গরিবদের জন্য দোরে দোরে ঘুরে হুইলচেয়ার আর ক্রাচ জোগাড় করেন মোহন

66
project embrace

বেসমেন্ট থেকে থ্রিফট স্টোর, ঘুরে ঘুরে জোগাড় করলেন একশ’র ওপর পুরনো হুইলচেয়ার আর ক্রাচ। বিলি করলেন দুঃস্থদের। তিনি মোহন সুদাবাতুল্লা,একজন দরদী কলেজ পড়ুয়া। অন্যের প্রতি সমবেদনায় প্রাণ কাঁদে যার। ফেলে দেওয়া চিকিৎসার কাজে লাগে এমন যন্ত্রপাতি তিনি কুড়িয়ে এনে তুলে দেন তাদের হাতে যাদের সেসব বড়ই প্রয়োজন কিন্তু কেনার ক্ষমতা নেই । এই কর্মকাণ্ডের নাম দিয়েছেন ‘প্রজেক্ট এমব্রেস’।

নিজের কোনও স্বার্থ জড়িয়ে নেই, ‘আলিঙ্গন প্রকল্প’টি নিতান্তই সেবামূলক কাজ। পুরনো ক্রাচ, হুইল চেয়ার, ওয়াকার, স্লিং, অর্থোটিক ব্রেস, রিহ্যাবিলিটেটিভ গিয়ার এসব শারীরিক ভাবে প্রতিবন্ধী কোনও কোনও মানুষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। কিন্তু খুব দরিদ্র যারা তা তো সবসময় কিনতে পারেন না। তাই ২৩ বছরের এই তরুণ স্থির করলেন আর কাজে লাগছে না কিন্তু সচল এই সব দরকারি চিকিৎসা সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি তিনি সংগ্রহ করে বিলিয়ে দেবেন তাদের মধ্যে যাদের দরকার অথচ কেনার সামর্থ্য নেই। আবর্জনার মধ্য থেকে ধুলোবালিতে ঢাকা এসব যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করে নিয়ে আসেন তিনি এবং তাঁর স্বেচ্ছাসেবী দল। কমিউনিটি মেম্বারদের থেকে ব্যক্তিগত অর্থ সাহায্যও পান কিছু। তা দিয়েই সেগুলি পরিষ্কার আর মেরামত করেন। তারপর পাঠিয়ে দেন দুঃস্থদের কাছে যারা পয়সার অভাবে এগুলি কিনতে পারেন না।

‘কারোর স্বামী বা স্ত্রী হয়ত হুইলচেয়ার ব্যবহার করতেন। তারপর তিনি মারা যাওয়ার পর ওই সচল হুইলচেয়ারটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। সেটি আস্তাকুড়ে ফেলে দেওয়ার কথা ভাবাই যায় না’ বলেন ওই স্বেচ্ছাসেবী দলটির একজন সদস্য। ‘সেটি আবারও অন্য কারো কাজে লাগবে এটা জেনে যারা আমাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন তাদেরও আনন্দের সীমা থাকে না, প্রিয় স্বজনের স্মৃতি বিজড়িত জিনিসটি যেন নবজন্ম পেল। দিতে পেরে তাদের মুখগুলোও আলোয় ভরে ওঠে’।

সুদাবাতুল্লা প্রথম এই রকম ভালোবাসার শ্রমে উদ্বুদ্ধ হন যখন তিনি উটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। পড়াশোনার পাশাপাশি এক নিকটবর্তী হাসপাতালের ‘প্রস্থেটিক্স’ (নকল অঙ্গ) বিভাগে তিনি স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করতেন। কৃত্রিম পা ঠিকমত গঠন হয়ে যাবার পর ওই সরঞ্জামটি আর কাজে লাগে না। সেটিকে পুনরায় ব্যবহার করা যেত না কারণ এক একজনের পায়ের আকার আকৃতি এক একরকম। তাই প্রস্থেটিকগুলি ফেলেই দিতে হয়। কিন্তু সুদাবাতুল্লার শুধু মনে হত যদি সেগুলি অন্য কেউ আবার ব্যবহার করতে পারত ! কিন্তু যেগুলো করা যায় সেসব যন্ত্রপাতি তো আবর্জনার স্তূপ থেকে এনে আবার ব্যবহার করা যেতেই পারে। যারা কিনতে পারছে না তাদের দেওয়া যেতে পারে। এরকম ভাবনা থেকেই সুদাবাতুল্লার এই মহৎ প্রয়াসের শুরু ।

২০০৬ সালে তিনি মা বাবার সঙ্গে ভারতে ঘুরতে এসেছিলেন। তাঁর বেশ মনে পড়ে বিকলাঙ্গ শিশুদের একটি অনাথাশ্রমে গিয়েছিলেন তিনি। সেই বাচ্চাদের কোনও সাহায্যকারী সরঞ্জাম ছিল না। মনে আছে, বাইসাইকেলের চাকা আর আসবাবপত্রের ভগ্নাবশেষ দিয়ে তাদের জন্য অস্থায়ী হুইলচেয়ার বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দশ বছর বাদে, সুদাবাতুল্লা আবার ফিরে এসেছেন ওই অনাথাশ্রমে। সঙ্গে কয়েক ডজন হুইলচেয়ার আর ক্রাচ, বাচ্চাদের জন্য। সুদাবাতুল্লার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি ৯০০র ওপর চিকিৎসা সংক্রান্ত সরঞ্জাম সংগ্রহ ও পরিমার্জন করে ভারতবর্ষ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিম্ন আয় সম্বলিত হাসপাতালগুলিতে দান করেছেন। ‘পথে যেতে যেতে অনেক বাধা বিপত্তি পেরোতে হয়। কিন্তু স্বাস্থ্য পরিষেবায় সাহায্য করার এই অঙ্গীকার আমার শিক্ষা জীবনে নেওয়া অনেক বড় একটি শপথ’, জানিয়েছেন সুদাবাতুল্লা।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.