নেতাজি-ঘনিষ্ঠ আইএনএ-এর এই বীর সেনানায়ক শাহরুখ খানের মাতামহস্থানীয়

1836

চারের দশকে এক মধ্য ত্রিশের ব্যক্তি সাহায্য করতেন একটি মেয়ে ও তার পরিবারকে | পরিবারটি বেশ কিছু বছর পরে জেনেছিল‚ আরও অনেক বছর আগে ওই সাহায্যকারী মানুষ ছিল দেশের নজরের কেন্দ্রবিন্দু | তিনি শাহনওয়জ খান | ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সেনাবাহিনীর প্রাক্তন ক্যাপ্টেন এবং পরে INA-এর মেজর জেনারেল |

ওই বালিকা‚ যার নাম ছিল লতিফ ফতিমা‚ প্রায় শাহ নওয়জের কন্যাসম ছিলেন | এতটাই বন্ধন‚ তাঁর বিয়েও ১৯৫৯ সালে হয়েছিল শাহ নওয়জের বাড়ি থেকে | ১৯৬৫ সালে ফতিমা ও তাঁর স্বামী মীর মহম্মদ খানের সংসারে এক পুত্রসন্তান আগমন | যিনি পরে পরিচিত হবেন শাহরুখ খান নামে |

জেনারেল শাহ নওয়জ খানের জন্ম ১৯১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি‚ রাওয়ালপিণ্ডিতে | তাঁর বাবা টিক্কা খান ছিলেন ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর অফিসার | বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে শাহ নওয়জ সেনায় যোগ দিয়েছিলেন ১৯৩৫ সালে |

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তিনি কর্মরত ছিলেন দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতে | ১৯৪২ এর ফেব্রুয়ারিতে জাপানি ফৌজের কাছে সিঙ্গাপুর পদানত হল | ৪০ হাজার ভারতীয় যুদ্ধবন্দি হলেন | তাঁদের মধ্যে একজন শাহ নওয়জ | এই বন্দিদের মধ্যে অন্তত ৩০ হাজার পরবর্তী সময়ে সুভাষচন্দ্র বোসের নেতৃত্বে যোগ দিয়েছিলেন INA-তে |

ব্রিটিশদের হাত থেকে মাতৃভূমিতে মুক্ত করতে INA হাত মিলিয়েছিল অক্ষশক্তির জাপান ও জার্মানির সঙ্গে | শত্রুর শত্রু হল মিত্র‚ এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নেতাজির | কংগ্রেসের বিপরীত পথে এগোতে চেয়েছিলেন সেনানায়ক | মুসোলিনি-হিটলারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে চর্চা হয়েছে অনেক | কিন্তু তাঁর বা তাঁর বাহিনীর দেশভক্তি প্রশ্নাতীত‚ দলমতনির্বিশেষে |

১৯৪২ সালে জাপানি শক্তি দখল করল আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ | নাম দেওয়া হল শহিদ ( আন্দামান ) ও স্বরাজ (নিকোবর ) দ্বীপ | গঠিত হয়েছিল আজাদ হিন্দ সরকার | ১৯৪৩-এর ৩০ ডিসেম্বর উত্তোলিত হয়েছিল ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা | এরপর ১৯৪৪-এর মার্চে মূল ভারতীয় ভূখণ্ডে কোহিমা অধিকারের পথে এগোলো জাপানি শক্তি‚ বকলমে আজাদ হিন্দ বাহিনী | জাপানি শক্তির পাশে স্ট্র্যাটেজিক সহযোগী হিসেবে থাকল INA | 

এই অভিযান সফল হল না | ব্রিটিশ শক্তির সামনে মুখ থুবড়ে পড়ল INA ও জাপানিরা | তবুও অসম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন শাহ নওয়জ খান | তিনি ও কয়েকজন সৈন্য ঘাঁটি করেছিলেন চিন পাহাড়ে | সেখানে খাবার বা ওষুধ বলতে কিছু ছিল না | বহিনীর বেশিরভাগ সৈন্য ভুগছিলেন ম্যালেরিয়ায় | পাশাপাশি ছিল বন্য জন্তুদের হামলা | ১৯৪৫ এর শুরুতেই বোঝা গিয়েছিল জাপানিদের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী | ওই বছরের মে মাসে ৫০ জন সৈন্য সমেত ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে বর্মার পেগুতে আত্মসমর্পণ করলেন শাহ নওয়জ | তাঁদের যুদ্ধবন্দি করা হল |

১৯৪৫-এর অগস্টে দিল্লির লালকেল্লায় শুরু হল ৬০০ জন INA যুদ্ধবন্দির বিচার | এই নিয়ে দেশ জুড়ে প্রবল প্রতিবাদ শুরু হল | দেশপ্রেমিকদের এভাবে দেশদ্রোহী যুদ্ধবন্দি হিসেবে দেখানো কোনওভাবেই বরদাস্ত করতে পারেনি ভারতবাসী | কিন্তু শেষ অবধি INA সেনানীরা যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত হলেন | তবে দেশবাসীর আবেগের কথা ভেবে তাঁদের শাস্তি রহিত হল | বীর নায়কের সম্মানে তাঁদের বরণ করা হল ১৯৪৫ এর ডিসেম্বরে‚ লাহোরের মিন্টো পার্কে | সেখানে জয়ধ্বনি ওঠে‚ ” চলিশ কড়োঁ কি এক হি আওয়জ‚ সহগল‚ ধিলোঁ‚ শাহ নওয়জ |” তখন দেশের জনসংখ্যা ছিল চল্লিশ লক্ষ |

INA সেনানীদের বিচারপর্ব বা INA সেনাদের প্রাপ্য যা হয়েছিল‚ সে সব আলাদা অধ্যায় | যাই হোক‚ স্বাধীনতা উত্তর দেশভাগের পরে শাহ নওয়জ পাকিস্তান যাননি | যদিও তাঁর বেশিরভাগ আত্মীয় পরিজন ছিলেন পাকিস্তানেই | শাহ নওয়জ ভারতবর্ষ ছেড়ে অন্যত্র যেতে চাননি | ১৯৫২ সালে স্বাধীন দেশের প্রথম লোকসভা নির্বাচনে তিনি মীরাট থেকে জয়ী হয়েছিলেন | ১৯৬৪ সাল অবধি রেল মন্ত্রকে তিনি ছিলেন উপমন্ত্রী | পরবর্তীকালে আরও নানা মন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করেছেন | ১৯৬৭ এবং ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে পরাজিত হন শাহ নওয়জ খান | তিনি প্রয়াত হন ১৯৮৩ সালে | স্বাধীন ভারতে তাঁর নেতৃত্বে গঠিত নেতাজি কমিশন অবশ্যই উল্লেখ্য | শেষ অবধি এই কমিশন মেনে নিয়েছিল‚ তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনাতেই প্রয়াত হয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু | এই কমিশন ও তার কাজকর্ম নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে |

একথা অনস্বীকার্য ভারতের স্বাধীনতা ত্বরান্বিত করেছিল আজাদ হিন্দ বাহিনীর সংগ্রাম | যার পুরোভাগে ছিলেন জেনারেল শাহ নওয়জ খান |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.