নিজের হারেমে কয়েক হাজার সুন্দরী‚ দিল্লিতে দেহ ব্যবসা নিষিদ্ধ করেছিলেন সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি !

তুর্কীদের একটা শাখা কয়েকশো বছর আগে চলে এসেছিল প্রাচীন গজনী বা আজকের আফগানিস্তানে | ২০০ বছর সেখানে বসবাসের পরে তাঁরা কার্যত আফগানই হয়ে যান | খিলজি সেরকমই একটি জনজাতি | নিজেদের বলতেন তুর্ক-আফগানি | বলীয়ান হয়ে তাঁরা  সেই একই স্বপ্ন দেখতে থাকেন যা সে যুগে সব শক্তিধর গোষ্ঠীই দেখত | তামাম হিন্দুস্তানে প্রভুত্ব কায়েম করা | জালাউদ্দিন খিলজি সেই স্বপ্ন সফল করলেন | ত্রয়োদশ শতকে মামেলুক বা দাস বংশের তুর্কী  কুতুবুদ্দিন আইবেক দখল করেছিলেন দিল্লি | সেই বংশের কর্মচারী ছিলেন জালালউদ্দিন খিলজি | তাঁর ভাইপো হলেন আলাউদ্দিন খিলজি |

# মনে করা হয় আলাউদ্দিনের জন্ম ১২৬৬ বা ১২৬৭ খ্রিস্টাব্দে | আসল নাম ছিল আলি গুরশাসপ | অল্পবয়সে পিতৃহীন আলাউদ্দিন ও তাঁর দু ভাই বড় হন কাকার অভিভাবকত্বে | 

# ১২৯১ খ্রিস্টাব্দে আলাউদ্দিন কারা-র শাসক নিযুক্ত হন | কিন্তু তাঁকে নিয়ে খুশি ছিলেন না আমির অমাত্যরা | সেকথা প্রকাশ না করে তাঁরা তাঁকে উস্কাতে থাকেন দিল্লির মসনদে বসার জন্য | এ বার দিল্লির তখতে বসতে পাগল হয়ে ওঠেন তিনি |

# তার বহু আগেই কাকা জালালউদ্দিনের মেয়ে মালিকা-এ-হিন্দ (উপাধি)-কে বিয়ে করেন আলাউদ্দিন | যদিও সে বিয়ে সুখের ছিল না | ব্যক্তিত্বময়ী স্ত্রী বশে আনতে চেয়েছিলেন স্বামীকে | তাঁর মাও আলাউদ্দিনকে হেনস্থা করতেন | একদিকে দিল্লির সিংহাসন অন্যদিকে অসুখি দাম্পত্য‚ কাকার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসলেন আলাউদ্দিন |

# মাত্র ৬ বছর সুলতান ছিলেন জালালউদ্দিন | বিদ্রোহ ঘোষণা করে তাঁকে অনৈতিক ভাবে হত্যা করেছিলেন আলাউদ্দিন | এরপর নিজে বসেন হিন্দুস্তানের সুলতান হয়ে | বিয়ে করেন সেনাপতি আল্প খানের বোন মহরুকে | এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন প্রথম স্ত্রী মালিকা-এ-জাহান | পিতৃঘাতক আলাউদ্দিনকে তিনি কোনওদিন ক্ষমা করেননি |

# এছাড়াও আলাউদ্দিনের দুই হিন্দু স্ত্রীর কথা জানা যায় | একজন গুজরাতের বাঘেলা বংশের রাজা কর্ণের মেয়ে কমলাদেবী | অন্যজন দেবগিরির রাজা রামচন্দ্রের মেয়ে ঝাত্যপালি | চার বেগমের মোট চারজন পুত্রসন্তানের নাম আছে ইতিহাসে | 

# আলাউদ্দিনের সুলতান হওয়ার পথে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তাঁর কাকি তথা শ্বাশুড়ি | কিন্তু সেই চেষ্টা খড়কুটোর মতো ভেসে যায় | তিনি ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে যান মুলতান | 

# আলাউদ্দিন যখন সিংহাসনে তখন সীমান্তে নিঃশ্বাস ফেলছে মোঙ্গলরা | পঞ্জাব ও সিন্ধে চাঘতাই খানাতে এবং অন্য মোঙ্গল হানাদারদের নির্মম ভাবে রোধ করেছিলেন আলাউদ্দিন | সারা জীবনই তাঁকে যুদ্ধ করতে হয়েছে মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে |

# সীমান্ত রক্ষার পরে আলাউদ্দিনের চোখ পড়ে দেশীয় রাজাদের উপরে | যাঁরা বশ্যতা ও কর্তৃত্ব স্বীকার করেননি‚ তিনি ছারখার করে দিয়েছিলেন | রণথম্ভর‚ গুজরাত‚ দেবগিরি‚ ওরাঙ্গলের কাকাতীয় শাসন‚ মেবারের চিত্তোর ( রানি পদ্মিনী থাকুন বা না থাকুন )‚ হোয়সল‚ পাণ্ড্যতাবড় শক্তিকে নিজের পদানত করেছিলেন আলাউদ্দিন |

# ক্রীতদাস থেকে সেনাপতিত্বে উত্তীর্ণ মালিক কাফুর না থাকলে আলাউদ্দিনের দাক্ষিণাত্য জয় ছিল অসম্ভব | জনশ্রুতি‚ মালিক কাফুরই কাকাতীয় বংশের কুলদেবতার মূর্তি থেকে উপড়ে নিয়েছিলেন কোহিনূর হিরে | উপহার দিয়েছিলেন সুলতান আলাউদ্দিনকে |

