ভূমিপুত্রদের কাছ থেকে অরণ্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া কি অপরাধ নয়!?

অরণ্যের অধিকার। দশ লক্ষতে – কয়জনা মানুষ হয় গ বাবুমশাইরা ? দশ কোটিতেই বা কয়জনা মানুষ হয় ? মুদের জল-জঙ্গল-আকাশ – ব্যাবাক তুমরা সাফ কইরা দাও … তাতে মুদের কুনো দুষ নাই, তাতে মুদের কুনো হাত নাই গ… এই হতচ্ছাড়া গরিবিটাই মুদের দুষ … অনেক কথা কইলাম, বাবুমশাইরা – তুমরা আনন্দ কর গ যাও, তুমাদের ঘরে বালবাচ্চা হোক …

সভ্যতা, তুমি শতপুত্রের জননী হও। অরণ্যের অধিকার – আজ অপসৃত, সুপ্রীম কোর্টের আদেশনামাতে সিলমোহর পড়তে পেরেছে। ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ …

মাফ করবেন, আদিবাসীদের নিয়ে সরাসরি কিছু বলতে যাওয়াটা বিপজ্জনক। এতগুলো প্রেজুডিস, এতগুলো রাজনৈতিক অর্থনৈতিক হিসেবনিকেশ – তাদেরকে নিয়ে জড়িত, সরাসরি কিছু বলতে যাওয়াটাই বিড়ম্বনার। কিছু বলতে চেষ্টা করাটাই দুঃসাহসের পরিচয়। আসলে, তাদের আর আমাদের মধ্যেকার অতলান্তিকসম যে একটা বিভাজন, চিরটাকাল থেকে আসতে পেরেছে, আমরা একে-অপরকে সঠিক ভাবে চিনেই উঠতে পারিনি। কালো-কুলো, বেঁটে-বেঁটে, তির-কাঁড় চালানো শিডিউলড ট্রাইবের দল – রিজার্ভেশন ছাড়া বোধহয়, ওদের আর কিছুই পাবার নেই।

সম্প্রতি ফরেস্ট রাইটস এ্যাক্টের বিরুদ্ধে কিছু বন্যপ্রাণ-বন্যপশুপ্রেমী সংগঠন আদালতে গিয়েছিলেন। তাঁদের পিটিশন অনুযায়ীই, ভারতবর্ষের মহামান্য সুপ্রীম কোর্ট আদেশনামা জারি করে জানিয়েছেন যে, দেশজুড়ে কমবেশী দশ লক্ষ আদিবাসীকে (যাঁরা কিনা অরণ্যসীমার মধ্যে বসবাস করে আসছেন এবং মামলাকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী অরণ্য-বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতিসাধন করছেন, তাঁদেরকে) উচ্ছেদ করা হবে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ফরেস্ট রাইটস এ্যাক্ট সংবিধানের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিধান হওয়া সত্ত্বেও – মামলার দিন কোনও সরকারি আইনজীবীই, আদালতে সরকার বা আদিবাসীদের পক্ষে সওয়াল করতে উপস্থিত ছিলেন না। মনে রাখতে হবে যে, ভারতবর্ষে জল-জমি-অরণ্যের উপরে আদিবাসীদের অধিকার, সংবিধান-স্বীকৃত অধিকার। তারাই আমাদের প্রাচীনতম পূর্বপুরুষ। আমাদের দেশের সত্যিকারের ভূমিপুত্রের দল।

আমাদের দেশে আদিবাসী জনসংখ্যা কমবেশি দশ কোটির কাছাকাছি। অর্থাৎ কিনা মোট জনসংখ্যার প্রায় সাত দশমিক ছয় শতাংশ (মোট জনসংখ্যা একশো ত্রিশ কোটি ধরলে পরে)। অথচ, আজ যখন – সমস্ত বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প (মূলত বড় কারখানা, খনিজ শিল্প) ইত্যাদির কারণে প্রচুর সংখ্যক মানুষ উচ্ছেদ হন – তাঁদের মধ্যে প্রতি একশো জন উদ্বাস্তুর ত্রিশ থেকে চল্লিশ জনই কিন্তু শিডিউলড ট্রাইবের আওতায় পড়েন। বৈষম্য নয় ? মাফ করবেন, আমি সহানুভূতি কুড়ুতে আসিনি। কেবল দুএকটি তথ্য পেশের চেষ্টায় আছি। বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা আপনাদের কাজ।

