ঝাড়ুদারের ঘরে মানুষ জন্ম পরিচয়্হীন প্রাচীন বাস্তুকারের নামেই নামকরণ ভূস্বর্গের সোপরের

গোলা বারুদ আর রক্তের গন্ধে মনেই পড়ে না এখানেই আছে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম ফলের বাজার | ফুলের পাশাপাশি প্রকৃতি ফলেও অকৃপণ ভূস্বর্গে | কাশ্মীরের বারমুলা জেলায় অবন্তীপুরা থেকে ৭৮ কিমি উত্তরে আছে সোপর | এখন জঙ্গি নাশকতার কেন্দ্রবিন্দু হলেও এর আরও কোমল পরিচয় আছে | এই শহরকে বলা হয় আপেল-নগরী | 

নৈসর্গিক দৃশ্যে সাজানো এই জনপদ সত্যি ছিল এর শাসকদের অ্যাপল অফ আই | নিজের চোখের মণিকে মনের মতো করেই সাজিয়েছিলেন রাজা অবন্তীবর্মন | উৎপল বংশের এই শাসক ছিলেন কাশ্মীরের যোগ্য শাসকদের মধ্যে একজন | তাঁর রাজ্যে তাঁর সময়ে এক সুদক্ষ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন সুয়া | তাঁর নামেই নাম হয়েছিল সুয়াপুরা | সেখান থেকেই সোপর | কেন‚ এই নামকরণ সে বিবরণ আছে কলহনের রাজতরঙ্গিনী বইয়ে |

প্রাচীন কাশ্মীরে প্রায়ই হতো ভয়ঙ্কর বন্যা | প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হতো উপত্যকার বাসিন্দাদের | প্রজাদের দুর্দশা দূর করতে উদ্যোগী হলেন রাজা অবন্তীবর্মন | তাঁর পূর্বসুরি রাজা ললিতাদিত্য মুক্তপীড়া বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন | কিন্তু সে সব নদী বাঁধ বা সেচ ব্যবস্থা যথেষ্ট পোক্ত ছিল না | ফলে এর সুদূরপ্রসারী ফল পায়নি কাশ্মীরবাসীরা |

যখন এই সমস্যায় রাজা অবন্তীবর্মন (৮৫৫ খ্রিস্টাব্দ-৮৮৩ খ্রিস্টাব্দ) জেরবার‚ যেন ঈশ্বরপ্রেরিত দূতের মতো এলেন সুয়া | যদিও তাঁর জন্মরহস্য কুয়াশায় ঘেরা | কে তাঁর প্রকৃত বাবা মা‚ জানা যায় না | কিংবদন্তি বলে‚ সদ্যোজাত সুয়াকে পথের পাশে ফেলে রেখে গিয়েছিল কেউ বা কারা | স্থানীয় এক ঝাড়ুদার ভোরবেলা কাজে বেরিয়ে কোলে তুলে নেন অনাথ পরিত্যক্ত শিশুকে | 

একবার রাজ্যে তীব্র ক্ষরা | অবন্তীবর্মনের রাজসভায় এলেন সুয়া | বললেন তাঁকে যদি সোনার মোহর ভর্তি পাত্র দেওয়া হয়‚ তবে তিনি সমস্যার সমাধান করবেন | সভাসদরা বললেন‚ তিনি ঠক ও প্রতারক | কিন্তু স্বয়ং রাজা চাইলেন তাঁকে একবার পরীক্ষা করে দেখতে | 

তিনি বিনা প্রশ্নে কয়েক পাত্রভর্তি সোনা দিলেন সুয়াকে | তারপরেই অবাক হওয়ার পালা | রাজা এবং উপস্থিত সবার | সবার চোখের সামনে মোহরগুলি নদীতে ফেলে দিলেন সুয়া | পলকের মধ্যে উপস্থিত জনতা ঝাঁপিয়ে পড়ল | সবাই চায় মোহর | অগভীর নদীতে যেভাবেই হোক সোনার মোহর পেতে মরিয়া দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষ | এই হুড়োহুড়ি চলল বেশ কিছুক্ষণ | একসময় সবাই শ্রান্ত হয়ে রণে ভঙ্গ দিল | অনেকেই পেয়েছেন মোহর | কেউ বেশি‚ কেউ কম | কিন্তু তাদের এই হুড়োহুড়িতে যা হয়েছে‚ নদীর কোল পরিষ্কার হয়ে গেছে | জমে থাকা কাদা বালি এবং পাথর উঠে এসীছে | ফলে নদী আগের থেকে অনেক বেশি গতিতে বইতে লাগল | এক নিমেষে আমূল পাল্টে গেল ছবি | কোনও কথা না বলে রাজার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন সুয়া |

বদ্ধ নদীকে এইভাবে সচল করতে দেখে মুগ্ধ রাজা বিস্ময়ে বাকহীন | এরপর সুয়ার উদ্যোগে নদীর সংস্কার সাধন করা হয় | পলি তুলে পরিষ্কার করা হয় নদীর কোল | দেওয়া হয় বাঁধ | অনেকটাই সুরাহা হয় ঘন ঘন বন্যা পরিস্থিতির | রাজা অবন্তীবর্মনের পৃষ্ঠপোষকতায় সুয়া ব্যাপক পরিবর্তন করেন নদীবাঁধ ও সেচ ব্যবস্থার | ঝিলম ও তার শাখানদীর গতিপথ এমনভাবে পাল্টান যাতে তারা প্রবাহিত হয়ে গিয়ে পড়ে উলার হ্রদে | এতে একদিকে বন্যার হার কমল | আবার অন্যদিকে নদীর জল কাজে লাগল কৃষিতে | তাঁর উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল বহু কুয়ো | সেসব কুণ্ডের চিহ্ন আজও আছে অবন্তীপুরা ও সোপরের নানা অংশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে | সুয়ার পরামর্শে রাজা অবন্তীবর্মন উলার হ্রদে মাছেদের প্রজননের সময়ে মাছ ও পাখি শিকার বন্ধ করে দেন | 

মোট কথা‚ সুয়ার অবদানের জন্যই নাম হয় সুয়াপুর | সেটাই আজকের সোপর | কিন্তু কোথায় হারিয়ে গেছে ইঞ্জিনিয়ার সুয়া | 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here