# মোঙ্গল ও দেশীয় রাজাদের দমন ছাড়াও সুলতান আলাউদ্দিনের নজর ছিল সংস্কারে | বিশেষ করে রাজস্ব ব্যবস্থা ঢেলে সাজিয়েছিলেন তিনি | যা তাঁর পূর্ববর্তী সুলতানরা করেননি | তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল যে করেই হোক সেনাবাহিনীকে ভাল রাখতে হবে |

# রাজস্বের বেশিরভাগ ব্যয় করা হতো সেনাবাহিনীর জন্য | আলাউদ্দিন জানতেন সফল শাসকের আসল অস্ত্র সৈন্যরা | যাতে শত্রু ও বিদ্রোহ দুইই দমন করা যায় |

# ভূমি সংস্কার ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণেও তিনি ছিলেন পথপ্রদর্শক | যা অনুসরণ করেছিলেন শের শাহ সুরী ও আকবর |

# গ্রাম থেকে রাজস্ব আদায়ে যাতে কোনও মধ্যস্থতাকারী না থাকে সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিলেন আলাউদ্দিন | সবই নিয়ে আসেন কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় | যাতে কোনওভাবেই বিদ্রোহ সংগঠিত হতে না পারে | অমুসলিমদের প্রতি যে সদয় ছিলেন না‚ তা ঐতিহাসিকরা স্বীকার করেন | সুলতানের নির্দেশই ছিল অমুসলিমদের আর্থিক ভাবে দুর্বল করে দেওয়া | যাতে অন্ন সংস্থানেই সব সময় চলে যায় | বিদ্রোহের অবকাশ না থাকে | তাদের উপর চাপানো হয়েছিল জিজিয়া কর |

# নিয়োগ করেছিলেন দক্ষ কর্মচারী ও প্রশাসকদের | যাতে এক কড়িও কর বাদ না যায় | গ্রামের কৃষকদের উপর কর বসাতেন না আলাউদ্দিন | কিন্তু জমিদারদের বিপুল অঙ্কের কর দিতে হতো | যাতে অস্ত্র অর্থ সব হারিয়ে সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করতে পারেন |

# বাজারে দ্রব্যমূল্য ছিল নির্ধারিত | নিজের শাসনে এক কড়িও জিনিসের দাম বাড়তে দেননি আলাউদ্দিন | বন্যা‚ ক্ষরা যাই হোক না কেন‚ দ্রব্যমূল্য রাখতে হবে একই | বাজারে নজরদারির কর্মী থাকত | এক চুল এদিক ওদিক হলেই ছিল কঠোর শাস্তি | ঐতিহাসিক বরনির মতে‚ সৈন্যদের নামমাত্র বেতনে বহাল রাখার ছক ছিল এই নিয়ন্ত্রিত দ্রব্যমূল্য |

# সেনাবাহিনীর দিকে বিশেষ নজর ছিল সুলতানের | সেনা এবং ঘোড়া দুইই হতে হবে সতেজ ও টগবগে | শোনা যায় তাঁর বাহিনীতে ছিল ৪ লক্ষ ৭৫ হাজার ঘোড়সওয়ার | 

# ইসলামে মদ্যপান নিষিদ্ধ | কিন্তু নিজে চূড়ান্ত মদ্যপ ছিলেন আলাউদ্দিন | শেষ দিকে নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন আসক্তি | দিল্লিতে মদ বিক্রি বন্ধ করতে চেষ্টা করেছিলেন | কিন্তু সফল হননি | প্রকাশ্যে মদ্যপানকে করেছিলেন শাস্তিযোগ্য অপরাধ |

# ছিল বিশেষ গুপ্তচর বাহিনী | আমির অভিজাত অমাত্যদের উপর নজরদারির জন্য | যাতে সুলতানের বিরুদ্ধে কোনও বিদ্রোহ না হতে পারে | আমির অমাত্যদের বিয়ের সম্বন্ধও তিনি মঞ্জুর করতেন | তবেই বিয়ে হতো | 

# নিজের হারেমে কয়েক হাজার সুন্দরী থাকলেও দিল্লিতে দেহ ব্যবসা নিষিদ্ধ করেছিলেন | নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে সব দেহ পসারিণী বিয়ে করেন | ব্যাভিচারও ছিল কঠিন শাস্তিযোগ্য | পুরুষ হলে তাকে খোজা করে দেওয়া হতো | মহিলাদের পাথর ছুড়ে হত্যা | জুয়া খেললে বা ব্ল্যাক ম্যাজিকের কারবার ফেঁদে বসলে তাদের জন্য শাস্তি ছিল জীবন্ত পুঁতে ফেলা |

# স্থপত্যেও আছে অবদান | দিল্লিবাসীর জলকষ্ট দূর করতে নির্মাণ করিয়েছিলেন ৭০ একর জায়গা জুড়ে বিশাল জলাধার হউজ-এ-খাস |  সিরি দুর্গ‚ আলাই দরওয়াজা‚ কুয়াত্-উল-ইসলাম মসজিদ তাঁর কীর্তির মধ্যে অন্যতম | যার অনেককিছুই পরে ধ্বংস হয় শের শাহ সুরীর আক্রমণে | 

অতি বড় খলনায়কেরও যেমন কিছু হলেও ভাল দিক থাকে‚ সুলতান আলাউদ্দিনেরও আছে | কিন্তু তা আটকে আছে ইতিহাস বইয়ের পাতাতেই | কামুক‚ পৈশাচিক আলাউদ্দিন খিলজি ঢেকে দিয়েছেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা সংস্কারী সুলতান আলাউদ্দিন খিলজিকে |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here