই বিষকন্যাদের সৌন্দর্য ও লাস্যের ফাঁদে পড়ে যৌনমিলন করতে গেলেই মারা পড়ত |

কাহিনিতে চরিত্র হিসেবে বা কিছু পুরাণ কাহিনিতে বিষকন্যাদের কথা পাওয়া গেলেও আদতেই তাদের অস্তিত্ত্ব ছিল কিনা তা নিয়ে দ্বন্দ্ব আছেই |শোনা যায় কেবলমাত্র একবার ব্যবহার করলেই বিষকন্যাদের সমস্ত বিষ নিঃশেষ হয়ে যেত | তাই বারবার তাদেরকে বিষের জোগান দিতে থাকতে হত | ধরা পড়লে বিষকন্যাদের পরিণতি কী হত সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনও প্রমাণ না থাকলেও জানা যায় যে তাদেরকে একবার চিহ্নিত করা গেলে কেটে টুক্রো টুকরো করে তাদের মাটিতে পুঁতে দেওয়া বা আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হত | নিজেদের জীবনকে বিষে জর্জরিত করতে নিজে চায়নি বিষকন্যারা | কিন্তু রাজাদের সাম্রাজ্যগ্রাসের কুটিল রাজনীতিতে বিষই হয়ে উঠেছিল বিষকন্যাদের জীবনের একমাত্র পরিচয় |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.