সেই কবে ১৯৭০ সালে প্রথম যশ চোপড়া তৈরি করেছিলেন তাঁর প্রোডাকশন হাউস ‘যশরাজ ফিল্মস’। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত এক এক করে ৭০টার বেশি ছবি তৈরি হয়েছে এই হাউস থেকে। ভেবেছিলাম যে আর কিছু হোক না হোক, দীর্ঘ দিন ধরে এত অগুন্তি শিল্পী সমন্বয় করে সিনেমা বানিয়ে আসছে যে সংস্থা, তাঁদের তৈরি ছবিতে ক্রিয়েটিভ আর্টিস্ট তাঁর মর্যাদাটুকু পাবেন।

সেই আশা ভেঙে-চুরে নদীর জলে ভাসিয়ে দিল এই কোম্পানির নতুন সিনেমা ‘সুই ধাগা’।

Banglalive-8

সিনেমাটা দ্যাখার পর স্পষ্ট এটা বুঝতে পারবেন, ক্রিয়েটিভ আর্টিস্ট হওয়ার জন্য আলাদা কোন গুণ লাগে না আদৌ। আজ অবধি ‘গোপাল বড় সুবোধ বালক’ হয়ে দিন কাটাচ্ছে যে, ইচ্ছে করলে কয়েকদিনের মধ্যে পুরো পালটে গিয়ে সেই ‘গোপাল’ই ‘রামগোপাল’ ভার্মা হতে পারে!

Banglalive-9

একঝলক এটা হয়তো মনে হবে যে, ছবিটা বোধহয় আসলে কোন উদ্যোগপতির স্টোরি। মামুলি জীবন কাটাতে কাটাতে বড় একটা টার্গেট নিয়ে নিজের বিজনেস শুরু করছে যে। কিন্তু তারপর একটু তলিয়ে যদি ভাবতে যান, তাহলে দেখতে পাবেন, গল্পের বেসিক ছাঁচেই অ্যাত্ত বড় ফাঁক!

দর্জি এবং ফ্যাশন ডিজাইনার – এই দুটো আলাদা পেশাকে মিলিয়ে-গুলিয়ে এক করে ছেড়েছে এই ছবি! জামাকাপড়ের দুনিয়া সম্পর্কে আমার ধারণা খুব কম। তবে যেটুকু জানি, তার ভিত্তিতে বলতে পারি, ফ্যাশন ডিজাইনার হলেন কিছুটা ক্রিয়েটিভ আর্টিস্টের মতো। পোশাক নিয়ে যাঁর নতুন নতুন কল্পনা আর ভাবনা-টাবনা থাকে।

আর তাঁর নির্দেশমতো সেই কল্পনা ছুঁচ আর সুতোয় পোশাকে-আশাকে ফুটিয়ে তোলেন দর্জি। তাঁকেও আপনি আর্টিস্ট বলতে পারেন, কিন্তু ঠিক সো কল্‌ড ‘ক্রিয়েটিভ’ নন তিনি। তিনি হলেন পারফর্মিং আর্টিস্ট। আমার-আপনার জামাকাপড় তুখোড়ভাবে তৈরি করে দ্যান। আর হ্যাঁ, আগেই যেটা বললাম যে, ফ্যাশন ডিজাইনারের কল্পনাকেও সাকার করে তোলেন।

পোশাক সেলাই করার সময় কোন রঙের সুতোর সঙ্গে কোন রঙের বোতাম ম্যাচ করবে ভাল, সেই ডিসিশন তাঁর হয়তো নেওয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু আজ বাদে কাল গোটা দেশ জুড়ে ফ্যাশনে ঠিক কেমন ট্রেন্ড হবে, সেটা ভেবে বের করা কিন্তু দর্জি কিংবা টেলরের কাজ না!

এটা শুনে মনে আবার কেউ আঘাত পাবেন না প্লিজ। এর মানে এটা কিন্তু বলছি না যে, ফ্যাশন ডিজাইনার হয়ে ওঠার দম বা ধক ওই দর্জিদের নেই। বরং উলটোটাই ঠিক। হতেই পারে, কোন দর্জি তাঁর নিজের কাজে এত দক্ষ, যে সেলাই তো করেন বটেই, তার ওপর তাঁর মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে সেই সেলাই দিয়েই নতুন নতুন স্টাইল তৈরির অগুন্তি সব শোচ! তাহলে ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার পথে আটকায় কে তাঁকে?