গবেষকেরা বলছেন, অরণ্যকে সত্যি সত্যি বাঁচিয়ে রাখতে পারে – তার ভূমিপুত্রেরাই। গবেষকেদের কচকচিকে দূরে সরিয়ে রেখে আমরা বরং একআধখানা গল্প শুনে নিই চলুন।

১৯২১ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর। ভুটানের রাজা তাঁর দেশের উন্নতিকল্পে ভারতবর্ষের ব্রিটিশ শাসকদের সাহায্য চাইলেন। ব্রিটিশ ভাইসরয় জানালেন, সাহায্য মিলতেই পারে – বদলে ভুটানের অরণ্যসম্পদের একচ্ছত্র মালিকানা তুলে দিতে হবে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের হাতে। ভুটানের রাজা তাঁর প্রস্তাব ফিরিয়ে নিলেন। কেটে গেলো অনেকগুলো বছর। স্বাধীন হলো ভারতবর্ষ। প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে চুক্তি করলো ভুটান। কেটে গেলো আরও সময়। একবিংশ শতাব্দীতে প্যারিস আন্তর্জাতিক পরিবেশ সম্মেলনে, সেই ১৯২১ সালের রাজামশাইয়েরই যোগ্য উত্তরসূরি রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করলেন, ভুটান প্রতি বছরে যত পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপাদন করে, তার তিনগুণ পরিমাণ গ্যাস সে শোষণও করে – সৌজন্যেঃ ভুটানের চিরহরিৎ অরণ্যানী। ব্রিটিশদের হাত থেকে যাকে সস্নেহে বাঁচিয়ে রেখে এসেছেন ভুটানের রাজাধিরাজেরা। এরজন্য কাউকে উচ্ছেদ হতে হয়নি বোধহয়।

তাঁর চিরস্মরণীয় বই, বিরসা মুন্ডার জীবনী ‘অরণ্যের অধিকার’-এর ত্রয়োবিংশ সংস্করণের ভূমিকায় – লেখিকা ও সমাজকর্মী মহাশ্বেতা দেবী লিখেছেন, “বিরসার আন্দোলনের পিছনে অরণ্যজনিত উদ্বেগ যত, তার চেয়েও বড় উদ্বেগ ছিল আদিবাসীদের জমি-ভূমি চলে যাবার জন্য বিপন্নতা”। বিরসা আমাদের দেশের প্রথম (এবং সম্ভবত এখনও একমাত্র) আদিবাসী নেতা যাঁর ছবি ভারতবর্ষের পার্লামেন্টে শোভিত। আপনারা যদি জিম করবেটের “মাই ইন্ডিয়া” বইটি পড়ে দেখেন, তবে দেখবেন – সেখানেও উল্লেখ রয়েছে যে, কিভাবে রেলপথ তৈরির প্রয়োজনে নির্বিচারে আদিবাসীদের বাসভূমি তরাই ও ভাবর অঞ্চলের অরণ্য সম্পদকে ব্রিটিশ প্রতিভূরা ধ্বংস করে এসেছেন। অসভ্য নয়, সভ্যদের হাতেই প্রকৃতির বিনাশ। মধ্যপ্রদেশের জঙ্গলে “কোরকু” উপজাতির সমস্ত মানুষকে উচ্ছেদ হতে হয়েছিল সরকারি রেলকর্মীদের হাতেই। মহাশ্বেতা দেবীর “মাহদু” গল্পে তার উল্লেখ পাবেন। কাজেই অরণ্যপ্রাণ রক্ষার্থে আদিবাসী-উচ্ছেদ – এই যুক্তিকে সাদা চোখে মেনে নেওয়াটা কষ্টকর।

