সুগার ফ্রি

 

শুভেন্দু স্যার প্রণামপ্রিয় মানুষ। খুব যত্ন করে পা ছড়িয়ে ছেলেপিলেদের প্রণাম গ্রহণ করেন। শিক্ষক দিবস কিংবা কোন স্পেশাল ডে-তে ছাত্রছাত্রীরা যখন টেবিলের তলায় ঢুকে হুড়মুড় করে প্রণাম করে, শুভেন্দু স্যারের মুখটা পাকা টুসটুস আমটি হয়ে যায়। দুই গালে লাল আভা বেরোয়। আবেগ চাপতে পারেন না। চোখের কোণ সুবর্ণরেখার বালির মতো চিকচিক করে।
  হাটে আরশোলা খেদাবার ওষুধ বেচে নমস্কার মাহাত। ক্যারক্যারে সাউন্ডবক্সে একই কথা রিপিট মারে- আপনি ঘর ছাড়বেন? না, আরশোলাদের ঘরছাড়া করবেন? ভেবে দেখুন ভেবে দেখুন ভেবে দেখুন। মার্কেটে এসে গেল জাপানি বোম জাপানি বোম জাপানি বোম। শুভেন্দু স্যারও অমনি। ম্যারাথন প্রণামপপর্ব চলাকালীন নমস্কার মাহাতর মতো একটাই ডায়লগ লাগাতার বলে যান- প্রকৃত মানুষ হও, প্রকৃত মানুষ হও, প্রকৃত মানুষ হও।
  সেই শুভেন্দু স্যার প্রণাম নিচ্ছেন না। মাধ্যমিকের রেজাল্ট আউট হল। অভাবনীয় সাফল্য। সবারই তুখোড় রেজাল্ট। পারদ নাইন্টির উপর দোল খাচ্ছে। আরও উপরে উঠছে তো নিচে নামছে না। ছেলেমেয়েদের মুখে চোখে বুনিপমারা কনফিডেন্স। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতি কৃতজ্ঞতায় আটখানা।  প্রণামের জন্য টেবিলের নিচে দলবেঁধে হামাগুড়ি দিচ্ছে। হামাগুড়িই সার। শুভেন্দু স্যারকে টলানো যাচ্ছে না। ‘থাক থাক’ বলে হটিয়ে দিচ্ছেন। এরমধ্যে কেউ কেউ সেই নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে পা ছুঁতে চাইছে। শুভেন্দু স্যার একমাত্র ধুতিপরা শিক্ষক। তিনি ধুতি টেনে চপ্পলশুদ্ধ পা ঢেকে বসে আছেন, যেন নারাণপূজার ঠাকুরমশাই এক্ষুনি শান্তিজল ছেটাবেন। চারু ঠ্যাটা ছেলে, ধুতির তলা দিয়ে পায়ে খাবলা মারার চেষ্টা করছিল। শুভেন্দু স্যার দিলেন ঘোড়ার মতো পা ঝেড়ে। অতুল স্যার বিড়বিড় করে বলে উঠলেন- পাজির পা ঝাড়া আর কাকে বলে। কথাটা চারুকে বলা হল, না শুভেন্দু স্যারকে, কেউ বুঝতে পারল না।
  দুদিন পর হায়ার সেকেন্ডারীর রেজাল্ট বেরোল। আবার ঢল নামল। এবারেও নারাজ শুভেন্দু স্যার। ছেলেমেয়েদের ধারেকাছে ঘেঁষতেই দিলেন না। অত্যন্ত কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিলেন- তোমরা ভেবো না অসাধ্যসাধন করে ফেলেছ। এখনও অনেক পথ বাকি। এই তো শুরু। জীবনে সফল হয়ে প্রণাম করতে এস। 
  ব্যাপারটা স্টাফরুমের কারও মাথাতেই ঢুকল না। অমন প্রণামখ্যাপা শুভেন্দু তপাদার এত নিরাসক্ত কেন? পায়ে কি দাদ হয়েছে? অতুল মণ্ডল বললেন- কি ব্যাপার হে শুভেন্দু, কিছু ঘটেছে নাকি?
  : কি ঘটবে?
  : ভালো মন্দ কিছু? অনেক সময় অশৌচ চললে অনেকে প্রণামটনাম নেয় না দেখেছি।
  : আরে না না, সেসব কিছু নয়। 
  : কিছু তো একটা ব্যাপার আছেই। ছেলেমেয়েদের তো কখনওই নিরাশ কর না।
  শুভেন্দু চোখ মটকালেন। অর্থাৎ পরে বলব।

  অতুল মণ্ডল তক্কেতক্কেই ছিলেন। ছুটির পর ঠিকঠাক বাগে পেলেন শুভেন্দু স্যারকে। – হ্যাঁ, এবার বলতো দিকি কেসটা কি।
  শুভেন্দু তপাদার মুখটা বাসি লাউয়ের মতো করে বলল- আর বোলো না ভায়া, আমার চপ্পলটার কি অবস্থা হয়েছে একবার দেখ। একটা দিক হাঁ করে হাঙরের মতো তাকিয়ে আছে। কোনমতে সেফটিপিন দিয়ে ম্যানেজ করেছি। এই চপ্পল চোখে পড়লে আমার উপর ছেলেমেয়েদের ভক্তিশ্রদ্ধা থাকবে?
  যেন একটা মৃত্যু সংবাদ পেলেন অতুল। বললেন- চপ্পল কি কারও চিরদিন থাকে শুভেন্দু? কালের নিয়মে তাকেও একদিন যেতে হয় ধুলিময় পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে। তুমি মাধ্যমিকের আগে একজোড়া কিনে নিলে না কেন? বহুত কিপটে আছ।
  : আরে ভায়া, যতবার কিনতে যাই তোমার বউদি বাগড়া দেয়। বলে, কদিন সবুর কর।
  : সে কি, কেন?
  : ওই যে কি একটা নতুন মার্কেট এসেছে না? সস্তায় জিনিষ দিচ্ছে, একসাথে তিন হাজার টাকার কেনাকাটা করলে দু কেজি চিনিও ফ্রি দিচ্ছে।
  : হ্যাঁ হ্যাঁ শুনেছি।
  : তো, তোমার বউদি বলল- ফর্দ বানাচ্ছি, 
তোমার চপ্পল বাবদ শ তিনেক টাকা ধরে রেখেছি। তিন হাজারের প্যানেল রেডি হলেই রওনা দেব। দু কেজি চিনি তো হাতছাড়া করা যায়না।
  : তিনহাজারি লিস্টি তৈরি হয়নি এখনও?
  : কি করে হবে, ধারেকাছে কোন অকেশন-টকেশন নেই তো। নিদেনপক্ষে একটা বিয়েবাড়ি। শুনেছি আড়াই হাজার টপকেছে। আর কটা দিন।
  শুভেন্দু স্যার ফোঁস করে উষ্ণ বাতাস ছাড়লেন নাক দিয়ে।
  মর্মাহত অতুল মণ্ডল বললেন- মাত্র দু কেজি চিনির জন্য অতগুলো প্রণাম পা-ছাড়া করলে শুভেন্দু?
  : এরচেয়েও বড় দুঃখটা কোথায় জান অতুল?
  : কোথায়?
  : আমরা দুজনেই হাই সুগারের পেশেন্ট।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nayak 1

মুখোমুখি বসিবার

মুখোমুখি— এই শব্দটা শুনলেই একটাই ছবি মনে ঝিকিয়ে ওঠে বারবার। সারা জীবন চেয়েছি মুখোমুখি কখনও বসলে যেন সেই কাঙ্ক্ষিতকেই পাই