খেয়াল করে দেখবেন যে, তেমন কোন ঘটনা কিন্তু ‘সুই ধাগা’তে একটা ফোঁটাও নেই! গল্প যত এগোতে থাকে, তত আপনি দেখতে পাবেন মৌজি (অভিনয়ে বরুণ ধাওয়ান) নামের এই ছেলেটা সেলাই করায় পটু। কিন্তু ওর মধ্যে আদৌ কোন আর্টিস্টিক মনও আদৌ রয়েছে কিনা, গল্পে সেটার প্রমাণ নেই কোন।

বরং একের পর এক যে সিনগুলো দ্যাখান হতে থাকে, তার থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে, মৌজি নামে ওই ছেলের মধ্যে আর যাই হোক, কোথাও কোন শিল্পী সত্তা নেই। মোটে পাঁচ-ছ’হাজার টাকার জন্যে মাসের পর মাস সেলাই মেশিন বিক্রি করার দোকানে সে চাকরি করেই খুশি!

শুধু তো সেলাই মেশিন বিক্রি করাই নয়, দোকান-মালিকের হুকুম মতো, যা-নয়-তাই করতে হয় তাঁকে। মালিকের কথা মতন পশুর রোলে অ্যাক্টিং করে লোক হাসাতে হয়! বিয়ের নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে মা-বাবা আর বৌয়ের সামনে কুকুর সাজতে হয়! চাকরি করার নামে সে এত অপমান সয় কেন? বা, পেটের দায়ে এরকম করছে বলে কি তাঁর মনের ভেতর তীব্র কষ্ট হয়?

আরও পড়ুন:  তৈমুরের জনপ্রিয়তায় একেবারেই খুশি নন শর্মিলা ঠাকুর!?

উত্তর হল, না! মালিকের এই কারবার নিয়ে মৌজি নামে ওই ছেলেটার নিজের যুক্তি ক্লিয়ার আছে খুব। ‘মালিক পয়সা দেগা তো থোড়া তো হাসি ঠাট্টা করে গা না?’

বরের মুখে নিদারুণ সেই অ্যাক্টিভিটির এরকম একটা ব্যাখ্যা শুনে বিস্ফারিত চোখ নিয়ে ওর বৌ মমতা (অভিনয়ে অনুষ্কা শর্মা) তাকিয়ে থাকে শুধু! জানতে চায় যে, ‘রোজ ডগি বানাতে হ্যায় কেয়া আপকো উয়ো?’ খেয়াল করে দেখবেন যে, স্ত্রীর মুখ যখন কান্না আর অপমানে কালো হয়ে গ্যাছে পুরো, তখনও কিন্তু সেই অনুভূতির জাস্ট কোন আঁচ নেই ওই মৌজির মুখে! সহাস্যে সে অমনি এটা জানিয়ে দ্যায় যে, ‘পাগল হো কেয়া? রোজ কৌন ডগি বনেগা? কভি ছাদ কা বান্দর, কভি গলি কা ষান্ড, কভি বাজার কা ভাণ্ড…’।

মালিকের হুকুম শুনে কুকুর কিংবা বাঁদর সেজে খেলা দ্যাখাতে অসুবিধে নেই সেলাই মেশিন বেচনেওয়ালা স্টাফের। আত্মসম্মান ব্যাপারটা কী, সেটাই জানে না সে! উলটে বাবুর এই ব্যবহার ন্যায্য বলে জানে! বৌয়ের কান্না অবধি প্রথম দিকে স্পর্শ করে না তাঁকে। উলটে বোধবুদ্ধিহীন রোবটের মতো বলতে থাকে ‘সব বড়িয়া হ্যায়’।

আপনি বলুন এই লোককে ক্রিয়েটিভ আর্টিস্ট বলে মানতে আমি পারব কী করে, ভাই?

শিল্পীর কাজ একটা স্পেশ্যালাইজড জব। ফস করে হরিপদ কোন কেরানিকে এনে সেই রোলটায় জুত করে বসিয়ে দেবেন, দাদা! মুড়ি-মিছরি একদর হলে, মুড়ির হয়তো যায়-আসে না কিছু। কিন্তু মিছরির ঠিক কেমন লাগে সেটা?