অরণ্য একাধারে ধাত্রী, পালয়িত্রী ও রক্ষয়িত্রী – এ আমার কথা নয়, মহাশ্বেতা দেবীর কথাও নয় – এমনকি কোনও ঝোলাওয়ালা কিংবা গামছাওয়ালা বুদ্ধিজীবীর কথাও নয়। এ সংলাপ ছিল বিরসার গলায়। ১৮৯০এর দশকে এক সামান্য আদিবাসী, উনিশ বছর বয়সী রগচটা খ্যাপা অসভ্য ‘বারবারিক’ নেতা বিরসা মুন্ডার গলায়। সুরেন ব্যানার্জীরা তখন কলকাতায় বসে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সবেমাত্র একটুআধটু লিখতে শুরু করেছেন।  ‘গাছেদেরও প্রাণ আছে’ – বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্রের এই দাবিটিও তখন অপ্রকাশিত – (যা কিনা প্রকাশিত হবে বিরসার মৃত্যুরও প্রায় কুড়ি বছর পর)। অথচ সেই সময়েই, শহর কলকাতা থেকে বেশ অনেকটা দূরে, সিংভূম-পুরুলিয়ায় মুন্ডা আদিবাসীদের নেতা হয়ে বসলো এমন এক যুবক – যে কি না জল-জমি-মাটি-আর-অরণ্যের সংরক্ষণের কথা বলবে। আর স্বাধীনতার সাত দশক পরেও, আমরা তাদেরকে কেবল শিডিউলড ট্রাইব বলেই চিড়িয়াখানার বাসিন্দে করে রাখতে চাই।

আদিবাসীদেরকে হিরো বানাবার চেষ্টা করছি না, তাদেরকে অকারণে বীর্যবান করে দেখানোটাও আমার উদ্দেশ্য নয়। কেবল প্রশ্ন করতে চাই, ভারতবর্ষীয় সভ্যতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত যে একটি সম্প্রদায়, জনসংখ্যার বিচারে প্রায় আট শতাংশের কাছাকাছি যাঁদের প্রতিনিধিত্ব – তাঁদের জীবন ও জীবিকার বিষয়ে একটি মামলা যখন সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন, এবং যার ফলশ্রুতি হিসেবে প্রায় দশ লক্ষ মানুষের উদ্বাস্তু হবার সম্ভাবনা রয়েছে – তেমন একটি ক্ষেত্রে কেন্দ্রের সরকার তাঁদের কোনও প্রতিনিধিকে পর্যন্ত সেই শুনানিতে পাঠালো না ? এই উদাসীনতার কারণ কী ? বচ্ছরভর কেবল ভোট আর উন্নয়ন নিয়ে মেতে থাকলেই বুঝি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় তাঁদের ? আসলে কি জানেন, আমাদের আর ওদের (ধনীদের এবং গরিবদের, শহুরে ভদ্রলোকেদের এবং বনচারী আদিবাসীদের) মধ্যেকার যে অতলান্তিকসম বিভাজন তা বুঝি কোনোদিনেই ঘোচার নয়। সেক্ষেত্রে আমরা, কেবল কলমে আর ‘কলাম’-এই বরং নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ রাখি আসুন। ‘সাচ্চা সহানুভূতি’তে, আমাদের সঙ্গে পাল্লা দেবার সাহস কারোর নেই। কালি-কলম-মন, এই নিয়েই আমাদের সংসার। আদিবাসীরাই বরং আবার পাল্টা মামলা করুক।

অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম – ১৯৯২, কলকাতায়। ২০১৪-এ পশ্চিমবঙ্গ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক্স এঞ্জিনিয়রিং-এ স্নাতক, পরে আইআইইএসটি, শিবপুর থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ ২০১৬-এ। বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক। নেশা বলতে বই আর বেড়ানো। শখের তাগিদে নানারকম বিষয়ে লিখে থাকেন। পছন্দ বলতে পরিবেশ আর মানুষের গল্প বলা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here