বাঃ! তাজপুর

2484
প্রথমবারেই ভালো লেগে গিয়েছিল তাজপুর

বর্ষাকাল এলেই বছরে অন্ততঃ একবার ব্যাগ গুছিয়ে তাজপুর চলে যাই | প্রথমবারেই ভালো লেগে গিয়েছিল সমুদ্রের ধারের এই জায়গাটা | সে বছর ছয়েক আগের কথা – খুব কাছের লোক দিব্যেন্দু ওখানে একটা রিসর্ট বানিয়েছে – খালি বলত ‘একবার তাজপুর ঘুরে যান দাদা |’  আজকাল ট্রেন হওয়াতে দীঘা যাওয়াটা অনেক আরামের | তাজপুর যেতে গেলে ভোরের ট্রেনে চেপে আগের স্টেশন রামনগরে নেমে পড়তে হবে – ওখান থেকে তাজপুর আধঘন্টার রাস্তা – চোদ্দ মাইল পেরিয়ে বালুশাহির পর রাস্তা ঢুকে গেছে সমুদ্রের দিকে – দু’পাশে শুধু ফিশারিজ-এর বিশাল বড় বড় পুকুর – বর্ষায় জল উপচে পড়ে _ এরপর রাস্তাটা বাঁক নিয়ে সমুদ্র আর ঝাউবনকে পাশে রেখে সোজা চলে গেছে মোহনা অবধি

তাজপুরের মোহনা

– পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রচুর হোটেল আর রিসর্ট – কোনটাই ঠিক বিচ-এর ওপর নয় – কারণ ওটা বেআইনি – দিব্যেন্দুর তাজপুর রিট্রিট একটু ভেতরে তবে মিনিট দু-এক হাঁটলেই ঝাউবনের মধ্যে দিয়ে সরু রাস্তা এঁকেবেঁকে চলে গেছে সমুদ্রের ধারে – বালিয়াড়ির ওপর ছোট ছোট ঝুপড়িগুলো প্রথম থেকেই ছিল…জলের মধ্যে কোমর ডুবিয়ে বসে থাকো – ডাব চলে আসবে – ইদানীং দেখছি ফুর্তির সবরকম আইটেমই মজুত – ঠান্ডা বিয়ার – কাঁকড়ার ঝাল – টাটকা মাছভাজা – একটু আগে জানালে দেশী মুরগির কারি আর ভাত |

হিসেবনিকেশে ব্যস্ত পরিমল

পরিমলের ঝুপড়িতে ভিড়টা একটু বেশি, ওর বউ রাঁধে দারুণ | একটু নির্জনতা পেতে শুধু কর্তা-গিন্নি মিলেই যাই তবে দলেবলে গিয়েও হইচই হয়েছে প্রচুর | সেবার রজত আর পিয়ালী ছিল – সন্ধেবেলায় গানের আসর জমে গেল – দিব্যেন্দুও ছিল ওর দুই বন্ধুকে নিয়ে – ওঁরাও গান-টান করেন…প্লেট ভর্তি আমোদি আর পমফ্রেট মাছের ফ্রাই আসছে গরম গরম আর ওদিকে রজত গেয়ে চলেছে ‘কাহারবা নয় দাদরা বাজাও’… ‘সে কথা কি জানে ইন্দু’…মাঝে মাঝে এক-আধটা অখিলবন্ধু |

পরের দু’বার ছিল আরো বড় দল – তার মধ্যে আমার ভাগ্নে কট্টর ধ্রুপদীয়া সায়ন ছিল মধ্যমণি…মনে আছে অনেক রাত অবধি প্রায় অন্ধকার সমুদ্রের পাড়ে বসে আমাদের সঙ্গীত সম্মেলন | এর মধ্যে হাজির আরেকটা দল…তারাও বসে গান শুরু করে দিল…এক মহিলার হিন্দি ফিল্মের গানের দাপটে সমুদ্র প্রায় উত্তাল হয়ে উঠল – আমরাও ছাড়বার পাত্র নই – ওই ছায়াময় পরিবেশে দু’পক্ষের গানের তরজা চলেছিল বহুক্ষণ | আমাদের রিট্রিটের সামনে দিয়েই সোজা রাস্তা মোহনা অবধি চলে গেছে – অনেকে গাড়ি করে এসে এখানে সারা দিন কাটায় – অনেকটা খোলা বালির চড়া – সরু একটা খাঁড়ি ঢুকে গেছে – ওপারেই মন্দারমণি | নৌকো চেপে একবার সবাই সমুদ্রের মধ্যে গিয়ে উথাল পাথাল হয়ে এসেছিলাম | মোহনার প্রান্তে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা ভোলা যায় না – ঝাউবনের ফাঁক দিয়ে আকাশের গায়ে তখন তীব্র গেরুয়া রঙের ছড়াছড়ি |