বোধশূন্য কেরানি লোককে শিল্পী বলে প্রমোট করলে, সত্যি যিনি শিল্পী মানুষ, কেমন লাগে তাঁর?

বৌয়ের থেকে চিমটি খেয়ে ক্রমে মৌজির জ্ঞানচক্ষু খোলে। ছেড়ে দ্যায় সে অবমাননার কাজ। বউয়ের বলা প্ল্যান শুনে সেলাই মেশিন সঙ্গে নিয়ে পথের ধারে গাছতলাতে বসে। সিনেমা গড়িয়ে যায় সিনের পরে সিনে, কিন্তু এর একটা সিনেও আপনি এটা দেখবেন না যে, আলাদা করে মৌজি নামে এই লোকটার আদৌ কোন শিল্পীসত্তা আছে। বা, মনের মধ্যে কোথাও কোন নকসা-টকসা আঁকিবুঁকি কাটতে থাকছে তাঁর! বৌ মমতা এমব্রয়ডারির কাজ জানে হয়তো ঠিকই। কিন্তু তাক লাগানো ট্যালেন্ট আছে বলে ছবিতে দ্যাখান হয় নি কোথাও।

এরপরেই হঠাৎ করে সব কিছু এক ঝটকায় পালটে গেল যেন!

ছবির সেকেন্ড হাফে একটা গানের মধ্যে হঠাৎ দেখবেন, মৌজি নামের এই দর্জির ট্রান্সফর্মেশন ঘটছে দ্রুত, আর ঝট করে সে হয়ে উঠছে ফ্যাশন ডিজাইনারের মতো! সঙ্গী তার বৌ! বলার মত আদৌ কোন উপার্জন নেই যার, উঠতে বসতে রিটায়ার-করা বাবার (রঘুবীর যাদব) কাছে গঞ্জনা খায় যে, বড় এক ফ্যাশন টাইকুনের সঙ্গে কম্পিটিশন করবে বলে সে কিনা তখন নাম লেখাল ‘রেমন্ড ফ্যাশন ফান্ড’ নামে এক কনটেস্টে গিয়ে!

মাথার ওপর ছাদের কোন ঠিক-ঠিকানা নেই, কিন্তু এক চুটকিতে নিজের কোম্পানি শুরু করে দিল ও!

সেই কোম্পানির ব্র্যান্ড বা লোগোর স্টাইল কেমন হবে, সেটা নিয়েও ভাবনা-চিন্তা শুরু হল এরপর! জীবনের এতগুলো বছর ধরে যে এই জোনটার একশো মাইলের মধ্যে কোথাও নেই, হঠাৎ করে একসঙ্গে এসব বিষয়ে তাঁর দিব্যচক্ষু খুলল কী করে, সিনেমার কোথাও তার ব্যাখ্যা নেই কোন! শহরের সবচেয়ে গরীব পাড়ার গরীব ঘরে যার কায়ক্লেশে বাস, সকালবেলা দু’বালতি জল ধরে না রাখলে যার জীবন অচল হয়, তার মুখে এই ব্র্যান্ড কনসাশনেসটা ভেবেচিন্তে বসান হল তো?

টেলরকে নিয়ে সিনেমা বলেই কি স্ক্রিপ্টটা এত টেলর-মেড হল? সেই কবে আমির খান একটা ‘লগান’ (২০০১) বানিয়ে দেখিয়েছিলেন যে, ঠিক মতো ম্যান-ম্যানেজমেন্ট জানলে পড়ে, ঝড়তি-পড়তি লোক নিয়ে বানানো টিমও ম্যাচ জিততে পারে। সেই থেকে কি সেটাই একটা সেট করে দেওয়া টেমপ্লেট হয়ে গেল? যে, ফি-বছর একটা সেট অফ মুভিজ থাকবে এমন, যেটার লাস্ট সিনে গিয়ে ‘আন্ডারডগ’ ক্যাটেগরিটার জিত!

আরও পড়ুন:  প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করায় মামলা দায়ের করা হল সোনাক্ষী সিনহার বিরুদ্ধে

সমাজের নিচু তলার বাতিল লোকে সবাই মিলে দল গড়বে এসে। আর ছবির ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে গিয়ে দেখতে পাবেন, কাল অবধি যেগুলো এঁদের খামতি ছিল, আজ সেগুলোই পালটে গিয়ে প্লাস পয়েন্টের মতো! আর হ্যাঁ, এটা লেখা বাহুল্য যে, তাঁদের কাছে ডাব্বা খাবে এই সমাজের উচ্চ কোটির দল!

খেয়াল করে দেখুন, এই বছরের গোড়ার দিকে যশরাজ থেকে তৈরি ছবি ‘হিচকি’ কিংবা এই কিছুদিন আগে তৈরি অক্ষয় কুমারের ‘গোল্ড’। বুঝতে পারবেন কোন ফর্মুলার কথা লিখতে চাইছি আমি।

শুধু একঘেয়ে এই ফর্মুলাটাই নয়। ‘সুই ধাগা’ দেখতে দেখতে হাঁ হয়ে যাচ্ছিলাম এটা দেখে যে, চিত্রনাট্যে তো এধারে-ওধারে গুচ্ছ গুচ্ছ ছ্যাঁদা। এত নামী হাউসের প্রোডাকশনেও আজকাল এরকম দায়সারা ভাবে স্ক্রিপ্ট লেখা হয় বুঝি?

ওই সিনটাই ধরুন। হঠাৎ করে হার্টের ব্যামোয় হসপিটালে ভর্তি হলেন মৌজির মা (যামিনী দাশ)। শাড়ি পরে হাসপাতালের বেডে খুব অসুবিধে হয় বলে, মৌজির থেকে ঢোলা মতন ম্যাক্সি চান তিনি। এটা শুনে, বাড়ির যত পুরনো চাদর ছিল, সব ছিঁড়ে-খুঁড়ে এক রাতে মায়ের জন্যে ম্যাক্সি বানিয়ে ফ্যালে ও।

এটুকু অবধি মেনে নিচ্ছি, কিন্তু এর পরটুকু মানব কী করে, ভাই? সিনেমায় দ্যাখান হচ্ছে, ওর মায়ের পরনে জোব্বা টাইপের সেই ম্যাক্সি হসপিটালে বাকিদের কাছে এত হিট হয়ে গেল যে, সেরকম ম্যাক্সি কেনার জন্যে বাকি সব পেশেন্ট-পার্টির মধ্যে পুরো হৈ-হৈ লেগে গেল! দুনিয়ায় কোথাও যেন ঢোলা ম্যাক্সির কোন দোকান নেই আর! ওই ওয়ার্ডে যারা ভর্তি, তাঁদের জীবনে অসুখ কিংবা ওষুধ নিয়ে কোন ডিম্যান্ড কোন প্রবলেম নেই! সবাই শুধু এক পিস ওই ম্যাক্সি কিনতে ব্যস্ত! সিনেমায় দেখতে পাবেন, সবার হাতে রেডি করে রাখা টাকা, কোনমতে সেটা মৌজির হাতে গুঁজে দিয়ে ম্যাক্সি পেলে যেন দেবতার প্রসাদ পাওয়া যাবে!

যশরাজ ফিল্মসের প্রধান পুরুষ আদিত্য চোপড়া তো খুব রেয়ার ট্যালেন্ট, জানি। তা’ এই সব সিন নিজে পড়ে-বুঝে তবে এগুলোকে পাস করেছিলেন তো?

মায়ের হার্টের অসুখটা ঠিক কী, হাসপাতালে আদৌ তাঁর কী কী চিকিৎসা হল, সেসব ডিটেলে কখনও ঢোকে না ছবি। ডাক্তারের মুখে আবছা করে একটা শব্দ রয়েছে যে, মৌজির মাকে নাকি ‘অ্যাঞ্জিও’ করাতে হবে। এখন সেটা অ্যাঞ্জিওপ্লাসটি, নাকি অ্যাঞ্জিওগ্রাম, সেটুকু অবধি কোথাও ক্লিয়ার বলা নেই! কয়েকদিন পরে দেখবেন হসপিটাল থেকে ছুটি পেয়ে গেলেন মা! এত দ্রুত ভাল হয়ে গেলেন নাকি? আর সরকারি হাসপাতালের মতো লুকের একটা হাসপাতালের বিল এই কয়েকদিনে দেড় লাখ হয়ে গেল? আবার কাউন্টারের কর্মীটিকে হাত করে ফেলে সত্তর হাজারে নামানোও গেল বিল? যত দেখছিলাম, ধাঁধা বাড়ছিল তত!