বালির ওপর দিয়ে হাঁটতে ভীষণ ভালো লাগে

জলে নেমে হাত পা ছোঁড়ার তুলনায় আমার সমুদ্রের পাড় দিয়ে হাঁটতে বেশি ভালো লাগে | একবার সন্ধের মুখে কর্তা-গিন্নি ছেলেকে নিয়ে ঝাউবন দিয়ে হোটেলে ফেরার রাস্তাটা ছাড়িয়ে চলে গিয়েছিলাম বহু দূর…ভিজে বালির ওপর দিয়ে হেঁটেই যাচ্ছি…অনেক পড়ে মনে হলো ভুল দিকে এসেছি…চারদিক তখন অন্ধকার…অনেক কষ্টে একটা বাজার খুঁজে পেয়ে ভ্যান রিক্সা জোগাড় করে রিসর্টে ফিরলাম – দিব্যি একটা অ্যাডভেঞ্চার হয়ে গেল |

তাজপুরের নিরিবিলি বালিয়াড়ি

রিট্রিটে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ভালোই – চেনা বলে যত্ন-আত্তিটা একটু বেশি পাই | তাজপুরে গাছপালা প্রচুর – বর্ষায় আরো সবুজ হয়ে ওঠে…টুরিস্টরা ছাড়া কোলাহল করার লোক কম…যদিও কোনও কোনও হোটেল বক্স বসিয়ে জোরে গান বাজানোর বদভ্যাসটা রপ্ত করে ফেলেছে | উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়ানোর জন্য তাজপুর আদর্শ…কেয়া ঝোপ আর ঝাউগাছের দোল খাওয়া দেখতে দেখতে চোখ চলে যায় অনেক দূর পর্যন্ত – মাঝে মাঝেই কানে আসে পাখির ডাক আর ঢেউয়ের শব্দ – ফিরতি পথে দূর থেকে দেখা যায় রিট্রিটের বাগানে আলোগুলো সব জ্বলে উঠেছে…গেট দিয়ে ঢোকার মুখে চাচার অনেক দিনের পুরানো দোকান…সিগারেট-চিপস-বোতলের জল-ঝিনুকের পুতুল-টুকিটাকি জিনিস…সাদা লম্বা দাড়িওয়ালা বয়স্ক লোকটিকে সারাদিনে বড় একটা দেখা যায় না – মাঝে মাঝে দোকান খোলে আবার সাইকেল চেপে হওয়া হয়ে যায় |

চাচা

খুব সকালে একদিন শিসের আওয়াজ শুনতে পেলাম – হিন্দি গানের সুর – দেখি চাচা…উনি নাকি বাঁশি বাজাতেন…সেটা ভেঙে যাওয়াতে এখন শিস ধরেছেন…বসে খানিক গল্প-টল্প করলে গানও গেয়ে শুনিয়ে দেন…রফি ভক্ত চাচা… “বড়ি দূর সে আয়ে হ্যায় …”| ওঁর একটা ছবি আঁকলাম – বেশ খুশি…আগাম জানিয়ে রাখলেন…পরের বার ওঁর বাড়ি নিয়ে যাবেন…পুকুর থেকে শোল মাছ তুলে রেঁধে খাওয়াবেন…বললাম অবশ্যই…ততদিন ভালো থাকবেন…ওপর দিকে দু’হাত তুলে চাচা শরিফ আলি বললেন… “আল্লার রহমত” |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.