খুব ভিড় বাসে ঠ্যালাঠেলি করে ওঠার সিন রয়েছে একটা। বাসের সামনের দরজা দিয়ে উঠতে পারছে স্ত্রী মমতা, কিন্তু বাসের পেছনের দরজায় এত প্রচণ্ড ভিড় যে সেখান দিয়ে উঠতে না পেরে রাস্তায় প্রায় উলটে পড়ছে মৌজি! খুব মর্মস্পর্শী সিন এটা ঠিকই, ভাই! কিন্তু একটু খুঁটিয়ে সিনটা দেখলে এটাও আপনি দেখতে পাবেন, যে বাসে ভিড়ের চোটে জানলা ধরে অবধি লোক ঝুলছে, সেই বাসের ভেতরটা এক্কেবারে ফাঁকা! আর সেই ফাঁকা ব্যাপারটা যে কয়েকটা শটে ধরাও পড়ে যাচ্ছে, শুট করার সময় বা ফাইনাল এডিটে একবার সেটা মনেও হল না কারুর!

ডিরেক্টর শরৎ কাটারিয়ার দ্বিতীয় ছবি এটা। ভদ্রলোকের প্রথম ছবিটা এত ভাল ছিল যে, আলাদা করে সেটা নিয়ে বলার নেই কিছু। ‘দম লাগা কে হেইসা’ (২০১৫) ছবিটা আজও দেখুন, একটা সিনে ভুল পাবেন না কোন। মনে হবে না যে, যেটা দেখছেন, সেটা বেখাপ্পা কিছু বলে!

আর তারপর সেকেন্ড ছবিতেই এরকম হাল হল?

তবে একটা ঝুল সিনেমাও যে কোন কোন সিনে কীভাবে পুরো অন্য লেভেলে পৌঁছে যেতে পারে, সেটা যদি আলাদা করে না বলি তো অন্যায় হবে তা।

আরও পড়ুন:  বলিউডের বিখ্যাত কয়েকটা গান যা না বাজলে হলির রঙও ফিকে মনে হয়!

যেমন ধরুন বিশাল বড় হল ঘরে সেই সেলাই পরীক্ষার সিন। পাশের ডিসপেনশারিতে পায়ে ওষুধ লাগাতে গিয়ে দেরি হচ্ছে মৌজির, আর ও এসে পৌঁছয় নি বলে, প্রতিযোগীর আসনে অক্ষম হাতে ওর বৌ মমতা একলা বসে। ঠিক তখন এসে পৌঁছল মৌজি, আর তারপর সবে ওষুধ লাগানো রক্ত মাখা পায়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে আসছে বৌয়ের দিকে ত্রাতার মতো প্রায়।

বলতে বাধ্য হচ্ছি, পুরো একঘর মোমেন্ট হয়েছে এটা! মৌজির ওই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আসার শটটা দেখে এক ঝলক মনে হচ্ছিল, এটা যেন শাহরুখের আইকনিক প্রেমের সিনেমা কোন। যেখানে ক্লাইম্যাক্সে রক্ত মেখে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হিরো এগিয়ে যাবে হিরোইনের দিকে। ‘সুই ধাগা’র এই সিনটা যখন টেক করেছিলেন, সচেতনভাবে এই কম্পোজিশন কারুর মাথায় এসেছিল কিনা, জানি না। তবে মনে হচ্ছিল, বড় বড় প্রেমের সিনের সাব-ভার্সন খুব নীরবে এই ছবিতে এখন তৈরি হল যেন।

দর্জি মৌজি-র ভূমিকায় বরুণ ধাওয়ান চমকে দিয়েছেন জাস্ট! কে বলবে এই ছেলেটাই ‘ম্যায় তেরা হিরো’ (২০১৪) বা ‘দিলওয়ালে’র (২০১৫) মত খাজা সিনেমায় গানের সঙ্গে কোমর দুলিয়ে ল্যা-ল্যা করে নাচে! ছবির শুরুর দিকে একটা শট আছে, যেখানে দেখবেন ট্রেনের কামরায় মেঝেতে বসে সঙ্গীসাথীর সঙ্গে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে গান করছে মৌজি। মাইরি, এই সিনে বরুণ ধাওয়ানের যা বডি ল্যাংগুয়েজ, সেটা দেখে কিছুক্ষণ চোখে পলক পড়ে নি আমার!

এরপরেই বলতে চাই অভিনেতা নমিত দাশের কথা। এ ছবি দেখে ভদ্রলোকের ফ্যান ক্লাবে আমি নাম লেখাতে চাই! চিনতে পারলেন না, আরে সিনেমায় ‘গুড্ডু’ নামে সেই লোকটির রোল করেছেন যিনি! কথা বলতে বলতে উলটো দিকের লোকের পেটে আঙুল দিয়ে খোঁচা মারার হ্যাবিট রয়েছে যার! স্ক্রিন টাইম কম, সাইড ক্যারেকটারই বলা চলে বোধহয় তাঁকে। কিন্তু সেই টুকুতেই এমন এমন জেশ্চার যে, সারাজীবন ভুলতে পারবো না তা!

মৌজির মা আর বাবার ভূমিকায় যামিনী দাস আর রঘুবীর যাদবকে নিয়ে আলাদা কিছু লিখছি না কারণ, সত্যি এঁরা অ্যাক্টিং কিছু করেছেন নাকি জাস্ট বিহেভ করে গ্যাছেন, সেটা নিয়েই এখনও অবধি ধন্দে রয়েছি আমি।

জেনারেলি বছরে একটা মেগাবাজেটের সুপারহিরোর সিনেমা বানায় যশরাজ ফিল্মস, সঙ্গে থাকে খানকয় ছোট বাজেটের ‘আন্ডারডগ’ ছবি। গত কয়েক বছরের হিসেব দিয়ে এই ছকতা বুঝিয়ে বলছি দাঁড়ান।

২০১৫-তে যেমন মেগাবাজেটের ব্যোমকেশ মুভি বানানো হল, তার পাশাপাশি কুচো বাজেটের ‘দম লাগাকে হেইসা’। ২০১৬-তে সুপারহিরো ‘সুলতান’ আর ‘ফ্যান’, সঙ্গে একেবারে মিনি বাজেটের ‘বেফিকরে’ দিয়ে ব্যালেন্স। ২০১৭-তে ব্লকবাস্টার ‘টাইগার জিন্দা হ্যায়’, তার সঙ্গে আবার আন্ডারডগ ‘কয়েদী ব্যান্ড’ বা এক্সপেরিমেন্টাল ‘মেরি পেয়ারি বিন্দু’। এবার এই ছকে মিলিয়ে দেখুন এই বছরের মুভি রিলিজের গ্রাফ, দেখবেন খাপে খাপ পুরো ফিট করে গ্যাছে যেন!

বছরের গোড়ার দিকে ছোট বাজেটের ‘হিচকি’ (যেটায় মেন রোলে আবার খোদ বড় কর্তার বৌ), তারপর সেকেন্ড হাফে এক্সপেরিমেন্টাল ‘সুই ধাগা’ আর তারপর দিওয়ালিতে বিগ বাজেট ধামাকা মুভি ‘ঠগস অফ হিন্দোস্তান’! থিয়েটারে ‘সুই ধাগা’কে পুশ দিতে তার সঙ্গে আবার ‘ঠগস অফ হিন্দোস্তান’-এর ট্রেলারটাও জুড়ে দেওয়া। খবরের কাগজে অ্যাড দেখেছেন নিশ্চয় যে, বিগ স্ক্রিনে ‘ঠগস অফ হিন্দোস্তান’-এর ট্রেলার এখন অবধি শুধু এই ছবিতেই আছে!

ছবি তৈরি আর রিলিজ করার এই অঙ্কটা তো একেবারে ঠিকঠাক। প্রশ্ন শুধু একটাই যে, আণ্ডারডগদের বাঁধা গতে জিতিয়ে দেওয়ার এই ফর্মুলা কি অনন্ত কাল চালিয়ে যাবেন দাদা?

মাথা খাটান, ব্রেন স্টর্ম করুন, নতুন কিছু বের করুন এবার প্লিজ। মনে রাখবেন এত বেশি প্রেডিকটেবল হয়ে পড়লে ছবি কিন্তু ছড়িয়ে লাট হবে!

NO COMMENTS